মানুষ কি বলতে চায় সেটি পরিষ্কার করে বুঝে ওঠার জন্য প্রয়োজন পড়ে ভাষার। ভাষা বক্তার বক্তব্যকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতেও সহায়তা করে। সে কারণে বক্তব্যের উদ্দেশ্য নির্ভুল করতে ভাষার শব্দ পরিবেশন যতটা যৌক্তিক হয়, অন্য কোনো মাধ্যম ততটা নির্ভুল হয়ে ওঠে না। সুতরাং মানবমনের অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করতে ভাষার বিকল্প হতে পারে না। ভাষাবিজ্ঞানীদের ধারণা মানুষ তাদের প্রয়োজন অনুসারে ভাষা আবিষ্কার করে নিয়েছে। ভাষা আবিষ্কারের আগে মানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ইশারা বা সঙ্কেত, অর্থহীন অস্ফুট ধ্বনি, নানা রকম রেখা, নকশা ও চিত্র অঙ্কনের সাহায্য নিতো। বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ম্যাক্সমুলারের মতে ইশারা-ইঙ্গিতের পরই এসেছিল মুখের ভাষা। কিন্তু পবিত্র কুরআন ভিন্ন কথা বলছে। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে এই গ্রন্থের সূরা রহমানে বলা হয়েছেÑ‘ তিনি (আল্লাহ) মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন’[ আয়াত: ২,৩]। পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছেÑ‘ হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও’ [সূরা হুজরাত:১৩]। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যেতে পারে মানুষ যখন পৃথিবীতে এসেছে তখন কথা বলার যোগ্যতা নিয়েই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই পৃথিবীতে আগে মানুষ এসেছে এবং পরে সেই মানুষ বিভিন্ন উপায়ে ভাষা শিখেছে এমন মন্তব্য গ্রহণযোগ্য কি না তা ভাবার অবকাশ রয়েছে। পবিত্র কুরআনের এই তথ্যমতে পৃথিবীর সব ভাষার উৎপত্তি হয়েছে (ধ্বনি তারতম্যে) একটি ভাষা থেকে। ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে কুরআনে বর্ণিত তথ্যের ওপর গবেষণা হলে এটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
ভাষার ভ্রƒণ, অস্থি, গোশত মানুষের মুখবিবরে সৃষ্টি হয়ে সেখানেই বেঁচে থাকার আশ্রয় খোঁজে। মুখে মুখেই ভাষার বেড় ওঠা, বিকশিত হওয়া এবং বিস্তার লাভ করা। মানুষের মুখ থেকে ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানেই ভাষার মৃত্যু হওয়া। পৃথিবীর বহু ভাষা এভাবে মানুষের মুখ থেকে হারিয়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। একটি ভাষাকে বেঁচে রাখার অর্থ সে ভাষাতে অধিক সংখ্যক গ্রন্থাদি রচিত হওয়াকে বোঝায় না। ভাষাকে সঠিক ও অভিন্ন উচ্চারণে মানুষের মুখে রাখাকেই ভাষার বেঁচে থাকা হয়ে থাকে। সম্প্রতি বাংলা ভাষায় অধিক সংখ্যক গ্রন্থ রচনা হওয়াকে অনেকেই বাংলা ভাষার বেঁচে থাকা বুঝতে চাচ্ছেন। কেউ আবার একুশে গ্রন্থ মেলাকে বাংলা ভাষার বেঁচে থাকার উপায়-উপকরণ মনে করছেন। বছরান্তে মেলার আয়োজন এবং সেই মেলাকে কেন্দ্র করে শত শত গ্রন্থ প্রকাশ করা মানে বাংলা ভাষার উন্নতি করা নয়, এমনটা অনুমান করা না গেলে ভাষার অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বাংলা ভাষা মুখের আশ্রয় ত্যাগ করে ধীরে ধীরে গ্রন্থের কোটরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। লক্ষ করা যাচ্ছেÑ তারুণ্যের ভাষা এখন বাংহিংরিজ। দশ শব্দের একটি বাক্য বলতে গিয়ে তরুণরা বাংলা ব্যতীত অন্য ভাষার সাতটি শব্দকে বেছে নিচ্ছে। বাংলা ভাষার তিনটি শব্দ আর অন্যান্য ভাষার সাতটি শব্দ নিয়ে যদি একটি বাক্য তৈরি হয় তাহলে এমন বাক্যকে বাংলা বাক্য বলা যায় কি না, পাঠকেরা বিচার করবেন। বাংলা ভাষার এমন দুর্দশা থেকে আমাদের গ্রন্থ ও গ্রন্থমেলা তরুণ প্রজন্মকে ফেরাতে পারেনি। অথচ একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়েছে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। এই দীর্ঘ পথ চলায় একুশে গ্রন্থ মেলা বাংলা ভাষার সমৃদ্ধিতে কিছু একটা যোগ করতে পারলে হয়তো বাংলা ভাষাকে আজ অস্তিত্ব সঙ্কটের উৎকণ্ঠায় পড়তে হতো না।
