তখনো শীত শুরু হয়নি। হেমন্ত যাই যাই করছে মাত্র। আগে কখনো এতটা অনুভব করিনি হেমন্তকে। দুপুরে খাওয়ার পরই শরীর ম্যাজ ম্যাজ করতে শুরু করে। কাজ না থাকায় বিছানার ডাক স্পষ্ট শুনতে পাই। গা এলিয়ে শুয়ে পড়ি। ল্যাপটপ হাতে ইউটিউব আর ফেসবুক করতে করতেই বিকেল হয়ে যায়। তখন আর কিছুই ভালো লাগে না। তামিমকে ফোন করি। জানি, তামিম এখন আসতে পারবে না। তবুও তামিমকেই ফোন দিই।
হ্যালো তামিম!
জি মামুন ভাই! দোকানে আছি। রাতে দেখা হবে।
বিষণœ মন আরো খারাপ হয়ে যায়। প্রচণ্ড অনিচ্ছা নিয়ে বের হই। বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে চলে যাই আইন্তা শাড়িঘাট। নাম শাড়িঘাট। কিন্তু সেখানে না আছে শাড়ি না আছে ঘাট। কয়েকটা চায়ের স্টল আর ঘাসের গালিচা বিছানো বিস্তীর্ণ মাঠ। এক পাশে একটি ছোট্ট কালভার্ট। আরেক পাশে বিশাল বিশাল গাছ। কী গাছ এগুলো? বটগাছ নয় এটা নিশ্চিত। কড়ই-শিরিস হবে হয়তো। গাছের নামই জানলাম না। কী লাভ এত পড়াশোনা করে!
চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন বিকেলে এ শাড়িঘাটই আমার ঠিকানা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভাবি, গোসল করে অসামাপ্ত উপন্যাসটা শেষ করব। কিন্তু দুপুর হলে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। শুয়ে থাকতেও ভালো লাগে না। শাড়িঘাটের কালভার্টের এসে বসি। তামিম নেই। একাই বসি। সিগারেটের পর সিগারেট ধরাই। তবুও অলসতা কাটে না। কাটে না মনের ভেতর জন্ম নেয়া অসুখটা। হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ ভাল্লাগে না রোগে আক্রান্ত। তাদের কিছুই ভালো লাগে না। এমনিতেই ভালো লাগে না। আমিও এখন ভাল্লাগে না স্টেপ পার করছি। আমাদের তামিমও ভাল্লাগে না স্টেপ পার করছে। তামিমের ভাল্লাগে না রোগের কারণ সানজানা। সানজানা হলো তামিমের প্রাক্তন প্রেমিকা।
তামিম আর আমি একই এলাকায় থাকি। আমার বাসার বাঁ পাশের বিল্ডিংয়ে তামিম আর ডান পাশের বিল্ডিংয়ে থাকে সানজানা। তামিম আমার ছোট ভাই। সানজানাকে এখনো আমি দেখিনি। দেখার ইচ্ছেও নেই। ওদের দু’জনের সাত বছরের রিলেশনের পর যখন ব্রেকআপ হয়ে যায়, তারও অনেক পর আমি জানতে পারি, তামিম আর সানজানার মাঝে কিছু একটা ছিল।
সিনিয়র হওয়ায় তামিম কখনোই আমার সঙ্গে সহজভাবে মেশার চেষ্টা করেনি। দেখা হলে দূর থেকে সালাম দিত। হাসি মুখে হাত মেলাত। আমিও জুনিয়র ভেবে তার সাথে মেশার চেষ্টা করিনি। মনে পড়ে, সাত বছরের রিলেশন ব্রেকআপ হওয়ার পরও তামিম আমাকে দেখে হাসিমুখেই সালাম দিয়েছিল। আফসোস! মানুষ এতই দুর্ভাগা প্রাণী, জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তাকে কান্না লুকিয়ে হাসতে হয়। কান্নার সময় হাসার যন্ত্রণা প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার জানা নেই।
২.
সানজানার সাথে তামিমের সাত বছরের প্রেম। সাত বছরের হাসি-কান্না রাগ অভিমান কি মাত্র একটি ছোট গল্পে লিখে প্রকাশ করা যায়?
এক বছর পেছনে ঘোরার পর অনেকটা সিনেম্যাটিকভাবে তামিমকে হ্যাঁ বলে দেয় সানজানা। সিনেম্যাটিক এ জন্য বললাম, এ ধরনের প্রেম শুধু সিনেমাতেই দেখা যায়। মেয়েটি রাজি না হলে ছেলেটি মেয়ের বান্ধবীর সাথে প্রেমের অভিনয় করে। তখন মেয়েটি হিংসায় জ্বলেপুড়ে বান্ধবীকে শাসায়। ছেলেটিকে হ্যাঁ বলে দেয়। তামিমের বেলায়ও তাই ঘটেছে। তারপর দীর্ঘ সময় চলতে থাকে তামিম সানজানার ভালোবাসার খুনসুটি।
সাত বছরের রিলেশনে সুখ স্মৃতি কত হবে? সেগুলো তামিমকে কাঁদায়। প্রতিদিন। প্রতিরাত। প্রতিটি মুহূর্ত তামিম কাঁদে। সানজানার সাথে কাটানো একেকটি মুহূর্ত মনে পড়ে আর কষ্টের পাহাড় তামিমের মনসমুদ্রে ভেঙে পড়ে। কারণ, কাল সানজানার বিয়ে। বুকের ভেতর জমানো বিন্দু বিন্দু ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলা প্রিয় মানুষটি কাল আরেকজনের সাথে বাসর করবে, এর চেয়ে ভীষণ যন্ত্রণা বোধহয় আর নেই। আমারও ব্রেকআপ হয়েছে। তাই তামিমের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারছি আমি।
তারপর কেটে যায় এক বছর সাত মাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় সময়টা মাত্র এক বছর সাত মাস। সময় তত্ত্ব নিয়ে কত থিওরিই তো বিজ্ঞানী আর দার্শনিকরা কপচে গেছেন। কেউ বলেছেন সময় চলমান। নদীর স্রোতের মতোই সময় বয়ে চলে। আবার কেউ বলছেন সময় স্থির। অর্থাৎ সময় থেমে আছে। জগৎ এগিয়ে চলছে। যে যাই বলুক, সময় ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জগতের সবার কাছেই সময়ের গুরুত্ব অনেক। সবার ঘড়িতেই সময় নিজ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যতিক্রম শুধু তামিম। আমাদের ক্যালেন্ডারের পাতায় যখন সানজানার বিয়ের পর এক বছর সাত মাস কেটে গেছে, তামিমের ঘড়ি তখনো সানজানার বিয়ে পর্যন্তই থেমে আছে। তামিম জানে না সানজানার ইতিহাস। সানজানা জানে না তামিমের থেমে যাওয়া সময়ের গল্প। দু’জনই ভাবছে, একজনকে ছেড়ে সুখেই আছে অন্যজন। তামিমের মনে প্রচণ্ড ঘৃণা। কেন সানজানা এমন করল? কেন তার ভালোবাসার গোলাপটিকে পায়ে মাড়িয়ে অন্যজনের হাত ধরে চলে গেল সানজানা। কী সুখের আশায় সাত বছরের যতেœ গড়া প্রেমকে একটি ‘কবুলের’ আঘাতে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলল? যে সুখের আশায় তার হাতটি ছেড়ে দিয়েছে, সে সুখ কি পেয়েছে সানজানা? বড় জানতে ইচ্ছে করে তামিমের।
৩.
সানজানার কোটিপতি স্বামী সিঙ্গাপুর প্রবাসী। বিয়ের কয়েক মাস পর জানা যায়, সিঙ্গাপুরে আরেকটি সংসার আছে সানজানার স্বামীর। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া বুঝি একেই বলে। দিন যায়। মাস যায়। সানজানার কোনো খোঁজ নেয় না স্বামী নামের অমানুষটি। প্রথমে কথা বন্ধ। তারপর বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ। অবশেষে ডিভোর্স। এই হলো সানজানার বিবাহিত জীবনে স্বামীর থেকে পাওয়া উপহার। এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনের কথা। অনেক দিন ট্রাই করে শত অনুরোধের পর ফোন রিসিভ করে তার হাজব্যান্ড। শান্তভাবেই বলল, ওগো! একটা জরুরি কথা বলার জন্য তোমাকে ফোন করেছি।
জরুরি কথা? তোর সাথে আমার কোনো জরুরি কথা নাই। গো টু হেল!
তার পরও সানজানা জরুরি কথাটি বলে। মনের কোণে ক্ষীণতম আশা ছিল, কথাটি শুনে হয়তো মন গলবে এই অমানুষটার। বলল, জানো! আমি না মা হতে চলেছি। স্বামীর রিয়্যাক্ট শোনার পর মনে হলো কথাটা না বললেই ভালো হতো।
তামিমের সঙ্গে সানজানার সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে। মাঝে মাঝে বাইরে দেখাও করে তারা। ফোনে কথা হয় টুকটাক। তামিমের সময় ঘড়ি চলতে শুরু করে। সানজানার জীবনের আকাশ থেকে দুঃখের মেঘ কেটে আলো হাসতে শুরু করেছে।
আর ক’দিন পরই সানজানার দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী। তামিম বলল, তোমার দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী আমরা দু’জন মিলে উদযাপন করব। তুমি আমার ছিলে, আছো, থাকবে। একজন ভুল মানুষের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলে তুমি আমার থেকে দূরে চলে যাওনি সানজানা।
প্ল্যান মতো কেনাকাটা করল তামিম। সানজানাকেও শপিং করে দিলো ভরপুর। কাল সানজানার বিবাহবার্ষিকী।
তামিম বলল, সানজানা! চলো আমরা কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি। কালই করি চলো।
আমার গর্ভের সন্তানের কী হবে তাহলে? তাকে কী ফেলে দেবো? সানজানা জিজ্ঞেস করল।
সানজানার হাতে হাত রাখল তামিম। বড় মমতার সাথে বলল, সানজানা! আমি তোমাকে ভালোবাসি। তার মানে তোমার সন্তানকেও ভালোবাসি। সে আমাদের সংসারেই বড় হবে।
আনন্দে চোখে পানি চলে আসে সানজানার। আজকের মতো এত খুশি আর কখনো হয়নি সে। মনে মনে বলল, তামিম! তোমার মতো ভালো আমাকে কেউ বাসবে না। তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য সত্যিই আমি সরি।
পুরো রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি তামিম। কাল সানজানা তার হবে। একান্তই তার। পৃথিবীর আর কোনো শক্তিই সানজানাকে তার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। সানজানা শুধুই তামিমের।
ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে তামিমের। ঘড়ি দেখে চোখ কপালে উঠে যায়। ইশ! ১১টা বেজে গেছে। ১০টায় সানজানার সঙ্গে বের হওয়ার কথা। এতক্ষণে মনে হয় একশটা কল দিয়ে ফেলেছে সানজানা। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে। নো কল। নো মেসেজ।
তামিমের তখনো মনে হয়নি, ডিকশনারিতে এক্সিডেন্ট বলে একটা শব্দ আছে। আছে নিয়তি বলে কথা। সানজানার নাম্বারে কল দেয়ার পর তামিমের মনে হতে শুরু করে, সামথিং ইজ রং। নাম্বার সুইচ অফ।
সানজানার বাসার সামনে এসে দাঁড়ায় তামিম। সানজানার সাথে নয়, দেখা হলো মৌয়ের সাথে। মৌ সানজানার ছোট বোন। বেশ সুন্দর করে সেজেছে। দূর থেকে পরীর মতো লাগছে মৌকে। তামিম ডাক দিলো, এই মৌ! এদিকে আসো তো আপু!
দৌড়ে আসে মৌ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খুব আনন্দে আছে সে। তামিম ভাইয়া! কেমন আছেন? জানেন আজ আমি অনেক খুশি। শুধু আমি নই। আমাদের বাসার সবাই খুশি। বিশেষ করে আপু।
এক ফালি আনন্দ ঝলমল করে উঠল তামিমের মনে। সে ধরেই নিয়েছে, তামিমকে বিয়ের করার কথা সানজানা বাসায়ও বলেছে। তাই হয়তো তামিমকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যই সানজানা ফোন অফ রেখেছে। কিন্তু না। একটু থেমেই মৌ বলল, ভাইয়া! জিজ্ঞেস করলেন না কেন আমরা এত খুশি?
কেন মৌ? তামিম জানতে চায়।
ভাইয়া! আজ আপুর দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী। গতকাল দুলাভাই এসেছেন। আপুকে সরি বলে সব ঠিক করে নিয়েছেন। কাজী ডেকে নতুন করে বিয়ে পড়ানো হয়েছে তাদের। আমরা এখন আপুর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি সেলিব্রেট করতে যাচ্ছি...
আর কোনো কথাই তামিমের কানে যায়নি। নিজেকে সামলাতে না পেরে রাস্তার ওপরই বসে পড়ে সে। ঠিক তখন বারান্দায় আসে সানজানা। অসহ্য সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। তামিমের দেয়া শাড়িটিই পরেছে। সব ঠিক আছে। শুধু পাশে তামিম নেই। দাঁড়িয়ে আছে ভুল মানুষটি।
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
