উৎসবপ্রিয় হিসেবে বাঙালির পরিচয় দীর্ঘ সময়ের। কোনো বিশেষ উপলক্ষকে সামনে নিয়ে বাঙালি তাদের মন-মেধা-মননকে ঢেলে দেয় উৎসবের মধ্যে। অন্য দিকে সারা দিন কর্মক্লান্ত হয়ে একটু বিনোদনের আশ্রয় পেতে চায় মানুষ। সেই নির্মল আনন্দে শরিক হয়ে দিনের সব রকমের দুঃখ-কষ্টকে নিমিষে উড়িয়ে নতুন উদ্যমে নতুন উৎসাহে আবার নতুন একটি দিন শুরু করে। এভাবেই দিন আসে আর যায়। এই আসা-যাওয়ার মধ্যেই মানুষ জেনে নেয় নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। এসব কৃষ্টি-কালচারকে নিয়েই মানুষ আগামীর জন্য নতুন করে, নতুনভাবে বেঁচে থাকতে চায়। মানুষ বংশপরম্পরায় তার পারিপার্শ্বিক আবহকে নিজের হৃদয়ে গ্রোথিত করে লালন করে আসছে প্রতিনিয়ত।
আবহমান বাংলার প্রেক্ষাপটে বাংলা নববর্ষ এবং নববর্ষকেন্দ্রিক পার্বণাদি সেই হৃদয়ে ধারণ করা একটি চিরায়ত পর্ব। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে অনেক আগ থেকেই মানুষের ভেতরে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে আবাহনের জন্য হৃদয়-মন থাকে ব্যাকুলতায় ভরপুর। বাংলা নববর্ষ মানে কেবল নতুন একটি বর্ষ উদযাপনই নয়, এ দিনকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে সেই প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখী মেলা অনিবার্যতায় এসে পড়েছে, যা এখন দেশের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন মেয়াদে উদযাপিত হয়ে থাকে তুমুল উৎসবের আমেজে।
তবে মেলা কবে থেকে কোথায় প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সে বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য আদান-প্রদানের যৌথ প্রয়াস তথা পরস্পর পরস্পরের ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের প্রদর্শনী বা বিনিময়ের জন্যই মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হয় কোনো নির্দিষ্ট স্থানে। এভাবে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে হাটবাজার। আর হাটবাজারের জমজমাট সংস্করণই মেলা, যা উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয় পূর্বনির্ধারিত কয়েক দিনের জন্য। মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মেধা-মননের চমৎকারিত্ব প্রকাশ পায়। প্রতিযোগিতামূলক এসব উৎসবে ক্রেতাসাধারণ পায় সংশ্লিষ্ট পেশার সেরা হস্তশিল্পের জোগান। মেলা উদযাপনের জন্য মানুষের মধ্যে অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। নতুন অতিথিকে বরণের জন্য সবার ভেতরে যেমন ব্যাকুলতা বাসা বাঁধে, ঠিক সেভাবে বাংলাবর্ষের শেষ মাসÑ চৈত্র মাসেই আবালবৃদ্ধবণিতার মধ্যে সাড়া পড়ে যায় বাংলা নববর্ষকে বরণের। বৈশাখ বাংলাবর্ষের প্রথম মাস। নববর্ষের প্রথম দিন পয়লা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির যুগ যুগ ধরে লালন করে আসা ঐতিহ্য। এ সময় সবখানে পুরাতনকে বিদায় করে নতুনকে স্বাগত জানানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কেবল আনন্দ আর উৎসবেই সময়টা চলে যায় তা নয়; পরস্পরের মধ্যে ভালো-মন্দ, সহমর্মিতা আর হৃদয়ের বন্ধনও তৈরি হয়। একে অন্যকে বিভিন্ন ধরনের উপহারসামগ্রী দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে এ সময়টাকে অর্থবহ করে তোলে সবাই।
নববর্ষের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে মানুষ ভুলে যায় গত হওয়া বছরের সব রকমের ক্লান্তি, ক্ষোভ, জড়তা, জীর্ণতা, দুঃখ। সব কিছু ভুলে গ্রহণ করতে ছুটে যায় চমৎকার সুন্দর আগামীকে।
বাংলা নববর্ষের উৎসবকে পুরো বাঙালি জাতি নানাভাবে রঙ-বেরঙে সাজিয়ে তোলে। পয়লা বৈশাখের প্রথম প্রহরে আনন্দ আর উৎসবমুখর পরিবেশে নানারঙা পোশাক, মুখোশ পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা। নাচে-গানে মুখরিত হয় রমনার ছায়াঘেরা বটমূল। সাড়া জাগে প্রাণ থেকে প্রাণের অন্দরে। সুতোছেঁড়া ঘুড়ির মতো মন কেবলই উড়তে থাকে আকাশে।
হালখাতা বাংলা নববর্ষের অন্যতম অন্যরকম এক আয়োজন। আমাদের দেশে যারা বাংলা মাস অনুযায়ী হিসাবের খাতা লেখেন, তারাই মূলত হালখাতার মাধ্যমে অর্থাৎ ক্রেতাদের নতুন বছরে মিষ্টিমুখ করিয়ে পুরনো হিসাব-নিকাশ শেষ করে নতুন খাতায় নতুন হিসাব লেখেন। তবে পুরনো দিনের সেই হালখাতা অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। এখন প্রায় সারা বছরই হালখাতা হতে দেখা যায়। কেউ কেউ পুরনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে এখনো হালখাতার মহরতের আয়োজন এই বাংলা নববর্ষে মানে পয়লা বৈশাখে করে থাকেন।
শুভ নববর্ষের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সূচনা হয় নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখÑ বাংলা সনের প্রবর্তনের সময় থেকেই। তখন সম্রাট আকবর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
হিজরি সন ও সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছরকে যুক্ত করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। ফসল কাটার মওসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য এই সন চালু করা হয়েছিল। সম্রাট আকবরের রাজসভার উপদেষ্টা আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী বাংলা মাসের নামগুলো নক্ষত্রের নাম থেকে নিয়ে সৌর মাসের দিন মিলিয়ে বাংলা সন প্রবর্তন করেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছেÑ বাংলা নববর্ষের সাথে বৈশাখী মেলা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলা নববর্ষের কথা উঠলে মেলার প্রসঙ্গ আসবে অনিবার্যভাবে। আমাদের দেশের মেলা সম্পর্কে ইংরেজ লেখক মি. বেন্টালি একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ রচনা করেন ১৯২১ সালে। তিনি ওই গ্রন্থটিতে লিখেছেনÑ ‘গ্রামে গ্রামে মেলা উপলক্ষে যাত্রাগান, কবিগান, জারিগান এবং বাউল-ফকিরদের গানের আসর বসে। গ্রামীণ শিল্পীদের গাওয়া এবং গ্রামের মহিলাদের নকশিবাহার কারুকাজ এসব মেলার অনবদ্য আকর্ষণ।’
মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে খুব উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ পালন এবং মেলার আয়োজন হতো। ‘আইন-ই-আকবরি’তে বলা হয়েছেÑ ‘এ দেশে এমন কোনো গ্রাম নেই, যেখানে মেলার ধুম পড়ে না। বিভিন্ন মওসুমের রকমারি দ্রব্যসামগ্রীর সাথে মানুষের মহামিলনই মেলার প্রধান উপভোগ্য বিষয় ছিল।’
মেলায় দেশের লোকসংস্কৃতি উজ্জীবিত হয়। এতে যাত্রা, পুতুল নাচ, পালাগান, বাউলগান, কবিয়ালদের জমজমাট আসর বিশেষ বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে থাকে।
মেলা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়েও আমাদের দেশে সমৃদ্ধ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তার ভেতর গাজী-কালু-চম্পাবতীর স্মরণে মেলা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদিন উপলক্ষে মধুমেলা, মহান ভাষাশহীদদের স্মরণে অমর একুশে গ্রন্থমেলা অন্যতম। কেবল পালা-পার্বণকে ঘিরেই মেলা হয় এমনটি নয়। ধর্মীয় অনুভূতিকে উপজীব্য করেও এ দেশে বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। ধর্মীয় তীর্থস্থান, ওরস, দরগা এসবের শ্রেণীভুক্ত। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় তীর্থভূমি।
মেলার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে অনেক সহজলভ্য পণ্যের সাথে দুষ্প্রাপ্য পণ্যের আমদানি। অনেক দেশে মেলায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে সে দেশের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ইতিহাস, ঐতিহ্য তুলে ধরে। সেগুলোর মাধ্যম হিসেবে বই, বিজ্ঞাপন, পোস্টারকে বেছে নেয়া হয়।
আদিম মানুষ মুদ্রার পরিবর্তে পণ্যের বিনিময় করত। তখন এক ধরনের মেলা হতো বলে জনশ্রুতি আছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের মেলা হয়। যেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বৈশাখী মেলা, রাজপুণ্যাহর মেলা, আদিবাসীদের বিজু মেলা, গঙ্গার আবির্ভাব উৎসব ও মেলা, বৌদ্ধ মেলা, ক্ষেত্রপাল ঠাকুরের মেলা, শীতলার মেলা, কালীপূজার মেলা, শিব মেলা, মঙ্গলচণ্ডির মেলা, চিলাইর মেলা, মহররমের মেলা, ফলাহারের মেলা, রথমেলা, মনসার মেলা, পুলনযাত্রার মেলা, জন্মাষ্টমীর মেলা, দুর্গাপূজার মেলা, কার্তিকব্রতের মেলা, দেওপলির মেলা, বুড়াবুড়ির মেলা, পৌষপার্বণের মেলা, পুরো ঠাকুরের মেলা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মেলা, বসন্ত উৎসব ও মেলা, দোলপূর্ণিমার মেলা, রাঁধুনি উৎসব ও মেলা, চৈত্রসংক্রান্তির মেলা, বাউল মেলা, কৃষিমেলা, কম্পিউটার মেলা, চামড়া-পাট-কুটিরশিল্প, বৃক্ষ, মৎস্যসহ বিভিন্ন ধরনের মেলা বসে এ দেশে।
বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো মেলা বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন বলেই মেলা কার্যত জমজমাট হয়ে ওঠে।
কুমারপাড়ার কারিগররা আনে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, বাসনকোসন, মালসা, সরা, ঘটিবাঁটি, শিশুদের মনকাড়া সব খেলনাসামগ্রী। যার মধ্যেÑ রঙেচঙে সাজানো হাতি, ঘোড়া, নৌকা, পাখি, পুতুল, গরু, খরগোশ, ব্যাঙ প্রভৃতি।
কাঠশিল্পী ছুতার সম্প্রদায়ের লোকেরা আনে লাঙ্গল, জোয়াল, মই, খাট-পালং, আলমিরা, চেয়ার, টেবিল, সিন্দুক, পিঁড়ি, বেলনা, খাদি, বাতিদানি, ডালঘুঁটুনি, কাঁকই, লাটাই, খড়ম, আলনাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য।
বাঁশ ও বেতের কাজ যারা করে, তারা আনেÑ ধামা, কুলা, ডালা, খালুই, টুকরি, পলো, সরপোশ, পাখির খাঁচা, ভেলকি, দমা, চারো, চাটাই, ঝুড়ি, মাদুর প্রভৃতি।
অন্য দিকে মেলায় আসে দা, বঁটি, খুন্তা, কোদাল, নিড়ানি, কাঁচি, ছুরি, চাকু, লাঙলের ফলা ও শাবল। এসব আনে কামার সম্প্রদায়ের লোকেরা।
ময়রারা পসরা সাজান মণ্ডা, মিঠাই, জিলাপি, বাতাসা, তক্তি, নাড়–-চিঁড়ে, মুড়ি-মুড়কি, বরফি, কদমা, সন্দেশ, পানতোয়া, রসগোল্লা, চমচম, রসমালাই, দই, বন্দেল, রসমুণ্ডুসহ মিষ্টান্নসামগ্রী দিয়ে।
বৈশাখী মেলার প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছেÑ সার্কাস, জাদু, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, টকি, বায়স্কোপ, সঙ, সঙের নাচ, ঘুড়ি ওড়ানো, ঘোড়দৌড়, মই দৌড়, পশু-পাখির লড়াই, কুস্তি, সাপখেলা, বানরনাচ, পায়রা উড়ানো, মোরগ লড়াই, নাগরদোলা, লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু খেলা, বাউল গান, মুর্শিদী গান, ভাটিয়ালি গান ও পালাগান অন্যতম।
এসব আয়োজনও মেলা প্রাঙ্গণকে জমজমাট করে রাখে। এ থেকে মেলায় আগত মানুষ নির্মল আনন্দ উপভোগ করে থাকে। এ জন্য এই নির্ভেজাল খুশির ভেলায় চড়তে মানুষ সারা বছর ধরেই অপেক্ষায় থাকে।
সব মিলিয়ে যুগ যুগ ধরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে বেঁচে রয়েছে আমাদের বৈশাখ। বেঁচে থাকবে এভাবেই অনাদিকাল ধরে। হ
উৎসবপ্রিয় হিসেবে বাঙালির পরিচয় দীর্ঘ সময়ের। কোনো বিশেষ উপলক্ষকে সামনে নিয়ে বাঙালি তাদের মন-মেধা-মননকে ঢেলে দেয় উৎসবের মধ্যে। অন্য দিকে সারা দিন কর্মক্লান্ত হয়ে একটু...
