নীতিগতভাবে বলব, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার দ্বার এখন উন্মোচিত। অবাধ উচ্চশিক্ষার ভালো সুযোগ আছে এ কথা আমরা বলতে পারি। তবে, একটি বিষয় লক্ষণীয় হলোÑ দুর্নীতি আমাদের জাতীয় পর্যায়ে ঘেরাও করে ফেলেছে। এ দুর্নীতির কারণে উচ্চশিক্ষার যে কাক্সিক্ষত মান তা আমরা বজায় রাখতে পারছি না। কারণ ক্লাস ঠিকমতো হবে না, পরীক্ষা দেয়া লাগবে না। কোনো রকমে সার্টিফিকেট জোগাড় করে, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি নিজেকে জাহির করে, আমি সার্টিফিকেটধারী। এ অবস্থা তো এখন বিরাজ করছে। সুতরাং শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা যদি দূরীভূত না করা যায়, তা হলে উচ্চশিক্ষার কাক্সিক্ষত মান ও এর ফলাফল আমরা যাচাই, তা অর্জন করতে পারব না। তার মানে এ নয় যে, এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটছে। এটি (দুর্নীতি) একটি জাতীয় পর্যায়ে এটা রোগ ও (উচ্চশিক্ষার) এ ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কিন্তু এ ব্যতিক্রমটাও সামান্য। তবে দুর্নীতিগ্রস্ত উচ্চশিক্ষা চর্চা, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটিগুলোতে যে দুর্নীতি হচ্ছে, আমি এ ব্যাপারটি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।
শিক্ষাটা কেন? শিক্ষাটা কিসের জন্য? শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান বিতরণের জন্য। সুতরাং জ্ঞানার্জন বলতে বোঝায় তার আদর্শিক ও চেতনাগত দিকটা যদি না থাকে এবং শুধু যদি বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানই অর্জন করি তা হলে কোনো অবস্থাতেই মানুষ হিসেবে যে কাক্সিক্ষত ফল লাভ করার কথা সেটা কিন্তু অর্জিত হবে না। কারণ, একজন ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছেন। ইঞ্জিনিয়ার হয়ে তিনি ঘুষ খাচ্ছেন। ঘুষ খেয়ে রডের জায়গায় বাঁশ দিয়ে ঢালাই দেয়া হচ্ছে। এ অপকর্মে ইঞ্জিনিয়ারও সহযোগিতা করছে, ঠিকাদারও করছে এবং ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে, তারা ইঞ্জিনিয়ারিং জানেন না, তাদের নির্মাণ কৌশল-প্রকৌশলগত জ্ঞান তাদের জানা নেই... আছে। কিন্তু দুর্নীতি কারণে আজ এ অবস্থা হয়েছে। এ দুর্নীতির কারণ কী? ওই যে তার আদর্শগত দিক, চেতনাগত দিক, মূল্যবোধগত দিক... তার অবর্তমানের ফলেই ঘটছে। মূল্যবোধ কী? আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, আমি পরকালকে বিশ্বাস করি, আমরা মুসলিম, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ আমাদের। আমি এ বিশ্বাস লালন করি, আল্লাহ তায়ালার সামনে আমাকে একদিন দাঁড়াতে হবে, জীবনের সব কর্মের হিসাব দিতে হবে। এই যে মূল্যবোধ ও চেতনা, এ চেতনা যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে এ চেতনানির্ভর করতে পারি, তা হলে কাক্সিক্ষত ফলাফল লাভ করতে পারব। দুর্নীতিমুক্ত থাকতে পারব। আর এখন যে ধর্মহীন এবং বস্তুনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চলছে, তা দিয়ে আমাদের জাতিকে উদ্ধার করা মোটেই সম্ভব নয়। দেশের কল্যাণও সম্ভব নয়। বরং আজকে যে অকল্যাণগুলো হচ্ছে, আজকে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা ও নারী নির্যাতন, সুদ, ঘুষ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি চলছে, এ সব কিছুর কারণ হলোÑ এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করা হচ্ছে জাতিকে, যার মধ্যে কোনো জবাবদিহিতা নেই। আমরা যারা রাজনীতি করছি, তারাও এর সাথে জড়িয়ে পড়ছি। যেখানে জবাবদিহিতার অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে।
মানুষকে ফাঁকি দেয়া যায়, পুলিশ ফাঁকি দেয়া যায়, ঘুষ দিয়ে নানান কায়দায় ফাঁকি দেয়া যায়, কিন্তু এক জায়গায় ফাঁকি দেয়া যাবে না, আল্লাহকে ফাঁকি দেয়া যাবে না। অতএব এ বিশ্বাস যদি বদ্ধমূল করা যায়, যারা শিক্ষার্থী, যারা শিক্ষা গ্রহণ করছেন, তাদের অন্তরে ও মন-মগজে ঢুকিয়ে দেয়া যায়, হলে তারা সত্যিকার মানুষ হবেন। তা হলে তাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে, দেশের প্রতি, দশের প্রতি, নিজের প্রতি, পরিবারের প্রতি এবং আল্লাহর প্রতি দায়িত্বও কাক্সিক্ষত মানে সম্পাদন করতে পারবে।
তা না হলে আমরা শিক্ষা নেবো এবং শিখব ঠিকই। এতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, থিংকার, বিচারক, সাংবাদিক হবে, কিন্তু সর্ব ক্ষেত্রেই এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে, এতে সর্বনাশ ডেকে আনবে। বরং আমরা এখন সর্বনাশের পথেই এসে পড়েছি। আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুক।
আজকে যুগ প্রযুক্তির যুগ। যে কারণে সব কিছুই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। তরুণ সমাজ প্রযুক্তির দিকেই ঝুঁকে পড়েছে, প্রযুক্তিমুখী হয়ে পড়েছে। এটি সময়ের চাহিদাও বটে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য গৌরব গাথা জানতে প্রযুক্তির মাধ্যমেই আগ্রহী হলে আপত্তি নেই। প্রযুক্তির মাধ্যমেই অতীতকে জানার সুযোগ রয়েছে। অতীতকে জানতে বই পড়ার অভ্যাসও সবার মধ্যেই গড়ে তুলতে হবে। বই পড়ে দেউলিয়া হয় না বলে এখনকার সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা প্রচার করেন। কিন্তু আমি বলব, নীতি-আদর্শহীন বই পড়ে দেউলিয়া হয়। জ্ঞানের সাথে আদর্শিক চেতনা না থাকলে, যে কেউ দেউলিয়া হয়। যেমনটি আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী হয়েছেন। তাদের জ্ঞানের সাথে আদর্শিক চেতনার কোনো সম্পর্ক নেই।
জ্ঞানচর্চার মূল হচ্ছে আদর্শিক চেতনা। এ চেতনা না থাকলে অবশ্যই যে কাউকেই দেউলিয়া বলা যায়। রাজনীতি আজ সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনীতি মানে কী? রাজনীতি হচ্ছে রাজার নীতি? না রাজনীতি হলো নীতির রাজা। এ নীতি সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আমাদের প্রচলিত রাজনীতি এটা এখন বিভিন্ন দোষে দুষ্ট হয়ে গেছে। এ দোষের কারণে এ রাজনীতির অধীনে যা আমরা কিছু পাচ্ছি, যা হতে যাচ্ছে, তার ভুলত্রুটি থাকবে। সুতরাং রাজনীতিকেও আমাদের পরিশুদ্ধ করতে হবে। আমাদের নতুন করে রাজনীতির সবক নিতে হবে। তা হলেই আমাদের মনে করি দেশ ও জাতি পরিশুদ্ধ হবে।
নতুবা আজকে প্রাথমিক শিক্ষার কথাই বলেন, আর মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষার কথাই বলেন। মনে রাখতে হবে রাজনীতিই একে নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ, এ শিক্ষাব্যবস্থায় যারা বই লিখেন, তাদেরকে (লেখকদের) রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নির্বাচন করা হচ্ছে, বাছাই করা হচ্ছে। তারা তাদের মতামত দেন, তারা লিখেন। এ কারণেই আমরা দেখি সেখানে এক দেশদর্শী হয়ে যাচ্ছে, সেখানে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ত্রুটিপূর্ণ রাজনীতির এ প্রভাব আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ছে। ত্রুটিপূর্ণ রাজনীতির কারণে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
মাশাআল্লাহ, দেশে উচ্চশিক্ষার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে। এখানে আমরা দেখছি গোষ্ঠীগত ও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন হচ্ছে। এটা কাক্সিক্ষত নয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে দলীয় ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা একেবারেই সঠিক নয়। চরিত্রগত ও দর্শনগত দিক থেকে শিক্ষা ব্যবসা হতে পারে না। শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা দিয়ে জাতিকে গড়া হবে। এখানে ব্যবসা মুখ্য নয়। গোষ্ঠীগত ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে এটি ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান বজায় রাখা যাচ্ছে না।
