হাসপাতালে প্রতিদিনই ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের রাসায়নিক। ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং হাসপাতালে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে যে রাসায়নিক-মিশ্রিত নতুন ধরনের তরল তৈরি হয় তা স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে অপসারণের আগে পরিশোধনের নিয়ম রয়েছে। এজন্য নিজেদের উদ্যোগেই ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক। কিন্তু তা না করেই চালানো হচ্ছে অনেক হাসপাতাল। ট্রিটমেন্ট না করে সরাসরি হাসপাতাল বর্জ্য স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে অপসারণ করে ক্ষতি করা হচ্ছে পরিবেশের। আর এসব ক্ষতির সরাসরি প্রভাব ফেলছে মানব স্বাস্থ্যের ওপর।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে দুই হাজার ৭৬১টি নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে। নিবনন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা চার হাজার ৭০৪টি। এত বিপুল সংখ্যক ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে দৈনিক বিপুল পরিমাণ হাসপাতাল বর্জ্য উৎপাদন হয়ে থাকে এবং হাতেগোনা কয়েকটা ছাড়া পরিবেশ সম্মত হাসপাতাল বর্জ্য অপসারণে কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রায় সবাই মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্যগুলো যত্রতত্র ফেলে দেয়।
চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ বিধিমালা ২০০৮ অনুসারে চিকিৎসা বর্জ্যকে মোট ১১ শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- সংক্রামক, অসংক্রামক, প্যাথলজিক্যাল, রাসায়নিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, তেজস্ক্রিয়, ধারালো বর্জ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য, তরল ও প্রেশারাইজড বর্জ্য। বিধিমালা অনুসারে প্রতিটি বর্জ্যরে জন্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। তরল ও রাসায়নিক বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রি-এজেন্ট, সরাসরি রাসায়নিক যৌগ। ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ, দেহরস, সিরাম, তরল রক্ত, ড্রেনেজ ব্যাগের মধ্যে উৎপন্ন তরল বর্জ্য। অভিযোগ রয়েছে, এসব তরল বর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্য স্যুয়ারেজ লাইনে ফেলে দেয়া হচ্ছে ট্রিটমেন্ট না করেই। এছাড়া ঢাকা শহরে দুই শতাধিক ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। রক্ত ব্যবহার করে এরা রক্তের ব্যাগ, স্যালাইনের টিউব, সুই রাস্তার মধ্যে রাখা বর্জ্য রাখার স্থানে ফেলে দিচ্ছে। ব্লাড ব্যাংকের বেশির ভাগ যেমন অনুমোদনহীন আবার এদের বর্জ্য যথাযথভাবে নষ্ট করার ব্যবস্থাও নেই। অনুমোদনহীন ব্লাড ব্যাংকে পেশাদার রক্তদাতাই বেশি রক্ত দিয়ে থাকে। আর জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষ বাধ্য হয়ে অথবা না জেনে এসব রক্ত আপনজনদের জন্য নিয়ে থাকে। কখনো কখনো মানুষকে বিভ্রান্তও করে থাকে এরা। ফলে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি এরা রক্তের ফেলে দেয়া ব্যাগ ট্রিটমেন্ট না করেই রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে। পেশাদার রক্তদাতার রক্তে নানা ধরেনর জীবাণু বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি ও সি জীবাণু থাকে। আবার কারো কারো দেহে এইচআইভিও থাকে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় কিছু মাদকসেবী আছে। এদের বেশির ভাগই পেশাদার রক্তদাতা।
প্রতিটি হাসপাতালেই ডব্লিউটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও অনেক হাসপাতালে তা করা হয়নি। বাস্তবতা হলোÑ অনেক হাসপাতাল কেবল কঠিন বর্জ্য অপসারণ করতে পারে কিন্তু রাসায়নিক পদার্থযুক্ত তরল বর্জ্য নিষ্কাশনে কোনো ব্যবস্থা নেই।
কিছুদিন আগে রাজধানীর একটি টার্শিয়ারি হাসপাতালে ডব্লিউটিপি না থাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতর তাদের পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়ন করেনি। পরে তিন মাসের মধ্যে ডব্লিউটিপি স্থাপন করে ওই হাসপাতাল পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছিল। বিদেশী নাম রয়েছে আরো একটি বড় টার্শিয়ারি হাসপাতালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। পরে অবশ্য তারা ডব্লিউটিপি স্থাপন করে ছাড়পত্র নিয়ে যায়। রাজধানী নামী-দামি প্রায় সব হাসপাতালই ডব্লিউটিপি স্থাপন না করেই হাসপাতাল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চমূল্যে রোগী সেবা দিয়ে এলেও এরাই পরিবেশ দূষণে অবদান রাখছে এবং আরো কিছু মানুষকে রোগগ্রস্ত করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে কিভাবে এসব হাসপাতাল বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাবে একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, আমরা কিছু বাইরে ফেলে দেই। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা পরিষ্কার করে। আর কিছু বর্জ্য বেসরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংস্থাকে দিয়ে থাকি, যারা এ জন্য অর্থ নিয়ে থাকে।
কঠিন হাসপাতাল বর্জ্য অপসারণে ঢাকায় সিটি করপোরেশন ছাড়াও বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে। এর পাশাপাশি জাপানি অনুদানে আরো একটি কোম্পানির গাড়ি কঠিন হাসপাতাল বর্জ্য নিয়ে যায়। এটা শুধু ঢাকায় নয়, চট্টগ্রাম ও খুলনা শহরের কঠিন হাসপাতাল বর্জ্যও এভাবে অপসারিত হচ্ছে। ঢাকায় প্রিজম ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম সেবা সংস্থা ও খুলনায় প্রদ্দীপন ফাউন্ডেশন কাজ করছে। বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতাল ১১ শ্রেণীর বর্জ্যরে মধ্যে মাত্র চার শ্রেণীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে পারে। অন্য দিকে সরকারি হাসপাতালগুলো পরিবেশ সম্মত চিকিৎসা বর্জ্য অপসারণের সক্ষমতা নেই বললেই চলে। সরকারি হাসপাতাল বলে এদের পরিবেশ সনদ নবায়নেরও প্রয়োজন পড়ে না।
রাজধানীর প্রিজম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আনিসুর রহমান বলেন, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ আমরা করে থাকি। আমরা অ্যানাটমিকেল, সংক্রামক বর্জ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ করে মাতুয়াইলে নিষ্কাশন করে থাকি। প্রতিদিন সাত থেকে আট হাজার কেজি বর্জ্য অপসারণ করে থাকি। প্রিজম ফাউন্ডেশন কঠিন বর্জ্য অপসারণ করলেও তারা তরল বর্জ্য অপসারণ করে না বলে জানান আনিসুর রহমান। ফলে হাসপাতাল থেকে ড্রেনেজ সিস্টেমে ফেলে দেয়া তরল বর্জ্য পরিবেশে প্রভাব ফেলছে এবং রাজধানীর মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রিজম ফাউন্ডেশনের মনিটরিং অফিসার ইশতিয়াক আহমেদ জানিয়েছেন, আমরা রাজধানী ২০টি সরকারি ও ৭৭০ প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ১৩ হাজার কেজি মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ করি প্রতিদিন।
চিকিৎসা বর্জ্যে বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ থাকে। পরিশোধন ছাড়াই এগুলো উন্মুক্ত পরিবেশে নিষ্কাশন করা হলে নতুন নতুন ক্ষতিকর অণুজীব পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালে ব্যবহৃত তরল রাসায়নিকের বর্জ্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদি জেনিটিক্যাল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে। এসব পদার্থ পানিতে মিশে পানির বিওডি ও সিওডির সহনীয় মাত্রা পরিবর্তন করে দেয়। ফলে পানিতে ভাসমান নানা ধরনের উপকারী জীব অথবা অণুজীবের মৃত্যুর কারণ হতে পারে এসব রাসায়নিক পদার্থ।
হাসপাতাল স্থাপনে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন লাগে। কিন্তু শুধু রাজধানীতে কেন, রাজধানীর বাইরে হাসপাতাল ক্লিনিক স্থাপনে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন নেয়া হয় না। কারো কাছে অনুমোদন পত্র থাকলেও তা নকল অনুমোদন অথবা পরিবেশ অধিদফতরের লোকজনকে আস্থায় নিয়েই এ অনুমোদন নেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কারণ ডব্লিউটিপি রয়েছে এমন হাসপাতালের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশরাফ জানিয়েছেন, ডব্লিউটিপি ছাড়া কোনো হাসপাতালে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। আগে যেগুলোর ছাড়পত্র নেয়া হয়েছে সেগুলোর তদারকি করা হচ্ছে। ডব্লিউটিপি নবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে নবায়ন না করতে পারলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নেয়া হবে। হ
