একালে বাংলা একাডেমির পরিচিতি তার প্রাঙ্গণে আয়োজিত একুশের বইমেলার জন্য। ভাবখানা এমন যে, বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একুশের বইমেলা করার জন্য। ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা সবই বিশেষ সময়ে ঐতিহাসিক ঘটনা। এক বিশেষ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত। কারণ পাকিস্তান আমলে যুক্তফ্রন্ট সরকার নির্বাচনের আগে অঙ্গীকার করেছিল, তারা সরকার গঠন করলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে বাংলা ভাষা উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করবেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। লক্ষ করার বিষয়, ‘একাডেমি’ শব্দের কোনো বাংলা প্রতিশব্দ করা হয়নি। যাতে বাংলা একাডেমি গঠিত হয় একাডেমিশিয়ানদের দ্বারা, একাডেমিশিয়ানদের জন্য ও একাডেমিক কাজের জন্য। একাডেমির সেই অর্থ, সেই উদ্দেশ্য কী আমরা যথাযতভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলাম? যদি একাডেমির অর্থ অনুধাবন করতে পারতাম, তাহলে প্রকাশনা অপেক্ষা গবেষণাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতাম। প্রশাসন অপেক্ষা পাণ্ডিত্যকে গুরুত্ব দিতাম। তা তো দেইনি। তাই বাংলা একাডেমি একটি বিশাল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কোথায় হারিয়ে গেল প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্যজ্ঞান। স্থান নিলো প্রকাশক, প্রকাশনা ও ব্যবসায়িক মানসিকতা। ধীরে ধীরে আমরা এমনভাবে একাডেমি থেকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, একাডেমিশিয়ান থেকে প্রকাশক হয়ে যাচ্ছিলাম। এ যাত্রা কবে কোথা থেকে আরম্ভ হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। প্রথম দিকে ততটা বোঝা যাচ্ছিল না। কারণ একাডেমির কাজের চেয়ে একাডেমির অস্তিত্বই ছিল বড়। সে যেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের প্রতিবাদ। একাডেমির অবস্থান ছিল প্রতীকী, প্রতিবাদের প্রতীক।
অন্য দিকে, প্রতি বছর ভাষার জন্য যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালন করতাম ভাবগম্ভীর পরিবেশে। দিনটি ছিল শোক দিবস, প্রতিজ্ঞা গ্রহণের দিবস। মহৎ কিছু আকাক্সক্ষা করার ও মহত্তর কিছু করার প্রতিজ্ঞা করার দিবস ছিল এই দিনটি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও তেমনি বাংলা একাডেমিও এই শহীদ দিবস পালন করত। শোকের বেদনা বক্ষে ধারণ করে বাংলাদেশের আপামর সব মানুষ দিনটি উদযাপন করত কতগুলো স্মরণীয়কে স্মরণ করার জন্য। বাংলা একাডেমির সাথে একুশে ফেব্রুয়ারির আর কোনো সম্পর্ক ছিল না। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সাথে দিবসটি পালন করার মধ্যে ছিল এ দিবসের সার্থকতা। বাংলা একাডেমির কাজ ছিল বাংলা ভাষার উন্নয়ন।
ষাটের দশকের বেশির ভাগ সময় বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। অন্য দিকে, পাকিস্তান গ্রন্থকেন্দ্রের ঢাকা অফিসের দায়িত্বে ছিলেন সরদার জয়েন উদ্দীন। গ্রন্থকেন্দ্রে যোগদানের আগে তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির প্রকাশন ও বিক্রয় বিভাগে আমার সহকর্মী। তিনি ছিলেন দারুণ আড্ডাবাজ লোক। তাই আমি ও একাডেমির গ্রন্থাগারিক শামসুল হক গ্রন্থকেন্দ্রে মাঝে মধ্যে আড্ডা দিতে যেতাম। ১৯৬৪ বা ১৯৬৫ সালের কোনো একদিন তিনি বললেন, কেন্দ্র থেকে নির্দেশ এসেছে শিশুসাহিত্য নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে। তখন আমি বললাম, ‘প্রদর্শনী নয়, ফেয়ার করুন’। কারণ একাডেমির গ্রন্থাগারে ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড অব বুকস’ নামে একটি বই কেনা হয়েছে, সেখানে প্রদর্শনী নয়, বইয়ের ফেয়ারের বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি আমার কথাটা লুফে নিলেন। আমরা বুক ফেয়ারের বাংলা করলাম গ্রন্থমেলা’। সরদার সাহেব সেই বছর গ্রন্থকেন্দ্র থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির নিচতলায় প্রথম শিশু গ্রন্থমেলার আয়োজন করলেন। তারপর ১৯৭০ সালে সুধীজন পাঠাগারের উদ্যোগে ও গ্রন্থকেন্দ্রের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে সপ্তাহব্যাপী গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়েছিল।
এদিকে সৈয়দ আলী আহসান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ার পর ড. দীন মোহাম্মদ ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে একাডেমিতে যোগ দিলেন। যোগদান করেই একাডেমির বই বাজারজাত ও প্রচারণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিলেন। বাহ্যত তিনি প্রাচীনপন্থী হলেও কাজকর্মে তার অনেক আধুনিক আইডিয়া ছিল। প্রকাশক হিসেবে একাডেমির বইয়ের প্রচারণার প্রয়োজন এ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তাঁর নির্দেশে পরের বছর একুশে ফেব্রুয়ারির সময় বাংলা একাডেমির বই অর্ধেক মূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। বছরের কোনো একসময় অর্ধেক মূল্যে বা হ্রাসকৃত মূলে পণ্য বিক্রয় এ দেশে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তা। বিশেষ করে সরকারি জিনিস গুদামে পোকায় কাটুক, ইঁদুরে খেয়ে নষ্ট করুক তাতে কোনো অপরাধ নেই। কিন্তু অর্ধেক বা হ্রাসকৃত মূল্যে বিক্রি রীতিমতো অপরাধ। দীন মুহাম্মদ মান্ধাতার আমলের সরকারি চিন্তাধারা ভঙ্গ করে নতুন কিছু করতে চেয়েছিলেন এবং সাহস করে তাই করেছিলেন। হ্রাসকৃত মূল্যে বই বিক্রির খবর পেয়ে নিউমার্কেটের অনেক পুস্তক বিক্রেতাও প্রচুর বই কিনতে আমাদের কাউন্টারে সমবেত হয়েছিলেন। লাইন দিয়ে বই বিক্রি হচ্ছিল। বেশ ভিড় হয়েছিল। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশে বইমেলার সূত্রপাত হয়েছিল তখনই।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারির চরিত্র ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। আমরা বুঝতে পারলাম না, কে বা কাদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই মহান পবিত্র দিনের চরিত্র বদলিয়ে দিলো। সরকারিভাবে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছিলেন। অথচ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ আমরা পালন করলাম না। শোক ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম একুশের প্রতিজ্ঞা।
আমাদের দেশে যখনই কোথাও কোনো কারণে জনসমাবেশ ঘটে, তখন ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা, ফেরিওয়ালারা তাদের কিছু পণ্য নিয়ে বসেও একটা মেলার রূপ দিয়ে ফেলে। আমাদের বাংলা একাডেমিতে তেমনি ’৭২ সাল থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে জনসমাগম হতো। স্বাভাবিকভাবে নানা প্রকার পণ্যের ফেরিওয়ালারাও বটতলার জনসভার প্রবেশপথে ও আশপাশে তার পণ্য বিক্রির জন্য বসতেন। এমন করেই ’৭২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কয়েকজন পুস্তক ব্যবসায়ী কিছু বই নিয়ে বসেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশারস, মুক্তধারা ও বর্ণমিছিল। বাংলা একাডেমি নিজে তো ওই সময় অর্ধমূল্যে তার নিজের প্রকাশনা বিক্রি করছিল। মূলত বাংলা একাডেমি ১৯৬৮ সাল থেকেই অর্ধমূল্যে তার প্রকাশনা বিক্রির রেওয়াজ চালু করেছিল। ধীরে ধীরে এই বই বিক্রি ব্যবস্থা পরবর্তীকালে বইমেলার রূপ নিলো। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে একুশের বইমেলা বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে ক্রমেই বিশাল হতে বিশালতর হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বই দেশের সর্বত্র বইয়ের দোকানে সারা বছর পাওয়া যায় না। মনে হয় একুশের বইমেলার কারণে বাংলাদেশের বইয়ের বাজারকে সঙ্কুচিত করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ের সীমায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে এবং বাংলাদেশের সর্বত্র বাংলাদেশের বই পাওয়া যায় না।
