একসময় বাংলাদেশের পরিচয় দেয়া হতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ, বন্যা-জলোচ্ছ্বাসকবলিত, মানবেতর জীবনে অভ্যস্ত বিরাট জনসমষ্টির এক প্রান্তিক জনপদ রূপে। ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ মতো নির্মম অভিধাও জুটেছিল বাংলাদেশের ভাগ্যে। সত্যিই কি বাংলাদেশ এমন দরিদ্র দেশ, এমন ছন্নছাড়া, নাম-গোত্রহীন দেশ? সত্যিই বটে, বাংলাদেশ একটি অনগ্রসর, পশ্চাৎপদ দেশ। জনগণের বিরাট অংশ এখনো দারিদ্র্যপীড়িত। সম্পদের মধ্যে থেকেও বঞ্চিত। অনেক দেরিতে শুরু করা একটি দেশ। এ জন্য জনগণ এখনো উন্নত জীবনের সুযোগ-সুবিধা লাভে সক্ষম হচ্ছে না।
বাংলাদেশ যে একটি সম্পদশালী দেশ, এতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ যদি দরিদ্র হতো, তা হলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদেশীদের শ্যেনদৃষ্টি পড়বে কেন এ দেশটির ওপর? পূর্ব থেকে মগরা এলো, পশ্চিম থেকে এলো পাঠান, মোগল, এমনকি তুর্কিরা। ইউরোপের জলদস্যুদের, বিশেষ করে পর্তুগিজ-ওলন্দাজদের উপর্যুপরি হামলা কেন বাংলার মানুষকে সইতে হয়েছে? ফ্রান্স ও ব্রিটেনের কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যবহর বাংলার উপকূলে কেন ভিড় জমাত? বাংলাদেশ যদি দরিদ্রই হবে, তা হলে পাকিস্তানের শাসকেরা কেন গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেও দখলদারিত্ব স্থায়ী করতে দৃঢ়সঙ্কল্প হবে? কেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর শ্যেনদৃষ্টির অশুভ প্রভাবে চারদিক তছনছ হবে? কেন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো আমাদের সম্পদের ওপর এমন কড়া নজর রাখবে?
বাংলাদেশের মাটি বিশ্বের সবচেয়ে উর্বর এলাকাগুলোর অন্যতম। একটু পরিশ্রম করলেই এখানে মাটিতে তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব। মাটির নিচে গ্যাস ও কয়লার মতো খনিজ সম্পদের প্রতি একদিকে প্রতিবেশীর দৃষ্টি যেমন প্রখর, অন্য দিকে বাইরের বিশ্বও তেমনি ক্ষুধার্ত। এখানকার আকাশ ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩০০ দিনই থাকে সূর্যকরোজ্জ্বল। যথার্থ প্রযুক্তির প্রয়োগে সূর্যকিরণকে এনার্জিতে রূপান্তর করার প্রকল্প একবার বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে শত সম্ভাবনার হাজারো বাতায়ন উন্মুক্ত হতে পারে। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় একেকটা স্বর্ণখনির মতো। সমুদ্রের উপকূলে ছড়িয়ে-ছিটিযে রয়েছে সীমাহীন সম্পদ। সীমাহীন সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশের মাটির ওপর বসবাসকারী মানুষের দিকে তাকান, এ ক্ষেত্রে দেখবেন একই চিত্র। অনেকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কথা বলে বেশি, কাজ করে কম। এ দেশের মানুষ মন্দ। বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। কিন্তু কেউ খোঁজখবরও নিতে চান না, এ দেশের জনসমষ্টির কোন স্তরের মানুষ তারা। মোট জনসংখ্যার কতজন তারা? বাংলাদেশ ব্যাংকে যে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিত হয়েছে, তা কাদের পরিশ্রমের ফল? পর্যালোচনা করুন, দেখতে পাবেনÑ এই অর্জন এ দেশের ওই সব অভাজন, শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিতের শ্রমের ফসলÑ যাদের জন্য সমাজ কার্যত কিছুই করেনি। না শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছে তাদের জন্য, না এ দেশে তাদের জন্য ছোটখাটো কাজের সংস্থান করেছে। অতি কষ্টে, হাজারো ঘাট মাড়িয়ে একান্তই নিজের উদ্যোগ, অশিক্ষার বোঝা মাথায় নিয়ে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে যা উপার্জন করেছেন, তারই ফল এই বৃহৎ রিজার্ভ। নিজের অভিজ্ঞতায় জেনেছি, বিদেশে বাংলাদেশের চিকিৎসক উত্তম। বাংলাদেশের প্রকৌশলী প্রথম শ্রেণীর। বাংলাদেশের ছাত্র-শিক্ষকেরা সবার সেরা। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় সব কটিতে নিজেদের ক্ষমতাধরদের সামনে জড়োসড়ো হয়ে না দাঁড়িয়ে নিজেদের যা আছে, তাকেই কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর হই, নিজেদের গড়া কুঁড়েঘরকে নিয়ে গর্ব অনুভব করতে থাকি আর আমাদের সন্তানদের পথের সব কাঁটা দূর করতে সঙ্কল্পবদ্ধ হই, তা হলেই হলো।
আমাদের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অবহিত। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক হিসেবে আমাদের বয়স মাত্র ৪৮ বছর। অবশ্য সুসংবদ্ধ সমাজজীবনের ধারা এ জনপদে সূচিত হয়েছে সাড়ে চার, কী পাঁচ হাজার বছর আগে। এই দীর্ঘকাল আমরা শাসিত হয়েছি শুধু। নিজেদের শাসন করার জন্য এই দীর্ঘকালে আমরা শাসনদণ্ড হাতে পাইনি। শুধু শাসিত হয়েছি। হয়েছি শোষিত, বঞ্চিত। অন্যের অবহেলা গ্রহণ করতে হয়েছে। আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে ভণ্ডামির অসত্যের, প্রবঞ্চনার। দাসত্বের সাথে এসব মিলেমিশে একাকার হয়েছিল। এখন সময় এসেছে সেই মানসিকতা ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করার। মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়ানোর, প্রতিপক্ষের সামনে মানে সম্মানে। নিজের কথা জোরেশোরে উচ্চারণের। আমাদের যা পাওনা, তা সুদে-মূলে আদায়ের। এ জন্য চাই আত্মশক্তির উদ্বোধন। চাই আত্মবিশ্বাসের জাগ্রত সুর। চাই আত্মমর্যাদাবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে বন্ধুর পথে দ্রুতগতিতে চলার শক্তি। আমাদের সন্তানদের মধ্যে মেধার স্বল্পতা নেই, ঘাটতি নেই সৎকর্ম সাধনের আকাক্সক্ষার। ঘাটতি নেই নিজেদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনার সঙ্কল্পের। এই মেধা, আকাক্সক্ষা ও সঙ্কল্প সুনির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত করতে পারলে সমাজে সৃষ্টি হবে নতুন এক বিপ্লব। সেই বিপ্লবে ভেসে যাবে ব্যর্থতার সব গ্লানি, অনগ্রসরতার সব অন্ধকার, পশ্চাৎপদতার সব প্রতীক। অন্যের দিকে তাকালে হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হতে পারি। আত্মনির্ভরশীলতার দিকে পা বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
আমরা এগিয়ে যেতে চাই শুধু আমাদের জন্য নয়, আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া সবার কথা স্মরণ করে, সবার কাছে অগ্রবর্তী ভাবনার প্রতীক হিসেবে। বিশ্বের কারো সাথে শত্রুতা নেই। আমাদের শত্রু আমাদের দুর্বলতা, অপরের ওপর নির্ভরশীলতা, কর্তাভজা মানসিকতা, পাছে কেউ আমাদের ওপর নাখোশ হয় এই হীনম্মন্যতা, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে অন্যের জন্য নিজের সদর দরজা উন্মুক্ত করা এবং নিজেদের সম্পদ অপরের হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হওয়ার নিম্নস্তরের অনুভূতি। আন্তর্জাতিকতার এই কালে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে চাই না। তাই বলে আমরা অন্যের সুবিধা সৃষ্টির জন্য আমাদের দক্ষিণ দুয়ারি ঘরটা অন্যের হাতে তুলে দেবো, তা হয় না। মিলিত হতে চাই সমানে সমানে। ভূস্বামী-প্রজার অসম সম্পর্কে নয়, বরং বন্ধুত্বের সুষম সম্পর্কে। এসব ক্ষেত্রে সরকার কী করবে, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো আমরা কী ভাবছি, সরকারকে তা সজ্ঞাত করা। সরকারকে আমাদের চিন্তাভাবনা ধারণ করতে হবে। তাই সরকারের কার্যক্রম হতে হবে স্বচ্ছ। সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে আমাদের কাছে। আমাদের সন্তানদের চলার পথে সরকারের কাজ হলো সব বাধা অপসারণ করা। এর বেশি কিছু নয়, আমরা যা পারিনি, যা করতে ব্যর্থ হয়েছিÑ সেই অক্ষমতা ও ব্যর্থতার গ্লানি আমাদের সন্তানরা মুছে দেবে। সরকারের প্রতি শুধু আনুগত্যের কথা নয়, শুধু দলীয় চেতনার কথা অথবা দলীয় স্লোগান শুনতে চায় না; বলিষ্ঠ জীবনবোদের কথা শুনতে চায় এই প্রজন্ম। অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য তাদের মধ্যে যে আকাক্সক্ষা ও সঙ্কল্প সংরক্ষিত হয়েছে যেন বিকশিত হয়- সেই লক্ষ্যে তাদের চলার পথে দুর্লভ যে পাহাড় রচিত, তা অপসারণের কথা শুনতে চায় এ প্রজন্ম। সরকার তাদের জন্য সব কিছু করে দিক, তা তারা চায় না। তারা চায়Ñ সরকার তাদের পথটা সুগম করে দিক। যা করা প্রয়োজন, তারা তা-ই করে শিরদাঁড়া সোজা রাখবে। হ