'Fighting between various groups that has been going on for hundreds of years… USA should never have been in Middle East.'…'The stupid endless wars, for us, are ending!'
'Going into the Middle is the worst decision ever made in the history of our country!'… 'false & now disproven premise, WEAPONS OF MASS DESTRUCTION. There were NONE!' —সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। অনেকেই অভিযোগ করেন তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে শুধু ব্যবসা বোঝেন, স্ট্র্যাটেজিক বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অভিজ্ঞ নন। ইমরান খানও সম্প্রতি সিএনএনের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পকে নিয়ে হয়তো অনেক কথাই বলা যায়। তবে তিনি যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চান। বুশ প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র একসময় পৃথিবী ওলটপালট করে দিয়েছিল ইরাক ও আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়ে। ওবামা তার শাসনামলে চমৎকার বক্তৃতা দিতেন, কিন্তু অস্থিতিশীল সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বে বেশ বড় রকমের নৈরাজ্য সৃষ্টি করে গেছেন বলে অভিযোগ আছে। আজ লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর, ইয়েমেনসহ যেসব দেশে বিশৃঙ্খলা চলছে তার জন্য ওবামা প্রশাসনের এলোমেলো সিদ্ধান্তকে অনেকে দায়ী করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো এসব থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন যেখানে সে দেশের শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য। তিনি গত ৯ অক্টোবর বলেছেন ইরাক, আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠিয়ে ও যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তিনি ওইসব যুদ্ধকে ‘দি স্টুপিড এন্ডলেস ওয়ারস্’ হিসেবে চিহ্নিত করে মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছেন, আফগানিস্তান থেকেও সরিয়ে নিতে চাচ্ছেন। তিনি বেশ সাহস করেই তার টুইটার বার্তায় স্বীকার করেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে যাওয়া ছিল মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত।’ সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী রামসফেল্ডের সাক্ষ্য অনুযায়ী ইরাকে যে মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্রের অভিযোগে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল সেই সম্পর্কেও তার মত হচ্ছে, আমেরিকা যুদ্ধে গিয়েছিল ভুয়া ও অপ্রমাণিত প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে। উইপনস অফ মাস ডেসট্রাকশনস! ওসব কিছুই ছিল না!
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তিনি অন্তত হিপোক্রেট নন। তারই রিপাবলিকান পার্টি একসময় যে ভুল তথ্য দিয়ে মার্কিনিদের বিভ্রান্ত করেছিল ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অন্য দেশে আগ্রাসন চালিয়েছিল তিনি সেসবকে সরাসরি মিথ্যে, কুহেলিকা বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। তার গত তিন বছরের শাসনামল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনি হুমকি, ধমকি হয়তো দেন, দক্ষিণ চীন সাগরে নৌবহর পাঠান, কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে বেশি আগ্রহী। যুদ্ধ এড়িয়ে কৌশলগত সমস্যার সমাধান কিভাবে করা যায় তাই তার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে চরম বৈরী শক্তির সাথেও তিনি তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে সমঝোতার দ্বার খোলা রাখতে তৎপর। ইরান-সৌদি আরবের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তিতে তাই পাকিস্তানের ইমরান খানের সহায়তা চেয়েছেন ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়ায় প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে পা রেখে তিনি সমঝোতা প্রত্যাশা করেছেন। এই উপমহাদেশের সবচেয়ে জ¦লন্ত সমস্যা কাশ্মির নিয়েও তিনি মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত থেকে সরে আসতে চাইছেন। কিন্তু পৃথিবীর বহু এলাকা ও দেশ যেন তা চায় না। বরং অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য যেন জেঁকে বসেছে চার পাশে। এই নৈরাজ্য-গণতন্ত্রহীনতার ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা মানুষের মিছিলে যেমন দৃশ্যমান তেমনি আদর্শগত ভেদাভেদ থেকেও চলছে সীমাহীন, নিষ্ঠুর সব প্রক্সি ওয়ার ও গৃহযুদ্ধ। এসবের শেষ কোথায় তা কেউ জানে না।
যা হোক, পুরো পৃথিবীর কৌশলগত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা অত সহজ নয়। তবে স্নায়ুযুদ্ধের সময় আটলান্টিক মহাসাগর এলাকা যেমন সামরিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এখন তা সরে এসেছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে দক্ষিণ চীন সাগরে। একই সাথে উত্তপ্ত হয়েছে পারস্য ও আরব সাগর অঞ্চল। মাঝখানে বঙ্গোপসাগরের চুম্বক এলাকাটাও পিভোট হিসেবে ক্রমান্বয়ে সক্রিয় হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়া বেশ ক’টি প্রচলিত যুদ্ধ যেমন দেখেছে তেমনি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের মুখোমুখিও হয়েছে। পাকিস্তান, ভারতে এখনো চলছে বহুমাত্রিক ইনসারজেন্সি। দু’দেশের লাখ লাখ সৈন্য প্রতিদিন মোকাবেলা করছে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের। একসময় স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা গিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়াতেও স্থিতিশীলতার সুবাতাস বইবে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। একমাত্র কাশ্মির সমস্যাকে কেন্দ্র করে এই উপমহাদেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তা উল্লেখ করতে গিয়ে দু’জন মার্কিন গবেষক সেই নব্বই দশকে সতর্কবার্তা প্রদান করেন। তারা এই অঞ্চলকে চিহ্নিত করেন, The most dangerous place on EarthÕ’ অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এলাকা হিসেবে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক উইলিয়াম ইরোরুজ ও এনবিসির প্রযোজক বরার্ট উইনড্রোম তাদের লেখা 'Critical Mass' নামের একটি বইয়ে উল্লেখ করেন, কাশ্মিরকে ঘিরে দু’টি পারমাণবিক প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান যেকোনো সময় ‘চরম ব্যবস্থা’ নেয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতে পারে। সে সময় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র বিশ্লেষণও ছিল অনেকটা একই রূপ। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪ সংখ্যা ‘সাপ্তাহিক এশিয়াউইক’-এ বলা হয় সিআইএ বহু আগেই এই অঞ্চলকে ‘বিশ্বের পরবর্তী ঝলকবিন্দু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আজ এত বছর পরও এসব উদ্বেগজনক ভবিষ্যদ্বাণী সমান কার্যকর রয়েছে। আজ ভারত, পাকিস্তান সামরিক শক্তিতে ও প্রযুক্তিতে এতটাই এগিয়ে গেছে যে, অনেক উন্নত দেশও তাদের কাছে বিশেষ কিছু নয়। এখানে আবার শুরু হয়েছে জোটবদ্ধতার এলোমেলো সমীকরণ, যার হিসাব মেলানো কষ্টসাধ্য।
পৃথিবীতে এখন ন্যাটো জোটের সরাসরি কোনো স্বীকৃত প্রতিপক্ষ জোট নেই। তবে ন্যাটো মহাসচিব মনে করেন এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘ইসলামী জঙ্গিবাদ’ মোকাবেলা করা। তাদের কাছে নন স্টেট অ্যাক্টর ও দেশে দেশে নিবর্তনবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এসিমেট্রিক ওয়্যারগুলো বেশ বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এসব প্রথাগত সমরসজ্জা ও প্রক্রিয়া দিয়ে মোকাবেলা করা খুব কঠিন। এ ছাড়া নৈরাজ্যের সম্মুখীন বিভিন্ন দেশ থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ শরণার্থীকেও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে আশ্রয় দিতে হচ্ছে মানবিক কারণে। তবে ন্যাটো এখনো সরাসরি চীনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেনি। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথাবার্তা ও কাজ দেখে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মনে হতে পারে। ¯œায়ুযুদ্ধ অবসানের পর মার্কিনিরা দীর্ঘ দিন একচেটিয়াভাবে বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় বড় বড় সিদ্ধান্ত নিলেও এখন প্রেসিডেন্টের ট্রাম্পের কথাতেই সেসব ছিল ভুল। তারা দেখছে চীন এগিয়ে যাচ্ছে নীরব জোটবদ্ধতায় ও সামরিক প্রযুক্তিতে। এটাই মার্কিনিদের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় চীনের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল দা কুমড়ো সম্পর্ক। সীমান্তে তারা বেশ ক’টি বড় বড় যুদ্ধও করেছে। ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন-চীন জোটবদ্ধতার বিরুদ্ধে ভারতের সাথে সরাসরি সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধে চীন যাতে ভারতের সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করতে না পারে সে জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের সীমান্তে প্রায় চল্লিশ ডিভিশন সৈন্য মোতায়েন করেছিল। চৌ এন লাই ওই অবস্থায় পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে চীন পাকিস্তানের সহায়তায় ভারতের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে পারবে না। মঙ্গোলিয়া নিয়েও দুই দেশের ছিল চরম বৈরিতা। সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে হটিয়ে মঙ্গোলিয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীনের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরূপ সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করে তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মজবুত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার। এরপর চীন যখন দেং শিয়াও পিং এর আমলে তার বদ্ধ দুয়ার পৃথিবীর কাছে খুলে দেয় তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিণত হয় চীনের অন্যতম বিনিয়োগ ক্ষেত্রে। দেং দীর্ঘ সফরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। তাকে দেয়া হয় অবিস্মরণীয় অভ্যর্থনা। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করে বসলে মার্কিনিদের সাথে জোট বাঁধে চীন। বলা চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণেই চীন তার সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু একুশ শতকে এসে চীনের হাতে আসতে শুরু করে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কাজে লাগিয়ে তারা সামরিক খাতে বিনিয়োগ করতে থাকে পাশ্চাত্যের সামরিক সক্ষমতার সমকক্ষ হওয়ার উদ্দেশ্যে। তাই আজ চীন হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষ।
অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আর কখনো একটি পরিপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে পশ্চিমাদের সেভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পর রাশিয়া বেশ বেকায়দায় পড়ে যায়। চীন স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার সাথে ব্যাপকাকারে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেয়। বর্তমানে রাশিয়ার সাথে তাদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। তবে এখনো তা পরিপূর্ণ কোনো সামরিক জোটবদ্ধতায় রূপ নেয়নি। মার্কিনিরা এ দুই দেশের বন্ধুত্বকে নিয়েই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। চীন-রাশিয়ার এই সম্পর্ক ইতোমধ্যেই পুরনো শক্তিসাম্য ও জোটবদ্ধতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। মার্কিনিরাও অনেক ক্ষেত্রে কাছে টেনে নিয়েছে একসময়কার বৈরী শক্তিকে। যে ভিয়েতনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতা নিয়ে মার্কিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল সেই ভিয়েতনামই এখন মার্কিনিদের অন্যতম মিত্র। ওই দেশের দানাং বন্দরে রীতিমতো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অবস্থান নিয়েছে ও ভিয়েতনাম নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে মার্কিন নৌ-সেনারা। ভিয়েতনামে রয়েছে বহু মার্কিন ও পশ্চিমা দেশের শিল্প বিনিয়োগ। চীন হলো ভিয়েতনামের বৈরী রাষ্ট্র!
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি সরাসরি এমন না হলেও কোল্ড ওয়ারের সময় ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র ছিল। ভারতের প্রায় সব মিলিটারি হার্ডওয়্যার সরবরাহ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এমনকি আশির দশকে তারা ভারতকে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন দেয় আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের কথা চিন্তা করে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালালে ভারত কোনো রাখঢাক না করে ওই আগ্রাসনের সমর্থন করে। কুয়েতে ১৯৯১ সালে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম নামের মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অপারেশন শুরু হলে তাতেও ভারত বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু আজ? মার্কিনিদের কাছে ওইসব ইস্যু গৌণ হয়ে গেছে। বরং ইন্দো- প্যাসিফিক ডিফেন্স ফোরামের আওতায় ভারত এখন মার্কিনিদের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র! ভারতকে মার্কিনিরা গত ক’বছর যাবত পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার, অ্যাওয়াকস্ সরবরাহ করে আসছে। সম্প্রতি তারা অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারও দিয়েছে। ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে ‘পাক ফা’ ( এসইউ-৫৭) মাল্টিরোল ফাইটার বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েও এখন তা না নিয়ে কিনছে ফ্রান্সের রাফালে জঙ্গিবিমান। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার রাশিয়ার ওপর আরোপিত অবরোধের জন্য সে দেশ থেকে কোনো সমর সরঞ্জাম কেনা কঠিন জেনেও ভারত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ট্যাংক কিনতে যাচ্ছে। মার্কিনিরা এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও এখন আপাতত কিছু বলছে না। চীনকে ঘিরে ফেলতে হলে ভারত তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন চীন রাশিয়ার কৌশলগত মিত্র হলেও রাশিয়া কিন্তু তার দীর্ঘদিনের মিত্রকে একেবারে পরিত্যাগ করছে না। এ দিকে পাকিস্তানের সাথে সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিনিরা দুয়ার বন্ধ করে দেয়নি। ভারতকে কোনো আগ্রাসী বা অ্যাটাকিং অস্ত্র যেমন জঙ্গিবিমান না দিলেও তারা পাকিস্তানকে ঠিকই এফ-১৬ ফাইটার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম, অত্যাধুনিক দূরপাল্লার কামান সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের যে জিও স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান তাকে পরিত্যাগ করতে চাচ্ছে না মার্কিন প্রশাসন।
