সময়ের সাথে জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সময় অবিশ্রান্তভাবে বয়ে চলেছে। পল-অনুপল, সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর ইত্যাদি সবই সময়ের সমষ্টি মাত্র। এরপর দশক, যুগ, শতক, কাল-মহাকাল এসবই সময়ের অখণ্ড বিন্যাস। সময়ের বিশেষ এক মুহূর্তে আমাদের জন্ম, আরেক মুহূর্তে পৃথিবী থেকে আমাদের অন্তর্ধান। জীবন চলার পথে আমরা সব ব্যাপারে সময়ের হিসাব-নিকাশ করে চলি। মুয়াজ্জিন প্রতিদিন পাঁচবার নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদের মিনার থেকে সুললিত কণ্ঠে আজান দেন। মুসল্লিরা আজানের শব্দ শুনে মসজিদে হাজির হন, যথানিয়মে সালাত আদায় করেন। ভোরবেলায় সূর্যোদয়ের সাথে প্রাণিকুল নিদ্রা থেকে উত্থিত হয়ে নিজ নিজ কাজ শুরু করে। গাছে গাছে ফুল ফোটে, পাখি ডাকে, সবুজ প্রকৃতির বুকে নবজীবনের বর্ণাঢ্য আয়োজন শুরু হয়। শিশুরা বিদ্যালয়ে যায়, বড়রা চাকরি অথবা ব্যবসায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বের হয়। শ্রমিকেরা মিল-কারখানায় ভিড় করেন। কৃষকেরা মাঠে ফসল ফলাতে অথবা ফসল তোলার কাজে ব্যস্ত হন। দোকানিরা দোকানপাট খুলে খদ্দেরের আশায় বসে থাকেন। গৃহিণীরা গৃহস্থালির নানা কাজে পেরেশান হন। কর্মমুখর পৃথিবীতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
সূর্যাস্তের পর কোলাহলময় ব্যস্ত পৃথিবী হঠাৎ আবার নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। পাখিরা নীড়ে ফেরে, গৃহপালিত পশুরা গোয়ালে আশ্রয় নেয়, রাখালেরা বাড়ি ফিরে আসে। এভাবে সারা দিন নানা কাজে ব্যস্ত মানুষ গৃহে ফিরে অবসাদক্লান্ত দেহ-মনকে একটু আরাম দেয়ার জন্য শয্যা গ্রহণ করে। রাত্রির অন্ধকারে দিনের সব কোলাহল থেমে যায়। অবসাদগ্রস্ত পৃথিবী যেন পাহাড়-নদী আর ফসলের মাঠের আইলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে মহান স্রষ্টা বলেন, ‘তিনি প্রভাত রশ্মির উন্মেষক। তিনি রাত্রিকে আরামদায়ক করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে হিসাবের জন্য রেখেছেন। এটি পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানীর নির্ধারণ।’ (সূরা আন-আম, আয়াত : ৯৬)
জীবন-যাপনের প্রতিদিনকার এ একঘেঁয়েমির মধ্যে মানুষ ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে। ঘড়ির কাঁটা নিয়মমাফিক সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টা অতিক্রম করে সময় নির্দেশ করে। এভাবে চব্বিশ ঘণ্টায় এক দিন, সাত দিনে এক সপ্তাহ, ত্রিশ দিনে এক মাস, বার মাসে বছর। দশ বছরে এক দশক, বার বছরে এক যুগ, শত বছরে শতাব্দী। এভাবে সৃষ্টি হয় কাল-মহাকাল। এ অনন্ত বিশ্বে সময়ের যাত্রা কখন থেকে শুরু হয়েছে, কেউ জানে না। কোথায় এর শেষ, তাও সবার অজানা। আমরা কাল-মহাকালের এ চক্রবাঁকে নিরন্তর পথ চলছি। পথ চলতে চলতে একসময় আমরা পথের বাঁকে হারিয়ে যাচ্ছি, নতুন যুগের মানুষ এসে আমাদের পুরনো পথে নতুনভাবে জীবনের নব অভিযানে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।
এ পথচলাকে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও হিসাবের মধ্যে বেঁধে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সনের উৎপত্তি হয়েছে। কোনো একটি বিশেষ ঘটনা বা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সনের উৎপত্তি ঘটেছে। তবে বর্তমান পৃথিবীতে মাত্র অল্প কয়েকটি সন বিশেষভাবে পরিচিত, প্রচলিত ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তার মধ্যে গ্রেগরিয়ান বা ইংরেজি সন, হিজরি সন, বাংলা সন, বন্যা সন, হস্তি সন ইত্যাদি। বর্তমানে পৃথিবীতে ইংরেজি সনের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। সৌদি আরবসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে হিজরি সনেরও ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ফলে এ দু’টি সনের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অন্য যেকোনো সনের চেয়ে অধিক।
সন দুই রকমÑ সৌরসন ও চান্দ্রসন। পৃথিবীর আবর্তনের ওপর নির্ভর করে সনের উৎপত্তি ঘটেছে। মহাশূন্যে ভাসমান সমগ্র বিশ্বজগতের গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি সব কিছু নিজ নিজ কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতিতে নিরন্তর আবর্তিত হচ্ছে। আমরা যে গ্রহে বসবাস করছি, পৃথিবী নামক সে গ্রহটি সূর্যের চার পাশে আবর্তিত হচ্ছে। আবার চন্দ্র নামক উপগ্রহটি পৃথিবীর চার পাশে আবর্তিত হচ্ছে। সূর্য আকারে অনেক বড়, তার আকর্ষণ শক্তিও বেশি। সূর্যের তাপে পৃথিবী আলোকিত (দিন), সূর্য অন্তরালে গেলে পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন (রাত্রি) হয়। ফলে সূর্যের কারণে পৃথিবীতে দিন-রাত্রি বিবর্তিত হয়। এ নিয়ম প্রবর্তন করেছেন স্বয়ং স্রষ্টা। তিনি বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোর্তিময় করেছেন এবং এর মনজিল নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন। দিন ও রাত্রির পরিবর্তনে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সে সব কিছুর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকিদের জন্য। (সূরা ইউনুস, আয়াত : ৫-৬)।
আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে সূর্য ও চন্দ্র দু’টি স্পষ্ট নিদর্শন। একটি তেজস্কর, অন্যটি জ্যোর্তিময়। একটি জগতের তাবৎ প্রাণিকুলকে নানা কর্মের আয়োজনে সজাগ ও কর্মচঞ্চল করে তোলে, অন্যটি আরাম, বিশ্রাম ও নিদ্রার স্বপ্নময় ভুবনে নিয়ে যায়। এ দু’টি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব কিছুর সুনির্দিষ্ট পরিক্রমের ফলে দিন-রাত্রি, মাস-বছর, ঋতু-তিথির হিসাব সংরক্ষণ সহজতর হয়েছে এবং পৃথিবীর সব সৃষ্টির ধারা যথারীতি অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র পরিক্রম করে নির্ধারিত কক্ষপথে।’ (সূরা আর-রাহমান, আয়াত-৫)।
রাত ও দিনের নিদর্শনদ্বয়ের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাত ও দিনকে করেছি দু’টি নিদর্শন; রাত্রির নিদর্শন অপসারিত (অর্থাৎ অন্ধকারে আচ্ছাদিত) করেছি এবং দিনের নিদর্শনকে আলোকপ্রদ করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ-সংখ্যা ও হিসাব নিরূপণ করতে পার।’ (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত-১২)।
দিন-রাত্রি ও চন্দ্র-সূর্যের নির্দিষ্ট আবর্তন ও তার গূঢ় তাৎপর্য সম্পর্কে মহান স্রষ্টার ঘোষণা, ‘তাদের জন্য এক নিদর্শন রাত্রি, তা থেকে আমি দিবালোক অপসারিত করি, সব কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবং সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চন্দ্রের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনজিল (এ হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনজিল বা তিথিতে বিভক্ত করেছেন); অবশেষে তা শুষ্ক বক্র, পুরাতন খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা; এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।’ (সূরা ইয়াসিন, আয়াত : ৩৭-৪০)।
পৃথিবী নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করায় এবং সূর্যের কারণে পৃথিবীতে দিন-রাত্রির আবর্তন ঘটায় সৌরবর্ষের হিসাব নির্দিষ্ট রয়েছে। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ সৌর বছরের হিসাবে দৈনন্দিন কাজ ও জাগতিক ক্রিয়া-কর্ম সমাধা করে এবং চান্দ্রবছরের হিসাবে ধর্মীয় বিধিবিধান অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকে। বছরের হিসাবে পার্থক্য থাকলেও সৌর ও চান্দ্র উভয় বছরেই মাসের সংখ্যা ১২। পৃথিবীতে যত সন প্রচলিত রয়েছে এবং বিভিন্ন সময় সেসব সনের উৎপত্তি হলেও প্রত্যেক সনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রতি সনের মাসের সংখ্যা ১২। এ জন্য মহান স্রষ্টা বলেন : ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট বছর গণনার মাস বারোটি।’ (সূরা তাওবা, আয়াত : ৩৬, আংশিক)।
প্রত্যেক সনের মাসের সংখ্যা বারো হলেও প্রতি মাসে দিনের সংখ্যা বা প্রতি সনে বর্ষের দিন সংখ্যায় তারতম্য রয়েছে। এর কারণ কোনো সন চন্দ্রের হিসাব এবং কোনো সন সূর্যের হিসাবে নিরূপিত হয়। চন্দ্রের হিসাবে নিরূপিত সনকে চান্দ্রবর্ষ এবং সূর্যের হিসাবে নিরূপিত সনকে সৌরবর্ষ বলে। চান্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায় এবং সৌরবর্ষ হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায়। ফলে চান্দ্রবর্ষ অপেক্ষা সৌরবর্ষ ১০-১১ দিন বড়। সৌরবর্ষ সূর্যের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় বার্ষিক ঋতু-পরিক্রম বা মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট ইত্যাদি নির্দিষ্ট সময়ে আবর্তিত হয়। ফলে আমাদের হিসাব ও গণনার কাজে বিশেষ সুবিধা হয়। তা ছাড়া অমাবস্যা, পূর্ণিমা, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা ইত্যাদি চন্দ্র-পরিক্রমণের সাথে যুক্ত। চান্দ্রবর্ষ চন্দ্র-পরিক্রমের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় এবং সৌরবর্ষ থেকে এটা ১০-১১ দিন কম হওয়ায় রোজা, হজ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় ইবাদত পালনে সুবিধা হয়। বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষই বছরের সব ঋতুতে ঘুরেফিরে রমজান, হজ, ঈদ ইত্যাদি পালনের সুযোগ পায়। অন্যথায়, কোনো দেশে প্রতি বছর শুধু শীতকালেই রমজান পালিত হতো, আবার কোনো দেশে শুধু গ্রীষ্মকালেই রমজানের আগমন ঘটত। এটা হতো ন্যায়বিচার বা ইনসাফের খেলাফ। স্রষ্টার বিধানে কোনো অবিচার বা বৈষম্য নেই। তাই তিনি এসব ইবাদতকে চান্দ্রবর্ষের সাথে সংযুক্ত করে পৃথিবীর সব অঞ্চলের সব মানুষের প্রতি সুবিচার করেছেন। বান্দার প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ নিয়ামত।
মোগল আমলে উপমহাদেশে সরকারিভাবে হিজরি সন চালু ছিল। সম্রাট আকবর ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সন ব্যতীত আরো কয়েকটি নতুন সন প্রবর্তন করেন। তিনি বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়কে ধর্মীয়ভাবে ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করার উদ্দেশ্যে ‘দ্বিনে এলাহি’ নামে এক নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করে সে ধর্মের স্মরণে তিনি ‘এলাহি সন’ চালুর চেষ্টা করেন। তার প্রবর্তিত নতুন ধর্ম দ্বীনে এলাহি যেমন জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়, তেমনি এলাহি সনও গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে তিনি যেসব নতুন সন প্রবর্তন করেন, কমবেশি সেগুলো স্থায়িত্ব লাভ করে। সুবে বাংলায় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তিনি নতুন বাংলা সন প্রবর্তন করেন। বাংলায় অনেকে এটাকে বঙ্গাব্দ নামেও অভিহিত করেন। বাংলা সন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। বাংলা সনকে হিজরি সনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে এটাকে সৌরসনে রূপান্তরিত করা হয়। খাজনাদি আদায় ও রাজকীয় অন্যান্য কার্যাদি সম্পাদনের সুবিধার্থে এ সনের উৎপত্তি। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন ঘটে। সম্রাট আকবর ফসল বোনা ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তার রাজত্বকালের ঊনত্রিশতম বছর অর্থাৎ ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে শাহি ফরমান জারি করে এ নতুন সন চালু করেন। চালুর পর এ সন ‘ফসলি সন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ‘ফসলি’ লকবটিও বহাল থাকে। নির্দিষ্ট দিনে খাজনা আদায়, অন্যান্য কর সংগ্রহ ও প্রজাসাধারণের সাথে শাহী দরবারের লেনদেনের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কাজে নতুন সনগুলো ব্যবহৃত হলেও মোগল রাজ-দরবার ও মুসলিম সমাজে সর্বত্র যথারীতি হিজরি সন চালু থাকে। আকবরের রাজত্বকালে ওই সময় ফসলি সন হিসেবে উড়িষ্যা ও মহারাষ্ট্র প্রদেশে যথাক্রমে ‘বিলায়তি’ ও ‘সুরসান’ নামে আরো দু’টি সন চালু হয়। এ দু’টি সনকেও বাংলা সনের মতোই হিজরি সনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়।
সম্রাট আকবর তার নবরতেœর অন্যতম বিজ্ঞ আমির ফতেহউল্লাহ শিরাজীকে বাংলা সন উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন। ‘আমির-উল মুল্ক’, ‘আযাদ-উদ্-দৌলা’, ‘রোস্তম সানি’ প্রভৃতি উপাধিপ্রাপ্ত বিশিষ্ট গণিতবিদ, অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও সুপণ্ডিত ফতেহউল্লাহ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরি বা ১৫৫৬ ঈসাব্দ পর্যন্ত হিজরি সন অপরিবর্তিত রেখে পরবর্তী সময় থেকে নতুন সন সৌরমাসের হিসাব অনুযায়ী গণনার ব্যবস্থা করে বাংলা সন উদ্ভাবন করেন। এভাবে হিজরি সনের ভিত্তিতে বাংলা সনের উৎপত্তি হলেও পরবর্তীতে নতুন সনের হিসাব সৌরবর্ষের সাথে যুক্ত হওয়ায় দুই সনের মধ্যে বছরে ১০-১১ দিনের এবং ৩৩ বছরে এক বছরের ব্যবধান ঘটে। কালপরিক্রমায় এ ব্যবধান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মোগল সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তার রাজস্ব কর্মকর্তা আমির ফতেহউল্লাহ শিরাজি প্রথম ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা নববর্র্ষের প্রথম মাস হিসাবে বৈশাখে উৎসব পালনের নির্দেশ দেন। এ ধারাবাহিকতায় ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি ঢাকায় সুবে বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে তখন থেকেই রাজস্ব আদায় ও ব্যবসায় বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য বাংলা সনের প্রথম মাস হিসাবে পয়লা বৈশাখে উৎসবের দিন ধার্য করেন। সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি তার বাসভবনের সামনে প্রজাসাধারণের শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং নববর্ষের উৎসব পালন করতেন। সেখানে জমিদার, কৃষক, ব্যবসায়ী প্রভৃতি সব শ্রেণীর মানুষ উপস্থিত থাকত এবং খাজনা আদায় করত। খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি মেলার আয়োজন থাকত। সেখানে গান-বাজনা, গরু-মেষের লড়াই, কাবাডি খেলা ও হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। পরবর্তীতে ঢাকা শহরের মিটফোর্ডের নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারি বাড়ি, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিল, ফরাসগঞ্জের রূপলাল হাউজ, পাটুয়াটুলীর জমিদার ওয়াইজের নীলকুঠির সামনে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। প্রজারা নতুন জামাকাপড় পরে খাজনা দিতে আসত। জমিদাররা আঙ্গিনায় এসে প্রজাদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। সবশেষে ভোজনপর্ব দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হতো। এভাবে মুঘল আমলে বাংলা সনের প্রবর্তন ও শাসককুলের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ চালু হয়।
হিজরি সনের ভিত্তিতে উদ্ভূত হলেও বাংলা সনের হিসাব সৌর সনের হিসাবে নিরূপিত হয়। শুরুতে বাংলা মাসের নাম ছিল যথাক্রমেÑ কারওয়াদিন, আরদিভিহিসু, খারদাদ, তীর, আমরারদাদ, শাহরিয়ার, মিহির, আবান, আয়ুর, দায়, বাহমান ও ইসকান্দার মিয। হিজরি থেকে উদ্ভূত বাংলা সনের সম্পর্কসূত্র বহাল রাখার উদ্দেশ্যে এ ধরনের মাসের নাম রাখা হলেও এ নামগুলোর উচ্চারণ ও ব্যবহার অনেকের কাছে কঠিন মনে হওয়ায় পরবর্তীতে সেগুলো শকাব্দের মাসের নাম অনুযায়ী রাখা হয়। কারণ শকাব্দের মাসগুলোর নাম তখন এ দেশে প্রচলিত থাকায় অনেকের কাছে তা পরিচিত ও সহজবোধ্য ছিল। শকাব্দের নামগুলো গ্রহপুঞ্জ ও সূর্যের নামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নামে বৈশাখ, ‘জ্যেষ্ঠা’ থেকে জ্যেষ্ঠ, ‘আষাঢ় পদ’ থেকে আষাঢ়, ‘শ্রাবণী’ থেকে শ্রাবণ, ‘ভাদ্রাদি’ বা ‘ভাদ্রপদ’ থেকে ভাদ্র, ‘অশ্বিনী’ থেকে আশ্বিন, ‘কৃত্তিকা’ থেকে কার্তিক, ‘পূষ্যা’ বা ‘পুষ্প’ থেকে পৌষ, ‘মঘা’ থেকে মাঘ, ‘ফল্গুনী’ থেকে ফাল্গুন এবং ‘চিত্রা’ থেকে চৈত্র। প্রাথমিকপর্যায়ে বাংলা সনের প্রথম মাস কোনটি ছিল, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ মতভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, প্রথম দিকে অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম দিন হিসাবে গণনা করা হতো। সেকালে বাংলাদেশের প্রধান দু’টি ফসলের মধ্যে একটি আমন ও অন্যটি আউশ ধান। আমন ধান অগ্রহায়ণ মাসে আর আউশ ধান বৈশাখ মাসে কাটা হয়।
উল্লিখিত মাসগুলোর মধ্যে একমাত্র অগ্রহায়ণ ব্যতীত অন্য সব মাসের নাম কোনো না কোনো নক্ষত্রের নামানুসারে রাখা হয়। ‘অগ্র’ থেকে অগ্রহায়ণ। এ অর্থে অগ্রহায়ণকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করাই স্বাভাবিক ছিল। তবে নতুন সনের যখন প্রচলন হয়, তখন ছিল বৈশাখ মাস। তাই বৈশাখ মাসকেই বছরের প্রথম মাস গণ্য করা হয়। ফসল কাটার মাস হিসেবেও বৈশাখের গুরুত্ব অধিক। অগ্রহায়ণ মাস আমন ধান কাটা ও মাস-মসুর-সরিষা আবাদের মওসুম হলেও বৈশাখে বাঙালির প্রধান ফসল আউশ ধান, তিল, কাউন, প্রধান অর্থকরী ফসল পাট ইত্যাদি তোলার মওসুম। এ সময় বাংলাদেশের প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, পেয়ারা, কলা, লেবু, আমড়া, বাঙ্গি, তরমুজ ইত্যাদি ফল পাকে। এ জন্য বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠকে ‘মধুমাস’ও বলা হয়। নানারূপ ফসল ও ফল পাকার মাস হিসেবে বৈশাখ মাসে নানাবিধ উৎসব-আনন্দের আয়োজন করা হয়। তাই ফল-ফসলের মাস হিসেবে বৈশাখ মাসের একটি আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে।
সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রতিটি দিনের জন্য পৃথক নাম ছিল। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এ প্রথা বিলুপ্ত করে সপ্তাহের সাত দিনের জন্য সাতটি নাম নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত এ সাতটি নামের সাথে রোমান সাপ্তাহিক নামগুলোর সাদৃশ্য রয়েছে। যেমনÑ ১. রবি (সূর্য)-Sun, ২. সোম (চন্দ্র)-Moon, ৩. মঙ্গল- Mars বা Monan অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহ থেকে, ৪. বুধ-Mercury বা বুধ গ্রহ থেকে, ৫. বৃহস্পতি- Jupiter বা বৃহস্পতি গ্রহ থেকে, ৬. শুক্র- Frigg (বাVenus) থেকে এবং ৭. শনিবার- Saturn বা শনি গ্রহ থেকে।
হিজরি সন ব্যতীত অন্য যে সনের সাথে বাংলা সনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তা হলো শকাব্দ। রাজা চন্দ্রগুপ্ত খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৯ অব্দে গুপ্তাব্দ প্রবর্তন করেন। এ সন পরবর্তীতে ‘বিক্রমাব্দ’ নামে অভিহিত হয়। প্রথমে এ ‘অব্দ’ শুরু হতো চৈত্র মাস থেকে। পরবর্তীতে কার্তিক মাসকে বছরের প্রথম মাস গণ্য করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫ সনে ভারতে ‘শক’ রাজবংশের রাজারা রাজত্ব করতেন। শকদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে শকাব্দ চালু হয়। তখন থেকে বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে সৌরভিত্তিক শকাব্দের প্রথম মাসের নাম রাখা হয় বৈশাখ। সেদিক থেকে শকাব্দ ও বাংলা সনের প্রথম মাসের নাম অভিন্ন। বাংলা সনের অন্যান্য মাসের নামও শকাব্দের মাসের নাম থেকে গৃহীত হয়েছে। তবে শকাব্দের বৈশাখ মাস যে দিন থেকে শুরু হয়, তার একদিন আগে শুরু হয় বাংলা সনের প্রথম মাস। হিন্দুদের পূজা-পার্বণ শকাব্দের তারিখ অনুযায়ী প্রতিপালিত হয়। এ কারণে আমাদের বৈশাখ আর শকাব্দের বৈশাখের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে যেদিন বাংলা নববর্ষের শুরু, তার এক দিন পরে পশ্চিমবঙ্গে (শকাব্দের হিসাব অনুযায়ী) বাংলা সন শুরু হয়। হিন্দুরা সাধারণত শকাব্দের হিসাবেই তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকে।
বাংলা সন প্রবর্তনের সময় থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত একই নিয়মে দিন-তারিখ ও মাসের গণনা চালু ছিল। তবে মাসের হিসাবে তারতম্য থাকায় সম্প্রতি এ ক্ষেত্রে কিছুটা সংস্কার সাধন করা হয়েছে। বাংলা সনের কোনো মাস ২৯, কোনো মাস ৩০, ৩১ এমনকি ৩২ দিনে গণনার নিয়ম থাকায় এবং এ সম্পর্কিত আরো কিছু সমস্যা থাকায় এসব সমস্যা ও জটিলতা দূর করে বাংলা সনের বিভিন্ন দিন-তারিখ একটি বৈজ্ঞানিক ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে বাংলা একাডেমি প্রাচ্যের প্রখ্যাত মনীষী বহু ভাষাবিদ, জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ১৯৬৩ সালের মে মাসে ‘বাংলা সালের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণ উপ-সংঘ’ নামে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এ উপ-সঙ্ঘ বা কমিটি ছিল নিম্নরূপ : ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (সভাপতি), অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান (তদানীন্তন পরিচালক, বাংলা একাডেমি), অধ্যক্ষ আবুল কাসেম (সদস্য), শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র শিরোমণি, জ্যোতিভূষণ (সদস্য), শ্রীযুক্ত অবিনাশ চন্দ্র কাব্য-জ্যোতিষতীর্থ (সদস্য), পণ্ডিত তারাপদ ভট্টাচার্য কাব্য ব্যকারণ পুরাণ স্মৃতিতীর্থ জ্যোতিশাস্ত্রী (আহ্বায়ক)। উক্ত উপ-সংঘ দীর্ঘ তিন বছর নানারূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গবেষণা-পর্যালোচনার পর সহজ পদ্ধতিতে বাংলা সনের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণের জন্য কিছু সুপারিশমালা পেশ করেন।
বাংলা সনের উদ্ভাবক আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজী বাংলা সন প্রবর্তনের পর এ সনের সংস্কার সাধনে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির নামও সম্পৃক্ত ও স্মরণীয় হয়ে আছে। হ