গত বছর পশুর হাট থেকে কেনা গরুটার আদর করে নাম রেখেছিলাম ‘মায়া’। কয়েক দিনে গরুটার প্রতি আমার বেশ মায়া জন্মে গিয়েছিল। তাই সবাই গরুটাকে কোরবানি দেয়ার জন্য যখন নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি অন্য দিকে মুখ লুকিয়ে ছিলাম। কিন্তু বিপত্তি ঘটল তখনই, যখন সবাই গরুটাকে জবাই করতে নিয়ে গেল। গরুটা আচমকা খুব শক্তি দেখিয়ে শোয়া থেকে আবার উঠে দাঁড়াল। তারপর এক দিকে মুখ করে ছুট লাগাল। কিছু দূর গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। গরুটাকে ধরে আনার জন্য সবাই আমাকে ডাকল। কারণ এই ক’দিনে গরুর সাথে আমার মায়া আর সখ্যের কথা সবার জানা হয়ে গেছে। আমি অবসরে গরুর মাথায় বসে হাত বুলিয়ে দিতাম। আমার কাণ্ড দেখে অনেকে আড়ালে হাসাহাসি করত।
ঝুমবৃষ্টি আসার সাথে সাথে আমি গরুটা যাতে ভিজে না যায়, সে জন্য তার ওপরে ছাউনির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। সেটাকেও অনেকে নিছক পাগলামি মনে করেছিলেন। অথচ আমি ভাবতাম, আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দেয়া পশুটাকে গভীর মমতায় আগলে রাখা দরকার। সেই সাথে বিশেষ যতœ নেয়াও উচিত। কারণ পশুটার জীবন আমাদের জন্য উৎসর্গিত হতে চলেছে। আমি নীরবে গরুটাকে ‘মায়া’ বলেই ডাকতাম।
এরই মাঝে কেউ কেউ গরুটাকে ধরে আনার ব্যর্থ চেষ্টা করে ফিরে এলো। কারণ কেউ যখন গরুটার দিকে এক হাত এগিয়ে যায় গরু দশ হাত দূরে চলে যায়। ঈদের দিন আজ। গরু বেশি দূরে চলে গেলে ভোগান্তি বেড়ে যাবে। ডালিম কাকা আবারো হাঁক ছাড়লেন আমার উদ্দেশে। আমি এগিয়ে গেলাম। সবার ধারণা সঠিক। আমি যখন গরুটাকে আনার জন্য গেলাম তখন গরু ছুটে পালাল না। আমি হাত বুলিয়ে আদরের সাথে গরুটাকে ধরে নিয়ে এলাম। এবার আমি অন্য সবার সাথে ধরে গরুটাকে শুইয়ে দিলাম। মায়া এবার আর আগের মতো শক্তি দেখাল না। আমি ছিলাম তাই বোধহয় শান্ত ছিল। আমার মায়ার বাঁধনে কোনো খাদ ছিল না। তাই গরুটা কোরবানি হতে সঙ্কোচ করেনি! আমার চোখ ছল ছল করে উঠল। আমি আকাশপানে তাকিয়ে আল্লাহকে মনে মনে বললাম, ‘হে আল্লাহ, মায়ার কোরবানি কবুল করুন।’
প্রিয়জন-১৬২৪