আটতলা এই অ্যাপার্টমেন্টের নাম গ্রিনপিস। গ্রিনপিস অ্যাপার্টমেন্টের ছয়তলায় থাকে মৌরী। মৌরীর দুই ছেলে। রুপম আর রুহান। মৌরীর স্বামী মাহবুব। নিউমার্কেটে বিশাল ব্যবসা নিয়ে তার কর্মজীবন। ভোরে বের হয় আর ফেরে গভীর রাতে। রুপম, রুহান স্কুলে চলে গেলে সারা দিন বাসায় একা থাকে মৌরী। হয়তো ফেসবুক নয়তো টিভি দেখে সময় কাটে। তবে আজকাল ফেসবুকের নেশা মৌরীকে পেয়ে বসেছে। খুব ভালো লাগে ফেসবুক।
মৌরী পাশের বাসার তামান্না ভাবীর কাছে জেনেছে, এই অ্যাপার্টমেন্টের দোতলা কিনেছে চিত্রনায়িকা সোনালি। সোনালির কথা শুনে বুকটা ধক করে উঠল মৌরীর। এই নায়িকার সাথে যে মৌরীর ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি।
চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত হওয়ার পর রাজশাহীর মেয়ে রুমার নাম হয়েছে সোনালি। বাবার চাকরির সুবাদে রুমারা তখন নোয়াখালীতে থাকত। হাইস্কুলে ভর্তির পর মৌরীর সাথে সখ্য বাড়ে রুমার। যথেষ্ট সুন্দরী সে। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে কোন ছেলে কী ভাষায় চিঠি লিখেছেÑ সব মৌরীকে জানাত আর হেসে গড়াগড়ি খেত। দু’জনের বন্ধুত্ব স্কুলের সবাই জানত।
ক্লাস নাইনের সময় হঠাৎ করে রুমার বাবা আবার বদলি হন। নোয়াখালী থেকে তারা তখন ঢাকায় চলে যায়। বান্ধবীকে বড় মিস করত মৌরী। একদিন টিভিতে সাবানের বিজ্ঞাপনে রুমাকে দেখে মৌরী টাসকি খায়। পরে পত্রিকা আর টেলিভিশনে তারকা-সংক্রান্তি অনুষ্ঠানগুলোতে মৌরী জেনেছে, সাবানের বিজ্ঞাপনের সেই মডেল কন্যা তার বান্ধবী রুমাই। অবশ্য তখন রুমা নাম বদলে হয়েছে সোনালি। অল্পদিনে মডেলিং আর ছোট পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে সিনেমার প্রথম সারির নায়িকা হয়ে ওঠে সোনালি।
আজ সেই রুমা, মানে সোনালি মৌরীর এত কাছে। গ্রিনপিসের দোতলায়। বহু বছর পর বান্ধবীকে দেখবে, এটা ভাবতে গিয়ে আনন্দে মৌরীর চোখে পানি চলে এলো। বিকেলেই সে দোতলায় যায় বান্ধবীর খোঁজে। সোনালি তখন বাসায় ছিল না। তার শাশুড়ি আর ননদ জানায় সোনালি শুটিংয়ে। রুমার বিয়ে হয়েছে, এই প্রথম জানল মৌরী। স্বামী নাকি চলচ্চিত্র প্রযোজক।
২.
আজো দোতলায় এসে নিরাশ হয়েছে মৌরী। সোনালি আজো বাসায় নেই। শুটিং নিয়ে ঢাকার বাইরে। কখন ফিরবে বলা যায় না। তার হাতে অনেকগুলো সিনেমার কাজ। তাই সারা দিন বাইরে থাকে। ফিরে মধ্যরাতে। এত রাতে তো আর কারো বাসায় যাওয়া যায় না। কিন্তু সোনালিকে একটুখানি দেখতে বড্ড মরিয়া মৌরী।
পড়ন্ত বিকেল। নিউমার্কেটে যাবে বলে বাসা থেকে বের হয় মৌরী। নিচতলার গ্যারেজে এসে দেখে দারোয়ান গেট খুলে দিচ্ছে। একটা সাদা প্রাইভেট কার ভেতরে এলো। কার থেকে যে নামছে, তাকে দেখে মৌরী অনেকটা চমকে উঠল। এ যে স্বয়ং সোনালি। কী ¯িœগ্ধ লাগছে। টিভি পর্দার থেকেও সে যে বাস্তবে দশ গুণ সুন্দরী। নায়িকা বলে কথা! মৌরী এগিয়ে যায় সোনালির দিকে।
কেমন আছিস তুই?
জি ভালো। ইয়ে মানে...
তুই করে বলাতে অবাক হলি? হা হা হা। আমাকে চিনতে পেরেছিস?
না তো।
আমি মৌরী। নোয়াখালীর মৌরী। মনে পড়েছে? তোরা এক সময় নোয়াখালী থাকতি।
ও আচ্ছা। অনেক দিন আগের কথা তো, ঠিক মনে নেই।
কী বলছিস? সত্যি মনে নেই?
না। আচ্ছা আমি ওপরে যাবো। খুব ক্লান্ত। সকাল থেকে শুটিং করেছি। ভালো থাকুন। একদিন বাসায় এসে চা খেয়ে যাবেন।
শোন না...
ছবি তুলতে হবে, তাই তো? এখন না আপু। খুবই ক্লান্ত আমি আজ। প্লিজ বিলিভ মি।
বলেই সোনালি হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। মৌরী সোনালির এই ব্যবহার আশা করেনি। সোনালি, মানে রুমা কি সত্যিই তার অতীত ভুলে গেছে? নাকি ভুলে থাকার অভিনয় করছে; ঠিক বুঝতে পারছে না মৌরী।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী
