পৌষের রাত, হাড় কাঁপানো শীত। দুই ঘণ্টার যাত্রাপথে আট ঘণ্টায় জামে আটকে বাস গন্তব্যে পৌঁছে রাত ১টায়। অধিক আয়ের আশায় দু-একজন রিকশাওয়ালা না থাকলে এত রাতে অবস্থা বেশ শোচনীয় হতো।
চাচা যাবেন? মিনিট খানেক তাকিয়ে চাচা কি যেন ভাবল, যেতে রাজি হওয়া মাত্রই উঠে পড়লাম।
কুয়াশার চাদর ভেদ করে এগিয়ে চলছি। সারা গ্রাম ঘুমিয়ে আছে, কোথাও কেউ নেই, মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে সদ্য গড়ে তোলা নতুন বসতবাড়ি থেকে শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। একঘেয়েমি কাটাতে চাচার সাথে আলাপজুড়ে দিই।
চাচা, এই শরীরে এত রাতে রিকশা না চালালে হয় না?
কি করমু বাজান, সারা দিন রিকশা চালানোর শক্তি নাই গতরে, রাতে ভাড়া একটু বেশি পাই, অল্প কিছুণ চালিয়ে খরচের টাকা জোগাড় হলেই বাড়ি ফিরে যাই।
টুকটাক আলাপচারিতায় বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেই দিনার ফোন- কী ব্যাপার, কই হারালে খোঁজখবর নাই যে।
ভাবলাম বাড়িতে পৌঁছে জানাব, তাই ফোন করিনি আর।
থাক আর বলতে হবে না, তুমি আজীবন এমনই থাকবে।
ওর মেকি রাগ দেখানোর ভনিতা বেশ মুগ্ধই করে। দিনার সাথে রেহানার কণ্ঠের দারুণ মিল। মাঝে মাঝে চমকে উঠি, রেহানা এলো কোথা থেকে।
রেহানা আমার চাচাত বোন, বয়সে সাত বছরের ছোট হলেও আচার আচরণে মনে হতো ও যেন আমার সমবয়সী। রেহানাকে তেমন একটা মনে করা হয় না এখন, ওর একমাত্র স্মৃতি যে ডায়েরিটা ছিল তাও উইপোকার পেটে গেছে।
গত ইউপি নির্বাচনে বিটলু মিয়ার প্রার্থী হওয়া দেখে অনেকটা অবাকই হয়েছিলাম, তাও আবার চেয়ারম্যান! কেউ কেউ বলেই বসল- শালার জামানত হারানোর শখ হইছে। তখনো জানা ছিল না ওর দৌড় কতদূর। ভোটের আগের রাতেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল, ভুতুড়ে পরিবেশে ভোট কেন্দ্রে যেতে সাহস করেনি অনেকেই। কেন্দ্র দখলে নিয়ে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে দিন শেষে বিটলু মিয়াকে জয়ী ঘোষণা করা হয়।
বিটলু মিয়ার ছেলে জামাল রেহানাকে বিরক্ত করত প্রায়ই, শেষমেশ ধমক দিলো- আব্বারে আগে চেয়ারম্যান বানাইয়া লই, তোর দেমাগ ছুটামু। রেহানা মুখের উপর বলে দিলো- যা যা, বিশ ভোটও পাবি না। ফলাফল ঘোষণার পর ভীষণ ডানপিটে রেহানা কেমন জানি মনমরা হয়ে গেল।
ভোটের পরদিন বিকেলে চাচী রহিমা খালাকে দেখতে গেলেন, রেহানা আহাদি গলায় চাচীকে বলল, তাড়াতাড়ি এসো মা, অন্ধকারে আমার খুব ভয় করে।
চাচী যেতে না যেতেই জামাল এসে হাজির, চেঁচিয়ে উঠেছে রেহানাÑ ওই, তোরে এদিকে আসতে নিষেধ করছি না, জুতাপেটা করুম তোরে। রেহানার রাগ যত বাড়ে জামালের পৈশাচিক হাসিও তত বাড়ে। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, চাচীও নেই, কী এক বিদঘুটে সময় পার করছি, খানিক পরেই দেখি একটি সাদা রঙের গাড়ি এসে থামল, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল রেহানাকে। দু’দিন পর রেহানার তবিত লাশ পাওয়া যায় নদীর পাড়ে।
তুমুল প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সোস্যাল মিডিয়ায়, মানববন্ধন আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মনে হয়েছিল অপরাধী পার পাবে না, তবুও এই বিশ্বাসে চিড় ধরে অল্প দিনেই। ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়াল হয় সবকিছু, পাঁচবার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরির্তন শেষে ওই মামলার খোঁজও রাখা হয় না আর।
রিকশা ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম, বাড়ির সামনেই কবরস্থান, তীব্র সুগন্ধ টের পেলাম, ছোট্ট একটা হাসনাহেনা গাছ, আর কোথাও হাসনাহেনা চোখে পড়ল না, মনে হচ্ছিল শত শত হাসনাহেনা গাছ বুঝি গন্ধ বিলাচ্ছে চার পাশে। একটু এগোতেই রেহানার কবর চোখে পড়ল, বুকের ভেতর নড়েচড়ে উঠল, আমার মনে যেন রাজ্যের ভয়, অথচ ঘোর অন্ধকারে কবরস্থানের পাশ ঘেঁষে অজস্রবার হেঁটে গিয়েছি অবলীলায়।
বাড়িতে পৌঁছানো মাত্রই মা ডাক দিলেন- বাবা এসেছিস?
হুম, অসুস্থ শরীরে এত রাত পর্যন্ত জেগে আছো কেন মা?
মা জড়িয়ে ধরো বলল- তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নেয় বাবা, সেই কখন গাড়িতে উঠেছিস।
তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম, হাসনাহেনার তীব্র গন্ধ এখনো লাগছে নাকে, ঘরের আশপাশে হাসনাহেনার গাছ নেই, কবরস্থানের হাসনাহেনার গন্ধ এতদূর আসার কথাও নয়, তবুও টের পাচ্ছি। ঘুমের ওষুধেও কাজ করছে না, এত কান্তির পরও ঘুম উধাও, মাথা ব্যথাটা বেড়েই চলছে। ঘরের পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে এমন শব্দ শুনে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করিÑ এখানে কে?
চুপ করে আছেন কেন?
কোনো সাড়া শব্দ নেই, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে কাউকে পেলাম না, মনের ভুল মনে করে শুয়ে পড়ি, আবারও সেই একই শব্দ, এবার শুধু পায়ের আওয়াজই নয়, বিড়বিড় করে কী যেন বকছে, আরে! এ যে রেহানার গলার আওয়াজÑ আমার অন্ধকারে খুব ভয় করে, খুব ভয় করে...।
ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, প্রচণ্ড তৃষ্ণায় পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও পারিনি, প্রচণ্ড চিৎকার করে মাকে ডাকার চেষ্টা করছি, গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কেউ একজন আমার চোখ মুখ চেপে ধরেছে, ভাবনায় তখন অন্যকিছু নেই। অস্পষ্ট স্বরে কেবলই শুনতে পাচ্ছি রেহানার মতো হুবহু গলায় কেউ একজন বলছেÑ অন্ধকারে আমার খুব ভয় করে, খুব ভয়...।