আমরা যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে আবেগকে গুরুত্ব দিলাম। যে দিনটি ছিল জাতীয় শোক দিবস, সেই দিবসকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক মানসিকতার কারণে আমরা ‘বইমেলা দিবসে’ পরিণত করলাম। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত পরিকল্পনা অবশ্য ছিল না। আমরা ইংরেজি ফেয়ার শব্দের পরিবর্তে মেলা, বুক ফেয়ারের পরিবর্তে বইমেলা করলাম। কিন্তু চিন্তা করলাম না ফেয়ার যে সাংস্কৃতিক পরিবেশে আয়োজিত হয় বা হতো, মেলা সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশে আয়োজিত হতো না। মেলা বহুলাংশে বাংলাদেশের আদিম ও গ্রামীণ। বই আধুনিক, মেলা আদিম। বই সভ্যতার বাহক, মেলা আদিমতার ধারক। মেলা সব প্রকার পণ্য বেচাকেনার বার্ষিক বাজার। যেকোনো শব্দের যে ঐতিহ্যগত শক্তি থাকে, সেই শক্তির ক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়, এই সত্য তারা স্বীকার করবেন। ‘মেলা’র ঐতিহ্যগত শক্তির মধ্যে পরিবর্তন আনা সহজ নয়। আমাদের যদি সেই অনুধাবন শক্তি থাকত, তাহলে আমরা বইয়ের বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতাম না। আমাদের সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব, সামাজিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের মতো অর্ধশিক্ষিত মেধাহীন মেধাবীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তাই সর্বক্ষেত্রে দূরদর্শিতার প্রচণ্ড অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা নিজেদের সুশীলসমাজ বলছি, বুদ্ধিজীবী বলছি। আমরা জানি না আমরা কত কম জানি। সে কারণেই যে মহান ভাষা আন্দোলনের প্রভাবে স্বাধীনতার প্রাপ্তি ঘটল, অথচ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও সেই বাংলা ভাষাকে তেমন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পরলাম না। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতি বছর স্মরণ করিয়ে দিত আমাদের কী নেই এবং আমাদের কী প্রয়োজন। আমরা উদ্বুদ্ধ হতাম। বাংলা একাডেমির কর্মকাণ্ডের প্রভাবে চালিত হওয়ার কথা রাষ্ট্রীয় যাবতীয় কাজকর্ম বাংলায় এবং বাংলাই একমাত্র শিক্ষার মাধ্যম হয়ে থাকার কথা ছিল। অথচ হয়নি এবং যারা ইংরেজি শিখবে পড়বে বলবে ও লিখবে; তারা সত্যই ভালো ইংরেজি শিখতে পারবে। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, জাপানি ইত্যাদি বিশ্বের সব ভাষার পণ্ডিত থাকবে এ দেশেই। ও লেভেল আর এ লেভেল পরীক্ষা দেয়ার জন্য জাতি উন্মাদ হয়ে যাবে না। বিদেশে পড়তে না গিয়ে বিদেশ থেকেই এখানে পড়তে আসবে। আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। এমন সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করাটাই সম্ভবত ছিল বাংলা একাডেমির কাজ। কিন্তু তেমন পরিবেশ তো সৃষ্টি হয়নি। একুশের বইমেলা বর্তমানে জনতার বইমেলায় পরিণত হয়েছে। জনতার ইংরেজি ‘মব’। জনতা নির্বোধ আর ব্যক্তি বুদ্ধিমান। জনতার বইমেলায় বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ততটুকুই সম্পৃক্ত যতটুকু তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট। লেখক হিসেবে তাকে অংশ নিতেই হয় মেলায়। কিন্তু সে হারিয়ে যায় জনতার মাঝে।
আমরা একবার কী ভেবে দেখেছি, কলকাতার বই সারা বছর বাংলাদেশের সর্বত্র পাওয়া যায় কেন? হ