ঈদুল ফিতর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুই ঈদের মধ্যে ঈদুল ফিতর খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি শ্রেষ্ঠ উৎসব। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পরে এই ঈদ পর্বটি রোজাদার ব্যক্তি মানসের জন্য একটি সীমাহীন অনির্বচনীয় আনন্দের দিন। ব্যাপক উষ্ণতা এবং প্রচণ্ড তাপদাহের ভেতরে বসবাস করে রোজাদার যে অপরিসীম ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত অবস্থার সম্মুখীন হয় এবং চরম পরম ধৈর্য ও সংযমের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনপূর্বক সিয়াম সাধনার সমাপ্তি ঘটে। তার পুরস্কারস্বরূপ হৃদয়মনের পরম প্রশান্তির ছোঁয়ায় প্রাণ বিগলিত হয়ে ওঠেÑ এমন অবস্থার সৃষ্টি শুধুই চরম ধৈর্যশীল রোজাদাররাই গভীরভাবে অনুভব-উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, অন্য কেউ নয়। বেরোজাদার ব্যক্তির পক্ষে তো নয়ই। অন্য ধর্মের অনুসারীরাও প্রকৃত রোজাদার ব্যক্তির স্বর্গীয় আনন্দ ও তৃপ্তির মজা বোঝার প্রশ্নই আসে না।
অন্য ধর্মের ধার্মিক ব্যক্তিরাও উপবাসব্রত পালন করে থাকেন এবং ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর না হলেও ক্ষুধার্ত অবস্থার সম্মুখীন হলেও মুসলিম জাতির সিয়াম সাধনা সম্পূর্ণই আলাদা এক সাধনা ও নির্ভেজাল কঠিনতম কষ্ট প্রয়াসের নাম। অন্য ধর্মের ধার্মিক ব্যক্তি যে উপবাস ক্রিয়া অবলম্বন করেন ইসলাম ধর্মের সিয়াম সাধনার সাথে তার তুলনা একদম অমূলক এবং সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যহীন। কারণ ইসলামের সিয়াম সাধনার ধরন ও প্রক্রিয়া পুরোপুরি ইসলামের নিজস্বতা এবং বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিফলন মাত্র। মানুষের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং মানসিক বিকাশের জন্যই সিয়াম সাধনার প্রয়োজনীয়তা সর্বাংশে অতীব আবশ্যক বলে, ইসলাম মুসলিম জাতির জন্য সিয়াম সাধনাকে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করেছে। এই সিয়াম সাধনার পদ্ধতি আগের অন্যান্য জাতির জন্যও অপরিহার্য বিষয় ছিল।
মুসলিম জাতির মানসিক উন্নয়ন, আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রয়োজনে অন্য দরিদ্র জনমানুষের অভাব অনটন, ক্ষুধার কষ্টের চিত্র কিরূপ ধারণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রেÑ তার উপলব্ধি সৃষ্টির একটি সুবর্ণ সুযোগের তৈরি করা হয়। দীর্ঘ সিয়াম সাধনার দ্বারা গরিবের অভাব-অনটন এবং ক্ষুধার কষ্টের বাস্তবতা ধনাঢ্য ব্যক্তিরা উপলব্ধি করে দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির একটা প্রশিক্ষণ হোকÑ এটাই সিয়াম সাধানার অন্যতম উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। যদিও আজকাল সিয়াম সাধনার সেই মহৎ শিক্ষা ও উদ্দেশ্য তেমন একটা ফল দেয় না। কারণ, সিয়াম সাধনার প্রকৃত সেই শিক্ষা ও লক্ষ্য আজ তেমন অর্জিত হয় না বা হচ্ছে না। সিয়ামকে শুধু রেওয়াজে পরিণত করা হয়েছে মাত্র। মানুষজন দলবেঁধে রোজা রাখেন, তারাবিও পড়েন প্রচুর সংখ্যক সারিবদ্ধভাবে দীর্ঘ সময়ব্যাপী। সম্পূর্ণ কুরআন খতম করা হয়। কিন্তু যে কুরআন খতম করা হয় সেই কুরআনের মর্ম ও তাৎপর্য ধারণ করাই শুধু বাকি থেকে যায়। কথা ছিল খতমে কুরআনের মাধ্যমে কুরআনকে বুঝবে সব মুসল্লি এবং সেই কুরআনের শিক্ষা জীবনের সব স্তরে তা প্রয়োগ করবে। কিন্তু কোথায় প্রয়োগ, কোথায় কুরআনের শিক্ষা সমাজ রাষ্ট্রে ব্যবহারের উদ্যোগ আয়োজনের? আয়োজন দেখি শুধু কুরআনকে চুমু খাওয়ার এবং বখশিয়া দেয়ার। আর কিছু নয়। হায়রে দুর্ভাগা মুসলিম!! এ কুরআনের বহু শিক্ষার মাত্র গুটিকতেক শিক্ষা কাজে লাগিয়ে অন্য জাতিরা আজ সর্বেসর্বাÑ আর মুসলিম শুধুই হাহাকার করেই দিবস রজনী পার করছে। কিন্তু রোজার লক্ষ্য উদ্দেশ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিফলন ঘটে না বলেই সমাজ রাষ্ট্রের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না। সিয়াম সাধনার দ্বারা সমাজ রাষ্ট্রের মধ্যে অন্যায়-অবিচার-জুলুম-নির্যাতন-গুম-ধর্ষণ ও মিথ্যাচারের মূলোৎপাটনের কথা থাকলেও সেসব কুকর্মের অবসান আর হয় না। তবে এ কষ্টের কী প্রয়োজন? ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে লাভটা কী? লাভের মধ্যে যেটুকু অর্জিত হয় তা হলো রোজাদারের খানিকটা আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে মাত্র। আর পায়ের তলে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় বেশ কিছু অভাব-অনটনে বিপর্যস্ত বনি-আদম।
এ ছাড়া, সিমায় সাধনার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই অর্জিত হয় না। শুধু রেওয়াজেরই মহড়া চলে দিনের পরে দিন। তাহলে সিয়াম সাধনার ফলটা কোথায় হারিয়ে যায়? হারিয়ে যায়। চরম ব্যর্থতা ও অসফলতার থিকথিকে অন্ধকারে।
যে রোজার মাসে মহাগ্রন্থ আলকুরআন অবতীর্ণ হলো হেদায়েতের নিমিত্তে ও মানবজাতির কল্যাণের জন্য যে কুরআন এই বিশ্বে এলোÑ সেই কুরআনের হাফেজরা তারাবিতে কুরআন তিলাওয়াত করে মুসল্লিদের প্রাণ কেড়ে নেন এবং মুসল্লিদের বিমোহিত করে তোলেনÑ সেই মুসল্লিরা কুরআনের সাথে সারা বছরে আর কোনো সম্পর্কই রাখেন না। কুরআনকে সাবধানে তাকে তুলে রাখেন মাত্র। কুরআনের শিক্ষা ও হুকুম আহাকাম, নির্দেশনার কথা বেমালুম ভুলে যানÑ এটা তো দেখা যাচ্ছে একধরনের অবিমিশ্র অবিমৃশ্যকারিতা, এক প্রকার নিষ্ঠুর হঠকারিতারই শামিল। যে সিয়াম সাধনায় কুরআনের শিক্ষা থাকা দরকার সর্বাধিক, কুরআনের নিয়ম নীতির অনুশীলনের জন্য সিয়ামকে ফরজ করা হলোÑ সেই কুরআন শুধু আবৃত্তি করেই সব কর্তব্য শেষ করা হয়। সেই সিয়াম ও কুরআনের কাছে আর কিছু পাওয়ার আশা করা কতটুকু ঠিক ও যথার্থ - তা ভেবে দেখা সবার দায়িত্ব, কিন্তু সেই দায়িত্ব কে করবে পালন? তাহলে দেখা যাচ্ছে এক মাসের সিয়াম সাধনার দ্বারা কাজের ‘কাজ’ কিছুই হচ্ছে না। যে মাসকে কেন্দ্র করে যে সাধনাকে সামনে রেখে কুরআন অবতীর্ণ করা হলো, সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই নিদারুণভাবে বাদ পড়ে যাচ্ছে। যে মহান মাসের নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই, কৃতিত্বের মূলে রয়েছে আল কুরআন। কুরআনের কারণেই এই মাসের এত মূল্য ও মর্যাদা প্রদান করা হয়। অথচ এই মহান মাসে সমগ্র বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান গ্রন্থ মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ করা হলো। তাই যেন ফাঁকতালে বাদই পড়ে যাচ্ছে। আমের চেয়ে আঁটিই যেন বড় হয়ে যাচ্ছে, খাজনার চেয়ে বাজনার মূল্যই বেশি হাঁকা হচ্ছে। এ যে এক ধরনের প্রহসনেরই অবতারণা মাত্র। এ জন্যই কি আজ মুসলিম জাতি দিশাহারা? মুসলিম জাতি বিশ্বের সব স্থানেই নিষ্পেষিত নির্যাতিত এবং নির্মম নির্মূলতার শিকার? এ জন্যই কি বিশ্বকবি আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল বলেছিলেন : মুসলিমেরা এ বিশ্বে বিজয়ী হয়েছিল কুরআনকেই অবলম্বন করে। আর আজ পতিত হয়েছে, বিপর্যস্ত হচ্ছে কুরআনকে পরিত্যাগ করে। হ