মর্মের মূলে যে বেদনা নিহিত তাকে প্রকাশ করা খুব সহজ নয়। তবে একুশের স্মৃতির সাথে সম্মিলিতভাবে আমাদের মন ও মানসে যেমন রয়েছে এক গভীর বেদনাবোধ, তেমনি বিরাট কিছু, মহৎ কিছু প্রাপ্তির আনন্দ।
১৯৫২ সালের কথা, সত্যি বলতে গেলে, আমার খুব স্পষ্ট কালানুক্রমিক পদ্ধতিতে মনে আসে না। স্মৃতি বেশ ঝাঁপসা হয়ে গেছে। অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে বলে নয়। কিংবা আমি খুব ছোট ছিলাম সে কারণেও বোধ হয় নয়। আমি তো তখন কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে অবতীর্ণ হচ্ছি। চট্টগ্রামে সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষ আইএ অধ্যয়নের শেষ দিকে রয়েছি। কিন্তু আশ্চর্য! যান্ত্রিক গোলযোগে দ্রুতচালিত চলচ্চিত্রের মতো যেন ঘটনাগুলো ঘটে গেল। এর চেয়ে এর আগে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রাম ১৯৪৮ সালের মার্চের কথা আমার আরেকটু স্পষ্ট করে মনে পড়ে। তখন আমি স্কুলের ছাত্র। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের নেতৃত্বে আমরা মিছিল করি এবং তলতাদার এতটি সাময়িকীতে ‘বিক্ষুব্ধ ঢাকা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধ পড়ে খুব উত্তেজিত হই। পত্রিকাটি নিয়ে লঞ্চে বাড়ি যাওয়ার পথে প্রায় গ্রেফতার হতে যাচ্ছিলাম। কোথায় পেয়েছি এই পত্রিকা? শাদা পোশাক পরিহিত এক পুলিশ অফিসার মনমতো জবাব না পেয়ে জোর করেই আমার কাছ থেকে পত্রিকাটি নিয়ে গেলেন। সে দৃশ্য এখনো চোখ বুজলেই যেন দেখতে পাই।
’৪৮ সালের আন্দোলন সারা দেশে ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটা সচেতনতা এনে দিয়েছিল। তাই ’৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষার প্রশ্ন একটা উটকো আন্দোলন শুরু হয়নিÑ সাধারণভাবে এটা ছিল প্রতিরোধের পরীক্ষা, যাবতীয় বিক্ষোভের অভিপ্রকাশ।
যদ্দুর মনে পড়ে, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি হচ্ছিল চট্টগ্রামে। শহরে সরকারবিরোধী নেতাদের মধ্যে তখন নাম করে উঠছিলেন জহুর আহমদ চৌধুরী এবং এম এ আজিজ যুবনেতা ও সাহিত্যসেবীরূপে মাহবুবুল আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরী প্রমুখ, কলেজে নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে ছিলেন মাহফুজুল হক, ফরমানউল্লাহ খান, শাহাবুদ্দিন খালেদ, কবির উদ্দিন আহমদ, আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী এবং অন্যরা। এ ছাড়া আহমদ ফরিদ, খান শফিকুল মান্নান, ওপর হায়াত, জহুরুল ইসলাম ছুটু, নুরউল আলম, সৈয়দ শামসুল হুদা, আফলাতুন প্রভৃতি সক্রিয় সহপাঠীদের কথা মনে পড়ে। আরো অনেকে ছিলেন যাদের নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না। সে সময়ে আমরা যা করেছি তা হলো, মিছিল আর জনসভা। ছাত্রদের মিছিল আর ছাত্রদের রইল না।
শ্রমিক-জনতা সবাই যোগ দিলো। জনসভা পরিণত হলো অসংখ্য মানুষের বিক্ষুব্ধ সমাবেশে। একুশে ফেব্রুয়ারি দুপুরে আমরা কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে লালদীঘি ময়দানে আসি এবং সেখানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় পুলিশি জুলুমের বিরুদ্ধে, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে।
ময়দানের দক্ষিণপূর্ব পাশে টিলার ওপর রয়েছে পুলিশের হেড কোয়ার্টার। তবে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা তখন ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। কিন্তু সে রাত থেকে বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। ইতোমধ্যে সে বিকেলেই ঢাকায় গুলি চালনার খবর চাটগাঁয় চলে আসে। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে অগণিত ছাত্র-জনতার নিহত হওয়ার খবরে ছড়িয়ে পড়ে অভূতপূর্ব উত্তেজনা। মাহবুবুল আলম চৌধুরীর ‘ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটির এক অসামান্য আবৃত্তি শুনে থাকার কথা মনে পড়ে।
স্লোগানের বজ্রনাদ যারা শুনেছেন তারা সাথে সাথে শিউরে উঠেছেন। ক্ষমতাসীনদের অন্তরাত্মাও কাঁপিয়ে তুলছিল হয়তোবা। কিন্তু রাতের অন্ধকারে প্রেস থেকে পাণ্ডুলিপিসমেত ছাপা কবিতাটির সব কপি ওরা নষ্ট করে দেয়। পরদিন লালদীঘি ময়দানে আরো বড় সভার জমায়েত হলো। সম্ভবত দুই লাখ লোকের সমাবেশ হয়েছিল। সে জনসভায় তখনকার দিনের যুবনেতা চৌধুরী হারুন উর রশিদ এক অনলবর্ষী কবিতা পাঠ করেন। এটি পুস্তিকা আকারে ছাপাও হয়। কবি ও মুদ্রাকরের কপালে কারাবাসও জোটে যথারীতি।
কিন্তু যতই ধরপাকড়, নির্যাতন বাড়তে লাগল, ততই অধিকারসচেতন হয়ে উঠল মানুষ। পরবর্তী দিনগুলোতে একবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল অবধি ছড়িয়ে পড়ল ভাষা আন্দোলনের ভাবনা। হ