অসুস্থ ব্যক্তিকে ঘরের বাইরে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার উদ্যোগ অটোম্যান সাম্রাজ্যের সময় তুরস্কেই প্রথম শুরু হয়। তখন হাসপাতালে চিকিৎসা করা স্বাস্থ্যসেবার একটি প্রতীক হিসেবে গণ্য হতো, পণ্য হিসেবে নয়। তবে কালক্রমে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবা একটি আস্বাস্থ্যকর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যা একটি শোষণ (Exploitation)-এর পণ্য হয়ে যাচ্ছে। অহেতুক ডায়াগনস্টিক টেস্ট দিয়ে রোগীদের হয়রানি করার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। হাসপাতালগুলো আরোগ্যদায়ক ব্যবস্থা (Curative measures) নিয়ে ব্যস্ত থাকে, যেখানে অসুস্থ লোককে সুস্থ করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কথায় আছে, প্রতিষেধক অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম (Prevention is the better than cure)। এ কথাটি আমাদের হাসপাতালগুলো ভুলেই গেছে।
স্বাস্থ্য খাত যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্যান্য খাতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আমরা প্রায়ই তা ভুলে যাই। সুস্থ ও সবল স্বাস্থ্যের সাথে কর্মঠ জনশক্তি সরবরাহের বিষয়টি জড়িত। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে উৎপাদন যে ব্যাহত হবে, এটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে দক্ষ ও মানসম্মত শ্রমশক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা যখন স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের কথা ভাবি; এর যে একটি বিশাল অর্থনৈতিক দিক রয়েছে তা খতিয়ে দেখি না। অথচ স্বাস্থ্য খাতে যথাযথ বিনিয়োগ ও দূরদর্শী নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে এটি আমাদের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যার উদ্বৃত্ত শ্রম (Surplus labour) আছে, যা বিভিন্ন দেশে উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের দিকে তাকালে দেখব, এই বিনিয়োগ কোনো সুস্থ বিনিয়োগ নয়। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের অবস্থা একই। আমাদের দেশে এমন অনেক চিকিৎসক আছেন, যারা আর্তমানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু পাশাপাশি আরেক দল চিকিৎসকের প্রসঙ্গ উঠলে অনেকেই সেখানে নানা নেতিবাচক বিশেষণ যোগ করেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের স্বাস্থ্য খাতে সুষ্ঠু বিনিয়োগ হয় না। দেখা যায়, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, কিন্তু সেই হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। ডাক্তার যদিও বা থাকে, পর্যাপ্ত চিকিৎসা-উপকরণ বা ওষুধ থাকে না। হাসপাতালে ড্রাইভারহীন অ্যাম্বুলেন্স বা অ্যাম্বুলেন্সবিহীন ড্রাইভার এ দেশে খুবই সাধারণ ঘটনা। মোট কথা, স্বাস্থ্য খাতে যুগোপযোগী পরিকল্পনার অভাব প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে আমাদের জাতীয় দিকনির্দেশনায়। সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকায় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ প্রায়ই অপচয়ের রূপ নেয়।
আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় সর্বাধিক জোর দেয়া হয়েছে এলোপ্যাথিক পদ্ধতির চিকিৎসার ওপর। অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় এই চিকিৎসা পদ্ধতি সবচেয়ে ব্যয়বহুল। তা ছাড়া রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বা ডায়াগনসিসের ব্যবহার এত বেশি হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন এক রকম অসম্ভব। কিছু এলোপ্যাথিক চিকিৎসক এই সুযোগে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের সাথে জড়িয়েও পড়েছেন। এতে কেবল সম্পদের অপচয় হচ্ছে তা কিন্তু নয়, যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা থেকেও মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। এ দেশের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। তার ওপর চিকিৎসাব্যবস্থায় এই অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিনই বহু মানুষ যোগ হচ্ছে এই বঞ্চিত শ্রেণীর কাতারে।
আমরা হাসপাতাল তৈরি করছি রোগী আসবে, এই আশায়। হাসপাতাল স্থাপনের আগে আমরা ভাবি, যত রোগী আসবে ব্যবসার প্রসার তত ঘটবে।
কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি এমন কোনো হাসপাতালের কথা, যেখানে এমনভাবে চিকিৎসা দেয়া হবে, রোগী যেন আর না আসে? আমরা কি ভেবেছি এমন হাসপাতালের কথা, যেখানে রোগীর ‘ভিড়’ বৃদ্ধি না পেয়ে কেবল কমবে? সম্ভবত কেউ ভাবিনি। অথচ এই ভাবনাই দিতে পারত একটি সুস্থ জাতি গঠনের দিকনির্দেশনা। এ চিন্তা হতে পারে সমাজের সার্বিক উন্নয়নের আলোকবর্তিকা।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা
চিকিৎসা প্রসঙ্গে আমরা সব সময় আলোচনা করি নিরাময়যোগ্য (Curative) ওষুধ নিয়ে। প্রতিরোধমূলক (Preventive) ওষুধ নিয়ে আলোচনা খুব একটা হয় না। কেবল উপদেশ দিয়ে বা কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা কোনো পরিবার পারে বহু জটিল ও কঠিন রোগ থেকে বাঁচতে, সে দিকটি নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কিউবায় সরকারের উদ্যোগে প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় এক অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার যে উন্নতি হয়েছে তাতে মাথাপিছু খরচ মাত্র ৪০০ ডলার। অথচ আমেরিকায় অনুরূপ স্বাস্থ্যসেবা পেতে খরচ হবে প্রায় ২২ গুণ। অর্থাৎ ৯০০০ ডলারের মতো। হিসাব করে দেখা গেছে রোগের প্রতিরোধ চিকিৎসার তুলনায় ২০০ ভাগ সাশ্রয়ী। কারো যক্ষ্মা হলে তার চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু তার পরিবার ও প্রতিবেশীদের যাতে এ রোগ না হয় সে ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
আমরা সহজেই এমন হাসপাতালের কথা ভাবতে পারি, যেখানে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর জোর দেয়া হবে। যে এলাকায় যে রোগের প্রবণতা বেশি, সে এলাকায় সে ধরনের প্রতিযোগিতামূলক হাসপাতাল স্থাপন করে এলাকাবাসীকে উপযুক্ত পরামর্শ-উপদেশ দেয়া হবে; যাতে সংশ্লিষ্ট রোগের প্রকোপ কমানো যায়। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় বিষয়টি যে একেবারে নেই তা নয়। তবে তা এতটাই অবহেলিত ও অনুল্লেখযোগ্য অবস্থায় আছে, যা না থাকার মতোই।
হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ বা সার্বিক ব্যবস্থা
আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রিভেন্টিভ মেডিসিন ছাড়াও আরো যে বিষয়টির অভাব, তা হলো হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ বা সার্বিক ব্যবস্থা। যেমনÑ কোনো যক্ষ্মা রোগী পেলে দেখা যাবে ডাক্তাররা তাকে চিকিৎসা দিচ্ছেন, কিন্তু তার পরিবারের কথা ভাবা হচ্ছে না। যক্ষ্মা বা যেকোনো ছোঁয়াচে রোগ পেলে তার পরিবার যাতে একই রোগে আক্রান্ত না হয়, সে ধরনের ফলোআপ চিকিৎসার ব্যবস্থা হলো ‘হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’। রোগীর পরিবারে অন্য কারো একই রোগ দেখা দিলে তার দায়িত্ব কে নেবে?
স্বাস্থ্যসেবা অধিকসংখ্যক জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আরেকটি বিষয় চিন্তা করা যায়। আমাদের দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রায় বিনা খরচে শিক্ষা নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, পশ্চিমা দেশে যা অকল্পনীয়। এই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এই জাতি ও সমাজ কী পাচ্ছে তা ভেবে দেখা দরকার। গরিব জনগণের করের টাকায় ডাক্তার হয়ে এদের খুব কমজনই সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। আমরা কি এমন হাসপাতালের কথা চিন্তা করতে পারি, যেখানে সুনির্দিষ্ট ডাক্তার থাকবেন না? আমাদের চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলো থেকে পড়াশোনা শেষ করে সনদ নিয়ে যারা বের হন তারা এখানে প্র্যাকটিস করবেন বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে। এটি নবীন-প্রবীণ সবার জন্য হতে পারে। হতে পারে শহরে যারা প্র্যাকটিস করবেন তাদের ক্ষেত্রেও। বিষয়টি এমন হবে, ডাক্তার হওয়ার পর নির্দিষ্ট কিছু দিন তাকে জনগণের সেবা করতে হবে, এটি হবে বাধ্যতামূলক। সরকারি ভর্তুকির শিক্ষা নিয়ে তার যে সামাজিক দায়ভার তৈরি হয়েছে তা কিছুটা কমানোর প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে এটিকে। ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেক নবীন ও প্রবীণ চিকিৎসকই এসব হাসপাতালে এসে শ্রম দিয়ে যাবেন।
পশ্চিমা অনেক দেশে মেডিক্যাল স্কুলে কেউ ভর্তি হতে চাইলে তাকে নির্দিষ্ট কিছু ঘণ্টা কোনো হাসপাতালে থেকে রোগী সেবার পেছনে ব্যয় করতে হয়। এটা তার বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে ভর্তি পরীক্ষায় যোগ হয়। আবার শিক্ষা শেষে ইন্টার্নশিপ বা এ ধরনের সোস্যাল সার্ভিসের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এর জন্য মোটিভেশন প্রয়োজন। জোরজবরদস্তি করে এ ব্যবস্থার সুফল পাওয়া যাবে না। মোটিভেট করা গেলে সম্ভবত এমন কাউকে পাওয়া যাবে না, যিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে জনকল্যাণে সময় ব্যয় করতে রাজি হবেন না। এর জন্য ব্যাকআপ সুবিধাও থাকতে হবে। প্রত্যেক জেলা সদরে যদি এ ধরনের একটি ডাক্তারবিহীন হাসপাতাল করা যায় এবং সেখানে জনসেবায় উদ্বুদ্ধ স্বাস্থ্যকর্মীদের শ্রমদানের ব্যবস্থা করে দেয়া যায়, তাহলে এ দেশের স্বাস্থ্য খাতে অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হতে পারে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে যেমন মোটিভেশনের বিষয়টি অনুপস্থিত, তেমনি চিকিৎসা শিক্ষা কারিকুলামেও এর সামাজিক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। দুঃখজনক হলো, আমরা বিনিয়োগ করছি কেবল বস্তুগত সুবিধা হাসিলের জন্য, রোগীর মানসিকতার দিকটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
