হঠাৎ একদিন বনে হুলস্থূল কাণ্ড শুরু হলো। কোত্থেকে যেন এক পাগলা সিংহ তাড়া খেয়ে বনে এসে প্রবেশ করল। বনে প্রবেশ করেই শুরু করে দিলো অত্যাচার। দুর্বল প্রাণীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের হত্যা করে খাওয়া শুরু করে সে। বড় প্রাণীদের ওপরও আক্রমণ করতে থাকে। ভয়ানক স্বরে গর্জন করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতি, গণ্ডার কিংবা বুনো মহিষের ঘাড়ে। তারপর কামড়িয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে এদের।
এদিকে পাগল সিংহের ভয়ানক আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সব প্রাণীই বন থেকে পালিয়ে যেতে চায়। প্রাণপ্রিয় এই বন ছেড়ে চলে যেতে তাদের খুব কষ্ট হবে। জিরাফ ও হরিণও বন ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবে। এই বন ছেড়ে গিয়ে থাকবে কোথায়? কেমন হবে তাদের অনাগত জীবন? এই চিন্তা করতে গিয়ে কেঁদে ফেলে হরিণ।
জিরাফ বলে, ‘ওহে বন্ধু, চিন্তা করো না। কিছু একটা হয়ে যাবে। দু’জনে মিলে যেকোনো জায়গায় থাকতে পারব।’
সব প্রাণী যখন সিংহের ভয়ে বন ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে তখন বুদ্ধিমান শিয়াল সবাইকে জড়ো করতে লাগল। শিয়ালের গুহায় ডাকা হলো সবাইকে।
শেষ বেলায় জিরাফ ও হরিণও সবাইকে একনজর দেখবে বলে শিয়ালের গুহায় আসে। সবাই সলাপরামর্শ করতে থাকে।
হরিণ বলে, ‘এই বন ছেড়ে আমরা যাবো কোথায়? এখানেই আমাদের জন্ম আর এখানেই থাকতে চাই আজীবন।’
জিরাফ বলে, ‘যে করেই হোক একটা ব্যবস্থা করুন শিয়ালপণ্ডিত।’
হাতি বলে, ‘আমার ঘাড় কামড়ে ধরেছে এই রাক্ষুসে সিংহ। আমি ওকে আমার শুঁড়ের ডগায় তুলে এমন আছাড় দেবো একেবারে হাড়গোড় ভেঙে ফেলব।’
সবাই বলে ওঠে, ‘যদিও বন ছাড়ার কথা ভাবিনি কখনো। এবার যখন এই বিপদ সামনে তাহলে বন ছাড়ার আগে সিংহের পেটেই যাবো, নইলে ওকে উচিত শিক্ষা দেবো।’
সবাই সায় দিলো। অবশেষে শিয়ালপণ্ডিত বলে, ‘আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস এই বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। আগে সবাইকে এক হয়ে ভাবতে হবে কিভাবে কি করা যায়? ভাবুন সবাই, ভাবুন।’
জিরাফ বলে, ‘সবাই মিলে একসাথে আক্রমণ করব।’
হরিণ বলে, ‘তাহলে তো ও ইচ্ছেমতো আমাদের খাবে।’
হাতি বলে, ‘না, অন্য কিছু ভাবতে হবে।’
শিয়ালপণ্ডিত বলে, ‘একটা উপায় আছে। সবাই শোনেন। আমরা বনের মাঝখান দিয়ে যে রাস্তা গেছে, সে রাস্তায় মাঝখানে একটা বিশাল গর্ত খুঁড়ব। সে গর্তে বিষাক্ত কাঁটাজাতীয় বৃক্ষের ডালপালা ফেলব। ফেলে সেগুলোর ওপর সবুজ ঘাসের স্তূপ ফেলে রাখব। আর সিংহ যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটবে তখন আমি ওকে গিয়ে বলব, ‘সিংহ ভায়া, ওদিকে যান। ওদিকে হরিণ ছানার দল হাঁটছে। আর যেই ওদিকে যাবে এমনি ধপাৎ করে ওই গর্তে পড়ে যাবে। বিষাক্ত কাঁটায় আহত হয়ে পড়ে থাকবে আর আমরা মাটি চাপা দিয়ে দেবো।’
সবাই এই সিদ্ধান্তকেই স্বাগত জানায়। সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তারা এ ফাঁদ তৈরি করে। পরদিন সকালে সিংহ এই রাস্তা দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে। শিয়াল এগিয়ে যায় তার দিকে। বলে, ‘ওহ সিংহ ভায়া। কোথায় যাচ্ছেন?’
রাগান্বিত স্বরে সিংহ বলে, ‘কেন রে তোকে বলতে হবে নাকি? আসব নাকি তোর ঘাড় মটকাতে?’
শিয়াল বলে, ‘আরে না ভায়া। আপনি নিশ্চয়ই শিকার খুঁজছেন? এদিকে যান। দেখেছি হরিণের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে।’
‘সত্যি বলছিস? না হলে কিন্তু তুই শেষ।’ সিংহ বলল।
‘তাড়াতাড়ি যান। নইলে ওরা চলে যাবে।’ শিয়াল মুচকি হেসে বলল।
সিংহ শিকারের নেশায় যেই দিলো দৌড় অমনি ধপাৎ করে গর্তে। গর্তে পড়েই চিৎকার করে বলছে, ‘উফ! কী বিষাক্ত কাঁটা বিঁধেছে পায়ে। শরীর জ্বালা করছে। পা নাড়াতে পারছি না। কেউ বাঁচা আমায়, কেউ বাঁচা।’
বনের সব প্রাণী এসে জড়ো হলো। সবাই সিংহের এ পরিণতি দেখে খুশি হলো। তারপর সবাই মিলে মাটি চাপা দিলো হিংস্র এই পশুকে।
বিপদ কেটে গেল। সবাই যার যার গুহায় ফিরে গেল। বনে আবার শান্তি ফিরে এলো।