বিজয় দিবস এলে অনেক কথা মনে হয়। এক কোটি লোক দেশ থেকে বিতাড়িত। কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধা, যারা সশ¯্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। এদের সাথে ছিল ভারতীয় সৈন্যরা, যারা না থাকলে এই মুক্তিযুদ্ধ হতো বিলম্বিত। বড় বড় শক্তিরা হাত গুটিয়ে বসেছিল। আর আমরা যারা দেশে ছিলাম, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রায় নিরানব্বই ভাগ লোক কাজ করেছি। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়ে, কেউ লিখে, কেউ বা প্রার্থনার ঘরে। এদের সম্বন্ধে লিখেছিলেন মাত্র একজনই, তার নাম এনায়েতউল্লাহ খান। তার প্রবন্ধটির নাম : ‘পয়ষট্টি মিলিয়ন কোলাবোরেটর্স’। এটি সবারই পাঠ করা প্রয়োজন। ওদের ভাইবোনরা সবাই নানাভাবে দেশে সুপরিচিত। আমাকে একদিন মিন্টু বললেন, আমাকে বধ করার জন্য প্রতিদিন কিছু শয়তান প্রতীক্ষা করে। কিন্তু ওরা জানে আমাকে যে মারবে, সে বেঁচে থাকতে পারবে না। তারও মৃত্যু হবে। এ কথাটি ভুলে যাইনি।
আরেকজনের কথা ভুলিনি। তার নাম আসফুদ্দৌলা। তিনি বলেছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছে, তারা শ্রদ্ধেয়। কিন্তু প্রতি পদে পদে ওই কাজটির সুনামের ভাগিদার হতে চায় তারা। এরা অন্যদেরকে মানুষ মনে করে না। মনে করে বাকি সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি। তিনি বলেছিলেন, যদি আক্রান্ত হই, তাহলে ওদের সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ করার অধিকার আমার থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ৫০ জন হিন্দুকে আমি রক্ষা করার দায়িত্ব নিই। আমার গোডাউনে তাদের থাকতে দিয়েছি। এ ছাড়া সমর্থন করি মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে, কখনো অর্থ দিয়ে, কখনোবা খবর পাচার করে। দেশ থেকে বেরুনোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাধ সেধেছে আমাদেরই পরম পরাক্রান্ত গোয়েন্দা বাহিনী। সে ফাইল এখনো আছে। আমরাই আমাদের শত্রু। এরপর বহুদিন অনেক অনুষ্ঠান থেকে হই বঞ্চিত। সেই ট্র্যাডিশন এখনো সমানভাবে বয়ে চলেছে। সম্ভবত আমার মৃত্যু পর্যন্ত।
যারা স্বাধীনতা এনেছে, তাদের জন্য আমার অশ্রুজল বাধা মানেনি। যারা সন্তান হারিয়েছে, সেই মাদের কাছে ছুটে গেছি, সহায়তা করেছি। এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমার সংগৃহীত ‘স্বাধীনতা দিনের গান’-এর চেয়ে অথেনটিক আর কোনো বই এখনো কেউ বের করতে পারেনি। পারবেও না। কেউ কেউ বলছে মুক্তির গান। তাতে অনেক অর্থের যোগান ছিল। তবুও কালের বিচারে আমার বইটি উত্তীর্ণ হবে বলে আমার বিশ^াস। আমার সম্পাদিত বইটিতে যাদের গান ছিল, এতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর যারা গান লিখেছেন এবং যে গানগুলো গাওয়া হলেছিল, তার সব ক’টি মজুদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এ বইটি উপহার দিয়েছিলাম তার জন্মদিনে। বইটির কোনো স্বীকৃতি কারো কাছ থেকে আজ পর্যন্ত মেলেনি। অথচ ওটিই ছিল স্বাধীনতা দিনের গানের প্রথম উপহার। বইটির সংস্করণ বেরিয়েছে এবং বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। দেশকে চিরদিনের জন্য বিভক্ত করার পরিকল্পনা আমাদের বিরোধী পক্ষের। সেটা আরো এক শ’ বছর ধরে চলতে পারে। তাতেও ইতিহাসের ক্ষয় হবে না। ইতিহাস সত্যি কথা বলবে।
রাজনীতির অনেক মারপ্যাচ। তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায়টিও অবমুক্ত নয়। ভাবতে হবে পাকিস্তান কেন হয়েছিল। কী করে আমরা এত অল্প সময়ে নিজের পায়ে দাঁড়ালাম, মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে আমাদের বলবান করেছে, সেই সাথে আমাদের বিভেদকে যারা শতবর্ষী করতে চায়, তাদের কী উদ্দেশ্য, তাও জানতে হবে। ওরা সবাই আমাদের বন্ধু নয়, এ কথা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। হ
বিজয় দিবস এলে অনেক কথা মনে হয়। এক কোটি লোক দেশ থেকে বিতাড়িত। কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধা, যারা সশ¯্র সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। এদের সাথে ছিল ভারতীয়...
