গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন মাত্রা ও অভিযোজন রয়েছে এবং দেশ ও সময় ভেদে গ্রামীণ উন্নয়নে নেয়া পদ্ধতির ভিন্নতা থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গ্রামীণ উন্নয়ন বলতে বোঝানো হয় গ্রামীণ মানুষের সামগ্রিক সুষম ও সমানুপাতিক কল্যাণ। কিভাবে এটি কাজ করে এবং এটি কোন পদ্ধতি গ্রহণ করে, তা বেশ কিছু উপাদানে নির্ধারিত ও প্রভাবিত হয়।
গ্রামীণ উন্নয়নের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় যখন ১৯৫৬ সালে কুমিল্লার কোটবাড়িতে ভি-এইড (গ্রামীণ কৃষি ও শিল্প উন্নয়ন) একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল সরকার ও সাধারণ মানুষের মোট সম্পদ সমন্বয় করে গ্রামীণ জীবন পুনর্গঠনে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানো। ড. আকতার হামিদ খান (একজন সাবেক আইসিএস কর্মকর্তা) ছিলেন এ একাডেমির প্রধান। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (বিএআরডি বা বার্ড) প্রকাশ পায় ১৯৫৯ সালে, যেটি কুমিল্লা একাডেমি হিসেবে বেশি পরিচিত। এ একাডেমি এক সেট পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়, একটি প্যাকেজে একীভূত করে, যেটি বিস্তৃতভাবে ‘কুমিল্লা মডেল’ নামে পরিচিত। চার প্রধান উপাদান ছিল: থানা ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (টিটিডিসি), রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম (আরডব্লিউপি), থানা ইরিগেশন প্রোগ্রাম (টিআইপি) ও প্রতিটি থানায় (এখন উপজেলা) টু-টায়ার কো-অপারেটিভ সিস্টেম (কিএসএস)। এ চার উপাদান দেশজুড়ে প্রতিলিপি করা হয়েছিল।
ওই সময়ের সরকার উন্নত জাতের বিভিন্ন বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ সুবিধা ও আধুনিক কৃষিচর্চার মাধ্যমে দ্রুত কৃষি উন্নয়নের দিকে মনোযোগী ছিল। কুমিল্লা মডেলের আওতাধীন এলাকাগুলোর উন্নতির অভিজ্ঞতার আলোকে, সরকার প্রবর্তন করে ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিআরডিবি) প্রধানত টিটিডিসি ও কেএসএস উপাদানগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য, যখন বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন (বিএডিসি) ও লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো (এলজিইবি, এখন এলজিইডি) গঠন করা হয় যথাক্রমে টিআইপি ও আরডব্লিউপির জন্য। আশির দশকের শুরুতে সেচ যন্ত্রপাতি, সার ও অন্যান্য উপাদান সরবরাহ বেসরকারীকরণ হয়ে যায় এবং এ জন্য বিএডিসি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইউএন-এফএওর উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে আইআরডি ধারণা চালু করা হয়েছিল এবং এ পদ্ধতি প্রমোট করার জন্য এবং ১৯৭৯ সালে রোমে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অন এগরারিয়ান রিফর্ম অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (ডব্লিউসিএআরআরডি) অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭৯ সালে সিরডাপ গঠন করা হয়।
সত্তরের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের সমস্যা সরকারগুলোর নজর কেড়েছিল এবং এ সমস্যা মোকাবেলায় বিস্তারিত প্রোগ্রাম পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ধারাবাহিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো এ ইস্যু ব্যাপকভাবে মোকাবেলা করেছিল এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দিয়েছিল। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (এফএফওয়াইপি ১৯৭৩-৭৮) বিভিন্ন লক্ষ্য স্থির করলেও সর্বাগ্রে জোর দেয়া হয়েছিল দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপর। এটি উন্নয়নের জন্য উৎপাদন ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয়ের জন্য পরিকল্পনা করেছিল। গ্রামীণ মানুষদের সংগঠিত করা, সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও স্থানীয় পরিকল্পনা সিস্টেম উন্নয়ন সমস্যা সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে সামলে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশলে জোর দেয়া হয়েছেÑ ক. গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জন্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান প্রোগ্রাম, খ. প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত গ্রামীণ সড়ক ও বাজারের মতো প্রত্যক্ষ অবকাঠামো উন্নয়ন, গ. কৃষি সেচ নিষ্কাশন ও ক্ষুদ্র বন্যা নিয়ন্ত্রণকাজ, ঘ. মৎস্য চাষ, পশুপালন, পোলট্রি ও অন্যান্য ফসলবহির্ভূত কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং ঙ. কৃষিবহির্ভূত কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