শিক্ষা ও জ্ঞান ছাড়া মানুষ, মানুষ হতে পারে না। সৃষ্টির প্রথম মানুষটি হলেন হজরত আদম আ:। আল্লাহ তার (আদম) আ:-এর বস্তুগত অবয়ব দেয়ার পরে, সৃষ্টিগত অস্তিত্ব দিলেন। তার ভেতর রুহ ফুকে দিলেন। এরপর আল্লাহ তার সাথে যে আচরণ করলেন, সেটি কী? আল্লামা আদামুল আসমাও... আল্লাহ আদমকে সব কিছুর নাম শিখিয়ে দিলেন। আল্লামাহু মানে কি... আল্লাহ তাতে তালিম দিলেন, শিক্ষা দিলেন। আদমকে যে লক্ষ্যে বানানো হয়েছিল, সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শিক্ষা অনস্বীকার্য অনুসঙ্গ। এটি (জ্ঞান ও শিক্ষা ) ছাড়া আদম মানুষ হিসেবে তৈরি হতে পারে না। সে জন্য আল্লাহ জ্ঞানকে পারফেক্ট ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছেন। এ জন্য কুরআনেও স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘রাতে কিছুক্ষণ জ্ঞানচর্চা করা, সারা রাত জাগ্রত হয়ে ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ সুতরাং জ্ঞানের কোনো বিকল্প হয় না। মানুষ হলো একটি জীব। পশুও একটি জীব। কিন্তু মানুষ হচ্ছে সুপার জীব। কিন্তু মানুষ হিসেবে মানুষকে যদি জীবিত রাখতে হয়, তা হলে তাকে জ্ঞান দিতে হবে। সে জ্ঞান হবে সমন্বিত। যেমন আমাদের দেহ হলো রূহ ও বস্তুগত অবয়বে তৈরি। ঠিক অনুরূপভাবে জ্ঞানেরও দু’টি দিক আছে। একটি হলো বস্তুগত জ্ঞান, অপরটি হলো স্পিরিচুয়াল বা ধর্মীয় জ্ঞান। সেটি হলো আল্লাহ সংক্রান্ত, স্রষ্টা সংক্রান্ত, আদর্শ সংক্রান্ত ও নীতি সংক্রান্ত। সেটি হলো তৌহিদ। সেটিই হলো স্পিরিচুয়াল জ্ঞান। অন দিকে বস্তুগত জ্ঞান অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদি। সুতরাং দু’টির সমন্বয় হলেই জীবন্ত শিক্ষাব্যবস্থা হবে এবং এ শিক্ষায় আপনি যাকে তৈরি করবেন, সে দায়িত্ববোধসম্পন্ন, সেন্স অব অ্যাকাউন্টিবিলিটি তার মধ্যে গ্রো করবে। এরপর দায়িত্ববোধ তার মধ্যে জাগবে। সে নিজকেও তৈরি করবে, সমাজকে তৈরি করবে, সমাজের প্রতি যে দায়িত্ব, সে দায়িত্ব সে পরিপালন করবে। আল্লাহ প্রতি দায়িত্বও সেটাও পরিপালন করবে। এটা তখনই সম্ভব যখন সমন্বিতভাবে ‘বস্তুগত শিক্ষা’ ও ‘স্পিরিচ্যুয়াল শিক্ষা’, দুটোকে ‘রূহ ও দেহ’ হিসেবে আমরা সমন্বিত করে তৈরি করতে পারি, তবেই সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, বুদ্ধি এক জিনিস, জ্ঞান আরেক জিনিস। বুদ্ধিটা দেয়া হলো জ্ঞানার্জন করার জন্য। বুদ্ধি থাকতে হয়, যার মধ্যে বুদ্ধি নেই সে জ্ঞানার্জন করতে পারে না। এখন বুদ্ধির চর্চাকেই যদি বলা হয় তিনি জ্ঞানী হয়ে গেলেন, তা মোটেই ঠিক নয়। বুদ্ধি হলো জ্ঞানার্জন করার জন্য। এটি এরূপ যেমনÑ একটা মোমবাতির মতো। মোমবাতির মধ্যে রয়েছে একটা সলিতা। এ সলিতায় আগুন লাগিয়ে দেয়া হলেই মোমবাতি নিজেও আলোকিত হয়, তার আশপাশকেও আলোকিত করে। বুদ্ধি হলো আমাদের সলিতা। মনে রাখতে হবে, আমাদের বস্তুগত যে সত্তা বা দেহটার মধ্যে বুদ্ধি রাখা হয়েছে সলিতা হিসেবে। এ সলিতার মাথায় জ্ঞানের খোঁচা দিতে হবে। জ্ঞানের খোঁচা দিলেই বুদ্ধি এটাকে ধারণ করবে। ধারণ করলে নিজেও আলোকিত হবে, সমাজকেও আলোকিত করবে। সুতরাং ইসলামের শিক্ষার দর্শনটা এখানেই।
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ
বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
নীতিগতভাবে বলব, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার দ্বার এখন উন্মোচিত। অবাধ উচ্চশিক্ষার ভালো সুযোগ আছে এ কথা আমরা বলতে পারি। তবে, একটি বিষয় লক্ষণীয় হলোÑ দুর্নীতি আমাদের জাতীয়...