প্রচলিত বা দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতি
আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় আরেকটি বিষয় চরম উপেক্ষিত দিক বলা চলে, তা হলো প্রচলিত বা দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতি। পশ্চিমা সভ্যতায় যাকে বলে ‘কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন’। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তার কারণে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের লাখ লাখ মানুষ এখন ক্রমেই একটি সমন্বিত প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে, যা অধিক নির্ভরযোগ্য ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। এ ক্ষেত্রে রোগী সম্পূর্ণভাবে ওষুধ ও চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের মধ্যে লুকায়িত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ‘কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন’ দুনিয়াজুড়ে একটি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে গবেষক ও চিকিৎসাবিদদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও বিস্তৃতি লাভ করছে। প্রচলিত ওষুধনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতির বাইরে নানা রকম হার্বাল মেডিসিন, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন, আকুপাংচার, ফিজিওথেরাপি, মিউজিক থেরাপিসহ এসব কমপ্লিমেন্টারি পদ্ধতিগুলোই এখন রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে আগ্রহের বিষয় এবং শেষ ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের নিজস্ব জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান, খাদ্যাভ্যাস, শরীর ও মনের স্বাভাবিক বিন্যাস এবং সেই সাথে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বয় সাধনই এই চিকিৎসার বৈশিষ্ট্য। নিউ ইয়র্কে এ ধরনের চিকিৎসার একটি কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং অনেক দুরূহ রোগের নিরাময়ে সফল ডাক্তার মিচেল গেইনার এই পদ্ধতিকে বলেছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ‘ওয়াল্ডারফুল গিফট’ হিসেবে। জীবনের অনেক নিগূঢ় দিক রয়েছে, যা মেডিক্যাল ল্যাবরেটরির চৌহদ্দিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মেডিক্যাল কলেজেই ইন্ডিগ্রেটেড মেডিসিনের কোর্স চালু হয়েছে। তবে এর প্রথাগত প্রশিক্ষণ খুব সহজসাধ্য নয়। হার্বাল মেডিসিন, মেডিটেশন, আকুপাংচার ইত্যাদি ফর্মুলাগুলো এখন সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। গাছপালা, প্রকৃতি, প্রাণশক্তি, চিরন্তন প্রক্রিয়া এবং জীবনযাপনের একটি সমন্বিত মাধ্যম নীরোগ বেঁচে থাকার এই পদ্ধতি এখনকার বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে সমন্বয়ের বাস্তবতা।
অল্টারনেটিভ মেডিসিন
অল্টারনেটিভ মেডিসিনের বহু পদ্ধতি হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজে চালু হয়েছে। ভেষজ, হেকিমি, কবিরাজি ইত্যাদি চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি আমরা দৃষ্টি দিতে পারিনি তেমনভাবে। স্বল্প ব্যয়ের আরেকটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হলো হোমিও চিকিৎসা পদ্ধতি। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না এটি একটি পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতি। জার্মানির মতো সূক্ষ্ম প্রযুক্তির জন্য খ্যাতিমান দেশের চিকিৎসার জন্য এই পদ্ধতির চিকিৎসার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্যনীতিতে বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এসব চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুুধ আধুনিক করার কোনো উদ্যোগ আমাদের নেই। এলোপ্যাথিক চিকিৎসার ওপর অতিমাত্রায় জোর দিয়ে আমাদের দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির মতো অমূল্য সম্পদ ও জ্ঞান বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমরা ভেষজ চিকিৎসার উন্নয়ন ও গবেষণায় বিনিয়োগ করছি না বললেই চলে। এই চিকিৎসা ক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগমন উৎসাহিত করার মতো কোনো প্রচেষ্টাও আমাদের নেই।
