মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পুড়ে প্রাণোচ্ছল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ যখন তার জয়যাত্রা শুরু করেছিল, তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রটি সম্পর্কে দেশী ও বিদেশী বহু পর্যালোচক এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই আশার কথা শুনিয়েছেন। অন্যান্য নতুন রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ যে তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে এবং এসব বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের জন্য কালে যে শুভ ফল বয়ে আনবে, তাও বলেছেন। এক. ছোট্ট ভূখণ্ডে বিরাট জনসমষ্টি বসবাস করলেও, এই জনসমষ্টি নৃতাত্ত্বিক সূত্রে সমজাতিক (homogeneous) এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সমমাত্রিক। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এমনটি সাধারণত দেখা যায় না। বাংলাদেশে বাঙালিরাই হলেন শতকরা ৯৮ ভাগ। এ দেশে অন্যূন ৫৭টি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বাস করলেও তাদের সংখ্যা শতকরা ২ এর মতো। ৯৮ ভাগ বাঙালির মধ্যে শতকরা ৮৮-৯০ ভাগ মুসলমান। ভাষার দিক থেকেও দেখা যায় প্রায় ৯৭-৯৮ ভাগ জনসমষ্টির ভাষা বাংলা। জীবনাচার, চালচলন, খাদ্যাভাস, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং প্রাত্যহিক জীবনের আচার-আচরণেও এক ধরনের সমজাতীয়তা পরিস্ফুট। দুই. ছোট্ট বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুষম অগ্রগতির নিদর্শন এখনো সুস্পষ্ট হয়নি বটে, কিন্তু আঞ্চলিকতার বিষাক্ত দন্ত-নখরের তীক্ষèতা যা জাতীয় রাজনীতিকে খণ্ডছিন্ন করতে পারে তা অনুপস্থিত। তিন. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমানভাবে বঞ্চিত হয়ে, সমানভাবে শাসকশ্রেণী ও উৎপীড়কদের নির্যাতন সহ্য করে, বিরাট জনসমষ্টির বৃহৎ অংশটি শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর থেকেও আশা-আকাক্সক্ষায় ভয়ঙ্করভাবে ভবিষ্যৎমুখী। চার. বাংলাদেশের জনসমূহের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও উন্নয়নমুখী রাজনীতি সম্পর্কে তাদের মধ্যে গড়ে উঠে এক ধরনের সহমত। হাজার বছর ধরে একই ভূখণ্ডে বসবাস করে, সনাতন কৃষির ওপর নির্ভরশীল থেকে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত সমতলে দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে পারস্পরিক সহযোগিতার মন্ত্রেই হয়েছেন দীক্ষিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে তাই স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠে সহনশীলতা। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এ কারণে কোনো সময় এ ভূখণ্ডে তার কুটিল ফণা উদ্যত করতে সক্ষম হয়নি। পাঁচ. অন্য সময় না হলেও অন্তত সঙ্কটকালে বাংলাদেশের মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক কাতারে দাঁড়াতে শিখেছে। এ দেশের সামাজিক শ্রেণীগুলোও (Social Forces) এ সময়ে সাধারণ মানুষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৮-৫২ সময়কালের ভাষা আন্দোলনে, বিশেষ করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নির্মম সময়েও দেখা গেছে বাংলাদেশের মানুষ সঙ্কটকালে কত ঐক্যবদ্ধ, কত সংহত, কত দৃঢ়সঙ্কল্প। নেতৃত্বের দিকে না তাকিয়ে সাধারণ মানুষ এগিয়ে গেছেন মিছিলের অগ্রভাগে। কারো ডাকের অপেক্ষা করে তারাই ছুটে গেছেন সবার আগে। অনেকে আহত হয়েছেন। কেউ বা নিহত হয়েছেন। কেউ কিন্তু আর্তনাদ করেনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল না কোনো নেতার, ছিল না কোনো দলের, গণযুদ্ধের মাধ্যমে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর শত্রুকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন এ দেশের কৃষকের ছেলেরা, কারখানার শ্রমিকেরা, অখ্যাত পল্লীর অচেনা তরুণেরা, শহরের উদ্ধত বালকেরা। সাথে ছিলেন হাজার হাজার শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী-চিকিৎসক-ব্যবহারবিদ-প্রশাসক-রাজনৈতিককর্মী-সংস্কৃতিসেবক-লেখক-বুদ্ধিজীবী। ফলে এত অল্প সময়ে অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে এবং বাংলাদেশের জনগণের উত্তরণ ঘটেছে একটি সুসংবদ্ধ জাতিতে।
মাত্র চার দশকের মধ্যে জাতি হিসেবে বাংলাদেশ কিন্তু আজ বিভক্ত। খণ্ডছিন্ন। বিভক্ত বিদগ্ধ সমাজ। সাংবাদিকতা জগৎ, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীমহল, সংস্কৃতিসেবী, এমনকি ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক পর্যন্ত। বিভক্ত প্রশাসকরাও, ব্যবহারবিদ, এমনকি প্রাণ রক্ষাকারী চিকিৎসকেরাও। অনেকে বলেন, বিভক্ত সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল বিচারকেরাও। শুধু বিভক্ত নয়, অসহিষ্ণুতার তীর ঘেঁষে, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত। এমতিতেই এই সমাজ ধনী-দরিদ্র, সাক্ষর-নিরক্ষর, নগরবাসী-গ্রামবাসী, সুবিধাভোগী-বঞ্চিত প্রকরণে খণ্ডছিন্ন। রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক ডান-বাম কেন্দ্র এই বিভাজন তো রয়েছেই। তার ওপরে ক্ষমতাসীনেরা নতুন রেখা টেনেছেন স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ। সব মিলিয়ে জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে এখন চলছে এক নৈরাজ্য। এ অবস্থা অনভিপ্রেত। হাত-পা বেঁধে কাউকে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামালে যা হয়, হাজারো প্রকরণে বিভক্ত জাতির অগ্রগতি অর্জনের প্রতিযোগিতায় তেমনি ফল আসে। তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। মতাদর্শভিত্তিক বিভাজন কাম্য। কেননা তা সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিভাজন বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের স্লোগানে বিভাজন অত্যন্ত অশুভ। এই বিভাজন স্বাধীন চিন্তা অথবা স্বাধীনভাবে মতবাদ ব্যক্ত করার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করে। এতে আক্রমণাত্মক উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। হিংসা-প্রতিহিংসামূলক কার্যক্রমের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। পরিশীলিত রুচির ক্ষেত্র সীমিত হয়ে আসে। অশোভন উচ্চারণের প্রবণতা ভয়ঙ্করভাবে বৃদ্ধি পায়। জাতীয় জীবন হারায় তার সৃষ্টিশীলতা। অগ্রগতির প্রতি স্তরে স্থবিরতার জন্ম হয়। রাজনীতি ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদর্শন শুরু হয়। প্রতিপক্ষ দমনের মাত্রা আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। নেতার প্রতি আনুগত্য ছাড়া অন্য কোনো আচরণ কর্মীদের কাছ থেকে আসে না। নেতাকেন্দ্রিক দলীয় বিভাজনের কবলে আজ বাংলাদেশ। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থে, সুস্থ রাজনীতির স্বার্থে, দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্যের স্বার্থে।
রাজনৈতিক দল সংগঠিত হয় কিছু আদর্শ ও কর্মসূচির ভিত্তিতে। প্রতিপক্ষ দলেরও থাকে তেমনি স্বতন্ত্র আদর্শ ও কর্মসূচি। ভিন্ন পথে হলেও সব রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য কিন্তু এক ও অভিন্ন। প্রতিটি দল জনকল্যাণমূলক এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই হাজারো ভিন্নতা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে গড়ে ওঠে ঐকমত্যের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র। যে সমাজে ঐকমত্যের বিস্তৃতি যত ব্যাপক, সেই সমাজ তত সুস্থ, সুঠাম ও অগ্রসরমান। জন্মক্ষণ থেকেই বাংলাদেশ এই সম্পদ নিয়েই পথচলা শুরু করে। বর্তমানে তা নিঃশেষ হয়েছে। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রের দৈন্যতা অত্যন্ত প্রকট, কেননা এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে আদর্শের ভিত্তি যত সুদৃঢ়, তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে ব্যক্তিত্বের প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণ। উইলিয়াম শেক্সপিয়র (Shakespeare) তার Twelfth Night নাটকের Act II (Sc 4)-G লিখেছেন : ("Some are born great, some achieve greatness, and some have greatness thrust upon them.") বাংলাদেশে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা কিন্তু অর্জিত নয়, অনেকটা চাপিয়ে দেয়া, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা তাই সেই নেতৃত্ব সঠিকভাবে ধারণ করতে সক্ষম হয়নি। জাতীয় মনন সেই নেতৃত্বে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে ঐকমত্যের পরিবর্তে এখানে সৃষ্টি হয়েছে তীক্ষè ভিন্নমত এবং এর বেশির ভাগই ওই সব ব্যক্তির চিন্তাভাবনা, ব্যর্থতা ও সাফল্যকে ঘিরে। এই ভিন্নমতের গাঢ় অন্ধকারে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা পথ হারিয়েছে। ‘আলোর হাজার বিন্দুর’ ('Thousand points of light') ঔজ্জ্বল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে জাতি দিনের পর দিন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিযোগিতা পরিণত হয়েছে বৈরিতায়। প্রতিপক্ষ হয়েছে শত্রু। ফেলো ট্রাভেলররাই শুধু মিত্র, তা যতই স্থূলবুদ্ধির হোক না কেন। শুধু সমর্থকরাই বন্ধু, তা যতই অর্বাচীন হোক না কেন। একটি অগ্রসরমান সমাজের জন্য এই বিভাজন কাম্য হতে পারে না। চিন্তাভাবনার স্থবিরতার গন্তব্যে এসব বিভাজন হলো মহাসড়ক। সৃজনশীল কর্মের অপমৃত্যুর অন্ধকূপ হলো এই বিভাজন। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন : ‘নেতৃত্ব কারো কারো কাছে মস্ত বড় এক নাটকের মতো। নাটকের সূর্যধ্বনিও কেউ কেউ শুনে থাকেন। আমি কিন্তু (নেতৃত্বের) ইতিহাসকে দেখি বিরাট এক গ্রন্থরূপে এবং প্রতিদিন আশাব্যঞ্জক ও অর্থপূর্ণ কর্মের দ্বারা এক একটি পৃষ্ঠা পূরণ করি।’ [Some see leadership as high drama and hear the sounds of trumpet calling. But I see history (of leadership) as a book with many pages and each day we fill a page with acts of hopefulness and meaning.] আশাপ্রদ ও অর্থবোধক কর্মের বিরাট সমারোহ হিসেবে নেতৃত্বকে এ দেশের কেউ দেখেন না। এ দেশের সবাই রাজনীতি করেন এবং বোঝেন রাজনীতির কলাকৌশল। রাজনীতি ও রাজনীতির কলাকৌশল বলতে তারা বোঝেন রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ক্ষমতা সৃষ্ট বৈভব, প্রভাব ও মর্যাদার মতো কাক্সিক্ষত বিষয়গুলো। ক্ষমতা লাভ এবং একবার ক্ষমতা হাতে পেলে কিভাবে তা স্থায়ী করা যায় তার সার্বিক প্রয়াসেই সীমিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যক্রম।
এ দেশে নেতৃত্ব তাই হয়েছে উত্তেজনাকর এক নাটক। ইতিহাস রূপে অনুভব করার মতো মানসিক সমৃদ্ধি অর্জনে এ দেশের নেতানেত্রীরা ব্যর্থ হয়েছেন বলেই নাটকের নায়ক ও খলনায়কের ভূমিকার মতো বিভাজন ঘটিয়ে তা পরিব্যাপ্ত করেছেন।
সমাজে কোন কাজটি উত্তম আর কোনটি মন্দ, তা কোনো নাগরিক সরকারের কাছ থেকে শিখতে চায় না। শিখতে চায় না কোনটি নীতিসম্মত আর কোনটি নীতিবিরুদ্ধ। জনগণ শুধু জানতে চায় যারা নিজেদের জন্য সোনাচাঁদির পাহাড় গড়েন আর যারা নিভৃতে নীরবে নিজেদের অন্তরের উষ্ণতা এবং আত্মার মহিমায় সমাজে ছোট ছোট শান্তির নীড় রচনা করেন তাদের পার্থক্য নির্ণয় করতে সরকার শিখেছে কি না। আর এ জন্য প্রয়োজন যে অন্ধকার কুঠরিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বন্দী হয়ে পড়েছে তার দ্বার উন্মোচন যেন মুক্ত আলোয়, নীল আকাশের নিচে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার খোলস পাল্টাতে সক্ষম হয়। রাজনীতি সুস্থ না হলে বিভাজনের অভিশাপ থেকে এ জাতি মুক্তি পাবে না। অসুস্থ রাজনীতি নিকটকে দূর করেছে। আপনকে পর করেছে। ঐক্যের গ্রন্থি শিথিল করে বিভক্তির মাত্রা বাড়িয়েছে। সহনশীল উদারতাকে নির্বাসন দিয়েছে। বিভক্তির আগ্রাসনে সমগ্র জাতীয় জীবন আজ ক্ষতবিক্ষত। এ বিভক্তির অবসান না ঘটলে বাইরের চাপ বা শত্রুর প্রয়োজন হবে না। শুধু অন্তঃস্ফোটনের (Implosion) মাধ্যমেই জাতির ধীশক্তিসহ অন্তরাত্মা পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে পড়বে। ধসে পড়বে হাজার বছরে গড়া জাতীয় সৌকর্যের সৌধটি পর্যন্ত। হ
মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পুড়ে প্রাণোচ্ছল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ যখন তার জয়যাত্রা শুরু করেছিল, তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রটি সম্পর্কে দেশী ও বিদেশী বহু পর্যালোচক...
