অনেকটা বিনাদ্বিধায় বলা যায় যে, অর্থনীতির বিশ্বায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহার ও বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতিতে আশু ভবিষ্যতে আয়, দারিদ্র্য ও বিত্তের ক্ষেত্রে অসমতা বিভিন্ন পর্যায় ও স্তরে বিভিন্ন চেহারায় দেখা দেবে। কম উন্নত দেশগুলোর জন্য কঠিন সমস্যা হবে কম উন্নয়নের বৈশিষ্ট্যাবলি কাটিয়ে ওঠা। যেমনÑ গরিব ও অনুন্নত দেশগুলোর একটা চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য হলো ওইসব দেশে ক্ষমতা গুটিকয়েকের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা, যা উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির আদৌ অনুকূল নয়। অতএব যতই কঠিন হোক না কেন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হলে প্রথম কাজটি হলো, কেন্দ্রায়িত ও পুঞ্জীভূত ক্ষমতাকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিলিবণ্টন করে ওই ক্ষমতার ব্যবহারে একটা ভারসাম্যের বিধান করা। আগেই বলা হয়েছে, কুলীন ও অভিজাত মহলের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে সে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত স¤পদ করায়ত্ত করে। সেই কারণে অপেক্ষাকৃত গরিব জনগোষ্ঠী ও নতুন উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগাতে পারেন না। ফলে তারা নিজের ক্ষমতা, মেধা ও দক্ষতানুযায়ী আয়-উপার্জন থেকে বঞ্চিত হন।
শাসক ও কর্তাব্যক্তিরা তাদের ক্ষমতার লাগাম শিথিল করতে সাধারণ নিয়মেই আগ্রহী নন। এ ক্ষেত্রে তাদের আশঙ্কা যে তারা ক্ষমতার যথেষ্ট ব্যবহার ও অপব্যবহারের মাধ্যমে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণের আনন্দ উপভোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। অবশ্য একটা জনসমাজ যদি প্রাণবন্ত, সজীব, উন্মুক্ত ও সুশীল হয় তাহলে তা সেই সমাজে শাসকদের হাতে থাকা অতিরিক্ত ক্ষমতার বিলিবণ্টন তথা বিকেন্দ্রায়নের প্রক্রিয়াটি সক্রিয় করে তুলতে সহায়তা করতে পারে। এটা করা সম্ভব সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শক্তি, সামর্থ্য ও সাফল্য এবং উদার রাজনীতি ও মুক্তবাজার অর্থনীতির অমিত শক্তি কাজে লাগিয়ে। অন্যথায় এক দিকে স¤পদ বিলিবণ্টনে বৈষম্য দিন দিন বাড়বে, অন্য দিকে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও সহিংসতা বাড়বে। অস্থির সমাজে জনগণ কারণে অকারণে একে অপরের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হবে। উচ্ছৃঙ্খল মানুষের সমন্বয়ে গঠিত বিশৃঙ্খল সমাজ ধীরে ধীরে শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাতে এক দিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে যায়, অন্যদিকে ঐসব সমাজে সবাই সমান সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। ক্ষমতার বিলিবণ্টনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ-সুবিধা অবারিত করে দিলে মানুষ তার মস্তিষ্কের অমিত শক্তি কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করার সুযোগ পায়। তাতে অসমতা কমে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
পরিবেশের প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় সাড়া দিয়ে মানুষ নিজেকে বদলানোর অসাধারণ সামর্থ্যরে অধিকারী। কেননা মানুষের প্রকৃতি স্থিতিস্থাপক (বষধংঃরপ) গুণে সমৃদ্ধ। মানুষের এই ‘প্রকৃতি’র (বৈশিষ্ট্য) সর্বোত্তম ব্যাখ্যামূলক আখ্যান হতে পারে ‘উত্তরাধিকারের প্রভাব বা জন্মগত সূত্রে পাওয়া লক্ষণাদি’। অনেক কারণের মাঝে এর আংশিক কারণ হলো মানুষের একটা এজমালি উত্তরাধিকার আছে, যার বিবর্তন ঘটেছে বা ঘটে চলেছে প্রাকৃতিক নিয়মে বা নৈসর্গিক নির্বাচনের (হধঃঁৎধষ ংবষবপঃরড়হ) মধ্য দিয়ে।
মানুষের মস্তিষ্ক এক জটিল ও শক্তিশালী যন্ত্রবিশেষ। মানব মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে বেশি করেই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার উপযোগী। সে কারণে মানব মস্তিষ্ক অন্য যেকোনো সৃষ্ট জীবের চেয়ে অনেক বেশি করে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও রহস্যের উদ্ঘাটন করতে পারে এবং ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত বিষয়গুলোর আরো উন্নতি সাধন করতে পারে। অতএব সুযোগের দ্বার সবার জন্য অবারিত করে দিলে সবাই সুযোগের সমান ব্যবহার করার সুযোগ পায় বা নিজ মস্তিষ্ক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা কমে যায়।
প্রকৃতিগত (হধঃঁৎধষ) বা জন্মগত সমতা-অসমতা
পুঁজিবাদ ও শিল্পসমাজ বিকাশের আলোকে সমাজ ও সমাজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, ঘটে চলেছে। সমাজ সম্পর্কিত সব ধারণার খোলনলচে আগাগোড়া বদলে গেছে। নতুন সমাজ একবারেই নতুন ধ্যান-ধারণার আদলে গড়ে উঠেছে। নতুন সমাজে সদস্যরা হলো ‘মৌলিক, মুখ্য ও ব্যক্তি হিসেবে স্বাধীন’ যাকে আমরা বলতে পারি এক ধরনের স্বায়ত্তশাসিত ‘সমাজ-অণু’। এই ব্যক্তি সমাজে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যখন ইচ্ছা তখন যেতে পারে। এক ভূমিকা থেকে আরেক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। সমাজকে এখন আর ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্যাবলির কারণ হিসেবে নয়, বরং সমাজে বসবাসকারী সব ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যাবলির পরিণাম ফল হিসেবে মনে করা হয়। নতুন এই ধারণার মূলে হলো, ব্যক্তিবিশেষ দিয়ে গড়ে ওঠে সমাজ।
আমরা যদি এক দিকে প্রকৃতি (প্রাকৃতিক) ও অন্যদিকে ব্যক্তিবিশেষ কর্তৃক গঠিত সামাজিক পরিবেশের ক্রিয়াপার¤পর্য বা পরস্পরের ওপরে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াগুলো বিবেচনায় নিই এবং একই সাথে এও বিশ্বাস করি যে ‘আল্লাহ সৃষ্ট সকল মানুষ সমান’- তাহলে ভাবতে হবে সমাজে বিত্ত, বুদ্ধি, সুযোগ-সুবিধা, ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতা, বিভিন্ন জনসমাজে নারী-পুরুষ ও নরগোষ্ঠীর মধ্যে তারতম্য ও যে অসমতা সেই আদিকাল থেকে বিরাজমান, সেই অসমতাকে কিভাবে ও কেমন করে যৌক্তিকতা দেয়া যাবে।
সমাজে অনেকেই এক দিকে সমাজকে সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বলে দাবি করে, অন্যদিকে এটাও সত্যি যে, সমাজের মানুষ এক বিরাট, বিপুল বহুমাত্রিক অসমতার সম্মুখীন। বলতে গেলে সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অসমতা বিদ্যমান। তাছাড়া সমাজের মানুষে মানুষে অসমতা বহুমাত্রিক যেমন ক্ষমতার অসমতা, আয়ের অসমতা, ভোগ করার অসমতা, শারীরিক শক্তির অসমতা, বিচারবুদ্ধি ও জ্ঞানের অসমতা, সম্পদ অর্জন ও বণ্টনে অসমতা, সম্পদ অর্জনে সুযোগের অসমতা। অতএব, অসমতার গতি-প্রকৃতি বহুমাত্রিক ও এ সমস্যার সমাধানের পথও বহুমুখী। তার পরও আদিকাল থেকে অসমতার ঐতিহাসিক কারণগুলোকে একত্রে ধর্তব্যে এনে বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে বলা যায় যে, কোনো সমাধানই সমাজের সব অসমতাকে কোনোভাবেই দূর করতে পারবে না।
এটা সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার যে, অসমতা আমাদের জীবনধারারই অঙ্গ। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে আজকাল সমাজবিজ্ঞানীরা অসমতার একটি নতুন ধারণা ও ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাদের ধারণানুযায়ী ‘সমতা বলতে ফল বা পরিণামের সমতা নয়’, বরং সমতা বলতে বোঝায় ‘সুযোগের সমতা’। সমতার এ নতুন ধারণা অনুযায়ী, জীবন হলো ‘সূচনাবিন্দু থেকে একটা দৌড়বিশেষ’। আগেকার দিনে কেউ কেউ (অভিজাত শ্রেণী- গুটিকয়েক) দৌড় শুরু করার সুযোগ ছিল শেষ লাইন থেকে। আর বেশির ভাগ জনগণকে দৌড় শুরু করতে হতো সূচনাবিন্দু থেকে। অর্থাৎ তখনকার দিনে সমাজে যারা পেত অভিজাত শ্রেণী তারা জীবন শুরু করতে পারতেন দৌড়ের সীমারেখার ‘শেষ লাইন’ থেকে। যার ফলে তারা বিন্দু থেকেই সার্থক জীবন শুরু করার সুযোগ পেতেন। আর যারা ছিলেন গরিব ও বিত্তহীন, তাদের দৌড় শুরু করতে হতো অনেক পেছন থেকে। সে কারণেই অভিজাত বংশের মানুষ সর্বদাই এই দৌড়ে জয়ী হয়েছে। তবে আগেই বলা হয়েছে, বর্তমানে সমাজের খোলনলচে আগাগোড়া বদলে গেছে।
নতুন আদলে গড়ে ওঠা বর্তমান সমাজে দৌড় প্রতিযোগিতায় সূচনার বিষয়টি অনেকখানি ন্যায়সঙ্গত হয়ে উঠেছে। সবাই এখন একই সূচনারেখা থেকে সুযোগের দৌড় শুরু করার সুযোগ পায়। অতএব সবাইকে যদি বিন্দু থেকে দৌড় শুরু করতে হয় তাহলে সবার জন্যই সমাপ্তি লাইন অতিক্রম করে দৌড়ে প্রথম হওয়ার সমান সুযোগ থাকে। অবশ্য আমাদের এও ভুলে গেলে চলবে না যে, সমাজে অনেক অসমতা আছে যেগুলো প্রাকৃতিক। যেমন কোনো কোনো প্রতিযোগীর (সমাজ সদস্য) শারীরিক গঠন অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। যারা লম্বা ও শারীরিক গঠনে ভালো তাদের দৌড়ের গতি হবে অন্যদের তুলনায় দ্রুততর। অতএব কেউ পুরস্কার পাবে, কেউ পাবে না। এখানেই আসে ‘প্রকৃতি প্রসঙ্গ’। অর্থাৎ প্রাকৃতিক নিয়মেই কোনো কোনো অসমতা আমাদের সমাজ ও জীবনের অঙ্গ হিসেবে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের প্রাকৃতিক (প্রকৃতি সৃষ্ট) অসমতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে ‘জন্মগত সূত্র থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তির সামর্থ্যরে স্তর বিভিন্ন হয়’। অতএব, সমাজে সবার সামর্থ্য এক নয়। তাদের সামর্থ্যে তারতম্য থাকে। মানুষের মস্তিষ্ক অসাধারণ উন্নত ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও তার জন্মগত সহজাত শক্তির কারণে মানুষের নিজেকে বদলানোর সত্যিকার সামর্থ্য ও ধারণক্ষমতার নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। এ কারণে প্রতিটি ব্যক্তিকে তাদের নিজ নিজ বংশানুগতির নিয়ন্ত্রণ উপাদান ও গুণাবলির (জিনগত) সামর্থ্যকে বিকশিত করার সমান সুযোগ অবারিত করে দিলেও সামর্থ্য ও কার্যসম্পাদনের গুণগতমানের দিক থেকে মানুষে মানুষে একটা বড় রকমের পার্থক্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে উঠবে। আর সেটা ন্যায়সঙ্গত কিনা বলা মুশকিল ও এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিষয়টি এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য নয় বলে এ ব্যাপারে আর বিশেষণের দরকার নেই। তবে আমরা বিনাদ্বিধায় বলতে পারি যে, এই তারতম্য হলো : ‘প্রকৃতিক কারণে জন্মগত ও স্বাভাবিক প্রকৃতিগত পার্থক্য বা তারতম্য’। এ ধরনের পার্থক্যের মধ্যে একটা বোধগম্য, বলিষ্ঠ যুক্তির আভাস অবশ্যই আছে। তবে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, পরিবেশের তারতম্য অনুকূল হলেও অবারিত সুযোগ পাওয়া গেলে যে, কোনো মানুষ তার সামর্থ্যকে বহুভাবে, বহুগুণে ও বিশালভাবে বদলে দিতে পারে। তাছাড়া নতুন প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক উদ্ভাবনায় বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যকার সামর্থ্যরে প্রাকৃতিক তারতম্য বহুলাংশে লোপ পায়। এমনকি কোনো কোনো সময় বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন কোনো ছেলে জন্মগতভাবে অংকে একেবারেই ভালো নয়। অন্য একজন খুবই ভালো। পরীক্ষার সময় যদি দু’জনকেই ক্যালকুলেটর দেয়া হয় তাহলে দু’জনেই সমান নম্বর পাবে। এখানে জন্মগতসূত্র থেকে পাওয়া তারতম্য তেমন কোনো অসমতা সৃষ্টি করে না। তবে মূল বিষয় হলো, দু’জনকেই ক্যালকুলেটর দিতে হবে। আগেকার দিনে একজন পেত, আর বাকিদের নিজেরা বসে বসে যোগ-বিয়োগ কষতে হতো। তাতে এক দিকে সময় কম, অন্য দিকে অঙ্ক কষতে গিয়ে ভুল হতো বেশিÑ এসব মিলে ফেল করাটা ছিল স্বাভাবিক।
সমতাভিত্তিক সমাজ কাঠামো
অতএব, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সমাজবিন্যাসের কাঠামো ও গঠনপ্রণালী মূলত সমতাভিত্তিক হওয়া উচিত। সুযোগের অসমতা দূর করার লক্ষ্যে সমাজ ও সমাজ সংগঠনগুলো সমাজ কাঠামো পরিবর্তনে যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাতে ইদানীংকালে সামাজিক উত্তাপমাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। তাদের ধারণা যে, সমাজের বেশির ভাগ লোক যদি সম্ভাব্য সব সুযোগের সমতা অর্জন করে তাহলে সমাজের বহুমাত্রিক অসমতা দূর না হলেও অনেক ক্ষেত্রে এর মাত্রা কমে আসবে।
তত্ত্বের দিক থেকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য সমাজে যেসব সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান সেগুলো বৈষম্যমূলক নয় বা হওয়া উচিত নয়। তাছাড়া শিক্ষা, জ্ঞান, দক্ষতা-নৈপুণ্য ও উত্তম চরিত্রÑ এগুলোকে অর্থবহ জীবন পরিচালনের মসৃণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়। অতএব, সমতাভিত্তিক সমাজে সবাই যদি সমান সুযোগ পায় তাহলে সেটা জীবনের মসৃণ দৌড়ের নিশ্চয়তা বিধান করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সত্যিকারের মেধা যদি সমতাভিত্তিক সমাজে অবারিত সমান সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে সেটা পাঁচমিশালি বস্তু থেকে প্রকৃত উপাদান সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক শ্রেণীবিন্যাস প্রক্রিয়ার বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করবে। এ হলো তত্ত্ব।
শিক্ষার ইতিবাচক ধারণা দিতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী লেস্টার ফ্র্যাঙ্ক ওয়ার্ড বলেছেন : ‘সর্বজনীন শিক্ষা এমন এক ক্ষমতা বা শক্তি যা সুনিশ্চিতভাবেই শ্রেণীবিন্যস্ত সমাজের ক্রমোন্নত শ্রেণীবিভাগগুলোকে বিপর্যস্ত করে ভূপাতিত করে দেবে। সর্বজনীন শিক্ষা সমাজের সব কৃত্রিম অসমতাকে সুনিশ্চিতভাবে সরিয়ে দিয়ে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক অসমতাকে তার সত্যিকারের সমতা খুঁজে পেতে সুযোগ করে দেবে। নবজাত শিশুর সত্যিকারের মূল্য নিহিত থাকে তার কিছু করতে যে খোলামেলা ধারণশক্তির (হধশবফ পধঢ়ধপরঃু) প্রয়োজন, সে সামর্থ্য অর্জনের ওপর।’ তাই আমরা সত্যিকার অর্থে যা আশা করতে পারি তা হলো সত্যিকারের মেধা যদি সমতাভিত্তিক সমাজে সমান সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে সেটা পাঁচমিশালি পণ্য থেকে প্রকৃত উপাদান সংগ্রহ প্রক্রিয়া বা প্রাকৃতিক শ্রেণীবিন্যাস প্রক্রিয়ার বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করবে।
আগেকার আমলে শিশুরা কমবেশি তাদের বাবা-মায়ের সামাজিক মর্যাদা সহজে অর্জন করতে সমর্থ হতো। কিন্তু বর্তমান সমাজ কাঠামো ক্রমাগতভাবে সমতাভিত্তিক আবর্তনের ফলে সমাজে যারা মর্যাদাবান বলে দাবি করে বা অন্যায়ভাবে সুযোগ পেত তাদের সেই সুযোগ দিন দিন কমে আসছে। অর্থাৎ এখন সবাইকে জীবনের দৌড় শুরু করতে হবে একই বিন্দু থেকে এবং শেষ করতে হবে একই সীমারেখা অতিক্রম করে। কেননা সমাজ এখন অনেক বদলে গেছে। আমরা এখন মেধাতন্ত্রের বাস্তবতার জগতে বাস করি। এই মেধাতন্ত্রে, একজন ব্যক্তি তার অন্তর্নিহিত সামর্থ্য (রহহধঃব ধনরষরঃু) ও যোগ্যতাবলে সাফল্য ও মর্যাদার সিঁড়ি বেয়ে যতদূর ওপরে উঠতে পারার সামর্থ্য অর্জন করে ততদূর উঠতে তার কোনো বাধা নেই। এর জন্য প্রয়োজন হলো সামর্থ্য অর্জনে সবার জন্য সমতাভিত্তিক ও অবারিত সুযোগ-সুবিধা।
সমতাভিত্তিক সমাজকাঠামোর অর্থ হলো ব্যক্তিসামর্থ্য (পরিবেশের ফলাফল ও জন্মগত সূত্রে পাওয়া - দুয়ের যোগফল) ব্যবহার করে সাফল্য অর্জনের জন্য অবারিত সুযোগ। সাফল্য অর্জনের মূল তত্ত্ব হলো উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষের জীবন মানোন্নয়ন করা। এখানে সম্পদ বলতে বোঝানো হয় এক দিকে ব্যক্তিমানুষের সম্পদ, অন্য দিকে দেশের প্রতিটি মানুষের সব সম্পদ মিলে জাতীয় সম্পদ। তবে সমাজে কারো সম্পদ বেশি হবে, কারো কম হবে। কারণ সম্পদ অর্জনে সবার সামর্থ্য এক নয়। সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমেই কেবল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা যায়। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। তারপর পূঞ্জীভূত সম্পদ বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তবে সম্পদের ভাগাভাগি বা বিলি-বণ্টনের আগে সম্পদ সৃষ্টি যেমন জরুরি, তেমনি সৃষ্ট সম্পদের বিলি-বণ্টনে রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে প্রয়োজনীয়তা অতীব জরুরি।
