পাকিস্তান আমলের রোজা-ঈদ দেখেছি। তখন মানুষের হাতে এত পয়সা ছিল না, তাই খরচের একটা সীমাবদ্ধতা থাকত। এখন মানুষের আয় বেড়েছে তাই খরচের রকমফের হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার তিন-চার বছর আগের রোজা-ঈদের কথা মনে আছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষই ছিল কৃষিজীবী এবং নি¤œ আয়ের। বাড়ির বাড়তি ফসল বিক্রির টাকাই ছিল তাদের আমোদ-প্রমোদের অর্থের প্রধান উৎস। সময়ের ব্যবধানে মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, চাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হয়েছে, ফলে আয় বেড়েছে। নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে। তখন সংসারের স্বাভাবিক হাটবাজার, কাপড়-চোপড়, চিকিৎসা, মেহমানদারি, লেখাপড়া সব কিছু চলত ধান-চাল অথবা ফসল বিক্রির টাকায়। আয়ের প্রধান উৎস ধানের ফলনও বেশি ছিল না। সুতরাং নেহায়েত জরুরি না হলে চাল বিক্রি অনুমোদন জোটত না সংসারে। সংসারে দাদাই ছিলেন প্রধান নির্বাহী, আব্বা ছিলেন রাষ্ট্রপতি শাসিত পরিবারের প্রধান উজির। আমরা সব প্রয়োজনে দাদার কাছেই ছুটে যেতাম, এমনকি আব্বাও। অন্য দিকে দাদীর কাছে অর্থের ভাণ্ড থাকলেও খরচ করা তো দূরের কথা, গোপনে তা গোনারও সাহস বা মানসিকতা ছিল না দাদীর। তবে এ নিয়ে দাদীর কোনো আক্ষেপ দেখিনি। স্বামী ভক্তি বলতে যা, তা সেখানে পুরোপুরি বর্তমান ছিল। তারা কেবল জানত স্রষ্টার পরে কাউকে সিজদাহ করার নির্দেশ থাকলে তা হতো স্বামীকে। এখনো মা, খালা, মামী ও চাচীদের মধ্যে এই মানসিকতা অনেকটাই বিদ্যমান আছে। এটা নারীকে চেপে রাখা নয়, বরং পুরুষ বা স্বামীদের সম্মানের সেকালের ঐতিহ্য।
রোজা বলতে আমরা ছোটরা বুঝতাম সন্ধ্যায় রকমারি ইফতারি, পেঁয়াজু, ছোলা, কলা, মুড়ি, ডালের বড়া ও গুড়ের পায়েস খাওয়া। সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানাপিনা ও কিছু বৈধ কাজের নিষেধাজ্ঞা এত সব মাথায় ঢুকত না। সে আমলে মাঝে মধ্যে মসজিদে ইফতার করলে ইফতারি পরিবেশন করা হতো কলার পাতায়। আর ঈদ-কোরবানি বলতে বুঝতাম নতুন জামাকাপড়, সেমাই, পায়েস, পোলাও ও গোশত খাওয়া আর ফুর্তি করা। রোজার সময় সে আমলের কথায় আসা যাক। আমরা ছোটরা রোজা রেখেও নামাজে এত তৎপর ছিলাম না। রমজান মাসের শুরু থেকে কাজ ছিল শুধু রমজানের গণনা। আজ একটা হলো, কাল দু’টা হলো আর মাত্র ২৯টি বা ২৮টি বাকি আছে। প্রতিদিন শুধু গণনা আর গণনা, এই গণনা দিনে না হলেও ১০ বারের বেশি হতো। আর যেদিন বেশি কষ্ট হতো, সেদিন আর ছয় ঘণ্টা আছে, পাঁচ ঘণ্টা আছে এরপর চার ঘণ্টা আছে এভাবে গণনা চলত ইফতার পর্যন্ত। শেষের দিকে ঘণ্টায় কুলাত না, চলে আসতাম মিনিটে। মূল টার্গেট ছিল কবে ঈদ হবে আর আমরা মজা করব। পাকিস্তান আমলে রোজায় এলাকায় মসজিদে মাইক ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। সুতরাং ইফতার হতো মেঘলা দিনে মুরগি ঘরে ঢুকেছে কি না? মুরগি ঘরে ঢুকলে ইফতারের সময় হয়েছে বলে ইফতার করা শুরু হতো। সাহরিতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে আকাশে সাতটি তারার একটি ছোট জোট ছিল, যাকে সাত-ভাইয়েরা বলা হতো এবং