জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদতের মাত্র তিন মাস আগে ১৯৮১ সালের ১৯ মার্চ লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় ছাপা হয় প্রখ্যাত লেখক ও ব্রডকাস্টার ট্রেভর ফিশলকের
এ লেখাটি। এতে তিনি জিয়াকে অসঙ্কোচে বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক। তুলে ধরেছেন সেই জিয়াকে, যিনি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক। আজ নতুন প্রজন্মকে শোনানো হচ্ছে জিয়া নাকি ছিলেন ‘পাকিস্তানের চর’ এবং আরো কত কিছু। এসব যে ইতিহাসের সুস্পষ্ট বিকৃতি, ফিশ ট্রেভরের এ লেখা তারই জ্বলন্ত সাক্ষী।
বিখ্যাত দ্য টাইমস ও ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার বৈদেশিক সংবাদদাতা হিসেবে ৬০টিরও বেশি দেশ ঘুরেছেন এবং রিপোর্ট করেছেন এই বরেণ্য সাংবাদিক।
বাংলাদেশেও এসেছিলেন তিনি। সেই বিরল রিপোর্টটি অনুবাদ করেছেন ঐশী পূর্ণতা
আজ থেকে ১০ বছর আগে, ঠিক এই মাসে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ফেটে পড়েছিল প্রচণ্ড এক উত্তেজনায়, জড়িয়ে পড়েছিল এক বেপরোয়া লড়াইয়ে এবং অবশেষে নিজেদের অনিবার্যভাবে আলাদা করে ফেলেছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের।
বহু বছরের অস্থিরতা এবং কয়েক সপ্তাহের তুমুল উত্তেজনা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে, যখন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে নির্মূল করতে মাঠে নামে। তাদের পদক্ষেপে ঢাকায় রক্তগঙ্গা বয়ে যায় এবং পুরো দেশ নিপতিত হয় এক চরম দুরবস্থায়।
ঠিক এই সময়ে, ২৬ মার্চের সূচনালগ্নে জিয়াউর রহমান নামে পাকিস্তানি বাহিনীর এক তরুণ মেজর, যিনি ছিলেন একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদীও, সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধের। তিনি তার লোকজনকে বলেন, ‘উই রিভোল্ট’ (আমরা বিদ্রোহ করলাম)। ওই দিনের পরবর্তী ভাগে তিনি রেডিওতে যান এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ডিসেম্বর মাসে দেশ স্বাধীন হয়। অবশ্য এতে ইন্ডিয়ার কার্যকর সহযোগিতাও ছিল।
বাংলাদেশ তার পতাকা হিসেবে বেছে নেয় সবুজ জমিনের ওপর লাল বৃত্তকে। সরকারিভাবে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়, ‘রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের কালো রাত শেষে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের প্রতীক’ হিসেবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রস্তুতি ও অভ্যুদয়ের ভয়ঙ্কর বেদনাদীর্ণ দিনগুলো সম্বন্ধে অনেক বীরত্বব্যঞ্জক সালঙ্কার বর্ণনা দেয়া হলেও স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী কয়েক বছর দেশটি তীব্র টানাপড়েনে পড়ে যায়। একদিকে ভয়াল দারিদ্র্য, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দুর্ভিক্ষ এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে জনসংখ্যা বেড়ে চলা, অন্য দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে কুরে কুরে খেতে থাকে।
দেশটি নিয়ে হতাশ হওয়ার অনেক বাস্তব কারণ ছিল। কারণ, পুরো দেশটিই ছিল ইনটেনসিভ কেয়ারে।
তবে এখন আশাবাদী হওয়ার মতো কারণগুলো জোরালো হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ আজ কোমর বেঁধে চলতে শুরু করেছে। দেশটিকে টেনে নিয়ে চলছেন জিয়াউর রহমান, যিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধেরও প্রাণকেন্দ্রে। ১৯৭৫ সালেল অভ্যুত্থানের পর তিনি দৃশ্যপটে আসেন এবং গত প্রায় চার বছর ধরে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দেশ চালানোর ধরনটা অনেকটা বেল হেলিকপ্টারের মতো, যাতে প্রচণ্ড গতি সঞ্চার করলে সেটি চলতে শুরু করে। জিয়াউর রহমান তার ভিশন দিয়ে জনগণকে উদ্দীপ্ত করে দেশকে এগিয়ে নিতে চান। তার ভিশন হচ্ছে উন্নয়নশীল বাংলাদেশ। তিনি কোনো ফ্যানাটিক (উন্মত্ত) নন, বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আস্থাশীল একজন মানুষ। তিনি বিশ্বাস করেন, তার একটি বড় দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে আহ্বান জানানো ও উদ্দীপ্ত করা।
তিনি করেনও তা-ই। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র, সব চাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এবং ৯ কোটি মানুষের দেশে তিনি ডাক দেন : উৎপাদন বাড়াও। দেশ গড়ো। সেচ বাড়াও। খাল খনন করো। দু’টি সন্তানই যথেষ্ট।
জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগান। সেখানে তিনি দেখেছেন,্ একজন উদ্দীপ্ত মানুষ যেকোনো বাধাই ডিঙিয়ে যেতে পারে। প্রণোদনা ও সংগঠিত করা তার দুটো প্রিয় শব্দ। ‘না’ শব্দটি তার অপ্রিয়। তার পছন্দ হচ্ছে লক্ষ্য (টার্গেট) স্থির করা।
জিয়া আমাকে বলেছেন, ‘জনগণকে সংগঠিত করাই হচ্ছে (এগিয়ে যাওয়ার) চাবিকাঠি। যখন আমি ক্ষমতায় আসি, তখন অর্থনীতির অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। দেশে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। প্রশাসন ছিল না। ব্যাংকে টাকা ছিল না। বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। ছিল শুধু খরা ও দুর্ভিক্ষ।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার জন্যে কাজ করছি। শিক্ষিতরা অন্যদের শেখাবেÑ এই নীতির ভিত্তিতে নিরক্ষরতা দূর করছি এবং প্রতি মাসে কয়েক লাখ স্টেরিলাইজেশনের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঠেকানোর কাজ করছি।’
ঢাকার বেশির ভাগ পর্যবেক্ষকই প্রেসিডেন্টের উৎসাহের প্রশংসা করেন। তারা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া সমস্যাগুলো যথাযথভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তবে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবেÑ এমনটাও কেউ মনে করেন না।
বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, ‘আমি জানি, লোকজন আমার টার্গেটগুলোকে অতি উচ্চাভিলাষী বলে থাকে। কিন্তু আমরা প্রমাণ করছি যে, আমরা পারি। কেবল জমির দিকে তাকান, দেখুন কিভাবে আমরা সেচের জন্য খাল খনন করছি এবং দ্বিগুণ ফসল ফলাচ্ছি। পাশাপাশি আমরা পাচ্ছি প্রাকৃতিক গ্যাস ও পাথর, যা আমাদের উন্নয়নের কাজে লাগবে। আমরা বুঝতে পারছি না, নিজ হাতে আমরা কতটা অর্জন করতে পারব। আমাদের সম্ভাবনাগুলো অনেক বড়।’
১৮ মাসের সামরিক শাসন শেষে প্রেসিডেন্ট জিয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরেছেন। তিনি কাজ করেন তার কাজের ধরন অনেকটা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জিসকার্ড দেস্তাঁর মতো।
দু’ বছর আগে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়েছে। জিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেছেন। সংবাদপত্রের প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করছেন। বাংলাদেশে সংবাদপত্র অনেকটাই স্বাধীন (যদিও সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর খানিকটা নির্ভরশীল) এবং অবাধে তার (জিয়া) সমালোচনা করতে পারে। এভাবেই অতিমাত্রায় রাজনীতিপ্রবণ একটি জনগোষ্ঠীর জন্য তিনি রাজনৈতিক ডাইমেনশন এনেছেন।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘সামরিক আইন একটা সাময়িক ব্যবস্থা। অনেকে আমাকে হুঁশিয়ার করেছিলেন যে, গণতন্ত্র টিকবে না, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্যই ঝুঁকি খানিকটা আছে। জনগণ কিছু ভুল করে বসতে পারে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি, নিম্নতম পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব তুলে আনতে। এই মুহূর্তে কার্যকর বিরোধিতার জন্য অনেকগুলো দল বা পক্ষ আছে। তবে আমরা ধাপে ধাপে স্থিতিশীল হবোই এবং এমন একটি বিরোধী দল গড়ব, যারা হবে ভালো সমালোচক।’
প্রেসিডেন্ট জিয়ার উন্নয়ন কৌশলের একটি হচ্ছে গ্রাম পরিষদ (গ্রাম সরকার : অনুবাদক) প্রতিষ্ঠা। এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণের একটি ভালো পদ্ধতি। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ‘নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেয়া’কে উৎসাহিত করা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য বিক্ষোভও ঠেকানো যায়।
এটা ঠিক যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের পথের বাধাগুলো অনেক বেশি ভয়ালদর্শন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন, তার দেশটি এক জাতির। এখানে নেই কোনো আঞ্চলিক বিরোধ। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট নিজে একজন দক্ষ শাসক। তিনি নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে এবং দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে অন্য যে-কারো চাইতে অনেক বেশি কিছু করেছেন। এ বছর (১৯৮১ : অনুবাদক) দেশটিতে উৎপাদিত খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকবে।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার বয়স এখন ৪৫। দেখার মতো প্রাণচঞ্চল মানুষ তিনি। অবশ্য চাটুকারিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক বাধার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। কিন্তু সত্য হলো, দক্ষিণ এশিয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এসব ‘উপাদান’ অনিবার্য।
প্রেসিডেন্ট জিয়া ছিমছাম জীবনযাপন করে থাকেন। তিনি থাকেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছোট একটি বাড়িতে। সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান হয়েও তিনি কখনো গায়ে উর্দি পরেন না বরং তিনি চমৎকার একটি শার্ট ও টাই পরে থাকেন। গ্রামাঞ্চল সফরে গেলে তার গায়ে থাকে একটি বুশ শার্ট।
যে দেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপী, প্রেসিডেন্ট জিয়া সে দেশে ‘মি. ক্লিন’। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই, বরং তিনি স্বজনপ্রীতিকারীদের আতঙ্ক। এভাবে তিনি কিছু লোকের কাছে অপ্রিয়ও। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযান চালাবেন বলে শোনা যাচ্ছে, তাতে করে কোনো কোনো মহলের কাছে তিনি জনপ্রিয়তা হারাবেন। তবে প্রেসিডেন্ট জিয়া দেখিয়ে দিয়েছেন, তিনি এ ক্ষেত্রে হবেন খুবই কঠোর। হ