২. রূপান্তর বৈশিষ্ট্য
যদিও দেশের পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক দারিদ্র্যের ব্যাপ্তির বহুমাত্রিক চরিত্র চিহ্নিত করেছে, তবে আনুষ্ঠানিক দারিদ্র্যের পরিমাপে আয় বা ব্যয়ের মাত্রা ব্যবহার করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। দারিদ্র্যের (দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা জনসংখ্যা) হার ১৯৭০ দশকের ৮০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০১০ সালে হয় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ (বিবিএস ২০১১)। ২০১৫ সালে দারিদ্র্যের হার আনুমানিক ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যখন চরম দরিদ্রের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে দারিদ্র্য হ্রাসের বার্ষিক গড় কমে গেছে, এটি ২০০৫-১০ সময়ের ১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০১০-১৬ সময়ে হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অপেক্ষাকৃত উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাবে এসব উন্নতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। তা সত্ত্বেও এখনো দারিদ্র্য বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ, যেহেতু সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের ব্যাপ্তি উচ্চমাত্রায় বজায় রয়েছে।
বাংলাদেশে বিস্তৃত গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা চারটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি ঘিরে পরিচালিত হয় : ক. প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও কাঠামোগত পরিবর্তন; খ. কৃষি, মৎস্য চাষ, পশুপালন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মতো খাতগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম; গ. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও আবাসনের মতো অকৃষি উপাদান এবং ঘ. টার্গেট গ্রুপ দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
দারিদ্র্য নিরসনে দু’টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ফ্যাক্টর হলো : ১. শ্রম আয়ের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি, যা পরিবারের ব্যয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং ২. জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, বিশেষ করে নিম্নতর জন্মহারের কারণে নিম্নতর নির্ভরতা অনুপাত। সরকারি ও বেসরকারি পরিবর্তনও দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রেখেছে।
আয়-উপার্জন ও দারিদ্র্য হ্রাস দ্রুততর করতে সপ্ততম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) বেশ কিছু মৌলিক বিষয় ও লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে :
২০১৬-২০ সময়ে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় বছর প্রতি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ মাথাপিছু দারিদ্র্য অনুপাত ৬ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট হারে হ্রাস এবং চরম দারিদ্র্য ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট হারে শিল্প খাতে কর্মস্থানের পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে আংশিক বেকার ও শ্রমবাজারে আসা নতুনদের বেশির ভাগের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল গ্রহণ, যার লক্ষ্য থাকবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ ও সুবিধাপ্রাপ্তি টেকসই উন্নয়নের পথ খোঁজা, যেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে স্থিতিশীল থাকবে। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার ঘটবে এবং শহুরে রূপান্তরকে টেকসইরূপে পরিচালনা করবে।
সরকারের সাথে সাথে দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে এনজিওগুলো অন্যতম কার্যকরী সংস্থা হয়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে কাজ শুরু করে দেয়ার পর এনজিওগুলোর নিজেদের প্রকল্প বাড়িয়েছে এবং সমাজে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে কার্যকরী এজেন্ট হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। এখন দারিদ্র্যবিমোচনসহ গ্রামীণ উন্নয়ন, জেন্ডার সমতা, পরিবেশ নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার ও অন্যান্য ইস্যুতে নজর দেয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এ সংস্থাগুলো। এনজিওর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। তবে একই সাথে দরিদ্রদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে সহযোগিতা করার জন্য এদের কার্যক্রমের পরিধিরও বিস্তৃতি ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে গ্রুপ গঠন, ক্ষুদ্রঋণ, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, মা ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও কল্যাণ, নারীর উন্নয়ন, কৃষি, মৎস্য চাষ, পোলট্রি ও পশু, পরিবেশ, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, ওকালতি, মানবাধিকার, আইনি সহায়তা, ভূমি ও সম্পদ বিতরণ ও আরো অন্যান্য ক্ষেত্র।
