অর্থনীতি একটি দেশের চাকা। দেশ সচল থাকে এই অর্থের চাকার ওপর। আমাদের অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন বাধাবিপত্তি আছে। সে বিপত্তিগুলো অতিক্রম করতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় এক দশক ধরে মোটামুটি জিডিপির আনুপাতিক হার হিসেবে স্থগিত হয়ে আছে। তবে সার্বিক বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। মূলত এ বৃদ্ধি হয়েছে সরকারি বিনিয়োগের ফলে। তবে সরকারি বিনিয়োগ থেকে কাক্সিক্ষত সুফল পেতে দেশ প্রায়ই বঞ্চিত হয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। একটি হচ্ছে প্রত্যেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিমাত্রায় সময়ক্ষেপণ। প্রকল্প বাস্তবায়নের যে সময়সীমা নির্ধারণ করে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। যার ফলে প্রকল্প ব্যয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এ ছাড়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুণগত মান প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ থাকে। এ ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতির অভিযোগ আসে। এসব মিলিয়ে সরকারি বিনিয়োগ থেকে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায় না।
আবার অন্য দিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির আনুপাতিক হার হিসেবে খুব একটা বাড়ছে না। ২০০৯ অর্থবছরে জিডিপির আনুপাতিক হার হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। এই অর্থবছরে দাঁড়াচ্ছে বোধ হয় প্রায় ২৩ শতাংশের অল্প একটু বেশি। তার মানে ১ শতাংশ বেড়েছে প্রায় এক দশক সময়কাল পেরিয়ে। কাজেই এটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয়ত, আমরা দেখতে পাচ্ছি, যতটুকু বিনিয়োগ হচ্ছে বা দেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সে প্রবৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। যার ফলে বেকার সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি বাড়ছে। এর ফলে একটা সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কাজেই বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সাথে সাথে কর্মসংস্থান আরো বেশিমাত্রায় কিভাবে সৃষ্টি করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, সেটি হচ্ছে দারিদ্র্যবিমোচন। বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্টস গোল্ডস জাতিসঙ্ঘের যেটি ছিল, সেখানে দারিদ্র্যবিমোচনের হারের যে সংখ্যা উল্লেখ ছিল, বাংলাদেশ সেটি অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনো জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে। বর্তমানে প্রায় ২২ শতাংশ বা ২৩ শতাংশ জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমার নিচে। বাংলাদেশে যেহেতু প্রায় ১৬ কোটি মানুষের বাস, এই ২২ বা ২৩ শতাংশ মানে প্রায় চার কোটির কাছাকাছি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাসবাস করছে, যেটি শ্রীলঙ্কার টোটাল পপুলেশনের প্রায় দ্বিগুণ।
আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় দারিদ্র্যবিমোচনের দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখ করা যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, বার্ষিক গড় হার দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে ক্রমে কমে আসছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বার্ষিক দারিদ্র্যবিমোচনের গড় হার ছিল ১.৮ শতাংশ। ২০০৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এটা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছিল ১.৭ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ১.২ শতাংশ। কাজেই এক দিকে বিরাট জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমার নিচে আবার অন্য দিকে দারিদ্র্য বিমোচনের বার্ষিক হার কমে যাচ্ছে। সুতরাং এ ক্ষেত্রেও আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন আছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন দৃষ্টিকোণ থেকে একটা উপাদান প্রায়ই উল্লেখ করা হয়, সেটি হচ্ছে আমাদের জনশক্তি। এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাচ্ছি সংখ্যার দিক থেকে প্রসার হচ্ছে। অর্থাৎ প্রাইমারি ¯ু‹লে তো এখন আমাদের মোটামুটি শতকরা ১০০ পার্সেন্ট এন্ডোর্সমেন্ট হচ্ছে। কিন্তু তারপর থেকে বড়মাত্রার ড্রপআউট হয়। তার ফলে দেখা যাচ্ছে, সেকেন্ডারি লেভেল এবং চার্জশিয়াল লেভেলে হার অনেক কম। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের পরের যে এডুকেশন লেভেল, সেখানে আমাদের যে এন্ডোর্সমেন্টের হার, এটা এশিয়ার ১০-১১টা দেশের পরিসংখ্যানের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় সর্বনিম্নে। পাকিস্তানের হার আমাদের চেয়ে একটু কম আছে। কাজেই এক দিকে এ চার্জশিয়ালি লেভেলের শিক্ষার আরো সম্প্রসারণ করতে হবে; অন্য দিকে এ শিক্ষাটা যাতে কর্মমুখী হয় এবং বাজারে যে ধরনের স্কিলের চাহিদা আছে, সে ধরনের স্কিল শিক্ষার মাধ্যমে সৃষ্টি করাও চ্যালেঞ্জ। সেটা না করতে পারলে আমাদের দারিদ্র্যবিমোচনও বিঘিœত হবে। অন্য দিকে যেটা আমি আগে উল্লেখ করেছি, সাধারণ শিক্ষার হার বাড়লে তাতে বেকারত্বের সমস্যা আরো প্রকট হবে এবং এটা সামাজিক অসন্তোষের ভিত্তি তৈরি করবে। এসব অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কথা।
এ ছাড়া, আমাদের বহিঃখাতে এবং আর্থিক খাতে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। আর্থিক খাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি সাম্প্রতিককালে শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াচ্ছে। অন্য দিকে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। কাজেই ব্যাংকগুলোর যে ঋণ দেয়ার ক্ষমতা সেটি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। যদিও অতি সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রপার মাত্রা অনেক বেড়েছে। কিন্তু সে ঋণগুলো কোথায় কোন খাতে কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে তার কোনো বিশ্লেষণ নেই। ধারণা করা হয়, যেহেতু বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না, কাজেই এ ঋণের অনেক অংশ হয়তো অর্থ পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বা অন্যান্য উৎপাদনী ক্ষেত্রে খুব একটা ব্যবহার হচ্ছে না। কাজেই এই আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ অনেক বড় আকার ধারণ করছে ক্রমেই।
আর বহিঃখাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাম্প্রতিককালে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট অনেক বেড়েছে। তার কারণ হচ্ছে, আমদানি প্রবৃদ্ধির হার রফতানির প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও এর মধ্যে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ডেপিসিট অনেক মাত্রায় বেড়েছে। যেমনÑ দেখা যাচ্ছে ১৬ অর্থবছরে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ডেপিসিট ছিল চৌদ্দ শ’ আশি মিলিয়ন ডলার। বর্তমান অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে ছয় হাজার তিন শ’ আঠারো মিলিয়ন ডলার। এত বড় কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেপিসিট হওয়ার ফলে টাকার যে চেঞ্জ রেট, ডলারের তুলনায় সেটি অনেক অবমূল্যায়ন হচ্ছে। যেমনÑ ৩০ এপ্রিল ২০১৭ এভারেজ ব্যাংকিং খাতে ইন্টার ব্যাংক টাকা ইউএস ডলারের রেট ছিল ৮০ টাকার মতো। আর ৩০ এপ্রিল ২০১৮-তে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩ টাকার মতো। এই হারে যদি মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়, সেটি কিন্তু মূল্যস্ফীতির ওপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর কারণ একটা হলো সরাসরি ভোগ্যপণ্য আমরা আমদানি করি, সেগুলো স্থানীয় বাজারে দাম বেড়ে যায়। এ ছাড়া, মধ্যবর্তী পণ্য কাঁচামালের প্রায় বিরাট অংশ আমরা বাইরে থেকে আমাদানি করি। সেগুলোর দাম বাড়লে প্রায় স্থানীয় বাজারের জন্য উৎপাদন করে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং তার ফলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। মূল্যস্ফীতি কিন্তু গরিব মানুষকেই বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুতরাং সেটি আরো একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর কথা। এটি আমার মনে হয় স্বপ্নেই রয়ে যাবে। কারণ, এখন আমাদের যে পার ক্যাপিটা ইনকাম তার প্রায় তিন গুণ লাগবে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে। আর ৮ শতাংশ হারে যদি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলে ১০ বছরে গিয়ে এটা দ্বিগুণ হয়। আমাদের তো ৮ শতাংশে এখনো পৌঁছতে পারেনি। সরকারি সম্পত্তির যে নম্বরটি সংযুক্তি হয়েছে, সেগুলো কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। কাজেই তিন গুণ লেভেলে পৌঁছানো আগামী তিন বছরের মধ্যে অসম্ভব বলে মনে হয়। জাতিসঙ্ঘের যে শ্রেণিবিন্যাস স্বল্পোন্নত দেশ বা লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনটি সূচক আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে মাথাপিছু জাতীয় আয়। দ্বিতীয় হচ্ছে ভঙ্গুরতার একটা সূচক। তৃতীয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচক। এ তিনটি সূচকে যে লিমিট আছে তার ওপরে উঠলে একটা দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে গ্র্যাজুয়েট করবে, আমরা তার ওপরে পৌঁছে গেছি এটা ঠিক। তবে এটা ২০২১ সালে আবার রিভিউ হবে। তারপর ২০২৪ সালে আরেকটা রিভিউ হবে। এবং বাংলাদেশের অবস্থানের যদি কোনো পরিবর্তন না হয় তখন বাংলাদেশ অফিসিয়ালি জাতিসঙ্ঘে গ্র্যাজুয়েট করেছে বলে ঘোষণা দেয়া হবে। তখন এর জন্য কী চ্যালেঞ্জ তা উল্লেখ করেছি আগে। সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জগুলো তো অবশ্যই থাকবে। এর সাথে আরো নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হবে। তা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে কোটা ফ্রি মার্কেট এক্সেস পাই, তা বহাল থাকবে না। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, আমরা এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে যে আর্থিক সহযোগিতা পাই, সেগুলোর সূদের হার খুবই অল্প এবং এ ঋণগুলো পরিশোধ করার সময় সীমা অনেক দিনের। যেমনÑ আমাদের সুদের হার ০.৭৫ শতাংশ বা ১ শতাংশ বা এ রকম রিপ্লেসমেন্ট ৩০-৪০ বছর। জেএসপিও বেশ লম্বা থাকে। এই সুবিধাগুলো তখন আমাদের কমে যাবে। কাজেই আমাদের বৈদেশিক আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়বে। রেসপিরিয়েট কম হবে এবং সুদ পরিশোধের সময়কালও কম হবে। তার ফলে কিন্তু আমাদের ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাবে।
তবে সুখের বিষয় হলো, বর্তমানে আমাদের ঋণ পরিশোধের জন্য যে পরিমাণ অর্থ লাগে, সেটি আমাদের রফতানি আয় এবং জিডিপি আনুপাতিক হার হিসেবে খুবই সামান্য। সুতরাং এটি চ্যালেঞ্জ অবশ্যই হবে তবে আমি মনে করি চ্যালেঞ্জটা মিট করা খুব কঠিন হবে না। আর যে রফতানির কথা আমি আগে উল্লেখ করেছিলাম, সেখানে যে সুবিধা হবে, সেটাকে এডজাস্ট করার জন্য প্রথম দেখতে হবে রফতানি খাতে পোশাক শিল্পের দাপট। এখানে প্রায় ৮০ শতাংশের ওপরে আমাদের রফতানি আয় আসে। কিন্তু আমাদের রফতানিকৃত পণ্যের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। হ্যাঁ, এটি সত্য বাংলাদেশ এখনো এক হাজারের ওপরে পণ্য রফতানি করে, কিন্তু সেগুলোর পরিমাণ বা আকার খুবই সামান্য। হয়তো ৫০ মিলিয়ন ডলার, ১০০ মিলিয়ন ডলার, ২০০ মিলিয়ন ডলার প্রভৃতি। কাজেই দেখা দরকার এই পণ্যগুলোর রফতানি আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কোথায়? সেটা কি দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নেই, সে কারণে রফতানিকারকেরা রফতানি বাড়াতে পারছে না? নাকি বিদেশী চাহিদার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে, এগুলো বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
রফতানির যে বাস্কেট, এই বাস্কেট ডাইবার্সি বাই করা লাগবে। এখন আমাদের রফতানিগুলো যায় মূলত উন্নত দেশগুলোয় ইউরোপ, আমেরিকা। সম্প্রতি কিছু যাচ্ছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ায় খুব বেশি নয়। কিন্তু আরো অনেক দেশ আছে যেগুলোতে আমাদের রফতানি বাড়ানো দরকার। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে। সেন্ট্রাল এশিয়ান আর্মেনিয়া, তুর্কমেনিস্তানÑ এসব দেশে রফতানি বাড়াতে চেষ্টা করতে হবে। সেটাও আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে রফতানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে। অন্য দিকে রেমিট্যান্সের কথা আগে উল্লেখ করেছিলাম। রেমিট্যান্স আমাদের সম্প্রতি বেড়েছে উল্লেখ করেছি। তবে পার ক্যাপিটা রেমিট্যান্স আমাদের কম। কারণ, লোকেরা যে রেমিট্যান্স বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে, পার ক্যাপিটা রেমিট্যান্স অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। যেমনÑ পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন সেসব দেশে কিন্তু মাথাপিছু রেমিট্যান্স আমাদের দেশের চেয়ে অনেক বেশি। এর কারণ হচ্ছে, আমরা যেসব লোক পাঠাই বিদেশে তারা বেশির ভাগই অদক্ষ। এরা হোটেলে, কন্সট্রাকশন বিভাগে বা ঝাড়–দারের কাজ করে। যদি আমরা দক্ষ লোক পাঠাতে পারি, তারা ওই সব দেশের মতো আয় বাড়াতে পারবে এবং রেমিট্যান্সও বাড়বে। দক্ষ শ্রমিক কিভাবে পাঠানো যায়, সেখানেও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রশ্ন আসে। কাজেই আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়ার জন্য যে প্রবৃদ্ধির হার উন্নত করা, এটাও আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতির দুর্বলতার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। আরো দু-একটি বিষয় বোধহয় উল্লেখ করা যেতে পারে। চারটা চ্যালেঞ্জের কথা বলব। একটা হচ্ছে অবকাঠামোগত। ঢাকা-চিটাগং হাইওয়ের কথা বলতে পারি। এটা অর্থনীতির মূল নার্ভ। এখানে প্রায়ই ৪০-৫০ কিমি: জানজটে ভরা। দ্বিতীয় হলো এনার্জি। এখানে সরকারের অনেক প্রকল্প আছে কিন্তু বাস্তবায়নে অনেক সময় লাগছে। তৃতীয়ত সার্বিকভাবে সুশাসনের বড় অভাব। এই সুশানের অভাবে দেশে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়। বিশ্বব্যাংকের সুশাসনের ছয়টি উপাদান আছেÑ ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেড লিপি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গভর্নমেন্ট ইফেক্টিভনেস, রেগুলেটরি কোয়ালিটি, আইনের শাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। এর প্রতিটির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনি¤œ ৩০ শতাংশ বা তার চেয়ে নিচু। কন্ট্রোল অব করাপশনে আমরা ১৮ শতাংশের মধ্যে আছি। পলিটিক্যাল এস্টাবিলিটি নেক্সাম অব ভায়োলেন্সে ১০ শতাংশের মধ্যে আছি। একইভাবে ই-জব ডুয়িং বিজনেস ইনডিগেটর একটা আছে, এখানেও কতগুলো সাব-ইনডেক্স আছে। সার্বিকভাবে ১৮৯ দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ২০১৫ সালে ছিল ১৭৬।
২০১৬ সালে এসে আরো অবনতি হয়েছে, অর্থাৎ ১৭৭-এ নেমেছে। এসব ক্ষেত্রে যদি উন্নীত না করতে পারি তাহলে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ খুব বেশি বাড়বে না। জনসংখ্যা এবং জিডিপি ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়ায় আমাদের চেয়ে অনেক কম সত্ত্বেও তারা অনেক বেশি বিদেশী বিনিয়োগ পায়। এসব সূচক বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মনিটর করে।
আরো মনিটরিং দেশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি খাত কতটুকু বিনিয়োগ করছে। কেননা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা যদি বিনিয়োগ বাড়ায় তখন বিদেশীরা ভাবে এ দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আছে। কিন্তু আমাদের দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারী বাড়ছে না। আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে এবং এসব সূচকের কারণে এ দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীর হার খুবই কম। এ দুর্বলতা কাটাতে বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়া উচিত। হ
