আমরা আল্লাহ তায়ালার বান্দা। এই দাবি বর্তমানে মুখে স্বীকৃতির সাথে ঠিক আছে। কিন্তু অন্তরের গহিনের স্বীকৃতির সাথে যেন অনেকটাই ফারাক। একজন অমুসলিম ইসলামকে জানার জন্য বা ইসলামকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্য, ইসলামকে নিয়ে বিতর্ক-বাহাস করার জন্য অথবা ইসলামের বিপক্ষে লেখার জন্য ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করে থাকে। ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে সে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, রাসূল সা:-এর রিসালাত নিয়েও অনেক সময় পড়াশোনা করে। এই পড়াশোনা বা জানার কারণে সে মুসলমান হয়ে যায় না। সে যদি আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে বিশ^াসী না হয় এবং রাসূল সা:-কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে মেনে না নেয়, তবে সে ঈমানদার হতে পারে না। এই বিশ্বাস তার মুখে, কর্মে চিন্তা-চেতনায় সবখানেই প্রতিফলিত হবে। এজন্যই তো দেখি যে, ব্যক্তি বুঝেশুনে ইসলাম ধর্মে ফিরে আসে, তার পুরো জীবনটাই পাল্টে যায়। তখন আগের মানুষ আর ইসলাম গ্রহণের পরের মানুষটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত হয়ে যায়। এমনটিই ঘটেছিল সাহাবা রা:-দের জীবনে, এর পরবর্তীতে এবং বর্তমানকালেও এরূপই ঘটছে।
ঈমানের ব্যাখ্যায় আরো গভীরে গিয়ে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি রা: ইকফারুল মুলহিদিনে হাফেজ ইবনুল হাজার আসকালানি রাহ:-এর সহিহ বোখারি শরিফের বিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারির বরাত দিয়ে লিখেছেন, কোনো কাফেরের শুধু রাসূল সা:-এর নবুওয়াতকে স্বীকার করে নেয়াই তার ঈমানদার হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের সব বিধানের ওপর আমল করার বিষয়টি তার নিজের জীবনে অত্যাবশ্যক করে না নেবে, ততক্ষণ সে কাফেরই থেকে যাবে।
একজন মানুষ তার দেহ এবং রূহ এই দু’টির সমন্বিত রূপ। রূহ ছাড়া দেহকে যেমন মানুষের পরিচয় বলে না। শুধু তার লাশ বলা হয়। তেমনি আমল ছাড়া ঈমানও একটি লাশের মতো। পার্থক্য এটুকু যে, মানুষ মারা যাওয়ার পর লাশের ভেতরে আর রূহ ফেরত আসে না; তাকে তাড়াতাড়ি দাফন করতে হয়। কিন্তু আমলবিহীন লোক যেকোনো সময় আমল শুরু করতে পারে। লাশ দিয়ে যেমন কোনো কাজ করানো যায় না। লাশের যেমন কোনো মূল্য নেই। বরং লাশকে কবরস্থ করার জন্য অনেকের ব্যস্ত হতে হয়। তেমনি আমলহীন ঈমানের দাবিদাররাও তেমনি। একটি মানসিক বিকারগ্রস্ত সন্তান যেমনÑ পিতা-মায়ের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ, কষ্টের কারণ, পরিবারের বোঝা। আমলবিহীন মুসলমানও ঠিক তেমনি।
ইসলামের সোনালি যুগে মুসলমাদের আমল-আখলাক দ্বারাই সারা বিশ^ জয় করেছিল। আমরা যদি দেখি আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির দিকে। এক সময় আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হয় হিন্দু অথবা বৌদ্ধ থাকারই সম্ভাবনা বেশি। তারা কিসের কারণে অন্য ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন? শক্তি দিয়ে দেশ জয় করা যায়। মানুষের অন্তরের বিশ^াস, ধর্ম পরিবর্তন করানো যায় না। সুদূর আরব থেকে কয়েকজন মানুষ পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে বা নৌকায় চড়ে এসে একটি দেশ, একটি ভূখণ্ড শক্তিতে জয় করে ফেলবে এটা বাস্তবতা নয়। কখনো হয়তো তাদের একটি গোষ্ঠী বা দলের সাথে অথবা রাজন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু তাদের আমল-আখলাক, চরিত্র-মাধুর্য, চিন্তা-চেতনা, আল্লাহ তায়ালার ওপর একান্ত নির্ভরতা, ইসলামের বিধানগুলোর সৌন্দর্য আপামর জনসাধারণকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করেছে। দলে দলে লোক ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা আল্লাহকে পেয়েছেন। আমরাও খুব সহজে ইসলামের আহ্বান শুনতে পেয়েছি।
আমরা যারা জন্মসূত্রে মুসলমান হয়েছি। অর্থাৎ মুসলমান বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেয়ার কারণে অতি সহজে ইসলাম পেয়েছি। এটাও আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার এক বিরাট নেয়ামত। এর জন্য সর্বাগ্রে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আর এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদাই করার যে তৌফিক পেয়েছি, তার জন্যও আবার শুকরিয়া আদায় করা দরকার। একে তো পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ হেদায়েতের পথ গ্রহণ করেনি, আমরা সবার কাছে হেদায়েতের আহ্বান পৌঁছাতে পারিনি, আমরা যারা ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করি তারা বেশির ভাগই ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি না বা চলার চেষ্টা করি না বা অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসনের বিপক্ষে রুখে দাঁড়াই।
সমগ্র বিশ্বে আমাদের অবস্থা আরো করুণ। কোথাও অন্য ধর্মের অনুসারী দ্বারা আমরা নির্যাতনের শিকার, কোথাও নিজেদের মধ্যে জুলুমের শিকার সবখানে অশান্তি আর অশান্তি। এই অশান্তি যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। বর্তমান পৃথিবীতে আমরা জ্ঞানে পিছিয়ে, শক্তিতে পিছিয়ে, বুদ্ধিতে পিছিয়ে। জনসংখ্যায় আমরা পিছিয়ে নেই। আমরা বিশ^ নেতৃত্বে নেই। এর কারণ কী? আগেকার মুসলমানদের চরিত্র-মাধুর্য দেখে একজন অন্য ধর্মের লোক মুসলমান হয়ে যেত। আজ আমার চরিত্র কী এমন যে আমাকে দেখে একজন মানুষ মুসলমান হবে বরং আমি বলি আমার চরিত্র এমন যে, আমাকে দেখে একজন মুসলমান নামাজিও হয় না।
কুফরের ভিত্তিতে পরিচালিত কোনো জাতি যদি শুরু থেকেই কুফরের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তারা দীর্ঘ দিন প্রতিষ্ঠিত থাকলেও থাকতে পারে। কোনো জাতি যদি শুরুতে ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে পরে ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। কুফর দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে, তাহলে এটি বেশি দিন টিকবে না। আস্তে আস্তে তা ধসে যাবে। কোনো কিছুর ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, ভিত্তি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ওই বস্তুও ধ্বংস হয়ে যায়। ভূমিকম্প কোনো দালানের চূড়াকে আক্রমণ করে না। সে জমিনকে নাড়া দেয়। জমিনকে নাড়া দেয়ার সাথে সাথে জমিনের ওপর দাঁড়ানো দালানের ভিত্তি টলতে থাকে। ভিত্তি যখন দুর্বল হয়ে যায়, দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন পুরো দালান ধসে যায়।
আমাদের ভিত্তি ঈমান। ঈমান হলো বিশ^াস আর কর্মের সমষ্টি। কর্ম না থাকার কারণে বা কর্মে আত্মনিবেদন না থাকার কারণে আমাদের কর্ম হয় দায়সারা গোছের। ফলে আমাদের ইমানের মজবুতি আসে না। আমাদের আমল পরিপক্ব হয় না। ঈমান শক্তিশালী হয় না। আমাদের আখলাকে পরিবর্তন আসে না। আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয় না। আল্লাহর গাইডে আমি পরিচালিত হই না। ফলে জীবনের সৌন্দর্য বিকশিত হয় না। মনে হয় যে আমি পিছিয়ে পড়া জাতি। আমি হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকি, এই বলি আমি শেষ হয়ে গেলাম।
আমরা যদি সারা পৃথিবীর দিকে তাকাই, তাহলে এ বিষয়টি আমাদের সামনে আসে যে, সমাজের মুসলমানেরা ইসলামকে যত বেশি মেনে চলে, সে সমাজে তত শান্তি বিরাজ করে। ইসলাম ছাড়া আমাদের অন্য কোথাও শান্তি নেই, মুক্তি নেই। আমরা উন্নতি আর অগ্রগতির জন্য যতই ইসলাম থেকে দূরে সরেছি, ততই আমাদের ওপর বিপদ, মসিবত, অশান্তি এসে হানা দিয়েছে।
আমাদের শান্তির বুনিয়াদ ঈমানের ওপর নির্ভরশীল। আমরা যত বড় ঈমানদার হবো, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক যত মজবুত হবে, আল্লাহর প্রেমে আমরা যত আত্মহারা হবো, ইসলামকে যত বেশি অনুস্মরণ করব; তত বেশি শান্তি আর নিরাপত্তা পাবো। আর পরকালে পাবো অনাবিল শান্তির জান্নাত। পাবো মাওলার দিদার। আমরা পরিচালিত হবো মহান প্রভুর নির্দেশনায়। রাসূল সা: বলেন, ‘তোমরা মুমিনদের দূরদৃষ্টির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখো, কারণ তারা আল্লাহর নূর দেখে চলে।’ হ