বাংলা ভাষা শুধু ভাষা নয় এটি শক্তি, সম্পদ, সম্মান, ঐতিহ্য। এই ভাষা বাঙালি জাতিসত্তার পরিচায়ক। বাংলা ভাষা মানে বাঙালি জাতিসত্তা; বাঙালিদের মধ্যে এই মূল্যবান জ্ঞানের উদয় ঘটেছিল মাত্র একদিন। সে দিনটি ছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির দিন। এর পর স্বাধীনতা। তারপর বাঙালি আর সেই জ্ঞানের সন্ধান করা প্রয়োজন মনে করেনি। বাঙালি হয়তো বুঝতে পেরেছিল কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা তো অর্জিত হয়েছে আর বাংলা ভাষার দরকার কি। তারা হয়তো সেদিন বাংলা ভাষাকে রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তারা এটা আজও ভাবতে পারেনি যে, বাংলা ভাষা রাজনীতির অস্ত্র নয়; এ ভাষা বাঙালি জাতির শেকরের সাথে প্রোথিত। বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হলে জাতিসত্তারও বিলুপ্তি ঘটতে পারে। বাংলা ভাষার বিষয়ে বাংলাদেশে যে চিন্তাগুলো বহমান রয়েছে সেগুলো খুবই খাপছাড়া, বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত। ভাষা, জাতি, জাতীয়তা, দেশপ্রেম এসব বিষয়ে এ দেশের প্রগতিশীল চিন্তাকেও অপোক্ত বেমানান মনে হতে পারে। পৃথিবীর অন্যকোনো জাতির প্রগতিশীলদের মধ্যে জাতীয় অগ্রগতির এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদাসীন থেকে উদ্ভট বানোয়াট, ক্ষয়িষ্ণু ধারণার প্রগতিবাদ নিয়ে ভাবতে দেখা যায় না; যা নিয়ে বাঙালি বুদ্ধিপ্রেমীরা ব্যস্ত রয়েছেন। পৃথিবীর উন্নত সভ্যতাগুলো টিকে ছিল তাদের স্বকীয়তাকে ধরে রাখার ফলে। বাংলা ভাষা-ভাষীদের কাছে সেসব ইতিহাসও ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছে। ফলে জাতি গঠনের উপায়গুলো দেশ থেকে মুছে যেতে বসেছে। একটি জাতি নিজেকে সভ্যজাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিতি পেয়ে মর্যাদার শীর্ষে অবস্থান করতে পারে এমন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ এদেশের প্রগতিশীল সমাজে লক্ষ্য করা যায়নি। বাংলা ভাষার ক্ষয়ে যাওয়া তার একটা উদাহরণ হতে পারে। বাংলাদেশের প্রগতিশীলরা সারা জীবন ধরে একটি রাজনীতির পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে আর মাঝখান দিয়ে সভ্যতা-সংস্কৃতি-সার্বভৌমত্ব উচ্ছন্নে গেছে। সোনা-দানা, জমি-জায়গা, বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা এগুলো যেমন সম্পদ এর থেকে বহুগুণে দামি সম্পদ হচ্ছে ভাষাপ্রেম, দেশপ্রেম, জাতিপ্রেম, শ্রদ্ধা- ভালোবাসা, ¯েœহ-মায়া-মমতা, সততা, পরোপকারিতা, বদান্যতা, ন্যায়-নীতি, অধিকার, মর্যাদা, মূল্যবোধ ইত্যাদি। অথচ বাংলাদেশের মানুষ এখন সম্পদ বলতে শুধু টাকা-পয়সা, জায়গা-জমি, সোনা-দানাকে বুঝতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বুদ্ধিপ্রেমীরা রাজনীতি আর ক্ষমতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। এতে করে জাতির ভেতরে দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের পরিবর্তে পেশিশক্তি ও ক্ষমতার কদর বেড়ে চলেছে।
এক ভাষা; এক জাতি; এক দেশ; এর অর্থ এক বৃহৎ শক্তি। এই বৃহৎ শক্তি সংগঠিত হওয়ার কতগুলো উপায় রয়েছে। যেমন জাতীয় সম্পদগুলোকে চিহ্নিত করে জনসাধারণের বোধের মধ্যে সেগুলোকে ধরে রাখার ব্যবস্থা করা এবং এই সম্পদকে সবার উপরে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করা। সেটি করা না গেলে বৃহৎ শক্তি সংগঠিত হয় না। রাজনীতি এই জায়গাটা নষ্ট করেছে। শুধু রাজনীতির কারণে এদেশের ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, নাটক, সিনেমার উপজীব্য বিষয়গুলো আমদানি করা হচ্ছে সীমান্তপারের বন্ধুদের আইডিয়া থেকে। এই যে ধার করা আইডিয়া! এটা কোনো জাতির মেরুদণ্ডকে পোক্ত করতে পারে না। মনে রাখা দরকার, ধারে দেনার দায় বাড়ে। আর এই দেনা দিন দিন বাড়তে থাকলে মানুষের সবশেষ আশ্রয়স্থল বাস্তুভিটা বিক্রি করে সেই দেনার দায় পরিশোধ করতে হয়। বাংলা ভাষাও শব্দ ধার করে সমৃদ্ধ হয়েছে। সেই ধার এখন এত বেশি হচ্ছে যে, ধার করা শব্দেই এক ধরনের বাংলা ভাষা গড়ে উঠছে, যেখানে বাংলা শব্দের জায়গা হচ্ছে না; আর এই বাংলাকে ঠিক বাংলা ভাষা বলা যায় কি নাÑ সেটার বিচারও কিছু মানুষের মাথাব্যাথার কারণ হয়েছে। বাংলা ভাষার এই শ্রী দেখে হয়তো মনে হতে পারে বাংলা ভাষার যে প্রয়োজন ছিল সেই প্রয়োজনটুকু ছিল শুধু বাহান্নে; আজ তা ফুরিয়ে এসেছে।
বাংলা ভাষার কপালটাই হয়তো মন্দ। এই ভাষার গোড়াপত্তন থেকে আজ অবধি বহুবার অন্য ভাষার অসংখ্য শব্দের পেরেক তার শরীরে বিঁধেছে। এসব পেরেকের ভিড়ে বাংলা ভাষার শরীরটাকে আর ভালো করে দেখা যায় না। বাংলা ভাষা প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। অষ্ট্রিক, দ্রাবিড়, অনার্য, আর্য জনগোষ্ঠীর ভাষা মিলে জন্ম নিয়েছে বাংলা ভাষা। অষ্টম শতকে রচিত ‘আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প’ নামে সংস্কৃত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে প্রাচীন গৌড় ও পুন্ড্র নগরের অধিবাসীরা অসুর ভাষায় কথা বলত। এই অসুর ভাষাকে অষ্ট্রিক বুলি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেছেনÑ আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে এই ভাষার অস্তিত্ব ছিল। তবে শহীদুল্লাহর মতে বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল খ্রিষ্ট্রীয় সপ্তম শতাব্দী। উৎপত্তির পর থেকে নানা পর্যায়ে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা এই পর্যায়ে এসে আবারো নতুন বিবর্তন শুরু হয়েছে। প্রাচীন কাল পেরিয়ে মধ্যযুগের শেষপ্রান্তে এসে বাংলা ভাষার দ্বিতীয় বিবর্তন শুরু হয়। চৈতন্যদেবের আর্বিভাবে বৈষ্ণব সাহিত্য ও পৌরাণিক অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে প্রচুর সংস্কৃত শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নেয় এবং মৈথিলিমিশ্রিত ব্রজবুলি কাব্যভাষা হিসিবে পরিচিতি পায়। ষোল শতক থেকে বাংলা ভাষাতে আরবি-ফারসি ভাষার প্রভাব পড়ে। মধ্য যুগের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তার কাব্যে প্রচুর আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহার করেন। ষোল শতকে চিঠিপত্র দলিল-দস্তাবেজে বাংলা গদ্যের ব্যবহার হতে থাকে। এ সময় পর্তুগিজ মিশনারিদের প্রভাবে পর্তুগিজ শব্দ প্রবেশ করে এবং পরে খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রভাবে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বাড়তে থাকে। বাঙালি জাতির ওপর প্রভাব বিস্তারের কারণে বাংলা ভাষাকে বিভিন্ন সময় কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলা ভাষার ওপর অধিপত্য বিস্তার করে ইংরেজরা। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতঘেঁষা করার চেষ্টা করা হয়। এতদিন তদ্ভব, আরবি-ফারসি ও দেশজ শব্দমিশ্রিত যে বাংলা প্রচলিত ছিল তা সংস্কৃতপণ্ডিত ও ইংরেজ পাদ্রিদের প্রভাবে ইংরেজি ও সংস্কৃতঘেঁষা হতে থাকে। আরবি-ফারসির অনাধিকার প্রবেশ ঘটেছে এই অজুহাতে বাংলা ভাষাকে কাটাছেঁড়া করে অল্পদিনের মধ্যে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতঘেঁষা করে তোলা হয়েছে। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে আরবি-ফারসি খেদানোর সূত্রপাত ঘটে আর ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানি আইনের নামে দেশের সদর-মফস্বল আদালতে আরবি-ফারসির পরিবর্তে বাংলা-ইংরেজির ব্যবহার শুরু হয়। এভাবেই ইংরেজি, বাংলা ভাষার মর্যাদাকে নিঃশেষ করতে শুরু করে। বাংলা ভাষার কাটাছেঁড়াকে বেগবান করেছে বহুজাতিক রাজনৈতিক আন্দোলন। ’৫২ সালেও বাংলা ভাষা সেই রাজনীতির সাথে ঘরবসতি করেছে। সংস্কৃত পণ্ডিতরা নিজেদের প্রয়োজনে যেমন বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করেছে তেমনি পর্তুগিজ ও ইংরেজ পাদ্রিরাও নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করেছে; এই একই ধারাতে ’৫২ ভাষা আন্দোলনও প্রবাহিত হয়েছে। ফলে বাংলা ভাষা রাজনীতির ইস্যু হতে পারলেও নিজের অস্তিত্বে টিকে থাকার ইস্যুতে পরিণত হতে পারেনি আজও।