সরকার এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় অঙ্গীকার করলেও তার প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায় না বললেই চলে। জাতীয় বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ এলোপ্যাথিক চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ করা হয়, তার ভগ্নাংশও বরাদ্দ হয় না দেশীয় বা হোমিও চিকিৎসা পদ্ধতির মতো স্বল্পমূল্যের অথচ কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থা প্রসার ও উন্নয়ন খাতে। এমন অনেক রোগ আছে, যার চিকিৎসা এলোপ্যাথির তুলনায় হোমিও বা ভেষজ পদ্ধতিতে অনেক বেশি সুফল পাওয়া যায়। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, পশ্চিমা এলোপ্যাথিক ওষুধের ৪০ শতাংশ ভেষজনির্ভর; তবে এর জন্য এসব পদ্ধতিকে ‘স্ট্যান্ডারডাইজ’ করার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সমন্বিতভাবে ভেষজ ও অন্যান্য দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির প্রবর্তন করা গেলে জনগণকে অধিকতর নিরাপদ ও সস্তায় কার্যকর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।
ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ
এরই প্রেক্ষাপটে সিরাজগঞ্জ শহরের সদরে লেখকের মায়ের নামে ‘সৈয়দা রিজিয়া মেমোরিয়াল-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল’ স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যাত্রা শুরুর একটি বিশেষ ঘোষণা
সৈয়দা রিজিয়া মেমোরিয়াল-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল, মাসিমপুর, সিরাজগঞ্জের প্রথম তলার ১৪০০০ (চৌদ্দ হাজার) বর্গফুট আয়তনের ওপর অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১৫ জুলাই ২০১৭ তারিখে যাত্রা শুরু করে। এই হাসপাতালের বিশেষ ১১টি লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য হলোÑ
হ এই হাসপাতালের মূল লক্ষ্য হলো আপনাকে অসুস্থ হয়ে যেন হাসপাতালে না আসতে হয়। ক্রমান্বয়ে যেন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসা সীমিত হতে থাকে;
হ সার্বিক পারিবারিক স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে ‘আপনি সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন’ এই কার্যক্রমের আওতায় দেশের অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় সবার জন্য ৩০ শতাংশ আর দুস্থ জনগোষ্ঠীর জন্য ৪০ শতাংশ ছাড়ে সর্বপ্রকার ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা যেমনÑ রক্ত, মূত্র, ডায়াবেটিস, হার্ট, লিপিড প্রোফাইল, কিডনি, লিভার, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ইত্যাদি পরীক্ষার সুব্যবস্থা আছে;
হ পাশাপাশি হাসপাতালটি স্বাস্থ্য নিরাপত্তা স্কিম চালু করার প্রক্রিয়াও শুরু করছে;
হ চোখের ছানি অপারেশন বিনা খরচে প্রদানের ব্যবস্থা চালু হয়েছে;
হ ইতোমধ্যে আউটডোর সুচিকিৎসা সুবিধা চালু করা হয়েছে ও সরকারের সহযোগিতায় বিনামূল্যে টিকা প্রদানের সুযোগ থাকছে;
হ দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ স্বল্পমূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে;
হ মানসম্মত ওষুধ সুলভমূল্যে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে;
হ তথ্য ও স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরাও অধ্যয়নের সুযোগ পাবে;
হ ফরমালিনমুক্ত নিজ বাগানের মওসুমি ফল, সুস্বাস্থ্য ও ডায়াবেটিক রোগীর খাবার এবং সবার জন্য ক্যান্টিন ও কফি হাউজ থাকবে;
হ দ্বিতীয় তলা থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত ৭০ হাজার বর্গফুট আয়তনের ওপর স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা হচ্ছে;
হ হাউজ অব মান্নান দাতব্য ট্রাস্টের অর্থায়নে হাসপাতালটি পরিচালিত।
যার যার অবস্থান থেকে, যে যেটুকু পারে, যদি চেষ্টা করি তাহলে আমরা সমাজের চেহারা বদলে দিতে পারি। একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ এক হাজার মাইল যাত্রার একটি অংশ। আসুন, আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে এক বিশাল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। এভাবে ত্যাগ, দান ও সমবেত অংশগ্রহণের (Living by giving and sharing) মাধ্যমে জীবনের মূল লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে। হ
লেখক : ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক ইকোনমিক কনসালট্যান্ট ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