পাশে সারিবদ্ধ কয়েকটি তারার লাইনকে বলা হতো আদম সুরত। এগুলোর হেতু কি তা এখনো অনুদঘাটিত। এগুলোর অবস্থান দেখে নিশানা ঠিক করে সাহরি খাওয়া হতো। আর আকাশ মেঘলা থাকলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আনুমানিক রাত একটা বা দু’টায় সাহরি খাওয়া হতো। সাহরির পরে ঘুম দেয়া ছিল রুটিন ওয়ার্ক। তারপর ফজরের নামাজ। মহান আল্লাহ এখন আমাদের কত নিয়ামত দিয়েছেনÑ মসজিদে মাইক, ঘড়ি, ঘরে এলার্ম, মোবাইলে এলার্ম, সময় দেখার ব্যবস্থা, বাইরে সাইরেন, রেডিও এবং টেলিভিশনসহ কত নিয়ামত দিয়ে আমাদের ধন্য করেছেন। সুতরাং আমরা তার সব নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি। ইফতারির আগে রেডিওতে খতমে কুরআন প্রচার পরে আজান প্রচার ইত্যাদি। সাহারির সময় শেষ রাতে রেডিও-টিভিতে সাহরি অনুষ্ঠান।
রমজান এলে ইফতারিতে মেনু ছিল আলো চাউলের জাউ যা শুধু পানি দিয়ে রান্না হতো, তার সাথে গুড় পরিবেশন করা হতো। মঝে মধ্যে ছোলা ভাজি হতো সাথে মুড়ি। কখনো কখনো কলা, ডালের বড়া অথবা আলো চাউলের পায়েস যাতে নারকেল, তিলের গুঁড়া ও গুড় সংমিশ্রণ থাকত। ’৮০ সাল পর্যন্ত পল্লী অঞ্চলে বেগুনি, আলুর চপ, খেজুর, শসা-খিরাইয়ের তেমন আয়োজন ছিল না। সালাদ, আঙ্গুর, মাল্টা, কমলা, আপেল, জিলাপি, হালিম, রকমারি খাবার ও শরবতের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তারাবিতে গ্রামে খতমে কুরআনের কোনো আয়োজন ছিল না। সূরা তারাবি এবং তারাবি শেষে মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ পাঠ করে শুনানো হতো সওয়াবের আশায়। ইসলামী বই বলতে তখন বার চান্দের ফজিলত, বেহেশতি জেওর অথবা মোকছেদুল মোমিনই ছিল তখনকার উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় গ্রন্থ। বেশি হলে বিবি রহিমা অথবা বিবি খাদিজার জীবনী। নতুন কাপড় চোপড়ের ব্যবহার ঈদে কম হতো। দু-চার বছর পর নতুন জামা ভাগ্যে জুটত। বেশির ভাগ বছরই পুরনো কাপড় পরিষ্কার করে ঈদ করতে হতো। তখন কাপড়চোপড় আয়রন করার কথা কোনো দিন চিন্তায়ও আসেনি। গ্রামাঞ্চলে জর্দা, পোলাও, কোরমার প্রচলন ছিল খুবই কম। তাও আবার বিশেষ সচ্ছল পরিবারে। পঁচাত্তরের আগে ঈদে সাধারণ পরিবারে সেমাই, পায়েস, সুজির কারবার ছিল না বললেই চলে। ঈদুল ফিতরে সাদা ভাতের সাথে মুরগির গোশত তাও আবার দুই থেকে তিন পিসের বেশি নয়। তখন ফিতরের ঈদে গরুর গোশতের কারবার তেমন ছিল না। মাঝে মধ্যে এটা হতো। এখন ছেলেমেয়েরা দুই ঈদে বায়না ধরে তাদের দুই ঈদেই নতুন কাপড় দিতে হবে। এক ঈদুল ফিতরে দিলে বলে এটা তো ঈদুল ফিতরের, আর আজহার কাপড় কই? কোরমা, পোলাও, বিরিয়ানি, সেমাই, সুজি, মোরব্বা, জর্দা, চটপটি আর কোল্ডড্রিঙ্কসসহ আরো নানা মজাদার খাদ্য ঈদে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়েছে।
