পাড়ার কচিকাঁচারা দাদুর কাছে প্রায়ই আসে গল্প শোনার জন্য। তারা দাদুর কাছ থেকে মজার মজার গল্প শুনতে বেশ পছন্দ করে। আজকেও তারা দাদুর কাছে এসে ভিড় জমাল গল্প শোনার জন্য। দাদু তাদের কাছে ডেকে খুব আদর করে ও যতœসহকারে গল্প শোনায়। দাদু সবাইকে কাছে পেয়ে খুশি হয়ে বললÑ আজ তোমাদেরকে চতুর শেয়াল ও বোকা বাঘের গল্প শোনাব। চলো দাদুমণিরা, আমরা মনোযোগ সহকারে গল্পটি শুনি। দাদু গল্প বলা শুরু করলÑ এক জঙ্গলে বাস করত এক বাঘ। সে খুব বোকা ছিল। তার নিজের কোনো বুদ্ধি ছিল না। তার সাথে বাস করত এক দুর্দান্ত চালাক শেয়াল। শেয়ালের বুদ্ধিতে বাঘ চলতো। আর বাঘের সব কাজকর্ম শেয়ালকেই করতে হতো। তার বদলে বাঘ শেয়ালকে বন্যহরিণ বা অন্যপ্রাণী মেরে খেতে দিত। এভাবে দিনের পর দিন যেতে লাগল। বাঘের প্রতি শেয়ালের খুব রাগ জন্মাল। মনে মনে ভাবলÑ ‘এভাবে অন্যের অধীনে আর কত দিন থাকব। এবার এর নিস্তার চাই। বাঘকে কোনো রকমে ফাঁদে ফেলে মেরে ফেললেই আমার নিস্তার।’ পরের দিন শেয়াল বাঘকে তার বাড়িতে খানা খাওয়ার নেমন্তন্ন করল। খানার কথা শুনে বাঘ তো মহাখুশি। শেয়ালের কথামতো বাঘ পরের দিন সকালে তার বাড়িতে এসে হাজির। শেয়াল বাঘের জন্য হরিণ মেরে তাতে লঙ্কা মরিচগুঁড়ো মাখিয়ে দিলো। হরিণের গোশত খেয়ে বাঘ ঝালে হু-হা হু-হা করতে করতে এক দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিলো। আর মনে মনে ভাবল, শেয়ালটাকে উচিত শিক্ষা দেবে। পরের দিন বাঘও শেয়ালকে তার বাড়িতে খানা খাওয়ার নেমন্তন্ন করল। শেয়ালের মতো বাঘও একই ব্যবস্থা করে রাখল। আর এ দিকে চতুর শেয়াল বাঘের বাড়ি না গিয়ে কিছু দিনের জন্য আড়ালে থাকার সঙ্কল্প করল। তাই সে অন্যত্র চলে গেল। বাঘ তার জন্য অপেক্ষা করে না আসতে দেখে শেয়ালের বাড়ি গেল। তার বাড়িতে এসে দেখে সে নেই। অনেক ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া না পেয়ে বাঘ রেগেমেগে আগুন হয়ে বাড়ি ফিরল। আর ভাবল শেয়ালটাকে পেলে আস্ত গিলে খাবে। ধীরে ধীরে বাঘের রাগ কমতে লাগল। কিছু দিন পর শেয়াল বাঘের সামনে এসে হাজির হলো। চতুর শেয়াল বাঘের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বলল, তার জরুরি কাজ থাকায় সেদিন তার নেমন্তন্নে আসতে পারেনি, তাই সে দুঃখিত। বাঘ তাকে ক্ষমা করে পুনরায় কাছে টেনে নিলো এবং পরের দিন আবারো তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। আর বলে দিলো, যদি কোনো রকমে টালবাহানা করে তবে তার নিস্তার নেই। বাঘের কথায় রাজি হয়ে শেয়াল পরের দিন তার বাড়ি এলো। তার জন্য মস্তবড় হাড় রাখল। তারা দু’জন হাড় চিবাতে শুরু করল। বাঘ তো মনের সুখে হাড় চিবাতে লাগল। কিন্তু হাড় চিবাতে গিয়ে শেয়ালের একটি দাঁত ভেঙে গেল। শেয়ালের দাঁত ভাঙতে দেখে বাঘ তো মনে মনে হেসে কুটিকুটি। ভাবল, হতচ্ছাড়াটার উচিত শিক্ষা হয়েছে। অপর দিকে শেয়াল রাগে দাঁত কড়মড় করে মনে মনে বললÑ এই বাঘের বাচ্চাকে যত দিন না উচিত শিক্ষা দিতে পারব; তত দিন আর এই জঙ্গলে ফিরব না। এই বলে সে এই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ের ধারে অন্য জঙ্গলে চলে গেল। জঙ্গলের পাশেই গেরস্তের প্রচুর আখক্ষেত ছিল। শেয়াল মনের সুখে আখ ভাঙত আর খেতো। এমন করে আখক্ষেত প্রায় সাবাড় করে ফেলল। আর আখক্ষেতের মালিকেরা রাগে চোর ধরার জন্য খাঁচা দিয়ে ফাঁদ পাতল। কেউ ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই খাঁচার দরজা আটকে যাবে, এমন ব্যবস্থা করল। চতুর শেয়াল লুকিয়ে সব শুনছিল। সব শুনে মনে মনে ভাবলÑ এই তো সুযোগ বাঘকে উচিত শিক্ষা দেয়ার। তাই সে জলদি করে ওই জঙ্গলে চলে গেল এবং বাঘকে বলল, রাজার ছেলের বিয়ে তাই রাজা বাঘের জন্য পালকি পাঠিয়েছে। পালকির কথা শুনে বাঘ বিলম্ব না করে তড়িঘড়ি করে শেয়ালের সাথে রওনা হলো। হাঁটতে হাঁটতে তারা খাঁচার কাছে এসে হাজির হলো। বড়সড় সুন্দর খাঁচাকে পালকি ভেবে বাঘ ত্বরা করে খাঁচার ভেতর প্রবেশ করল। আর অমনি খাঁচার দরজা আটকে গেল। শেয়াল বাইরে থেকে অট্টহাসি হেসে বললÑ যাও মামা! ইচ্ছেমতো পেটভরে বিয়ের খানা খেয়ো। আমি চল্লুম...।
বাঘ বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নানান কাকুতি-মিনতি করল। কিন্তু শেয়াল কর্ণপাত না করে জঙ্গলে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর গেরস্তেরা এলো। খাঁচার ভেতরে বন্দী বাঘকে দেখে তারা লাঠিসোটা নিয়ে বাঘের ওপর চড়াও হলো। সবশেষে বাঘ আধমরা হয়ে খাঁচা ভেঙে তার জঙ্গলে পালাল। বাঘ রেগেমেগে আগুন হয়ে সিদ্ধান্ত নিলো শেয়ালকে সামনে পেলেই মেরে ফেলবে। কিন্তু পরক্ষণে ভাবল, তাকে কৌশলে মারতে হবে। পরের দিন বাঘ শেয়ালের কাছে গেলে বাঘকে দেখে শেয়াল হাউমাউ করে মায়াকান্না করে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। বাঘ তাকে ক্ষমা করে পুনরায় তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। আর শেয়ালকে মারার জন্য গাছের ওপরে জালের ফাঁদ পেতে রাখল। পরের দিন সকালে শেয়াল যখন জঙ্গলে হেঁটে বাঘের বাড়ি যাচ্ছিল; অমনি বাঘ জাল ফেলে শেয়ালকে বন্দী করে ফেলল। তাকে বন্দী করতে পেরে বাঘ তো মহাখুশি। ভাবল এক্ষনি তাকে মেরে ফেলবে। চতুর শেয়াল তৎক্ষণাৎ বুদ্ধি বের করে বলল, বাঘের জন্য সে বিশাল বড় উপহার রেখেছে। আর সেটা হলো তার জন্য খরগোশ ও হরিণ মেরে রেখেছে। খাবারের লোভে বোকা বাঘের জিবে জল এসে গেল। তাই সে শেয়ালকে মুক্ত করে দিলো। মুক্ত হয়ে শেয়াল বাঘকে মারার নতুন ফন্দি আঁটল। তাই সে বাঘকে তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। শেয়াল জঙ্গলের ভেতরে পুরনো একটি কুয়ার সন্ধান পেল। সে বুদ্ধি করে কুয়ার ওপরে একটি মাদুর বিছিয়ে দিলো। পরের দিন শেয়াল বাঘকে সাথে করে নিয়ে এলো এবং মাদুরের ওপর বসতে বলল। বাঘ যেই মাত্র মাদুরে বসল, অমনি সে ধপাস করে কুয়ার ভেতরে পড়ে গেল। কুয়াটি পুরনো বিধায় ময়লায় প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। তাই বাঘ পানি খেয়েও প্রাণপণে বেঁচে গেল। বাঘ আবারো রেগে আগুন হয়ে গেল। শেয়াল বাঘের মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য হরিণের গোশত নিয়ে তার বাড়িতে গেল। ফেরার পথে নদীতে পানি খাওয়ার জন্য গেল। নদীর তীরে বড় একটা কুমির ভাসতে দেখে পুনরায় বাঘের কাছে ফিরে এলো এবং তার জন্য নৌকা তৈরি করেছে বলে ফুঁসলিয়ে নদীর তীরে নিয়ে এলো। বাঘ তীরে এসে ওটাকে নৌকা ভেবে তার ওপর চড়ে বসল। আর দুষ্টু কুমির বাঘকে নিয়ে নদীর মাঝখানে গেল। সেখানে নিয়ে বাঘকে মেরে খেয়ে ফেলল। বাঘকে মরতে দেখে পাজি শেয়াল নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেল...।
গল্প বলা শেষ হলে দাদু বলেÑ ‘এ গল্পটি থেকে আমরা শিখতে পারলাম যে, দেহে বল থাকলেই সব কিছু করা যায় না; বরং মাথায় বুদ্ধি থাকলে ছোট্ট প্রাণীও অনেক কিছু করতে পারে। সুতরাং আমাদের উচিত, সবার আগে মাথা খাটিয়ে ভেবেচিন্তে কোনো কাজে অগ্রসর হওয়া।
