নাসিমা (ছদ্মনাম), বস্তির ঘরে থাকে। সাত মাসের গর্ভবতী। তার দুটো সন্তান। একটির বয়স পাঁচ, আরেকটি তিন। শরীরে মাংস বলতে কিছুই নেই। একেবারেই রোগা। সামান্যতেই হাঁপায়। পাঁচ মাস হলো স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। দুই সন্তানসহ বোনের আশ্রয়ে থাকে। পুষ্টিহীনতায় তার পেটের সন্তানের অনেক ক্ষতি হবে যখন জানল, তখন বললÑ কি আর করা। তিন বেলা সন্তানসহ কবে খেয়েছি মনে নেই। পুষ্টিকর খাবার মাছ, গোশত, ডিম, দুধ এসব পাবো কই? বোনের নিজেরই চলে না, তার ওপর আমরা বাড়তি তিনজন। কাজে যে যাবো গর্ভবতী হওয়ায় নড়তেও কষ্ট হয়। শরীরের হাড়গুলো সব গোনা যায়। জীর্ণ মলিন তালি দেয়া শাড়ি। ওষুধ যেমনÑ আয়রন, ক্যালসিয়াম এসব ছুঁয়েও দেখেনি। বললাম, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এগুলো পাওয়া যায়। ওর উত্তরÑ আগে তিন বেলা খাওনের ব্যবস্থা হোক, তার পরে না ওষুধ। ছেলে দুটোরও স্বাস্থ্য বলতে কিছুই নেই। শুধু পেটটা ভারী। হাত-পা খুবই চিকন। গায়ে জামা নেই। রাস্তার পাশে খেলা করছে। পেটের ভেতর কৃমির বাসা। ছোট ছেলেটি ওখানেই মলত্যাগ করে ফেলল। দেখলাম, লম্বা লম্বা কৃমি মলের ভেতর থেকে বেরিয়ে শুকনো জায়গায় কেঁচোর মতো নড়াচড়া করছে। নাসিমাকে বললাম, সন্তানদের কৃমির ওষুধ খাওয়াবে। যেখানে সেখানে মলত্যাগ কখনোই করাবে না। কী বুঝল জানি না, চোখে-মুখে দারুণ হতাশা। পেটের সন্তানটি অপুষ্টির জন্য সময়ের আগেই ডেলিভারি হয়ে যেতে পারে। ডেলিভারির সময় নাসিমার রক্তক্ষরণ হতে পারে। ওর নিয়মিত পরিচর্যা খুবই দরকার। ওকে বললাম, কাশি কত দিনের?
মাস ছয়েক তো হবেই। কাশিও যে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করা ভীষণ জরুরি, এটাও বোঝালাম। একটি ছোট্ট ঝুপড়ির মতো ঘরে ঠাসাঠাসি করে ওরা এতগুলো মানুষ থাকে, একজনের যক্ষ্মা হলে আরো যারা আছে তাদেরও হতে পারে।
নীলার (ছদ্মনাম) ব্যাপারটি একদম উল্টো। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকে মা-বাবার অত্যন্ত আদরে মানুষ। মা সব সময় বেশি বেশি খাওয়াতেন। ছোটবেলা থেকেই ওজন বাড়তির দিকে। এখন একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। ওজন ৯৮ কেজি। সাথে প্রেসারও হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন ওজন কমাতে। কিন্তু বললেই হলো। ওজন কমানো কি এতই সহজ? ফাস্টফুডের নেশা ছোটবেলা থেকেই। ভাত-চর্বি জাতীয় খাবার ডাক্তার কম খেতে বলেছেন। অথচ নীলার কম খেলেই মাথা ঘোরে। এত ওজন নিয়ে কাজ করা, হাঁটাচলা করাই কষ্ট। খাবার বাদ দেবে কিভাবে, ইদানীং হাঁটুতেও ব্যথা দেখা দিয়েছে। রোজা রাখছে কি না জানতে চাইলে বলল, দুই-তিন ঘণ্টা পরপর তাকে কিছু খেতে হয়। রোজা রাখবে কিভাবে? হায় খোদা! এর ওজন কমবে কী করে? ব্যায়াম করার কথা বললে জানাল, বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত। তখন ক্লান্তিতে শুয়ে থাকি। বরং উল্টো আমাকে প্রশ্ন করল, মেদ কমানোর জন্য বিদেশে নিয়ে সার্জারি করে আসাটা কেমন হয়? কিন্তু সত্যি কথা হলোÑ খাবার না কমিয়ে, ব্যায়াম না করে যতই মেদ ঝরানোর সার্জারি করুক আবার মেদ জমবেই। সমাজে এমন অনেকেই আছেন যাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। খাবার অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্রহণ করতে হবে। হাদিসে আছেÑ প্রতিবেশী অনাহারে রাত কাটালে সামর্থ্যবানের ইবাদতই কবুল হয় না। যারা সামর্থ্যবান আছেন তাদের উচিত ওইসব অনাহারী পুষ্টিহীন এদের খাবার, বাসস্থানের জন্য যতটা পারা যায় সাহায্য করা। নাসিমার কাশির সাথে যদি যক্ষ্মার জীবাণু থাকেই তবে সেটা বাতাসে আশপাশে ছড়াবেই। সেখান থেকে কেউই নিরাপদ থাকতে পারবেন না। এক দিকে পুষ্টির মাত্রাতিরিক্ত কারণে ওভার ওয়েট হয়ে জীবনে নানা রকম রোগবালাইয়ের কারণ হয়। আর অন্য দিকে পুষ্টিহীনতায় নাসিমার মতো কত শত শত দু’বেলা পেটভরে খাবারই পায় না। এর সমাধান তো আমার জানা নেই। তবে নিজ এলাকার সামর্থ্যবানেরা এই পবিত্র রমজানে আশপাশের ঝুপড়ি এবং বস্তিবাসীর খোঁজখবর নিতে পারেন। এটি একটি সর্বোত্তম ইবাদত। ঈদে নাসিমার সন্তানেরা পোলাও-কোর্মা পাবে না জানি, ফাস্টফুড কোল্ডড্রিংকস কারো হাতে দেখলে ওরা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। অথচ এই ফাস্টফুডের অতিরিক্ত গ্রহণই বড়লোকের জীবনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। সবাই যদি সচেতন হয়ে নাসিমাদের পাশে দাঁড়াই তাহলে নাসিমার সন্তানেরাও ঈদে নতুন কাপড় পরতে পারবে। নাসিমার হাসপাতালে ডেলিভারি হবে। একটি ছোট্ট সুন্দর শিশু এই সুন্দর পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখবে এবং ঈদের আনন্দ হবে সবার জন্য। হ
