হায়াৎ সাইফ
আরেক বৃত্ত

জীবনের চক্রবাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই ক্রমাগত আরেক
বৃত্তের দিকে,
অবিরত অতর্কিতে রাখি প্রেম উৎপীড়িত মণিবন্ধে,
বাক্সে ও সিন্দুকে কিছু সুপ্রিয় প্রাচীন গন্ধ,
পকেটে ঠিকানাহীন বাসের টিকিট;
গন্তব্য কোথায় উড়ে ঊর্ধ্বশ্বাস জীবন যাত্রার?

ঐ তো সম্মুখে দেখি বাসের স্টপেজ,
ভিড় আর হকারের, টাউটের বাজার বসেছে,
উজ্জ্বল বেসাতিও আছে জনতার সমূহ কল্যাণ,
ঐ কি গন্তব্য তবে আলোকিত জেনারেল স্টোর?

এদিকে ফুটপাথে প’ড়ে যে পঙ্গু পাড়ে আল্লাহ দোহাই
তিনি কি নিদ্রামগ্ন নৈঃশব্দ্যে স্বর্গের মিনারে ?
অতএব চলো যাই, ধেই ধেই নৃত্য করি চলো, খোঁয়াড়ি ভাঙাই,

টাউস ঘুড়ির মতো গোত্তা খেয়ে পড়ি,
নির্বিবাদে জীবনের চক্রবাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই,
প্রয়োজনে কখনো বা বাজাই শানাই।

 

কাবেদুল ইসলাম
আমার আনন্দ

একটাই তো আনন্দ আমারÑ সকাল নেই, সন্ধ্যা
নেইÑ ডুবে থাকা বইয়ের ভেতর; পড়–য়া কি না
জানি না, জানার তত ইচ্ছেও নেই। হ্যাঁ, আদৌ বন্ধ্যা
যে কাটেনি এ-জীবনÑ সেটুকুই গভীর সান্ত¡না।
‘বইয়ের পোকা’ বলে কথা আছে পাঠকমহলে।
কতটা সময় দিলে বইয়ের পিছে, গ্রন্থাগারে,
নিবিষ্ট পাঠক হয় কেউÑ কে দেবে সে কথা বলে?
অথবা আসন পাবে বইপ্রেমী বোদ্ধার কাতারে!

শুধু জানি, ব্যস্ততা যতই থাকুকÑ কর্মের ফাঁকে,
অবসরে বইয়ের পাতা উল্টে ফেলেছি দুচোখ;
মুহূর্তে বিপুল শান্তি এসে জুটেছে অস্থির মনে।
পরিযায়ী পাখির মতোন দুঃখগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে
উড়েছে আকাশে ডানা মেলে, আর ভূলোক-দ্যুলোক
পেরিয়ে অলক্ষে পাড়ি দিয়েছে সুদূর নির্বাসনে।

 

ফেরদৌস সালাম
ঈদের শিক্ষা

ঈদ আসছে খুশি নিয়ে ভেসে মেঘের নায়
সেই খুশিতে জোয়ার আসে পদ্মা যমুনায়
চশমা চোখে ছলিম বুড়ো মুছে পুরান কাচ
লাঠি হাতে ঠকঠকিয়ে করছে খুশির আঁচ।
ঈদের আগে নতুন কাপড় দিবে অনেক জনে
এই দিনটি সুখ নামতা আনে গরিব মনে।
ভয়ও থাকে হঠাৎ কোথাও পায়ের চাপায় পড়ে
জাকাত কাপড় আনতে গিয়ে অনেক গরিব মরে।
ঈদের শিক্ষা নেই ভেদাভেদ ধনী গরিব এক
এক কাতারে দাঁড়ায় এসে সৈয়দ শরিফ শেখ।
সারা বছর এই শিক্ষা থাকত যদি বেঁচে
মানবতার লাটিম তখন ঘুরত নেচে নেচে।
সিয়াম মানেই আত্মশুদ্ধি লোভ লালসা দূর
দুর্নীতি আর ঘুষের বিদায় শুদ্ধ অন্তপুর।
থাকবে না আর গুম আতঙ্ক থাকব নিরাপদ
এ দেশ থেকে উধাও হবে জঙ্গি মাদক মদ।
এমন ধারার আনন্দ সুখ আসুক ফিরে দেশে
উন্নয়নে গা মেশাবে সবাই হেসে হেসে।
সিয়াম শেষে ঈদের ছোঁয়ায় ওই দেখা যায় সুখ
শুভ আলোর ঝলকানিতে কাটবে সকল দুখ।

 


শাহাজাদা বসুনীয়া
শুধুই আমি তারে

কাঙালি হয়ে দেশান্তরে শরশয্যায় শুয়ে থাকো কেন
হতভাগা দ্রুত ফিরে এসো দেশে, এ দেশ আমাদের মাতৃভূমি
যেখানে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য অনিবার্য সত্য
শুভ্র সুধাময়ী, পুষ্পিত সুন্দরী ষড়ঋতুর সকালে,
মালতী, বকুল, যুঁথি আর রজনীগন্ধা ফুটে থাকে থরে থরে।
এখানে মেঘের ভেলায় মেঘপুঞ্জ ওড়ে,
মেঘ ছোটাছুটি করে অবিরত, চেয়ে দেখ মায়াবী নীলাকাশ,
মল্লিকা আর অশ্বথ বৃক্ষের নিচে বসে দেখি ছায়ালোক,
শুক্লাদ্বাদশীর রাত্রি, পূর্ণিমা তিথিতে সবাই প্রসন্নতাব্যঞ্জক।
বসন্তের রহস্যে আমাদের মাতামাতি পুষ্পসৌরভে,
মানুষ বদ্ধঘরে, হৃদয় পড়ে থাকে প্রাণহীন কর্মের ভেতর
সকাল-বিকাল-রাতের পার্থক্য নিরূপণ করা দুষ্কর,
হতভাগা ফিরে আয় দেশে, এ দেশ আমাদের মাতৃভূমি,
ফিরে আয় সবুজ কিশলয়ে, লাল সবুজের পতাকায়।
নদী চলে বাঁকে বাঁকে, মাছ চলে ঝাঁকে ঝাঁকে নৌকা সারি সারি
ছেলে-ছোকড়ার হৈ-হুল্লোড় হাঁটুভরা জলে
নেংটা ছেলে-ছোকড়ার কাদা মাখামাখি সেকি অপরূপ স্মৃতি
মায়ের ভাষায় কথা বলি, প্রাণখুলে হাসি।
ফিরে আয় খোকা, তুই ফিরে এলে ধন্য হবে মাতৃভূমি।

 

আনন্দমোহন রক্ষিত
অপেক্ষা

এত যে গভীর অনার্য পল্লী মাটির দেয়াল
নাগরিক স্পর্শ তাকে ছোঁবে না কখনো
অতীতের পলিভিটা স্যাঁতসেঁতে হতশ্রী
কুষ্ঠ উঠোন একদা সেখানে শুরু মায়াবী জীবন।

আধেক জীবন গেল পলিময় মাটির সোহাগে
আধেক জীবন শুরু নিয়ন আলোর উদ্ভাসে
বাকিটা কোথায় যাবে, কতদূর প্রতিচ্যের মোহে
এখনো হয়নি হিসেব ব্যস্ত শুধু জন্ম কোলাহলে।

স্মৃতির অঞ্জলি হাতে বেমানান অনার্য পথিক
জুঁই ও শেফালির খোঁজে উদাসীন পথের দিশায়
এখনও অপেক্ষা করে অনন্ত অপেক্ষার পালা
কোনো কালে হয়নি শেষ, হবেও না কোনো দিন শেষ।

 

সবুজ আহমেদ
ঈদ এসেছে

ঈদ এসেছে ধনী গরিবের দুয়ারে
সাথে নিয়ে এসেছে সাম্যের রঙ
এ এক অটুট বন্ধন, দেখ চেয়ে ধরা
যত ক্রোধ মিটিয়ে দিয়েছে মনের খরা
মানুষে মানুষে একি হাসির ঝাঁপি
সিয়াম সাধনায় গল্প হলো ভারী।

প্রতি বছর সংযমে প্রভুর দরবারে দু'হাত পাতি
নতুন জামা জড়িয়ে নোনা অশ্রুজলে দুঃখ দিয়ো ছুটি

মুসলিম মিল্লাতে ভেদাভেদ নেই ভালোবাসা ভরা
অন্ধকার সমাজে বাহুবন্ধনী ঈদ আলোর আভা।

 


শহীদ সিরাজী
ক্ষরণের নির্মোহ সুর

যে যেমন বলে শুধু শুনে যাই
নৈঃশব্দ্যের জাল বুনে যাই
সময়ের মোম শুধু গলে যায়
জীবনটা চুপিসারে ক্ষয়ে যায়।

কাকডাকা ভোর ঘুম ভেঙে যায়
দিনগুলো অবিরত বয়ে যায়
দুপুরের রোদে তেজ কমে যায়
জীবন প্রহরে রাত ছেয়ে যায়।

চোখগুলো অবিরাম দেখে যায়
অজানা কী রোগ? মুখে কথা নাই
চেতনার চেনা পথ ভুলে যাই
আবহ নেশাতে বুঁদ প্রাণ নাই।

এভাবেই দিনক্ষণ বয়ে যায়
জীবনের ঋণ শুধু বেড়ে যায়
বেহিসেবি দাঁও তবু মেরে যায়
নিরোদের বাঁশি তবু বেজে যায়।

 

স. ম. শামসুল আলম
বৈপরীত্য বাঁক

অন্য বাঁকে আমাকে রেখেছ
মূল বাঁকে ধূসরতা আঁধার অথবা নিষিদ্ধ পাহাড়
পাহারায় লগ্নিকৃত সমুদ্দুর খা-খা রোদ্দুরে মরীচিকা

আমার অসাবধানতাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করো
যুক্তিবাদ যৌনযজ্ঞে মজে থাকো বলে
আর কত ক্লান্তি দেখে যাব যে পৌরুষ
হে অগ্নিগর্ভ জমজ সমহোদর।

বেঁচে থাকা যদি বাঁকে বাঁকে পড়ে থাকে
অসুস্থতা কোথায় রাখবে বলো হে মহাজীবন
ভয়ানক পথ পাড়ি দিতে আকাশের সন্ধান কেন?
আমাকে আমার অস্তিত্ব ফিরিয়ে দাও

চেয়ে দেখ পৃথিবীও কেমন উন্মাদ
আমাকে বিদ্রƒপ করে নিঃশব্দে হাসে!

 

দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
এই ভেবে মরি

জীবনের দক্ষতায় যা হয়নি
দেখলাম শার্টের দক্ষতায়
তাই হচ্ছে।
আমি যা পারিনি অর্থাৎ এই জীবন
তাই পারছে শার্টের
ঝলমলে রঙ।
শার্টের বোতাম খুলে দিলে
হৃদয় খোলা হয়ে যায়
সবার এমন বিচার।
শার্ট আর ছায়া যেদিন
আমার কাছে এত বড়
সেইদিন থেকে জীবন
আমার কাছে তুচ্ছ।
জীবনের সেলাই করি না
রোগে শোকে মরিÑ
যথাসময়ে যথাযথভাবে
শার্টের সেলাই করি।
আমার এ জীবনটা যদি
না থাকে
শার্টটা কোথায় থাকবে
এই ভেবে মরি
হেসে হেসে মরি।

 


বাছিত ইবনে হাবীব
আশাবাদী ডানায় চড়ে

বর্তমান যেন একটা হৃষ্টপুষ্ট অন্ধকার কালো বৃত্ত!
অভ্যন্তরে বসবাসরত কেউ ভাবছেনÑ
সুখের সোনালি দিন ছিল অতীতের সুন্দর
নীতিমাখা প্রীতিময় ঝকঝকে আলোকিত দিন।

কেউ বলছেনÑ সুখের সোনালি পায়রা উড়বে
সুন্দরতর অনাগত দিনের সুমসৃণ নীলিমায়।

অতঃপর আমিÑ
বর্ষণসিক্ত সংরক্ত কৃষ্ণচূড়া দেখে দেখে
ছুটে চলেছি বহু পথ। বুকে তার অতুল রাতুল
ঝঙ্কার।

আর আমিÑ
নিসর্গ সঙ্গীত শুনতে শুনতে আশাবাদী
ডানায় চড়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের সন্ধানে
বিশ্বাসী অনন্তের অজানা দিগন্তে বেরিয়ে পড়লাম।

 


জাকির আবু জাফর
প্রেরণার ফুল

আত্মার আনন্দ রাখো যদি
যদি রাখো হৃদয়ের সুখ
বুকের গভীর দেশে
সহসাই মিটে যাবে
যাবতীয় মনের অসুখ

ব্যবহার যদি হয় মধুময়
যদি থাকে ঠোঁটে ভরা হাসি
মৃতফুল ফুটে উঠে সহসাই বলে
সব থেকে তোমাকেই বেশি ভালোবাসি

তোমার তারুণ্য যদি বিদ্রোহ করে
বিরহের বুকে জ্বালে প্রেমের জ্যোতি
পৃথিবীও চুমু খাবে তোমার দু’পায়ে
আধুনিক হবে তুমি
চিরকাল হবে সম্প্রতি

মেদামারা মুখ যার বুকে নেই প্রেরণার জল
তার বুকে ঢেলে দাও দ্রোহময় প্রেমের অনল।