আদি বাঙালি কারা ছিলেন সে ইতিহাস খুঁজতে গেলে বিলম্ব হতে পারে তবে বাঙালি যে তার খোলস পাল্টিয়েছেন সে কথা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে। বাঙালি যদি এখন নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় না দেন তাহলে তার পোশাক-আশাক; খাবার-দাবার; রুচি-অভ্যাস; কথাবার্তা; চলন-বলন, চিন্তা-দর্শন দেখে আর বোঝার উপায় থাকে না যে, তারা সেই চর্যাপদে উল্লিখিত বাঙালির উত্তর গণগোষ্ঠী। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে হয়তো দ্রুত এতটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাবে না, যতটা বিবর্তন এসেছে বাঙালিদের জীবনে। যে বাঙালি একসময় পান্তা-পিয়াজ দিয়ে প্রতিদিন সকাল বেলার ক্ষুধা মেটাত, সে বাঙালি এখন বছরে একদিন সখের বসে পান্তা খাওয়ার আয়োজন করেন। একসময় তহবন আর ধুতি পরা বাঙালি এখন নিয়ম করে ট্রাউজার আর স্যুটকোট পরেন। যে ভাষার জন্য বঙ্গদেশের মানুষ বাঙালি বলে পরিচিতি পেয়েছেন, সেই ভাষাতে ১০ শব্দের একটি বাক্য বলতে গিয়ে বাঙালি তাতে ছয়-সাতটি ইংরেজি শব্দ লাগিয়ে নিজেদের মহত্ব জাহির করার চেষ্টা করেন। বাঙালি তার ভাষা রক্ষার্থে জীবন দিয়েছেন; এ কথা বলতে যতটা গর্ববোধ করেন, সেই বাঙালিই ইংরেজি বলতে পারাতে তার চেয়ে বেশি সম্মানের মনে করেন। বাঙালি অতীতেও বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করেছে। বাঙালি একসময় বাংলা ভাষার চেয়ে সংস্কৃত ভাষাকে বেশি গুরত্ব দিয়েছে। কেননা বেদ-পুরাণের ভাষা বাংলা ছিল না; ছিল সংস্কৃত। বেদান্তবাদীরা মনে করতেন, বাংলা ভাষা হচ্ছে নিম্ন শ্রেণীর ভাষা। এ ভাষা ভদ্রজনের ভাষা নয়, এমনকি এ ভাষায় কোনো বই-পুস্তক রচনা করাও ভদ্রতার নয়। যদি কেউ এ ভাষায় বই-পুস্তক রচনা করেন, তবে তার অবস্থান হবে রউরফ নামক নরকে; এ কথা বাঙালি একসময় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে নিয়েছিল। এ অবস্থা থেকে বাংলাভাষাকে জনপ্রিয় করেছেন মুসলিম বাঙালিরা। যে ‘বাংলা’ বা ‘বাঙলা’ শব্দটি এখন বলা হয় সেই শব্দটিও বাংলা বা সংস্কৃত ভাষার শব্দ নয়; এটি একটি ফারসি শব্দের সংস্করণ। এ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে (ফারসি) ‘বঙ্গালাহ বা ‘বঙ্গালহ’ থেকে। সেখান থেকে সুলতানি শাসনামলে গ্রহণ করা হয়েছে বাঙলা। বাঙলা ভাষার প্রাণ সঞ্চারে সুলতানি আমলের অবদান রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক সময়েও ‘বঙ্গালহ’ বলতে বাংলা ভাষাকেই বোঝা যেত। কেউ কেউ বলেন সংস্কৃত বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে ‘বোঙ্গা’ শব্দ থেকে, যার প্রাচীন অর্থ ছিল অমার্জিত। পরে ‘বঙ্গ’ শব্দের সাথে ‘আল’ যোগে বঙ্গাল হয়েছে; সেখান থেকে বঙ্গদেশ; পরে বাংলাদেশ। বাঙালি বলতে বাংলাদেশের মানুষের জাতিসত্তাকে বোঝানো হচ্ছে। তবে একথা সত্য যে, এ অঞ্চলে মুসলিমদের আগমন না ঘটেলে এই অমার্জিত বোঙ্গারা কখনো মানুষ হয়ে উঠতে পারত না, আর বাংলা ভাষারও এতটা শ্রীবৃদ্ধি আশা করা সম্ভব হতো না। কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে; সেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি আবার সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে। হিন্দি ও ইংরেজির সাথে বাঙালিকে খাপখাওয়ানো প্রচেষ্টা চলছে। যাকে ভাষার আগ্রাসন বলা হচ্ছে।
বাঙালি মুখের ভাষা থেকে শুরু করে সমাজ-সংস্কৃতি; সার্বভৌমত্ত ও রাজনীতি সব আসনে নিজেদের বদলিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কোনো আসনেই বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তির প্রখরতা লক্ষ করা যায়নি; এমনকি উন্নত ভবিষ্যতের প্রশ্নে সঠিক সিদ্ধান্তেও বাঙালি কখনোই স্থিত হতে পারেনি। পরিবর্তনের হাওয়া প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর সমাজেই লাগে। সেই হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে অন্য জাতির লোকেরা তাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নীতি নৈতিকতা, সুস্থ রাজনীতি, মান-সম্মান, অর্থ-বাণিজ্যে সুগঠিত করতে পারলেও বাঙালি সেটা করতে বরাবর ব্যর্থই হয়েছে। ফলে বাঙালি সমাজে ফটকাবাজ, দালাল, শঠ, মিথ্যাবাদী, অসৎ চরিত্রের লোকদের উত্থান ঘটছে আর সমাজ দ্রুত অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারলে যে নিজেরই সম্মান বাড়ে; সততার সাথে জীবনযাপন করা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য করা গেলে যে সামাজিক কাঠামো মজবুত হয়; সৎ ও জ্ঞানী মানুষ যে প্রত্যেকটি সমাজের মূল্যবান সম্পদ; এ জ্ঞানটুকুও বাঙালি হারিয়ে ফেলেছেন। যার ফলে যোগ্য মানবসম্পদ তৈরিতে বাঙালিদের কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। সমাজ কিভাবে চলবে, রাষ্ট্রে কী কী কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা দরকার এসব ঠিক করে নেয়ার দায়িত্ব ছিল রাজনীতিকদের। দায়িত্ব পালনের সে প্রচেষ্টা (পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোয় জ্ঞানে-বোধে-বিজ্ঞানে ও চিন্তায় মানব উন্নয়নের কোনো এজেন্ডা) আজো লক্ষ করা যায়নি। বরং লক্ষ করা গেছে রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক জনগণকে প্রজা বানানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। ফলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ যোগ্য নাগরিক ও ভবিষ্যতের পরিবর্তিত বিশ্বকে মোকাবেলা করার মতো যোগ্য এমপি-মন্ত্রী পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে যা দেখা গেছে তা হচ্ছে, রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে অযোগ্য অসৎ দুর্বৃত্ত চরিত্রের লোক তৈরিতে পৃষ্ঠপোষকতা করা। অন্য দিকে গণতন্ত্রও পরিবার তন্ত্রের কাছে দীর্ঘ দিন ধরে আত্মসমর্পণ করে রয়েছে। এর ফলে মসনদকেন্দ্রিক রাজনৈতিকে টিকে রাখতে গিয়ে অন্যায়কেও আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। এই অপরাজনীতি তৃণমূল পর্যন্তু পৌঁছানোর ফলে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে রাষ্ট্রে খুনের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।
কিছু দিন আগেও শোনা যেত রাজনীতিতে সোপর্দ হওয়ার সময় যাদের যেটুকু সম্পদ থাকত, কিছু দিনের মধ্যে সে সম্পদটুকু জনসাধারণের কল্যাণার্থে ব্যয় হয়ে গিয়ে রাজনীতিকরা অর্থ-বিত্তে নিঃশেষ হয়ে যেত; বিনিময়ে তারা অর্জন করতে পারত অগাধ সম্মান ও মর্যাদা। এখন শোনা যায়, রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারলে অল্প দিনের ব্যবধানে কারো কারো পক্ষে ১৮ থেকে ২০ গুণেরও বেশি সম্পদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। নির্বাচনী হলফনামা সে কথার সাক্ষ্য বহন করে। অর্থ-বিত্তে উচ্চ হতে পারা যে একমাত্র সফলতা নয়, সে কথা কেউ আর মনে করতে চায় না। পুলিশ, শিক্ষক, ছাত্র, জনতা সবারই বেশির ভাগ সদস্য জ্ঞান, বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিতে অন্তসারশূন্য হয়ে উঠেছেন। এসব দেখে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের মতো মানবহিতৈষী চেতনাগুলো মানুষের কাছে সেকেলে ও তথাকথিত হয়ে পড়েছে।
অনেকেই বলেন, বাঙালি বীরের জাতি। আমার মনে হয়েছে বাঙালি পরাধীন থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাঙালি আপনজনের কথায় রাগে; অন্যের কথায় হাসে আর পরের কথায় নাচে। বাঙালিকে অল্প মূল্যে কেনা যায়; অল্প কথায় ফাঁসানোও যায়। বাঙালিকে যদি বলা যায় তোমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দেয়া হবে, তুমি তোমার বাঙালি ভাইদের বুকে গুলি চালাও। বাঙালি সেটাই করে। অতীতেও করেছে, এখনো করে। মীরজাফর আলী খাঁ ও ঘষেটি বেগমের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজউদ্দৌলার ভাগ্যে সেরকমই কিছু ঘটেছিল। বাঙালি একাত্তরেও নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র চালিয়েছে। পঁচাত্তরেও অস্ত্র প্রয়োগ হয়েছে নিজেদের বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। ’৮১ সালে জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করা হয়েছে; সেটাও রাষ্ট্রক্ষমতার লোভে বাঙালি নিজেরাই করেছে। বাঙালির দুর্ভাগ্যকে প্রলম্বিত করার লক্ষ্যে পিলখানাতে যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে, সেটাও বাঙালি সৈনিকেরা নিজেরাই ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি বাঙালির এতটাই লোভ-মোহ কাজ করে যে, একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করার পরও সারা জীবন সে ক্ষমতার স্বাদ ধরে রাখতে যে যা করতে বলে বাঙালি সেটাই মন দিয়ে করতে পারে। এসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি অন্য কিছু হতে না পারলেও আত্মঘাতী যে হতে পেরেছে, তা নিঃসঙ্কোচেই বলা যেতে পারে।
বাঙালির আত্মঘাতী হওয়াটা খুবই চমকপ্রদ। মানুষের শেষ আস্থার জায়গা হচ্ছে আদালত। সেই আদালতের নিম্নকক্ষ থেকে উচ্চকক্ষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে মল্লযুদ্ধের ময়দান। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের পরীক্ষা না হয়ে কূটবুদ্ধি ও প্রভাবপ্রতিপত্তির পরীক্ষা চলে। এ অবস্থায় ন্যায্যবিচার না পেলে মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই অনাস্থা জানাতে পারে। বাঙালি এ স্পর্শকাতর জায়গাটাকেও কলঙ্কিত করে তুলেছে। বিচার ব্যবস্থাকে নষ্ট করা বাঙালির জন্য আত্মঘাতী পদক্ষেপ ছাড়া অন্য কিছু নয়। বিতর্ক রয়েছে পুলিশ বাহিনী নিয়েও। বিভিন্ন টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুলিশ বাহিনীতে মানুষের আস্থা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। থানা না কি পীর-দরবেশদের মাজারে পরিণত হয়েছে। সেখানে দান-দক্ষিণার মাধ্যমে উপবেষ্টিত দরবেশদেরকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে বাদী-বিবাদী উভয়েরই কাজ হাসিল না হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে। এভাবে বাঙালি তাদের জীবনধারাকে এতটাই এলোমেলো; তালগোল পাকিয়ে তুলেছে যে, গন্তব্যহীন বেঁচে থাকাকে তারা নমস্য করতে পেরেছেন। মেরুদণ্ডহীন প্রাণীর মতো এঁকেবেঁকে চলতে গিয়ে বাঙালি বৈদেশিক বাণিজ্যনীতিতেও উদাসীন থেকেছে। অথচ জাতির উন্নয়নকাণ্ডারীর গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ শিক্ষা ও চিকিৎসাকে করে তুলেছে অভ্যন্তরীণ অর্থ উপার্জনের কারখানা। হতভাগ্য বাঙালি অপরিণামদর্শী চেতনায় এই দু’টি খাতকেও মনে ও শরীরে প্রতিবন্ধী তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে তুলেছে। যেকোনো জাতির শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মজবুত না হলে সে জাতি পঙ্গু জাতিতে পরিণত হতে পারে। বাঙালি সে পথেই পা বাড়িয়েছে। লজ্জার বিষয় হচ্ছেÑ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে বাঙালির যে চেতনা গড়ে উঠেছে, সে চেতনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বেমানান। তবুও বাঙালি এই আত্মঘাতী চেতনাগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন; আর বাগাড়ম্বর হচ্ছে যে, বাঙালি সমুদ্র থেকে মহাকাশ সবই জয় করে ফেলেছে।
একাত্তর-পরবর্তী সময়ে সাধারণ বাঙালিরা তাদের জীবনে যেটুকু আয়-রোজগার ও অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করতে পেরেছে, সেটা কোনো রাজনীতিকদের পরিকল্পনার প্রভাবে করতে পেরেছে; ব্যাপারটি এমন নয়। এ দেশ উর্বর ভূখণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষও দারুণ পরিশ্রমী। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে-ময়দানে জমিতে চাষ করে যে ফসল ফলিয়েছে, তারও একটা অংশ রক্তচোষা সুদখোর মহাজনদের দিয়ে খেয়ে না খেয়ে বাকিটুকু সঞ্চয় করেছে। সঞ্চয় করেছে কলকারখানায় দিনরাত পরিশ্রম করে, কাজ করা দিনমজুর ও শ্রমিকেরা। কৃষকশ্রমিকদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে যে যৌথ সঞ্চয় তিলে তিলে গড়ে উঠেছে সেটিই আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি। এ অর্থনীতির কৃতিত্ব কোনো রাজনীতিকদের পাওয়ার কথা নয়। অথচ সেই অর্থনীতির সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ বের করে দেখুন; সেখানে অস্ত্র হাতে উদোম শরীরের যে মানুষগুলোকে মুক্তিযুদ্ধ করতে দেখা যাবে, তাদের কেউ একজনও এই অর্থ লোপাটের সাথে জড়িত নয়। যারা জড়িত তারা স্যুটকোট পরা ভদ্রবেশী চোর-বাটপার, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে যারা বিদেশের মাটিতে বসে ফুর্তি করেছে, তারা। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এরাই মুক্তিযুদ্ধে জনতার রাখা অবদানকে হাইজ্যাক করে নিজেদের বলে প্রচার করছে। সে জন্যই দেশের টাকা ভিন্নদেশে পাচার হলেও তার বিচার করা যায় না। বিচার হয় না হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিরও। এরপরও আত্ম অবজ্ঞা করা বাঙালি বিজয়ের গানে বিহ্বল হয়ে ওঠেন।
উপার্জন ও সঞ্চয় করা অনেক কঠিন কাজ। তার চেয়েও কঠিন কাজ অর্জিত অর্থসম্পদ ধরে রাখা। বুদ্ধি-জ্ঞানে পোক্ত হয়ে সতর্ক না থাকতে পারলে চিলের মতো থাবা দিয়ে অর্জিত সম্পদ যে কেউ কেড়ে নিয়ে যেতে পারেন। সময় বদলেছে। এখন আর নীল চাষ নেই; দাদন ব্যবসায়ও নেই। তলোয়ারের মুখে জিম্মি করেও এখন অর্থসম্পদ কেড়ে নেয়া হয় না। এ জায়গা দখল করে নিয়েছে মুক্তবাণিজ্যের যুগ। বুদ্ধি ও কৌশলের যুগ। বুদ্ধির মারপ্যাঁচে পকেটের টাকা নিমিষেই উধাও হয়ে যেতে পারে। যখন বোঝা যাবে, তখন করার কিছু থাকবে না। বাণিজ্যে বাঙালি আত্মরক্ষা থাকতে পারেনি। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম গরিব দেশগুলোর একটি। এই গরিব দেশের দরিদ্র মানুষগুলো স্মার্টফোন ব্যবহারের দিক থেকে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। অর্থাৎ স্মার্টফোনের চাহিদা ধনী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বেশি। এক শ্রেণীর মানুষ এ চাহিদাকে উন্নয়ন বলার চেষ্টা করছেন। আদৌ এটি সুখের কোনো খবর কিনা সেটা ভাবা হয়ে ওঠেনি কখনো। এটি গরিবের ঘোড়ারোগ। এ দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রোজগার দরিদ্রসীমার নিচে। ডাক্তারের ফি; প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরিক্ষা ও ওষুধ কিনে দরকারি চিকিৎসা গ্রহণ করার ব্যাপারে যে বাঙালিকে ১১২ পয়সার হিসাব করতে হয়, সেই বাঙালি স্মার্টফোনের মতো ব্যয়বহুল ডিভাইস কেনে নিজেদের কষ্টোপার্জিত পয়সা বিদেশী বেনিয়াদের হাতে তুলে দিচ্ছে। যে জিনিসের প্রয়োজন নেই, তেমন একটি জিনিস কিনে ফেলে রাখার স্বভাব অন্য কোনো জাতির মধ্যে দেখা না গেলেও বাঙালিদের মধ্যে সেটিই লক্ষ করা গেছে। একটি স্মার্টফোনে অনেক কন্টেন্ট থাকে, যার মধ্য থেকে দু-একটি কন্টেন্ট ছাড়া বাকিগুলো ব্যবহার করার সুযোগ সাধারণদের হয়ে ওঠে না। অথচ যে কন্টেনগুলো আমাদের কাজে লাগে না তেমন কন্টেনগুলো স্মার্টফোনের নামে পয়সা দিয়ে কিনে রাখতে মানুষ বাধ্য হচ্ছেন। চটকদার বিজ্ঞাপণে বিভ্রান্ত হয়ে কোনটি প্রয়োজন আর কী অপ্রয়োজনীয় সেটি বিবেচনায় নিতে শিক্ষিত মানুষও ভুলে যাচ্ছেন। সেই সাথে একটি পণ্যের উপযোগিতা নিঃশেষ হওয়ার আগেই সেই পণ্যের নতুন মডেল ক্রয় করা যেন মানুষের নেশায় পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে মানুষের রুচি-অভ্যাস ও ব্যবহারসামগ্রী। খাট-পালং, সোফা থেকে শুরু করে, জুতা-জামা-কাপড়, থালা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, বাড়ি-গাড়ি এমন কি স্বামী-স্ত্রী; প্রেমিক-প্রেমিকা বদল করার মতো আত্মমর্যাদাহীন কাজের প্রতিও বাঙালি ঝুঁকে পড়ছে। পণ্যের উপযোগিতা কী সেটি না বুঝেই বৈশ্বয়িক বাণিজ্যের আগ্রাসনের শিকার হয়ে বাঙালি এক জিনিসের প্রতি বেশি দিন স্থির থাকতে পারছেন না। এ সবই বিশ্বায়নের প্রভাব হলেও মুক্তবাণিজ্যের ব্যাপারে বাঙালির সতর্ক থাকা জরুরি ছিল। বিশ্বায়ন কিভাবে কোন কোন বিষয়ে মানুষকে প্রতারিত করতে পারে, সে ব্যাপারে বাঙালি নিজেদের সচেতন করতে না পারলে মুক্তবাজারে প্রবেশ করা আর খাল কেটে কুমির আনা সমান হতে পারে। যে বাঙালি খেজুর রসের বিশুদ্ধ গুড় তৈরিতে এখনো অপারগ, সেই বাঙালি মুক্তবাণিজ্যের চুক্তিতে সই করেছে। ফলে বাঙালির কুঠির শিল্প ধ্বংস হয়ে চীনাদের ওয়ানটাইম পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। এখন বাঙালি শিশুদের পছন্দের পণ্য চায়নিজদের তৈরি হরেক রকমের খেলনা পণ্য আর ভারতের তৈরি প্রসাধনসামগ্রী। বাণিজ্যে বাঙালির বিজয় আজো অর্জিত হয়নি।
বাঙালির রফতানি বাণিজ্যের মতো রাজনৈতিক দর্শনও আত্মঘাতী দেশদ্রোহী। বাঙালির রাজনীতির চরিত্রে যে ধস নেমেছে, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। অপরাজনীতি যখন প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে, জনসাধারণ তখন হয়ে ওঠেন বলির পাঁঠা। এমন সময়ে প্রতিপক্ষও হয়ে ওঠেন অসহ্যনীয়। যখন প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না তখন ক্ষমতার নিশ্চিয়তা হয়ে পড়ে বিদেশনির্ভর। এ তত্ত্ব কাজ করে বাংলাদেশেও। বিদেশীদের পরামর্শে নির্ধারিত হয় বাঙালির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট; কখন কিভাবে রাজনীতির মাঠ গরম করতে হবে, তার রূপরেখা প্রণীত হয় বিদেশের ইঙ্গিতে। এ অবস্থা চলে আসছে বহুদিন থেকে, যা বাঙালি জাতির আত্মহননকে উৎসাহিত করে। এই সামান্য তত্ত্ব¡টুকু রাজনীতিকরা না বুঝলেও সাধারণ জনগণ না বুঝে পারে না। বুঝেই বা কি করা যায়? জনগণ রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। হ
