রতœা, স্বর্ণা, তন্ময়, শবনম, আরিজ, তাওফ, স্বাদ, মুন, মাহিন, প্রিন্স, আরমান, রাফিÑ আজ ওদের খুশির দিন। কারণ আজ ঈদের দিন। ওরা সবাই নতুন জামাকাপড় পরে, সুগন্ধি মেখে সেজেগুজে বের হয়েছে। আজ ওরা ঘুরবে, পোলাও খাবে, কোরমা খাবে, পায়েস খাবে আয়েশ করে। স্বাদ বলল আগে কার বাড়িতে যাবি? আরমান বলল, আগে যাবো বড় চাচ্চুর বাড়িতে। প্রিন্স বলল, তাহলে চল।
তারপর দলবল একসাথে বড় চাচ্চুর বাড়িতে হাজির। সবাইকে একসাথে দেখে বড় চাচ্চু অনেক খুশি হলেন। তারা একে একে চাচ্চুকে সালাম করল। শবনম বলে উঠল এবার ঈদ সেলামির পালা। রতœা বলল, চাচ্চু তুমি সবার আগে আমাকে সেলামি দেবে পাঁচ শ’ টাকা। স্বর্ণা বলল, চাচ্চু আমাকে এক হাজার টাকা। শবনম আর তন্ময় একসাথে বলে উঠল আমাদেরকে আরো বেশি। ওদিকে মুন মাহিন বলে উঠলÑ
ঈদ সেলামি দাও চাচ্চু
ঈদ সেলামি দাও
আজকের এমন খুশির দিনে
হাজার সালাম নাও।
চাচ্চু হা হা করে হেসে উঠে বললেনÑ ওরে বাবা, কবি হয়ে গেছিস দেখি। আয় আয় তোদেরকে ঈদ সেলামি দেই। চাচ্চু পকেট থেকে একের পর এক খাম বের করতে লাগলেন আর ধরিয়ে দিতে লাগলেন ওদের হাতে। ওরা পরস্পরের দিকে তাকাল, চোখের চাহনিতে বলতে লাগল, চাচ্চু আমাদেরকে কখনো খাম দেয়নি, ঘটনা কী? নিশ্চয়ই বড় অঙ্কের সেলামি হবে। মুন বলল, এই চল চল। বড় চাচ্চু পেছন থেকে বলে উঠলেন, আরে দুষ্ট ছেলেপেলের দল কই যাস তোরা? মেজো চাচ্চুর বাসায়।
কিন্তু পথেই দেখা হয়ে গেল মেজো চাচ্চুর সাথে। চাচ্চু গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, কই যাচ্ছিলি তোরা? তোমার বাসায়ই যাচ্ছিলাম। ও সেলামি নিতে বুঝি? ওরা হা হা করে হাসতে লাগলÑ ঠিক তাই চাচ্চু। ঈদের নামাজ পড়েছিস। পড়েছি চাচ্চু। তা বেশ বেশ। এখন আয় দেখি এক এক করে সালাম কর আমাকে। ওরা সবাই চাচ্চুকে সালাম করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ল, কে কার আগে সালাম করবে। এদের হুড়োহুড়িতে মেজো চাচ্চু পথেই চিৎপটাং। আরে তোরা যে আমাকে ফেলেই দিলি। হো হো করে হেসে উঠল আশপাশের লোকজন। ওরা চাচ্চুকে টেনে তুলল। তারপর দুঃখী দুঃখী মুখ করে একসাথে বলে উঠলÑ স্যরি চাচ্চু, আমরা আসলে বুঝতে পারিনি। চাচ্চু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। এবার বাসায় চল, তোদের চাচী অনেক মজার মজার খাবার রান্না করেছে, একসাথে খাবো। ওরা সবাই জানে, মেজো চাচীর হাতের রান্না কত্ত মজা! তাই আর দেরি না করে হই হই করতে করতে চাচ্চুর পেছন পেছন চলল।
ওরা মেজো চাচ্চুর বাসায় খেয়েদেয়ে আরাম করে ভাবল, এবার সেজো চাচ্চুর বাসায় যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। ওরা আনন্দ-উল্লাস করতে করতে বেরিয়ে পড়ল, তার পর সেজো চাচ্চুর বাসায় হানা দিলো, কিন্তু হতাশ! চাচ্চু দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে দিয়েছেন এক ঘুম। ওরা ঠিক করল চাচ্চুকে বিরক্ত করবে না। বেরিয়ে যাওয়ার দরজার কাছে যেতে না যেতেই ওরা পেছন থেকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে চাচ্চুর ডাক শুনতে পেল। শবনম বলে উঠল, চাচ্চু তুমি কখন উঠলে, আর যখন উঠেই পড়েছ, এখন আমাদের সেলামি দাও। চাচ্চু বললেন, দিতে পারি তবে একটা শর্ত। স্বাদ বলল, কী শর্ত। চাচ্চু ওদের সবাইকে চোখ বন্ধ করতে বললেন। ওরা চোখ বন্ধ করল। তারপর চাচ্চু একে একে সবার হাতে তুলে দিলেন ঈদ সেলামি। চোখ খুলেই ওরা হুররে বলে চিৎকার দিয়ে উঠল।
এবার আরো দুই চাচ্চুর কাছে যাওয়া যাক। বাবুল চাচ্চু আর মানিক চাচ্চু। দুই চাচ্চু একসাথেই থাকেন এবং দু’জনই ওদের সবার অনেক প্রিয়। ওরা দলবেঁধে সেখানে হাজির, ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। ওরা বাড়িতে ঢুকেই লম্বা এক সালাম দিলো চাচ্চুদ্বয়কে। এবার আর পা ধরে সালাম করবে না। যে ঘটনা ঘটিয়েছে বড্ড লজ্জার বিষয়। বাবুল চাচ্চু বললেন, সেলামি দিতে দিতে শেষ হয়ে গেছে। তোরা খুব দেরি করেছিস। মানিক চাচ্চু হাসতে হাসতে বললেন, আমি ঠিক করেছি, তোদেরকে আর সেলামি দেবো না। কারণ, তোরা বড় হয়েছিস। ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল, বলতে লাগল বলে কি চাচ্চু! আমরা বড় হয়েছি, তাহলে তো আয়নায় নিজেদেরকে ভালো করে দেখতে হয় কত বড় হয়েছি। রাফি বলল চাচ্চু আমরা বড় হয়েছি, তোমরাও তো বড় হয়েছ, তাই এবার সেলামিটাও বড় দিতে হবে। এই শুনে দুই চাচ্চুই তাড়াতাড়ি ওদের হাতে কিছু সেলামি গুঁজে দিয়ে বললেন, এর চেয়ে বড় আর দিতে পারব না। ওরা বলল, চাচ্চু আমরা এতেই খুশি।
বাড়ির পেছনেই রয়েছে সুন্দর একটি বাগান। ওরা সবাই সে বাগানের আমগাছের নিচে গিয়ে বসল। তার পর গুনতে শুরু করল কে কত ঈদ সেলামি পেয়েছে। প্রথমেই রতœা বড় চাচ্চুর দেয়া খামটি খুলল। নতুন টাকার সাথে বেরিয়ে এলো ছোট্ট একটি চিরকুট। তাতে লেখা, এই টাকার অর্ধেক তুমি গরিব কোনো আত্মীয়স্বজনকে দান করে দিয়ো, যেন ঈদের দিনে তার ঘরে অভাব না থাকে। তারপর খুলল স্বর্ণা, ওর খামের ভেতর থেকেও বেরিয়ে এলো একটি চিরকুট যেখানে লেখা আছে, এই টাকার অর্ধেক তুমি অনাহারী কাউকে দান করে দিয়ো, যেন ঈদের দিনে সে একটু ভালো খেতে পারে। এবার স্বাদের পালা, ও বড্ড উৎসাহের সাথে খুলল খাম, ভেতরের চিরকুটে লেখা, এই টাকার অর্ধেক তুমি যে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু টাকার অভাবে করতে পারে না তাকে দান করে দিয়ো, যেন ঈদের দিন তার মনটা আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তারপর শবনম, তন্ময়, প্রিন্স, রাফি, মুন আর মাহিন সবাই একসাথে নিজেদের খাম খুলল। প্রত্যেকের খামের ভেতর থেকেই বেরিয়ে এলো একটি করে চিরকুট। ওরা বড় বড় চোখ করে দেখতে লাগল কী লেখা আছে, আশ্চর্য সবগুলো চিরকুটের পেছনে একটি কথাই লেখাÑ এই টাকার অর্ধেক তুমি গুরুতর অসুস্থ কাউকে চিকিৎসার জন্য দান করে দিয়ো, যেন ঈদের দিনে সে একটু হাসতে পারে। সবশেষে ছোট্ট আরিজ, তাওফ ও আরমান খুবই উৎসাহের সাথে ওদের হাতের খাম খুলল। খামের ভেতরের চিরকুটে লেখা এই টাকার অর্ধেক পথশিশুদের দান করে দিয়ো, যেন ওরাও তোমাদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারে।
ওরা আনন্দের সাথে বেরিয়ে পড়ল ঈদের খুশি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে। প্রত্যেকেই বড় চাচ্চুর কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। এমন খুশির ঈদ ওরা আগে কখনো কাটায়নি।