বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা কবি আল মাহমুদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন অথচ কবিতা চর্চা করতে পারেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কবি আল মাহমুদ তরুণ কবিদের কবিতার লোভ দেখাতেন না, বরং সত্যিকারের কবি হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাস্তব স্বপ্ন দেখাতেন। তার সাহিত্যকর্মের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবেÑ তিনি পাঠককে কখনোই নিরাশ করেননি, সবসময়ই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছেন সাহস জুগিয়েছেন। কবির লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ বইটিতে কবি তার জীবনের নানা সময়ের সুখ-দুঃখের ছবি তুলে ধরেছেন। কবির আরেকটি বই ‘দশ দিগন্তে উড়াল’ এটিও সমসাময়িক বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। বই দু’টি পাঠ করলে জানা যাবে কবির কর্ম ও জীবনকে। কবির একজন শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, কবির কবিতা পাঠ করে জীবনের নতুন ঠিকানার সন্ধান পেয়েছি। বিবেককে সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য যে খোরাক, তা রয়েছে আল মাহমুদের কবিতায়। সঙ্গতকারণেই তার জীবদ্দশায় অগণিত লেখক সৃষ্টি করে গেছেন তিনি। তিনি অসুস্থ থাকার পরেও নিয়মিত খোঁজখবর রেখেছেন শুভাকাক্সক্ষী ও ভক্তদের। একজন স্বভাব কবি হিসেবে আল মাহমুদ বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান কবি ছিলেন। তার সাহিত্যকর্ম পাঠকদের আন্দোলিত ও আলোড়িত করে নিঃসন্দেহে। কবির জীবনের শেষ দিনগুলোতে চোখে কম দেখতেন ও কানে কম শুনতেন। তিনি নিজে লিখতে না পারলেও শ্রুতিলেখক ব্যবহারের মাধ্যমে কবিতা লেখার কাজ চালিয়ে গেছেন। একজন প্রতিশ্রুতিশীল মানুষ হিসেবে আল মাহমুদ কখনোই নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেননি। নিজের দুঃসময়েও দেশ ও দেশের মানুষের জন্য লিখেছেন। লিখেছেন নদী, পাখি ও গানের কথা। কবির কবিতায় মিশে আছে বিশ^াস ও মানবতার কথা, পাখির কিচির-মিচির, নদীর কল-কলানি আর পাতার মর্মর ধ্বনি। এমনই এক বাস্তবধর্মী কবি ছিলেন আল মাহমুদ। আমার তিনটি কবিতার শ্রুতিলেখক হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। এটা আমার জীবনের জন্য পরম পাওয়া। সময়-অসময়ে ছুটে গেছি কবির বাসায়। ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি লিখেছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ সোনালী কাবিন। নিজস্ব এক কাব্যধারায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন কবিতার জগৎকে। লিখেছেন ছড়া, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোট গল্প ও আত্মজীবনীমূলক অনেক লেখা। কবির শৈশব-কৈশোর কেটেছে তিতাস নদীরপাড়ে। শৈশব-কৈশোরের কষ্টগাঁথা উঠে এসেছে তার কবিতায়। তিনি যখনই আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতেন, তিনি তার শৈশবের কথা দিয়েই শুরু করতেন। তিনি খুব বেশি তার মায়ের কথা স্মরণ করতেন আর তাই, অনেক সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন।
একজন বাস্তববাদী কবি হিসেবে তার কর্ম আগামী প্রজন্মকে আদর্শবান মানুষ সৃষ্টিতে সাহায্য করবে। বার্ধক্যজনিত রোগে কবি আল মাহমুদ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কবির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে শেষবারের মতো কবিকে দেখার জন্য ভক্ত অনুরাগীরা ভিড় করেন হাসপাতালে। কবি ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবির বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ১৯৬৮ সালে লোক লোকান্তর ও কালের কলস-এর জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি একুশে পদকসহ আরো অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৮ বছর থেকে তার কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা ও কলকাতার নতুন সাহিত্য চতুঙ্কোণ, ময়ুখ, কৃত্তিবাস পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে ঢাকা-কলকাতা পাঠকের কাছে আলোচিত হয়ে ওঠেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, ডাহুকি এবং আগুনের মেয়ে চতুরঙ্গ।
জীবনের শেষ দিনগুলো একাকিত্ব ও নির্জনতার মধ্যে কাটলেও তাকে সঙ্গ দিয়েছেন অনুজ বন্ধুরা। দেখতাম, তার বাসায় কেউ না কেউ উপস্থিত থাকত। কবি আল মাহমুদ আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন। কবি আমাদের সবার মধ্যে না থাকলেও তার সাহিত্যকর্মে বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে। কবির কবিতা প্রেরণা জোগাবে, স্বপ্ন দেখাবে সত্য ও সুন্দর পথের। পরিশেষে কবির রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ কবির গুনাহ ক্ষমা করে তাকে জান্নাত দান করুন। কবি পরিবারকে আল্লাহ তায়ালা কবির শূন্যতায় ধৈর্যধারণ করার তৌফিক দান করুন।
দোহার প্রিয়জন
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা কবি আল মাহমুদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন অথচ কবিতা চর্চা করতে পারেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কবি আল মাহমুদ...
