গ্রীষ্মের ছুটিতে মামার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল লাবু। মামার বাড়ি তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। স্কুলের ছুটি পেলেই লাবুর টার্গেট থাকে মামার বাড়ি। কারণ মামার বাড়ির প্রকৃতির সঙ্গে তার খুব ভাব। গ্রামের রাস্তা, ফসলের মাঠ ও গাছের ছায়ার স্পর্শে থাকতে লাবুর খুবই ভালো লাগে।
মামাদের গ্রামটি কেমন যেন নির্জন। বড় বড় রাস্তাঘাট আর দুপাশে ফসলের মাঠ। সূর্যের খরতাপে বিশাল ডালপালার কড়ই গাছগুলো ছায়া দেয়। তবে গ্রামের বসত বাড়িগুলোর মাঝে দূরত্ব খুবই বেশি। তাই গ্রামের মানুষেরা থমথমে পরিবেশে থাকে। মামাদের গ্রামে খুব ঘন ঘন ডাকাত পড়ে। নগদ টাকা আর বিদেশ ফেরত কারো আগমনের ঘ্রাণ পেলেই সে রাতটি ডাকাতরা আর মিস করে না।
আবার দুই ঈদের আগেও মামাদের গ্রামে ডাকাতের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে যায়। ডাকাতদের জন্যই যেন এ গ্রামের মানুষ টাকা পয়সা রোজগার করে রাখে। রোজার ঈদে যখন শহরের সব লোকজন ঈদের বেতন-বোনাসের বান্ডেল নিয়ে গ্রামে ঈদ উদযাপনের জন্য আসে, তখন ডাকাতেরা ওঁৎ পেতে থাকে। সুযোগ পেলেই হানা দিয়ে কেড়ে নিয়ে যায় সর্বস্ব। কোরবানির সময় গ্রামের চাষিরা যখন সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রমে পালিত গরু হাটে বিক্রি করে টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরে তখনো ডাকাতরা সে টাকার ঘ্রাণ নিতে ভুল করে না। খোঁজ-খবর নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পেশাগত অভিযানে। মামাদের পুরো গ্রামই যেন ডাকাতের রাজ্য। তাই লাবুর জন্যও আনন্দময় সময়গুলো ভয়ের মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়।
শীতের ছুটিতেও লাবু মামার বাড়ি এসেছে। উদ্দেশ্য একটাই, শীতের সকালে খেজুরের রস খেয়ে বেড়ানো। মামার বাড়ির গ্রাম খেজুরের রসের জন্য বিখ্যাত। এদিকে মামাদেরও ফসল কাটা-মাড়াই সবকিছু শেষ। এবার শুধু সারা বছরের খাবারের পরিমাণ কিছু রেখেই বাকি সব ধান বাজারে বিক্রি করবে।
লাবু আসার পরদিনই মামা ধান নিয়ে গেলেন বাজারে। খুব বেশি দাম পেলেন না। গত বছর ধানের দাম আরো বেশি ছিল বলে দাবি মামার। এবার ধান চাষ করে কৃষকেরা একেবারে ক্ষতির মুখেই পড়ে গেছে। তবুও অতি কষ্টে ফলানো ফসল তো আর ঘরে রেখে পঁচাবেন না। তাই বাধ্য হয়েই বাজারে দিয়ে এসেছেন সবাই। কিন্তু কৃষকদের দুঃখ কি ডাকাতেরা আর বোঝে? টাকার গন্ধ পেলেই আরো হিং¯্র হয়ে ওঠে তারা। ঠিক নবান্নের মওসুমও ডাকাতদের জন্য ঈদের মতো একটি সুযোগ। গ্রামের চার পাশেই তারা ওঁৎ পেতে থাকে।
লাবুর মামার গ্রামে একটা প্রভাব আছে বলে সবাই একটু তাদের সম্মান দেখিয়ে চলে। গ্রামের মসজিদ, মক্তব ও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব সামাজিক উন্নয়নে লাবুর মামার অনেক অবদান আছে। কিন্তু তাই বলে তো ডাকাতেরা তাদের সুযোগ মিস করবে না। অন্যদের মতো ডাকাতেরা লাবুর মামাকে রাস্তায় আক্রমণ করে না। মাঝে মধ্যে ভালো কোনো খবর পেলে গভীর রাতে বাড়িতে হানা দেয়।
তেমনই একটি রাতে মামার ছেলে আকনের সাথে গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে আকন ঘুমিয়ে গেলেও লাবুর চোখে আর ঘুম আসে না। তাই আকনকে বিছানায় রেখেই লাবু জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারাগুলো যেন মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছে আর লাবুও দেখে দেখে আনন্দ কুড়িয়ে নিচ্ছে।
হঠাৎ ঘরের চারদিক ঘিরে ডাকাতের আক্রমণ। মামারাও সবাই ঘুম থেকে উঠে গেছে। লাবু তো ভয়ে একদম জবুথবু। তবে মামাদের কেউ তেমন ভয় পায়নি। কারণ তারা এমন পরিস্থিতির শিকার হতে অভ্যস্ত। সবাই লাঠিসোটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। লাবু তো এবার ভয়ে খাটের নিচে।
এদিকে মামাদের রণপ্রস্তুতি টের পেয়ে ডাকাতেরা উধাও। মামারা এবার পুনরায় ঘুমের ঘোরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তখনো লাবু খাটের নিচে ডাকাতের ভয়ে আর শীতে থর থর করে কাঁপছে। আকনেরও লাবুর ব্যাপারে পূর্ব-অভিজ্ঞতা আছে। তাই কোথাও খুঁজে না পেয়ে খাটের নিচে উঁকি মারতেই দেখে লাবু কাঁপছে। আকন আঙুল দিয়ে গুঁতো মেরে বলে, কী রে ভীতুর ডিম! তোর ভয় এখনো কাটেনি? ডাকাতেরা চলে গেছে এবার বেরিয়ে আয়। ভীতুর ডিম কোথাকার, দেখিসনি আমরা কিভাবে লাঠি নিয়ে বের হলাম। ওকে, তুই খুব সাবধানী।