বাংলাদেশ কৃষি খাতের উৎপাদন পারফরম্যান্স বিশেষ করে শস্য খাত, দারিদ্র্য ও অপুষ্টির হার ও কাঠামো, ট্রেড ব্যালান্স ও সরকারি আর্থিক অবস্থা এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখছে। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে ফসল উৎপাদন, বিশেষ করে খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কৃষি প্রোগ্রাম গ্রহণ করেছে। বছর ধরে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নেয়া কৌশল ফসল খাতের দ্রুত রূপান্তরের জন্য ‘বীজ-পানি-সার’ প্রযুক্তির প্যাকেজ প্রোগ্রাম গ্রহণে জোর দিয়েছে।
৩. গ্রামীণ রূপান্তরের জন্য প্রোগ্রামের স্থায়িত্ব
৩.১ মৌলিক ইস্যু
একটি ছোট দেশে ১৬ কোটির বেশি লোকের জীবিকাকে সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি অসাধারণ সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এ দেশের অর্থনীতি দুই দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ‘নিম্ন আয়ের দেশ’ থেকে ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে’ উন্নীত হয়েছে (বিশ্বব্যাংক অনুসারে) এবং ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ থেকে ‘ উন্নয়শীল দেশ’ হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে (জাতিসঙ্ঘ অনুসারে) কাঠামোগত রূপান্তরের হাত ধরে, যদিও অন্যদের তুলনায় এ গতি অপেক্ষাকৃত কম।
প্রকৃতপক্ষে এ দেশের গ্রামীণ খাত উচ্চতর কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা প্রতিফলিত হচ্ছে :
ক. জিডিপিতে কৃষি খাতের অংশ হ্রাস (২০০০ সালের ২৬ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ১৫ শতাংশ)
খ. কর্মসংস্থানে কৃষি খাতের অংশ হ্রাস (২০০০ সালের ৫১ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ৪৩ শতাংশ)
গ. গ্রাম থেকে শহুরে অভিবাসনের জের ধরে দ্রুত নগরায়ণ (বার্ষিক নগরায়ণ হার প্রায় ৩ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ)
বিভিন্ন দিক থেকে স্থিতিশীলতার প্রশ্ন উঠতে পারে। একটি হলো সমষ্টিগত স্থিতিশীলতা, যেটি পরিচালন ব্যয়ের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। এখনকার প্রশ্ন হলো, সমাজ কি সরাসরি ও লক্ষ্য স্থিরকৃত দারিদ্র্য বিমোচন প্রোগ্রামগুলো (পিএপিএস) চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদের জোগান দিতে ও ব্যয় করতে পারে? এটি যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে কি সরকারের পিএপিগুলোর জন্য কমপক্ষে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে আরো সম্পদ বরাদ্দ দেবে?
স্থিতিশীলতা-সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রশ্ন জড়িত প্রোগ্রাম সদস্যদের দূরে সরিয়ে দেয়ার (বাহ্যিক সহায়তা থেকে), যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের কাজ করতে পারে, মাইক্রোলেভেল ইস্যুর সাথে জড়িত। এ পয়েন্ট নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রোগ্রামগুলো বহু বছর ধরে চলে আসছে এবং আমরা দেখেছি, এখনো পুরো সুবিধা পাওয়া দেরি রয়েছে। এমনকি তার পরও সীমিত প্রমাণ রয়েছে, সদস্য পদের মেয়াদকাল ইতিবাচকভাবে সুবিধার পরিমাণের ওপর প্রভাব ফেলে, দীর্ঘমেয়াদে গরিবের সক্ষমতা খুব সম্ভবত বৃদ্ধি পাবে, যদি পিএপিগুলো আরো কয়েক বছর চালানো যায়।
৩.২ হস্তক্ষেপের বা সহায়তার স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ
অভিজ্ঞতা বলছে, গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প, যেগুলো কর্মসংস্থান ও আয় তৈরির দিক থেকে অত্যন্ত সফল ও দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ সৃষ্টির দরুন ইতিবাচক বিতরণমূলক সুবিধা রয়েছে, সংখ্যায় খুব কম। সুষম জাতীয় উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার হস্তক্ষেপগুলো বা সহায়তাগুলোর মধ্যে অবশ্যই সংযোগ ঘটাতে হবে। এজন্য ইনকাম জেনারেশন প্রজেক্ট (আইজিপি); এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন স্কিম (ইজিএস); স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসন সুবিধা, গ্রামীণ সরকারি কাজ ও কাজের বিনিময়ে খাদ্যের জন্য সরকারি বিধান এবং গ্রামীণ দরিদ্র লোকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা পদক্ষেপ একযোগে সফল গ্রামীণ রূপান্তরের দিকে পরিচালিত করা উচিত হবে।
চারটি বিষয়ের দিকে নজর দেয়া উচিত হবে :
১. সার্বিক উন্নয়ন কৌশলের সাথে মিলিয়ে গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা করা উচিত। এজন্য দেশের সামষ্টিক নীতি ও পরিস্থিতির সাথে অবশ্যই সহায়তা গ্রোগ্রামগুলোকে খাপ খাওয়াতে হবে।
২. প্রবৃদ্ধিভিত্তিক প্রোগ্রাম ও লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক প্রোগ্রাম উভয়ের সাথে গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশলকে অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে।
৩. গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টার জন্য চারটি প্রধান পক্ষের সাথে ঘনিষ্ঠ মিথস্ক্রিয়া ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো হলো : সরকার, বেসরকারি খাত, দাতা বা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান কিংবা এনজিও। সরকারের ওভারলোডেড আমলাতন্ত্র ও ভঙ্গুর এনজিওগুলো একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করলে কিংবা আলাদাভাবে কাজ করলে তা দেশের জন্য লাভজনক হবে না।
৪. স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরো বাড়ানো উচিত, বিশেষ করে অবকাঠামো (সড়ক, সেচ সুবিধা ইত্যাদি) রক্ষণাবেক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবার বন্দোবস্ত (কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি) ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ইত্যাদি)।
প্রজেক্ট পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও টেকসই তার ওপর আরো জোর দেয়া নিয়ে সরকার, এনজিও ও দাতাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে, যা এ-যাবৎ সরকার ও এনজিওগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টায় অগ্রাধিকার পায়নি।
দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ উন্নয়ন, যেগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রোগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, সেগুলো দেশে ও সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্যান্য বহু কার্যক্রমের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকের সাথে ওঁতপ্রোতভাবে জড়িত। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা হলো, বিশেষ করে মাইক্রো ইন্টারভেনশন বা ক্ষুদ্র্র সহায়তা গ্রামীণ রূপান্তরে নতুন জাতীয় কৌশল গঠন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তৃণমূল পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা গ্রামীণ এলাকার অনুষ্ঠান ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রে একটি নতুন টেকসই পুঁজিভবন প্রক্রিয়াকে স্পষ্ট করছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনেকগুলোই নিশ্চিত করছে, কিভাবে পুঁজিভবন প্রক্রিয়ায় মানবোন্নয়ন ও ইকুইটি পাশাপাশি চলে। এ ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো, একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভিন্ন কৌশলগত বিকল্প উপাদান এবং গ্রামীণ রূপান্তরের জন্য পরিবেশ। দরিদ্র লোকের স্বতঃস্ফূর্ত কার্যকলাপে বা সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, বেসরকারি সংস্থা কিংবা এনজিওর সহায়তায়, যা-ই হোক না কেন, তাতে যে গ্রামীণ রূপান্তর ঘটবে অথবা বিশেষ একটি ‘এন্ট্রি’ পয়েন্ট নিয়ে তারা উদীয়মান হলেও নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন অংশীদারদের জন্য ভবিষ্যতের নির্দেশিকা, পাশাপাশি প্রোগ্রাম ও প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য সার্বিকভাবে প্রক্রিয়া অবশ্যই কঠোরভাবে ও নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। আরো দু’টি ইস্যু উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, সড়ক নেটওয়ার্ক ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার দিকে দৃষ্টি দিয়ে নীতি কৌশল গ্রহণ করার কারণে গ্রামীণ-শহুরে বিভক্তি দূর হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু কৃষিচর্চার আধুনিকায়ন ঘটছে, তাই কৃষিপণ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
চূড়ান্তভাবে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন রূপান্তরের যে যে কৌশল গ্রহণ করা হবে, তাতে অবশ্যই কৃষির উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন পদ্ধতির সাথে ভ্যালু অ্যাড করার জন্য বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার নীতি থাকা উচিত। কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের জন্য সরকারের উচিত আরো অর্থায়ন করা। হ