সেকালের ঈদুল আজহায় সকালে পায়েসের সাধারণ মেনু, বিকেলে কোরবানির গোশত। এখন যেমন সপ্তাহখানেক কোরবানির গোশত বাসা থেকে শেষই হয় না। তখন কিন্তু ওই গোশত দুই ওয়াক্তের বেশি চলত না। সাত পরিবার মিলে দিয়েছে একটা গরু কোরবানি, তাও আবার মগড়া প্রকৃতির গরু। হাড্ডি ছাড়া ওই গরুর শরীরে গোশত বলতে তেমন ছিল না। সাত ভাগের এক ভাগে ১০ কেজির বেশি জুটত না। সেটা তিন ভাগ করলে গরিব ও আত্মীয় স্বজনকে দিয়ে নিজেদের পরিবারে সাড়ে তিন কেজির মতো ভাগে পড়ত। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল ১০ সদস্যের চেয়ে বেশি। সুতরাং ভাগে গোশতের পরিমাণ কেমন পড়ত তার জন্য কোনো হিসাব করার প্রয়োজন হয় না। গোশত সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মহান আল্লাহ তখনো গ্রামে ফ্রিজের ব্যবস্থা করেননি। কারণ ব্যবস্থা করলে ফ্রিজে রাখার গোশত কই ? এমনিতেই খাওয়ার সময় ভাগ করতে দাদীর অবস্থা খারাপ হতো। এখন হিসাব করে দেখি, দাদীকে মনে হয় না খেয়েই শুকরিয়া আদায় করতে হয়েছে। মহান আল্লাহর কাছে দাদীদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করি, আল্লাহ যেন তার এই রান্না গোশত পরিবারের মাঝে কোরবানি কবুল করে তাকে জান্নাত দান করেন। খরচের ক্ষেত্রে ঈদের বাজেট যত হবে, ধান বা চাল তত বেশি বিক্রি করে দাদাকে খরচ নির্বাহ করতে হবে, এমন চিন্তাই বেশি কার্যকর ছিল দাদার মাথায়। ঈদে যে গরু কেনা হতো তাতে কোনোভাবে সত্তর কেজির মতো গোশত হতো। মরা প্রকৃতির গরু কোনো মতে হাট থেকে হেঁটে আসতে পারত, মাঝে ছিল মধুমতি নদী। এমন গরু কেনা হতো, যার মধুমতি নদী পার হয়ে বাড়িতে আসতে যথেষ্ট বেগ পেতে হতো। তখন লোকেরা বলাবলি করত, এই গরু যা মধুমতি পার হতে পারছে না, তা কিভাবে সাতজন ভাগীকে কিয়ামতে পুলসিরাত পার করাবে? তখন কোনো পরিবারে মান্নত ছাড়া একটি গরু কোরবানি হতো না। প্রায় সবাই সাত ভাগে কোরবানি করত।
ঈদে সালামির সংস্কৃতি ছিল না বললেই চলে। পাঁচ পয়সা, এক আনা, ১০ পয়সা, দু’আনা, ২৫ পয়সা অথবা পঞ্চাশ পয়সা বেশি হলে এক টাকা। প্রায়ই ছয় পয়সায় এক আনার ভুনভুনি অথবা ১০ পয়সার মালাই আইসক্রিম অথবা মদন কটকটি। এখন নতুন জামাকাপড়ের সাথে সম্মানজনক সালামি। সালামি মা-বাবা, দাদা-দাদী, মামা-খালা অথবা চাচা-ফুফুর সবারই অঙ্ক থাকতে হবে। এখন ঈদে মিষ্টি বা গোশত খাওয়ার পর কোল্ড ড্রিঙ্কস, দই অথবা মাজাদার চটপটি না হলেই নয়। পাড়ায় পাড়ায় শামিয়ানার নিচে বিরাট বিরাট সাউন্ডবক্স নিয়ে রকমারি গানের আসর বসিয়ে কোল্ডড্রিঙ্কস অথবা চটপটিসহ রকমারি সামগ্রী চড়া দামে বিক্রি এখন ঈদ সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। গরিব লোকদের জন্য জাকাত ও ফিতরা বিতরণ করা হতো। তবে ফিতরা গরিবপ্রতি আট আনা থেকে সাধারণত দুই টাকার বেশি নয় এবং জাকাতের জন্য খুবই দুর্বল মানের পুরুষদের জন্য লুঙ্গি এবং মহিলাদের জন্য শাড়ির ব্যবস্থা হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাঝে মধ্যে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে শুরু হলো। এই ক্রীড়া আবার দেশী-বিদেশী ভাগে ভাগ হতো। যারা গ্রামে থাকত তারা দেশী আর যারা বিদেশে বা শহরে থাকতো তারা বিদেশী। কখনো কখনো বিবাহিত বা অবিবাহিতদের মাঝে খেলা হতো। এদের বলা হতো বিয়েধারী-অবিয়েধারী খেলা। এতে মজা ছিল ছেলে-বাপে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, চাচা-ভাতিজা পক্ষ-বিপক্ষে খেলত। তবে নারীদের জন্য এ ধরনের কোনো আয়োজন ছিল না। তারা সবাই দেখত মজা করে। হ