বোরকা পরলে পলিকে এত সুন্দর লাগে, আগে খেয়াল করেনি টুটুল। নেকাবের ফাঁক দিয়ে পলির চোখ জোড়া দেখতে বড়ই সুন্দর লাগছে। টুটুল পলিকে এভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে বলে লজ্জা পেলো পলি।
Ñ চোখ সরাও। কী দেখছো ওমন করে?
Ñবউ, তুমি এত সুন্দর কেন?
Ñহি হি হি।
পলির হাসিটাও বড় ভালো লাগে টুটুলের। এই হাসিটা দেখেই তো টুটুল প্রথম প্রেমে পড়ে পলির। টুটুলের মতো মিষ্টি চেহারার ছেলের ডাকে চুপ থাকতে পারেনি পলি। তাই তো সে বোন আর দুলাভাইয়ের আদর মমতাকে পরোয়া না করে রাতের আঁধারে টুটুলের জন্য ঘর ছেড়েছে।
ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারায় পলি।
বয়স তখন তার আট। ওই বয়সে রেহানা বুবু আর দুলাভাই কাশেমের সংসারে চলে আসতে হয়েছে তাকে। আপন মায়ের পেটের বোনের চেয়ে দুলাভাই যে বড্ড ভালোবাসত পলিকে। কাশেম বড় মায়া করে পলিকে ডাকত নাহার নামে। নাহার নামে যে কাশেমের একটি বোন রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। সেই বোনকে আর ভুলতে পারেনি কাশেম। নাহারের মৃত্যুর আট বছর পর পলি বোনের সংসারে চলে আসে এতিম হয়ে। শালী পলির মাঝে নাহারকে খুঁজে পায় কাশেম। পলিকে কাশেম যতবারই ডেকেছে, নাহার নামেই ডেকেছে। কাশেম পেশায় একজন রিকশাচালক। সবল পায়ে রিকশার প্যাডেল চেপে আসছে পনেরো বছর ধরে।
অভিভাবক হিসেবে দুলাভাই কাশেম আর বোন রেহানা বুবুকে পেয়ে পলি বাবা-মায়ের অভাব বুঝতে পারেনি। দুলাভাই তাকে স্কুলে ভর্তি করালেন।
মাধ্যমিক পাসের পর পলির জীবনে প্রেম আসে। প্রেমগীত শোনাতে আসে টুটুল। টুটুল টুলিপাড়ায় থাকে। কাজ করে হোটেলে। এই টুটুলকে ভালোবেসে অন্ধ হয়ে বোন আর দুলাভাইকে ফাঁকি দিয়ে রাত দুপুরে ঘর থেকে পালিয়ে আসে পলি। তারপর কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে। অতঃপর সংসার।
বন্ধু হানিফের ছেলের আকিকা প্রোগ্রাম থেকে ফিরছে টুটুল আর পলি। বাইরে বের হলে পলি সাধারণত বোরকা পরে আর নেকাবে মুখ ঢেকে বের হয়। এখন রিকশার অপেক্ষায় আছে টুটুল। ২০ মিনিট ওয়েট করার পরও রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা রিকশার আগমন। রিকশাওয়ালাকে দেখে বুক ধক্ করে উঠল পলির। এ যে স্বয়ং তার দুলাভাই কাশেম।
Ñ টুলিপাড়া যাবে?
Ñ যাব। উঠেন।
টুটুলের সাথে যখন রিকশায় চেপে বসে পলি, কাশেম তখন পলির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কিছু দেখার মতো হা করে তাকিয়ে থাকে। টুটুল সেটা খেয়াল না করলেও পলি খেয়াল করেছে। মুখে নেকাব বলে দুলাভাই তাকে চিনতে পারছে না।
রিকশা চলছে টুলিপাড়ার দিকে। বুকের ভেতরটা ভাঙতে শুরু করল পলির। গলা ভেঙে কান্নাও আসছে। একবার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘দুলাভাই, আমি পলি। আপনার আদরের শালী, যাকে নাহার নামে ডাকতেন।’
কাশেম ঘাড় ফিরিয়ে পলির দিকে তাকাচ্ছে। একবার নয়। বেশ কয়েকবার। টুটুল সেটা লক্ষ করেছে। একবার বলতে ইচ্ছে হলো, ‘ওই মিয়া, মেয়ে মানুষ বারবার দেখতে ভালো লাগে?’
এবারো কাশেম ঘাড় ফিরিয়ে পলির দিকে তাকাতেই প্রতিবাদ করে টুটুল।
Ñ তুমি বারবার আমার বউয়ের দিকে তাকাচ্ছো কেন?
Ñ উনার চোখ দু’টি বড় সুন্দর। ঠিক আমাদের নাহারের মতো।
Ñ মিয়া, ফাজলামোর আর জায়গা পাও না? তোমাদের সব মতলব বুঝি।
Ñ কিসের মতলব ভাইজান?
Ñ পটপট করো না। রিকশা চালাও।
টুলিপাড়ার মোড়ে এসে রিকশা থেকে নামার পরও কাশেম যখন আবার পলির নেকাবের ফাঁক দিয়ে চোখ জোড়ার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে, যে দৃশ্য দেখে টুটুল রাগে ক্ষোভে কাশেমকে কষে এক চড় মেরে বলে, ‘বার বার একদিকে নজর কেন হারামির বাচ্চা। একদম চোখ উপড়ে ফেলব।’ কাশেম কাঁপা গলায় বলে, ‘কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে তাকাইনি ভাইজান, উনার চোখ দুটো আমাদের নাহারের মতো। নাহার আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’
চড় মারা গালে ব্যথা পেয়ে হু হু করে কাঁদছে কাশেম। সেসব পরোয়া না করে টুটুল পলির হাত ধরে টেনে নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছে। পলির চোখ জলে ভিজে যাচ্ছে।

২.
রাতে পলি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে বিশাল এক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে সে। হঠাৎ পেছন থেকে তার দুলাভাই এসে দাঁড়ায়। দুলাভাইয়ের গালে পাঁচ আঙুলের লাল টকটকে দাগ। পলি দুলাভাইয়ের সে দাগ দেখে অঝোরে কেঁদে বলছে, ‘আমাকে মাফ করো দুলাভাই। আমার স্বামী তোমাকে চড় মেরে ওই দাগ বসিয়ে দিয়েছে।’
স্বপ্নের এ পর্যায়ে এসে ঘুম ভেঙে গেল পলির। পাশে অঘোরে ঘুমাচ্ছে টুটুল। বাইরে মধ্যরাতের ঝিকিমিকি চান্দের আলো। জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় পলি। দুলাভাইয়ের মুখের টুটুলের দেয়া চড়ের দাগটার কথা যতই মনে পড়ছে, পলির চোখ জোড়া ততই ভিজে আসছে।

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী