বিকেল থেকে দেখছি একটি মেয়ে ওয়েটিং রুমের শেষ চেয়ারটায় চুপচাপ বসে আছে। পরনে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। চোখে কাজল, কপালে লাল টিপ। ঠোঁটেও লাল লিপস্টিক। ম্যাচ করে খোঁপায় গুঁজেছে টকটকে দুটো লাল গোলাপ। সবকিছু মিলে টানা চোখের মেয়েটিকে অপরূপ সুন্দরী লাগছে।
উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে দু’টি, আর দক্ষিণ দিক থেকে উত্তরে তিনটি ট্রেন চলে গেল। অনেক যাত্রী স্টেশনে নামল, উঠল। কিন্তু মেয়েটি কোনো ট্রেনেই উঠল না বা তার কোনো যাত্রীও ট্রেন থেকে নামল না। মেয়েটি চুপচাপ স্টেশনে বসে আছে তো আছেই। রাত ১০টায় একটা ট্রেন আছে। আন্তঃনগর ট্রেন। ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে যাবে। ভাবলাম মেয়েটি নিশ্চয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ঢাকার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। দূরে বাড়ি, তাই আগেভাগেই স্টেশনে এসে বসে আছে। রাত ১০টা বেজে গেল। আন্তঃনগর ট্রেনও স্টেশন ছেড়ে চলে গেল। স্টেশন একেবারে ফাঁকা। নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। তবুও মেয়েটি চুপচাপ বসে রইল। এবার আমার মনে বেশ খটকা লাগল। আড়চোখে মেয়েটির দিকে আবারো তাকালাম। তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল। বললাম, শুনুন।
মেয়েটি চেয়ার ছেড়ে উঠে আমার সামনের চেয়ারটায় বসল।
বললাম, আমি বিকেল থেকে খেয়াল করছি আপনি স্টেশনে বসে আছেন। দুই দিকেই ট্রেন চলে গেল। আপনি কোনো ট্রেনেই উঠলেন না। আজ তো আর কোনো ট্রেন নেই, আপনি কোথায় যাবেন?
এবার মেয়েটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। চোখের পানিতে কাজলগুলো ধুয়ে মুছে একাকার। আমি একটা টিস্যুপেপার বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলাম। বললাম, ধরুন, চোখের পানি মুছে নিন। স্টেশনে কাঁদবেন না। এখন অনেক রাত হয়েছে। স্টেশনে কান্না করলে মানুষ সন্দেহ করবে। সমস্যা বাড়বে বৈকি কমবে না।
মেয়েটি এবার কান্না থামানোর চেষ্টা করল। চোখের পানি মুছে নাক টেনে বলল, ও আমাকে ঠকিয়েছে।
কে ঠকিয়েছে?
আমি যাকে ভালোবাসি।
মানে?
আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসি। নাম সাগর। সেও আমাকে খুব ভালোবাসত। আমাদের ভালোবাসার কথা দুই পরিবার জেনে যায়। তারা আমাদের ভালোবাসা মেনে নিতে পারে না। তাই আমরা ঠিক করেছি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করব। আর শুভদিন হিসেবে বেছে নিয়েছি পয়লা বৈশাখকেই। এদিন ঘুরে বেড়ানোর নাম করে আমরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবো। দুপুর অবধি সব ঠিকঠাক ছিল। দুপুরের পর আমাদের স্টেশনে আসার কথা ছিল। তারপর একসাথে পালিয়ে যাবো। কিন্তু ...
কিন্তু কী?
আমি এসেছি। এসেই দেখি ওর ফোনের সুইচ অফ। অফ তো অফই। কল যাচ্ছে না।
এখনো কি ফোন বন্ধ?
জি।
তাহলে এখন কি করবেন?
জানি না। আমি কিছু জানি না। বলে আবারো মেয়েটি কাঁদতে শুরু করল।
প্লিজ কাঁদবেন না। এটা স্টেশন। এখানে কান্না করা যায় না। এখানকার রাতের মানুষগুলো গাঁজা খায়। তারা ভালো লোক নয়। দয়া-মায়াহীন। হায়েনা। চোখের পানি দেখলে তাদের হায়েনা মন জেগে ওঠে। হায়েনা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চলুন আপনাকে আপনার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
নাহ! প্রায় চিৎকার করে উঠে মেয়েটি। নাহ, আমি বাড়ি ফিরে যেতে পারব না। বাড়িতে এতক্ষণ সবাই আমার পালিয়ে আসার খবর জেনে গেছে। আবার বাড়ি ফিরে গেলে ওরা আমাকে জ্যান্ত কবর দেবে।
তাহলে এখন কী করবেন?
ট্রেনের নিচে গিয়ে মরব।
এখন তো কোনো ট্রেনও নেই, যে কাটা পড়ে মরবেন।
ততক্ষণে স্টেশনে মাতাল হয়ে পড়ে থাকা গান্জুটিদের কানে পৌঁছে গেছে মেয়েটির কথা। তারা বেশ কয়েকবার আমার অফিস কক্ষের সামনে দিয়ে পাঁয়চারী করল। শেষে একজন আমার কক্ষে এসে বলল, স্যার।
আমি কর্কশ কণ্ঠে বললাম, কিছু বলবে?
সুন্দরী ম্যাডাম কে স্যার?
তোমার ভাবী। কেন? কোন সমস্যা?
না স্যার, ঠিক আছে। এমনি জানতে চাইলাম আর কী! আসি স্যার। মাতালের দল সামনে থেকে কেটে পড়ল।
সরি, কিছু মনে করবেন না। ওদের সামনে আপনাকে বউ বানিয়ে ফেললাম। এছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। গাঁজাখোর পোলাপান। তা না হলে কী থেকে কী করে বসত!
ইটস ওকে। আমি কিছু মনে করিনি।
ধন্যবাদ। এবার চলুন। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না।
মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, কোথায়?
বাসায়।
কার বাসায়?
আমার বাসায়।
মানে?
হাসলাম আমি। কোনো ভয় নেই। আমার সাথে মা আছেন। আপনি মায়ের কাছে থাকবেন।
মেয়েটি ভরসার জায়গা খুঁজে পেল। আস্বস্ত হলো। আমার পেছনে পেছনে মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল।
বাসায় ফিরে মাকে আমি মেয়েটির সব কথা খুলে বললাম। সব শুনে চা খেতে খেতে মা হেসে বললেন, একটা সেয়ানা মেয়েকে তো বাসায় আর এমনি এমনি রাখা যায় না।
মানে? চমকে উঠে বললাম আমি।
মেয়েটিকে খুব পছন্দ হয়েছে আমার। কী লক্ষ্মী মেয়ে! যেন লাল টুকটুকে বউ! দেখেই মন জুড়িয়ে যায়। আমি ঠিক এরকমই মেয়েকে বউমা হিসেবে খুঁজছিলাম।
বলে কী মা! আমি আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকালাম। দেখি মেয়েটি মিটিমিটি হেসে কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর অপলক চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। কী মমতা সেই চাহনির! কী ভালোবাসা সেই চাহনির! এ রকমভাবে কেউ কোনো দিন আমার দিকে তাকায়নি। আমার সিঁড়দারা বেয়ে কী যে এক ভালো লাগা বয়ে গেল।
আজ পয়লা বৈশাখ। আমার আর নিতুর প্রথম বিয়েবার্ষিকী। আমরা ঠিক করেছি আজ সারা দিন রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়াব। নিতু আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে। আজ থেকে এক বছর আগে যেভাবে সেজে পালিয়ে এসে স্টেশনে বসেছিল, ঠিক সেভাবে। আমরা পাশাপাশি রিকশায় বসে আছি। রিকশা চলছে। বাতাসে নিতুর চুল উড়ছে। আমার একটা হাত নিতুর হাতে।
আচ্ছা গত বছরের ঘটনাটা তোমার মনে আছে তুহিন?
কী?
আমার কোনো প্রেমিক ছিল না। আমি কারো সাথে পালিয়ে যেতেও সেদিন স্টেশনে আসিনি।
তাহলে?
পুরোটাই নাটক। আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমাকে দিয়ে করিয়েছেন।
কে?
তোমার মা।
মা কেন এই নাটক করতে যাবে?
তিনি নাকি অনেক দিন থেকে তোমাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন। তুমি রাজি হওনি। তোমাকে বিয়ে দেয়ার জন্যই...
এ্যা !
জি সাহেব। বলে হাসতে হাসতে আমার কাঁধে লুটিয়ে পড়ল নিতু। কী উচ্ছ্বল সে হাসি। আমি তাকে বড্ড ভালোবাসি। সেই প্রথম দিনের মতোই আমার সিঁড়দারা বেয়ে কী যে এক ভালোলাগা ছড়িয়ে গেল সারা দেহে।
সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর