চৈত্রের দুপুর। সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকায় বেলা অনুমান করতে কষ্ট হচ্ছে না রহিমা বানুর। এমন তপ্ত সূর্যকে মাথায় করে তেমাথার দোকানের দিকে যাচ্ছেন তিনি। রহিমা বানুকে গ্রামের ছেলেপুলেরা আক্কাসের মা বলে চেনে। আক্কাস তার একমাত্র ছেলে। আর মাঝবয়সীরা ডাকে ‘রহিমা বু’ বলে। গ্রামের সামনে তিনটি রাস্তা এসে মিলেছে এখানে তাই নাম হয়েছে তেমাথা। আছে দুটি দোকানঘর। সকাল হলেই কেরাম খেলার আড্ডা জমে।
রহিমা বানুর গন্তব্য এখানেই। এই তেমাথা মোড়ে আসতে না আসতেই এক ঝাঁক কাক এ গাছ থেকে ও গাছে উড়তে লাগল। দোকানের পাশে কেরাম খেলা ছেলেগুলো ঢিল মেরে কাকগুলো তাড়ানোর চেষ্টা করছে। তাড়া খাওয়া কাকগুলোর ডানা ঝাপটানি আর কা-কা শব্দে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আক্কাসের মা দোকানের বেঞ্চে বসল।
মুদি দোকানটা মাজেদের। তবে মাজেদকে আজ দোকানে দেখা গেল না। এই তেমাথা থেকে একটি রাস্তা সোজা মফস্বল শহর হয়ে ঢাকা গেছে। আর সেদিকে অপলক দৃষ্টিতে রহিমা বানুর চেয়ে আছেন। গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই জানে ছেলে আক্কাসের জন্য তার প্রতীক্ষায় থাকার কথা।
এই পৃথিবীতে রহিমা বানুর একমাত্র অবলম্বন আক্কাস। মা ছাড়া আক্কাসের বেলাতেও তাই। মাজেদের ছেলে আজ দোকানে বসেছে। রহিমা বানু মাজেদের কাছেই এসেছে। মাজেদ নাকি ভোরবেলা জরুরি কাজে ঢাকা গেছে। মাজেদ খুব পরোপকারী। রহিমা বানুর ভাবনা হয়তো মাজেদ কারো বিপদের সঙ্গী হয়ে ঢাকা গেছে। এ জীবনে রহিমা বানু মানুষের অনেক উপকার করেছেন। গ্রামে এক সময় রহিমা বানুর খুব নামডাক ছিল ভালো ধাত্রী হিসাবে। পাশে থাকতেন মানুষের অসুখ-বিসুখে। তবে দিন বদলে গেছে মানুষ এখন শহরমুখী। ব্যথা উঠলেই পেট কাটো। তাই এসব আর দরকার হয় না। আর ধাত্রীর কাজ তো এখন ডাক্তাররাই করে।
আজ আক্কাসের বাড়ি ফেরার কথা। তাই সকাল থেকেই রহিমা বানুর প্রহর গোনা শুরু। সপ্তাহে দুই একবার মাজেদের মোবাইলে আক্কাস মায়ের সাথে কথা বলে। সেদিন বললÑ মা আমি সোমবারে বাড়ি আসব। তখন থেকেই তিনি অপেক্ষায় আছেন।
সে বছর বড় বন্যার পর মাজেদের বাপ ঘটকালি করে রহিমা বানুকে বিয়ে দিয়ে দিলো। বিয়ের তিন বছরের মাথায় রহিমা বিধবা হন। আক্কাসের বয়স তখন দুই বছর। রহিমা বানু সেই যে বাপের ভিটায় এলেন আর ফিরলেন না। রহিমা বানুর সাথে ওদের কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক বলতে এতটুকুই। এক সময় মাজেদের দোকানেই টাকায় ফোন করা যেত। কিন্তু এখন হাতে হাতে মোবাইল হওয়ায় রহিমা বানুকে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। ছেলেপুলেরাও তাকে দেখে কেটে পড়ে। কিছুতেই মন স্থির করতে পারছেন না তিনি। পথ হারা পাখির মতো এদিক ওদিক করছেন। ছুটে গেলেন মাজেদের বাড়িতে। তার বউ বলছে সে আক্কাসের কাছেই গেছে। এমন খুশির খবরের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
গত পৌষ মাসে ছেলেটাকে শেষ দেখেছে মা। মাজেদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে একটা বুদ্ধি করেছেন তিনি। ছেলেকে এবার বিয়ে দিবেন। একা তার ভালো লাগে না। চোখে স্বপ্ন এসে ভর করে এই বাড়িতে এই উঠোনে তখন নাতিপুতির দৌড়াদৌড়ি। ভাবতেই অশ্রু ছলছল করে উঠে চোখে।
সেবারে ছেলের জন্য একটা সম্বন্ধ পাকা করেছিলেন। কনে পক্ষ বাহানা দিলো ছেলের বাপ নেই। শেষমেশ আশপাশের লোকেদের কূটনামিতে বিয়েটা ভেঙে গেল। রহিমা বানুর সংসারের সচ্ছলতা তাদের ভালো লাগে না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। খাওয়া, গোসল কোনো কিছুতেই সায় দেয় না মায়ের মন। এক জায়নামাজে বসেই মাগরিব থেকে এশা শেষ করেন রহিমা বানু। তারপর মধ্যরাত অবধি মায়ের মনে এক জিজ্ঞাসাÑ আক্কাস না আসুক, আক্কাসের খবর নিয়ে মাজেদ তো আসবে?
রহিমা বানু জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। মাজেদের ডাকেই তার ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভেঙে দেখেন বাড়িতে আলো আর লোকজনের শোরগোল। ‘উঠোনে কিসের খাটিয়া’ বলেই রহিমা বানু চিৎকার দেন। গগনবিদারী চিৎকারে ভেঙে যায় রাতের নিস্তব্ধতা। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হুঁশ ফিরলেই মায়ের আকুতি শুনে দুনিয়া। তবে আক্কাস আজ মূক আর বধির। পৃথিবীর কারো কথাতেই তার কর্ণপাত নেই। গতকাল রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আক্কাসের অগ্নিদগ্ধ হওয়ার খবরে মাজেদ ঢাকা ছুটে যায়। খবরটা রহিমা বানুর কাছে গোপন করে সবাই। কিন্তু তার আচরণে আক্কাসের জন্য যে ব্যাকুলতা তাতে গ্রামের সবাইকে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন তার সন্তানের কিছু একটা হয়েছে।
আজ চকবাজার ট্র্যাজেডির বেশ কয়েক মাস গত হতে চলল। ছেলের জন্য মায়ের অপেক্ষা তবু শেষ হওয়ার নয়। রহিমা বানুর বয়স খুব বেশি নয়, কত আর পঞ্চাশের ঘরে হবে। শোকের অশ্রু গড়াতে গড়াতে চোখে আর ভালো দেখতে পান না। ছেলে আক্কাসের জন্য অপেক্ষার দৃষ্টি দিতে দিতে তিনি চোখের দৃষ্টি হারাতে বসেছেন। গ্রামের ছেলে-বুড়ো যাকে দেখেন তাকেই মোবাইলে আক্কাসকে ফোন দিতে বলেন। তার আক্কাস যে না ফেরার দেশে তা তিনি মানতেই নারাজ। তিনি অন্ধ চোখে এখনো বসে থাকেন দোকানের সেই বেঞ্চটাতে।
শিক্ষার্থী, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর
চৈত্রের দুপুর। সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকায় বেলা অনুমান করতে কষ্ট হচ্ছে না রহিমা বানুর। এমন তপ্ত সূর্যকে মাথায় করে তেমাথার দোকানের দিকে যাচ্ছেন তিনি।...
