মিতালি বাবা-মায়ের সাথে ঈদের শপিং করতে এসেছে। শপিংমলে ঘুরে নতুন জামা দেখছে সে। বাহারি রঙের পোশাকে প্রতিটি দোকান টইটম্বুর। কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা কিনবে বুঝে উঠতে পারে না সে। এ দোকান ও দোকানে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে ইফতারির সময় হয়ে এলো। সে সময় তার একটা জামা পছন্দ হলো। লাল রঙের সুন্দর জামা। জামাটা বুকে জড়িয়ে ধরে সে বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটতে লাগল। শপিংমল থেকে বেরোনোর সময় দেখল, একটা মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে গার্ড।
মিতালি বললÑ বাবা, মেয়েটিকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে কেন বের করে দিলো গার্ড আঙ্কেল?
বাবা বললেন, ওরা টোকাই। হয়তো শপিংমলের কোনো কাপড় চুরি করতে গিয়েছিল, তাই গার্ড ঘাড়ধাক্কা দিয়ে মার্কেট থেকে বের করে দিচ্ছে।
ওরা টোকাই! টোকাইদের নিয়ে বইয়ে অনেক গল্প পড়েছে সে। ছোট চাচ্চু তো লেখক। সে তাকে অনেক গল্পের বই উপহার দিয়েছে। সেই বইয়ে টোকাইদের নিয়ে গল্প আছে। টোকাইদের জীবন খুব কষ্টের। তাদের মনে অনেক দুঃখ। তারা স্কুলে যেতে পারে না। ঠিকমতো খাবার পায় না। ভালো জামাকাপড় পরতে পারে না। গল্পগুলো পড়ে টোকাইদের প্রতি তার মনে মায়া জন্মে। সে মনে মনে টোকাইদের খোঁজে। তাদের গল্প শুনতে চায়, তাদের সাহায্য করতে চায়। ইতোমধ্যে স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সে একটা তহবিলও সংগ্রহ করেছে। যে তহবিলের টাকা সে শুধু ব্যয় করবে টোকাইদের জন্য। আজ যখন হাতের কাছে টোকাই পেয়ে গেল, সে তাকে সাহায্য করবেই। বললÑ বাবা, চলো ওই মেয়েটির কাছে যাই।
বাবা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেনÑ না, ওই মেয়েটির কাছে যাওয়া যাবে না।
কেন বাবা?
ও টোকাই। দেখো না গায়ে কেমন নোংরা জামা। ওর কাছে যেতে নেই।
গায়ে নোংরা জামা বলেই কি ওর কাছে যাওয়া যাবে না? প্রশ্ন করে ঠোঁট উল্টে বিদ্রƒপ হাসি হাসল মিতালি। ঠিক আছে, তোমাদের যেতে হবে না, আমি একাই যাচ্ছি। বলে মিতালি বাবার উত্তরের অপেক্ষা না করে হন হন করে হাঁটা শুরু করল।
মেয়েটির কাছে গিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, তোমার নাম কী?
গার্ডের ধাক্কা খেয়ে মেয়েটি তখনো হেঁচকি তুলে কাঁদছে। মিতালির প্রশ্ন শুনে কাঁদতে কাঁদতে একবার আড়চোখে তার দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো কথা বলল না।
মিতালি আবার বলল, আমি তোমাকে তোমার নাম জিজ্ঞেস করছি। তোমার নাম কী?
মেয়েটি এবার হেঁচকি কেটে কাঁদতে কাঁদতে বলল, খুশি।
খুশি! বাহ, খুব সুন্দর নাম তো। বলে হাসল মিতালি। তারপর বলল, তুমি কাঁদছ কেন?
দারোয়ান আমাকে গলা ধাক্কা দিয়েছে।
কেন?
এমনি।
এমনি এমনি গলা ধাক্কা দিলো?
আমি একটা দোকানে একটা জামা চাইছিলাম। অমনি দোকানি দারোয়ান ডেকে আমাকে মার্কেট থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো।
মিতালি ভাবল, আজব মানুষ। এইটুকু মেয়ে একটা জামা চেয়েছে বলে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো! আর চারপাশের লোক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল, কেউ কিছু বলল না! টোকাই বলে কি কেউ এদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্যই করে না? টোকাইরা কি মানুষ নয়? এই সমাজে তাদের কি কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকতে নেই?
মিতালি বলল, তুমি কি তোমার জন্য জামা চাইতে গিয়েছিলে?
নাহ।
তাহলে?
বাড়িতে ছোডো একটা বইন আছে, হের লাগি। হের খুব অসুখ। অসুখের ঘোরে শুধু কাঁদে আর বলেÑ আপুলে, মোক একটা জামা দে। নতুন জামা। লাল জামা। ঈদের জামা। ঈদে পরমুনি। হেই বোনডার কান্না সইতে না পেরে গেছিলাম ওই দোকানে একটা জামা চাইতে। জামা চাইতেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো।
কেন? তোমার বাবা-মা নেই।
নাহ।
কোথায় গেছে তোমার বাবা-মা?
মা মরে গেছে। মা মরে যাওয়ার পর বাবা অন্য একটা মাইয়্যারে বিয়া কইর্যা চইল্যা গেছে। আমরা দুই বোন ছিলাম নানীর কাছে। ছয় মাস হলো নানীও মরে গেছে। আমি এখন সারা দিন বোতল কুড়াই। রাতে বোতল বিক্রি করে যা হয়, তা দিয়ে দুই বোন খাই। যেদিন বোতল না পাই, উপোস থাকি।
খুশির কথা শুনে মিতালির চোখে জল চলে এলো। বলল, কেঁদো না খুশি। আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু। আমি তোমার বোনকে নতুন জামা কিনে দেবো, তোমাকেও নতুন জামা কিনে দেবো। ঈদের সেমাই-চিনি কিনে দেবো। তোমরাও আমাদের সাথে ঈদ আনন্দ করবে। তোমরা আমাদের চেয়ে আলাদা নও। আমরা সবাই এক সমাজের মানুষ। মিলেমিশে সবাই একসাথে ঈদ আনন্দ করব।
এতক্ষণ পেছনে দাঁড়িয়ে মেয়ে আর খুশির কথা শুনছিলেন বাবা-মা। ওদের কথা শুনে বাবা-মায়ের ভুল ভেঙে গেল। বাবা বললেন, আমাকে ক্ষমা করে দে মা, আমি না বুঝেই তোমাকে ওর সাথে মিশতে নিষেধ করেছিলাম। আজ তোমাদের কথা শুনে আমার মনের দরজা খুলে গেছে। সত্যিই আজ যদি আমরা পথশিশুদের পাশে না দাঁড়াই, তবে ওদের পাশে দাঁড়াবে কে?
চলো মা খুশি, আজ আমি তোমাকে আর তোমার বোনকে নতুন জামা কিনে দেবো।
নতুন জামা পেয়ে খুশির চোখ হাসি আর আনন্দে চকচক করে উঠল। পেছন থেকে কেউ যেন আর তার নতুন জামা কেড়ে নিতে না পারে, তাই জামা দু’টি বুকে জড়িয়ে ধরে সে প্রাণপণে ছুটতে লাগল।
মিতালি বললÑ দেখলে তো বাবা, কত অল্পতে ওরা কত বেশি খুশি। অথচ আমরা তাদের মুখে এই হাসিটুকুই ফোটাতে পারি না।
মা বললেন, যা আমরা জানি না, তা তুমি এইটুকু বয়সে বোঝো কী করে?
মিতালি মায়ের দিকে তাকাল। তাকিয়েই হাসল। মিষ্টি হাসি। বললÑ মা, যে গল্পের বই পড়লে তোমরা আমাকে বকা দাও। বলো, গল্পের বই পড়লে আমি মানুষ হবো না। সেই গল্পের বই পড়েই শিখেছি মা।
