শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। তবে সেই শিক্ষা হওয়া চাই নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন। যে শিক্ষার মধ্যে নৈতিকতার অভাব থাকে, সে শিক্ষা সমাজের দীর্ঘ মেয়াদি কল্যাণের চেয়ে বেশি অকল্যাণ বয়ে আনে। আজ আমরা যে টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবছি সেখানে নৈতিকতার স্থান নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা আমাদের স্বপ্নের স্থানে পৌঁছতে পারব না। বাংলাদেশে দিনে দিনে উচ্চ শিক্ষার হার বাড়ছে, এটি আমাদের দেশের জন্য সম্মান ও গৌরবের ব্যাপার। ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছে। মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭ সালে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসকারি মিলে ১৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৯ লাখ ৬০ হাজার ৪৭০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বর্তমানে-এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। ১৯৯২ সাল থেকে বেসরকারি বিশ্ববাবিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলেও দেশে উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে এর অবদান কোনো অংশে কম নয়। ২০০৮ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল এক লাখ ৮২ হাজার ৬৪১ জন। আর ২০১৭ সালে তা দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৩ জনে। গত ১০ বছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণের বেশি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তথ্য মতে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উচ্চ শিক্ষার মানের দিক দিয়ে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। ভারতের বৈশ্বিক অবস্থান ২৯তম। বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ৪১, পাকিস্তান ৭১ ও নেপালের অবস্থান ৭৭তম। তবে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিকতার বড়ই সঙ্কট রয়েছে। যার কারণে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের ছাত্রছাত্রীরা অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। মাদকাসক্তি, মাদক ব্যবসা, নারীর শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, পেশিশক্তির অপব্যবহার, নীতি- নৈতিকতাহীন রাজনীতি, মা-বাবা ও গুরুজনের সাথে অসৎ আচরণসহ আরো অনেক অনৈতিক কাজে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা সর্বোপরি উচ্চশিক্ষায় নৈতিক শিক্ষার অভাব শিক্ষার্থীদের দিনে দিনে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নৈতিকতার ঘাটতি থাকায় পাস করে কর্মস্থলে গিয়েও তারা সহজেই প্রলুব্ধ হয়ে যায় অনৈতিক কার্যক্রমে। এই নীতিনৈতিকতাহীন শিক্ষার্থীদের কেউ শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত হয়। যার কারণে শিক্ষকতার মহান পেশাকে মানুষ এখন আর আগের মতো সম্মানের চোখে দেখে না। যারা হবে সমাজে আদর্শ মানুষ, শিক্ষার্থীরা যাদের অনুসরণ, অনুকরণ করবে তারাই অনেক সময় অনৈতিক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। যা জাতির জন্য এক ভয়াবহ অশনি সঙ্কেত। নৈতিকতার মূল্য যেকোনো কিছুর চেয়ে ঊর্ধ্বে। আমরা সবাই একটি প্রবাদ জানি যে, অর্থ হারালে কিছু নাহি হারায়, স্বাস্থ্য হারালে সামান্য হারায়, কিন্তু চরিত্র হারালে সবই হারায় মানুষ। মানুষের বড় সম্পদ হলো তার চরিত্র। চরিত্রগুণেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে চরিত্রহীন মানুষ পশুর মতো কিংবা তার চেয়েও অধম।
২০০৬ সালে জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সিটি ফর পিস থেকে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে শান্তি শিক্ষার উপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরি। জাতিসঙ্ঘ আজ শিক্ষাব্যবস্থায় শান্তি শিক্ষার (চবধপব ঊফঁপধঃরড়হ) প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব¡ প্রদান করছে। আর এই শান্তি শিক্ষার বিষয়গুলো মূলত নৈতিক শিক্ষায় পরিপূর্ণ। সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, পরিবেশ সুরক্ষা, অস্ত্রনিরস্ত্রীকরণ, আত্মিক উন্নয়ন, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানবাধিকারসহ আরো অনেক বিষয়, যার প্রতিটি বিষয়ই আমাদের ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সুন্দরভাবে বিরাজমান। শুধু প্রয়োজন এর অনুসরণ, অনুকরণ ও বাস্তবায়ন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় সব বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষার সাথে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। যা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ছাত্রছাত্রীদের আচার-আচরণেই পরিলক্ষিত হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ শিক্ষার ঘাটতি থাকায় মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আজ নৈতিকতার ব্যাপক অবক্ষয় পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান সময়ে বাবা-মা কিংবা অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে খুবই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকেন। অনেক মা-বাবা আজ তাদের সন্তানদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক শিক্ষার সাথে নৈতিক শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তারা চায় যে, তাদের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি চরিত্র ও গুণে সুশিক্ষিত হোক। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে সফলতা লাভ করুক। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখুক।
মহাগ্রন্থ আলকুরআনের দৃষ্টিতে নামাজ মানুষকে সব ধরনের খারাপ কাজ ও অশালীনতা থেকে রক্ষা করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিরাট একটি অংশ এই নামাজ থেকে বিমুখ। নামাজের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আর নামাজ ছেড়ে দেয়ার কারণে মহান স্রষ্টার সাথে তাদের সম্পর্ক কমে যায়, আর মানুষের চিরশত্রু শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে। যার কারণে সহজেই বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনাচারের সাথে জড়িয়ে পরে আমাদের উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। ফলে তারা সমাজের উপকারের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে অপকার করে বসে। দেশ ও জাতির প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় এই সম্ভাবনাময়ী মানবসম্পদ। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সা: তাঁর জীবনের অন্তিমকালেও নামাজের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন, যাতে আমরা কোনোভাবেই নামাজ ছেড়ে না দিই।
যেকোনো উগ্রবাদই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বব্যাপী আজ উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাবে আজ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়্য়ুা কিছু শিক্ষার্থী আক্রান্ত হচ্ছে। কোনো শিক্ষার্থী ইন্টারনেটে ভিডিও দেখে, বিভ্রান্তিমূলক ধর্মীয় বই পড়ে কিংবা আলোচনা শুনে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ছে। ইসলামে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। এরা ইসলামের সঠিক ও সুন্দর পথ থেকে সরে গিয়ে বিভ্রান্তির পথে প্রবেশ করে, কখনো মানুষের ক্ষতি করে, এমনকি মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। কখনো বা তারা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে শহীদের মর্যাদা পেতে চান। আবার কিছু শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতির নামে উগ্রবাদী রাজনীতিতে জড়িত হয়। তারা তাদের মূল দায়িত্ব (লেখাপড়া) বাদ দিয়ে কিংবা নামমাত্র লেখাপড়া করে রাজনৈতিক কাজে বেশি সম্পৃক্ত হয়। তারা নিজ দল বা মতের বাইরে অন্য কোনো দল কিংবা মতকে সহ্য করতে পারে না। তাদের রাজনীতির মধ্যে নৈতিকতার লেশ মাত্র পাওয়া যায় না। তাদের মধ্যে একটি শ্রেণী আছে যারা মানুষের ক্ষতি করে, এমন কি তারা তাদের হীনস্বার্থে অন্যকে হত্যা করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। এই দুই শ্রেণীর উগ্রবাদকে রক্ষার জন্য কুরআনের শিক্ষার বিকল্প নেই। কুরআন শুধু মুসলিমদের সঠিক পথ দেখায় না, বরং পৃথিবীর সব মানব গোষ্ঠীর সঠিক ও সুন্দর পথ প্রদর্শন করে।
আমাদের দেশে সোনার ছেলেমেয়েদের যদি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারি, তা হলে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন থেকে আমরা অনেকটা পিছিয়ে পড়ব। মহান রাব্বুল আলামিন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ সা:-কে ওহির প্রথম যে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন তা হলো পড় তোমার প্রভুর নামে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তাই প্রত্যেকটি মানুষকে তার স্রষ্টার জ্ঞান অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ তাঁর পরিচয় আমাদের জানতে হবে, তাঁর দেয়া নির্দেশ আমাদের পালন করতে হবে, তাঁর নিকট আমাদের ফিরে যেতে হবে, কিয়ামতের কঠিন সময় তাঁর অনুকম্পা ছাড়া আমরা রক্ষা পাবো না। তিনি আমাদের, আলো, বাতাস ও পানিসহ পৃথিবীর সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তার দয়া ছাড়া এ সুন্দর ভূমণ্ডলে আমরা এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারি না। এসব জ্ঞানের বিষয়বস্তু ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান, ব্যবসা প্রশাসন, প্রকৌশল বিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যা কিংবা আধুনিক কোনো জ্ঞানের মধ্যে পায় না। তাই এসব বিষয় জানার জন্য আমাদের কুরআনের সান্নিধ্যে যেতে হবে, রাসূলের-হাদিসের কাছে যেতে হবে। সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ আদর্শ মানুষ মহানবী হজরত সুহাম্মদ সা:-এর অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হবে। কারণ তিনি পৃথিবীবাসীর জন্য সর্বোত্তম আদর্শের উদাহরণ। তাঁর শিক্ষায় আমরা আমাদের এ তরুণ ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষিত করতে পারলে তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। যাদের দেখে মা-বাবার নয়ন জুড়িয়ে যাবে। যাদের কাছে সমাজের মানুষ নিরাপদ থাকবে। যারা অফিসে সঠিক সময় যাবে, সঠিক সময় কাজ সম্পন্ন করে অফিস থেকে পরিবারের কাছে ফিরে আসবে। অফিসের দেয়া তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। মানুষকে অযাচিতভাবে হয়রানি করবে না, সুদ-ঘুষের সাথে সম্পৃক্ত হবে না, সম্পদের অপচয়ও অপব্যয় করবে না। এরা পরিবারে সদস্য, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করবে। অধীনস্থদেরসহ সবার সাথে সুন্দর আচরণ করবে। আর তাহলেই আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি নেমে আসবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। আমরা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিচিত হতে পারবো।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও ছাত্র উপদেষ্টা
সেন্টার অব জেনারেল এডুকেশন
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ঢাকা
অুধফ.ঁঢ়বধপব@মসধরষ.পড়স
ষধনঁথফঁ@ুধযড়ড়.পড়স
