আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড যথাক্রমেÑ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক, অর্থনৈতিক সূচক এর যেকোনো দু’টি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিন সূচকেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের জন্ম এখনো ৫০ বছর হয়নি, তথাপি অনেকটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এ অনন্য অর্জন আমাদের সাহসী ইতিহাসের পুনঃউচ্চারণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটা সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ। উন্নয়ন কৌশল রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই পথেই এগিয়ে চলছে দেশ।
এই যে বদলে যাওয়া একটা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের ছবি আমরা দেখছি, এখানে অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর মতো শিক্ষাও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। গত ১০ বছরে শিক্ষাখাতকে দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। অনেক দিন পর শিক্ষা নিয়ে একটা পরিবর্তনের উজ্জীবনী শক্তির জন্ম হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা খাতের গুণগত মানের উন্নয়ন এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
একসময় আমরা সাক্ষরতা নিয়ে ভাবতাম। শিক্ষাক্ষেত্রে গত ১০ বছরে সরকারের সর্বাত্মক পদক্ষেপের ফলে সাক্ষরতা এখন শুধু সাফল্য নয়, গর্বেরও বিষয়। ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ২৬ দশমিক ১০ শতাংশ। ফলে
আমাদের সাক্ষরতার হার এখন ৭২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং তবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে যার হার ৯২ দশমিক ২৪ শতাংশ। শিক্ষা ক্ষেত্রে শুধু সাক্ষরতার হারের বিবেচনা করলেও আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে।
আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়া এবং পিছিয়ে পড়া নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তির হার, পরিমাণ ও ব্যাপ্তি বাড়ানো হয়েছে। ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। বৃহৎ এসব পদক্ষেপের ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর সমতাই নয়, ছাত্রীরা এগিয়েছে ছাত্রের চেয়ে অনেক বেশি। এটিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় সাফল্য হিসেবে অভিনন্দিত হয়েছে দেশ-বিদেশে। ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে ভর্তি শিশুর শতকরা হার যেখানে ছিল ৬১ শতাংশ বর্তমানে তা ৯৮ শতাংশের বেশি উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়াও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষা নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট। শুধু শিক্ষা নয়, শিশুশিক্ষার্থীরা যাতে সুশিক্ষা পায় এবং সুকুমারবৃত্তির জাগরণ ঘটাতে পারে, এ জন্য স্কুলশিক্ষায় আনা হয়েছে শিল্প-সংস্কৃতি ও চারু-কারুকলার মতো নান্দনিক বিষয়গুলো।
প্রাথমিক স্তুরের মতো শিক্ষায় মাধ্যমিক স্তরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলি এবং এ ক্ষেত্রে সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে যেভাবে পর্যালোচনা করি সেভাবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা বিষয়টি উঠে আসে না। এখানে শিক্ষা ব্যয়, কারিকুলাম, বিষয় ইত্যাদি আলাদাভাবে কাজ করে যা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সুখকর হয় না। ফলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনকে মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
মনে রাখতে হবে, মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর শিক্ষাজীবনের একটা বড় বিষয়। এ সময়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। এ সময়টা শিক্ষার্থী কী শিখল বা আমরা তাকে কী শেখাতে পারলাম তা বিবেচ্য বিষয়। শিক্ষার্থীর ভাষাজ্ঞান, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ইত্যাদির আলোকে তার অবস্থান পর্যালোচনা করতে হবে। শুধু একটি জিপিএ-ভিত্তিক সনদ নয়, দেখতে হবে চিন্তার দক্ষতায় সে কতটা এগিয়েছে। আমরা শিক্ষার মাধ্যমেই পরিবর্তন আনব। যে পরিবর্তন পেছনের জীর্ণতাকে ঝেড়ে আলোর পথ দেখাবে এবং গড়বে স্বপ্নের সোনার বাংলা।
লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ও মাইলস্টোন কলেজ। উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা।