মানব সভ্যতার শুরু থেকে কোরবানির প্রচলন চলে আসছে। হজরত আদম আ:-এর আমল থেকেই কোরবানির গোশত খাওয়ার চেয়ে জ্বালিয়ে দিয়েই কোরবানি নিশ্চিত করা হতো। আদম আ:-এর ছেলে হাবিল ও কাবিল তার বোন আকলিমাকে বিয়ে করা নিয়ে বিবাদ দেখা দিলে আদম আ:-এর আদেশে তারা কোরবানি করতে মক্কার মিনায় পাহাড়ে গিয়ে কোরবানি করে। কোরবানি করে তারা উভয়েই আল্লাহর কাছে কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করে এবং হাবিলের কোরবানির পশু আকাশ থেকে ধোঁয়াযুক্ত মেঘ সি-মোরগের আকৃতিতে এসে জ্বালিয়ে দেয়। তখন এটা কোরবানি কবুল হওয়ার মুজেজা হিসেবে দেখা হতো। এভাবে সব নবী-রাসূলের জামানায় কোরবানির প্রচলন ছিল। তবে কোরবানি কাহিনী হিসাবে নবী হজরত ইসমাইল আ:কে কোরবানি করাটা ইতিহাসে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমান কোরবানিকে হজরত ইবরাহিম আ:-এর সুন্নত হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। যদিও তা সব নবী-রাসূলদের আমলে কার্যকর ছিল।
হাদিস ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: এক রাতে স্বপ্নে দেখেন, কে যেন তাঁকে বলছেÑ ‘আল্লাহর নামে কোরবানি করো’। স্বপ্ন মোতাবেক তিনি ২০০ উট কোরবানি করেন। এভাবে তিনি তিন রাত একই রকম স্বপ্নে দেখেন এবং ২০০ করে উট কোরবানি করেন। চতুর্থ রাতে আবার স্পষ্ট করে স্বপ্নে দেখেনÑ ‘তুমি সন্তানকে কোরবানি করো’। নবী-রাসূলের স্বপ্নও অহি। ঘুম থেকে জেগে তিনি স্ত্রী সারাকে বিষয়টি বলেন। তখন ইসমাইল ছাড়া তাঁর আর কোনো সন্তান ছিল না। সারার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে উটে চড়ে মক্কায় চলে আসেন। তখন ইসমাইলের বয়স ৯ বছর। মক্কায় এসে হজরত ইসমাইলের মা হাজেরা বেগমকে ছেলেকে মাথা আঁচড়িয়ে চোখে সুরমা ও মেশক লাগিয়ে পরিষ্কার বস্ত্রাদি পরিয়ে সাজিয়ে দিতে বললেন। সে আমার সাথে দাওয়াতে যাবে।
হজরত ইবরাহিম আ: আগেই ছুরি ও রশি নিজ আস্তিনের নিচে রেখেছিলেন বলে জানা যায়। রওনা হয়ে ইসমাঈল বাবা ইবরাহিমের পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। এ সময় অভিশপ্ত শয়তান ইবলিশ হাজেরাকে এসে বলতে থাকেনÑ তোমার ইসমাঈল কোথায়? তিনি বলেন, তার বাবার সাথে দাওয়াতে গেছে। ইবলিশ বললেনÑ আফসোস, বাবা নিরাপদে ছেলেকে জবাই করতে নিয়ে গেছে। হাজেরা বললেনÑ বাবা কী কখনো সন্তানকে জবাই করতে পারে? জবাবে ইবলিশ বললÑ ইসমাঈলকে কোরবানি করতে আল্লাহর আদেশ হয়েছে। হাজেরা বললেনÑ এটা যদি আল্লাহর আদেশ হয়ে থাকে, তবে আমি তাতে সন্তষ্ট। শয়তান হাজেরার কাছে পাত্তা পেল না।
শয়তান ইসমাঈলের কাছে এসে বললÑ তুমি কোথায় যাচ্ছ? ইসমাঈল জবাব দেয়, বাবার সাথে দাওয়াতে যাচ্ছি। ইবলিশ বললÑ আরে না, তিনি তো তোমাকে হত্যা করতে নিয়ে যাচ্ছেন। ইসমাঈল জবাব দিলোÑ বাবা কখনো তার নিরপরাধ সন্তানকে হত্যা করতে পারে? ইবলিস বললÑ এটা আল্লাহর হুকুম হয়েছে। তখন ইসমাঈল বললেনÑ আমাকে জবাই করা যদি আল্লাহর হুকুম হয়, তবে আমি আল্লাহর হুকুমে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। কিছু দূর গিয়ে ইসমাইল জিজ্ঞেস করলেনÑ আব্বা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। ইবরাহিম আ: জবাব দিলেনÑ ‘আমি স্বপ্নে দেখি, আমি তোমাকে জবাই করছি’ (সূরা আস সাফফাত-১০২)। সাথে সাথে ইসমাঈল বলে ফেললেনÑ হে আমার বাবা, আপনি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তা করুন, ইনশাআল্লাহ আমাকে আপনি ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন’ (সূরা আস সাফফাত-১০২)। ইসমাঈল আরো বললেনÑ আপনি তওবা করুন যাতে শয়তান আপনাকে প্রতারিত করতে না পারে। ইসমাঈল আরো বললেনÑ ইবলিশ যদি আমাকে বিভ্রান্ত করতে আসে তবে আমি তাকে পাথর নিক্ষেপ করব। সে মতে ইবলিশ তাকে বিভ্রান্ত করতে এলে বাবা-ছেলে উভয়ই শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন। সে জন্য মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ আজ হজের অন্যতম বিধান।
হজরত ইসমাইল আ: তাঁর বাবাকে কোরবানি করার আগে তিনটি ওসিয়ত করেছিলেন। ১. আমার হাত-পা ভালো করে বেঁধে নেবেন, যাতে জবাই করার সময় আমার জ্ঞান হারা অবস্থায় নড়েচড়ে না উঠি। আল্লাহ না করুন, যতি এক ফোঁটা রক্ত আপনার কাপড়ে লেগে যায়, তবে কিয়ামতের দিন আমি অপরাধী না হয়ে যাই; ২. আমার মুখমণ্ডল জমিনের দিকে উপুড় করে রাখবেন। যাতে আমার চেহারা দেখলে আপনার মাঝে মমতা না আসতে পারে; ৩. আপনি যখন ঘরে ফিরে যাবেন তখন আমার মাকে আমার রক্তমাখা কাপড় দেবেন, যাতে তিনি এ কাপড় দেখে প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। এরপর হজরত ইবরাহিম আ: ছুরি চালাতে শুরু করলেন। কোনোভাবেই যখন কাটছিল না, তখন তিনি বিরক্ত হয়ে ছুরি জমিনের ওপর ছুড়ে মারলেন। ছুরির জবান খুলে গেল। ছুরি বললÑ হে নবী, আপনি আমার ওপর রাগ করবেন না। আপনার ওপর একবার কোরবানি করার আদেশ হয়েছে এবং আমার ওপর ১০ বার আদেশ হয়েছে না কাটার। এ সময় দুম্বা জবাই হলে জিবরাইলÑ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ! দোয়া পড়তে পড়তে এগিয়ে এলেন।
বড় পরিতাপের বিষয়, এই মহা মূল্যবান কোরবানি আজ গোশত খাওয়া আর আনন্দ-ফুর্তির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফ্রিজের মতো নিয়ামত পেয়ে আমরা বছর ভরে এ গোশত খাচ্ছি। এ কোরবানিতে যে গরিব মিসকিন, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের হক আছে, তা আজ বেমালুম ভুলে গেছি। মুসলিম শরিফের কোরবানি অধ্যায়ে বেশ কয়েকটি হাদিসে কোরবানির কথা বলা আছে। তার মধ্যে বেশির ভাগ হাদিসে তিন দিনের বেশি কোরবানির গোশত খেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে ১৯২৭ নম্বর হাদিসে নবী করিম সা: বেদুঈনের দুরবস্থা দেখে কোরবানির গোশত তিন দিনে খেতে নিষেধ করেন। ১৯২৮-১৯৩০ নম্বর হাদিসে পাথেয় হিসেবে এই খাওয়ার অনুমতি দেন। একইভাবে ১৯৩২ ও ১৯৩৩ নম্বর হাদিসে পরিবার-পরিজন, কর্মচারী-খাদেম ও মানুষের কষ্ট দেখে তাদের গোশত রাখার অনুমতি দেয়া হয়। তিন দিনের বেশি কোরবানির গোশত রাখার অনুমতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নয়। সেখানে শর্ত ছিল। আজ এ শর্তও প্রতিপালন হচ্ছে না আবার গোশতও রাখা হচ্ছে। আমার মনে আছে, সালটা ১৯৮৬ কি ১৯৮৭ হবে, কোরবানির দিন এক বাসায় গেলাম। ওই বাসায় সেদিন সকালে আগের বছরের কোরবানির গোশত পরিবেশন করা হলো আমাদের। কী চমৎকার সংরক্ষণ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায়। তা কী ওই হাদিসের নির্দেশনার আলোকে গ্রহণ করা সম্ভব?
অথচ রাসূল সা:-এর জামানায় যুবাইর ইবনুল আওয়ামের দাস ইবরাহিমের দাদী উম্মু আতার কাছে গিয়ে তিনি দেখলেন, আইয়ামে তাশরিফের পরও তাদের কাছে কোরবানির গোশত অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি বললেন, উম্মু আতা! রাসূল সা: মুসলমানদের তিন দিনের বেশি কোরবানির গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। উম্মু আতা বললেন, আমি কী করব, লোকেরা এত হাদিয়া পাঠায় যে তা শেষই হয় না। এখানে উম্মু আতা একজন দাসী ছিলেন। তারপরও যুবাইর ইবনুল আওয়াম তাকে এভাবে প্রশ্ন করেন।
কোরবানি আজ গোশত খাওয়া আর আনন্দ-ফুর্তির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে! একসময় কোরবানির গোশত জ্বালিয়ে ভস্ম করে কোরবানি কবুল হতো। সে সময় গোশত খাওয়ার সুযোগ ছিল না। পরে যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হজরত ইবরাহিম আ:-এর জামানায় ছেলেকে কোরবানির মাধ্যমে এ বিধান জারি করেছিল। এর আগে মানুষ কোরবানি করার কোনো নজির ছিল না। ৮৬ বছরে জন্ম নেয়া একমাত্র সন্তানকে আল্লাহর রাহে কোরবানি করা খুব সহজ কাজ নয়। বাবা নিজেকে কোরবানি করবে এমন বিষয় জানার পরও ছেলে নিজেকে সোপর্দ করা মোটেও সহজ বিষয় নয়। এসব ভুলে কোরবানিকে আমরা আজ গোশত খাওয়া ও আনন্দ-ফুর্তি করাই অনুষ্ঠান বানিয়ে নিয়েছি। গোশত খেতে বাধা নেই, তবে তা উল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষে অন্যথায় কোরবানি বৃথা অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। সুতরাং গোশত খাওয়া নয়, কুরবানির আজ কুরবানি চাই। হ