এ দিকে দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগর এলাকার মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে বঙ্গোপসাগর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারতকে মাঝখানে রেখে চীন-পাকিস্তান ও মিয়ানমার হয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অধীন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলায় কৌশলগত পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। চীন ২০০৯ সাল থেকে পাকিস্তানের গোয়াদরের পাশাপাশি বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনসহ বেল্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-বিআরআই প্রকল্প নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছিল। চীন অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশকে বিআরআই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার জন্য। এরও আগে বাংলাদেশ-চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার করিডোর (BCIM) প্রকল্পের প্রস্তাব দেয় চীন। একটিও ভারতের অনীহার কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশও এসব প্রস্তাবনার কোনটির অংশীদার হয়নি। ফলে মিয়ানমার চীনের প্রস্তাব ত্বরিত গ্রহণ করে। এখন আরাকান অঞ্চলে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করেছে ও কুনমিং পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থা, গ্যাস পাইপলাইন গড়ে তুলছে। মার্কিনিরা এসব প্রকল্পকে শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে গণ্য করে না। এগুলো তাদের কাছে কৌশলগত ইস্যু। এ ছাড়া ১৯৭৬ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামরিক অংশীদার ও সহায়তাকারী। বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের প্রায় নব্বই ভাগ এখনো চীননির্ভর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত কখনোই চায় না ভারতের দুই পাশে দু’টি দেশ চীনের দুর্গ ি হসেবে গড়ে উঠুক। তবে রোহিঙ্গা সমস্যা কৌশলগত অনেক সমীকরণকেই ওলটপালট করে দিয়েছে। চীন হয়তো বাংলাদেশের ওপর বিরক্ত হয়ে জাতিসঙ্ঘে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ভেটো প্রদান করে আসছে। সাথে আছে তাদের মিত্র রাশিয়া। কিন্তু যে ভয়ে চীন এসব করছে তাই হয়তো বাংলাদেশকে পলিসি পরিবর্তন করতে বাধ্য করতে পারে। চীনের ওপর হয়তো আর ভরসা রাখতে পারবে না বাংলাদেশ। দশ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে অব্যাহত নিরাপত্তা সমস্যা মোকাবেলা করা দিন দিন দুষ্কর হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রভাব অবধারিতভাবে বাংলাদেশে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই আলামত কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাল্টিরোল জঙ্গিবিমান, অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, মিসাইল, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জামসহ ব্যাপক সামরিক সহযোগিতা কামনা করেছে। এর মাঝে ভারত এগিয়ে গেছে একধাপ। উপকূলবর্তী এলাকায় বিশটি রাডার স্থাপনা বসানোর জন্য সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশের সাথে। নিশ্চিতভাবেই এসব চীনা অক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে নেয়ার ইঙ্গিত। রোহিঙ্গা সমস্যা হয়তো বাংলাদেশের সামনে ভিন্ন কোনো পথ খোলা রাখছে না। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর এলাকায় দীর্ঘদিন চলে আসা চীনকেন্দ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য হয়তো পরিবর্তন হয়ে যাবে অদূরভবিষ্যতে।
আসলে বর্তমানে পৃথিবীতে কৌশলগত পর্যায়ে যা হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রেই এলোমেলো, স্বাভাবিক ধারণার বাইরে। তবে সমীকরণটি মোটেই সহজ নয়, অদ্ভুত ও জটিল। এই জটিলতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিহার করার আগ্রহ বা পলিসি কত দিন, কতটুকু কার্যকর হবে তা বলা সম্ভব নয়। ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বহু এলাকায় যেভাবে স্বৈরশাসন ও নিবর্তনবাদ চেপে বসেছে ও গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত সেখানে এখনো সাম্যাবস্থা বজায় রাখার জন্য কার্যকর কোনো দ্বিমেরু বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কার্যকরভাবে তা গড়ে উঠবে কি না তাও নিশ্চিত নয়। এমন অবস্থায় কৌশলগত প্রতিযোগিতা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে করে তুলবে আরো ঘোলাটে। হ
লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক। বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক
