মানুষের রয়েছে এমন কতকগুলো গুণ, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। বাহ্যিক অবয়ব, চেহারা-সৌন্দর্য, ভাষার ব্যবহার, জ্ঞান-বুদ্ধি, মনুষ্যত্ব-মানবিকতা, নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম-কর্ম ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত মানুষ যেমন শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার, তেমনি লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহঙ্কার, জেদ-ক্রোধ ইত্যাদি কুপ্রবৃত্তিগুলোকে চরিতার্থ করতে গিয়ে মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে। মানুষের প্রয়োজনে মানুষ না হয়ে মানুষ ক্রমশ হয়ে উঠেছে মানুষের শত্রু হয়ে। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ হজরত হাওয়া আ:-কে সৃষ্টি করেছিলেন হজরত আদম আ:-এর প্রয়োজনে; সঙ্গী বা সাথীরূপে এবং সহায়তাকারী হিসেবে। অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছে মানুষ।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছেÑ গধহ পধহহড়ঃ ষরাব ধষড়হব. অর্থাৎ ‘মানুষ একাকী বসবাস করতে পারে না’। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণসহ নানা কাজে তাকে সামাজিকভাবে বসবাস করতে হয়। অন্যান্য প্রাণী মানুষ থেকে ব্যতিক্রম : শুধু কথা বলায় নয়, বেড়ে ওঠায়, চলাফেরায়, জ্ঞানে বুদ্ধিতে, চাতুরতায় এবং পারস্পরিক সহযোগিতায়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মানুষ চলতে না পারলেও অন্যান্য প্রাণী তা পারে। জন্মের পরে অনেকটা দিন তাকে অসহায় অবস্থায় কাটাতে হয়। পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতা মানুষের পরম সঙ্গী। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সে কোনো না কোনোভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বলা চলেÑ নির্ভরশীলতাই জীবন। তবে এ নির্ভরশীলতা মানুষকে ছোট করেনি, বরং মানুষের জীবনের প্রয়োজন পূর্ণ করেছে। মানুষকে দিয়েছে সামাজিকতা, সুন্দর বসবাসের নিশ্চয়তা, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। ভালোবাসার নিবিড়তায় পৃথিবীটা মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে স্বর্গভূমি।
যুগে যুগে মানুষই মানুষের জন্য তথা অনাগত প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীটাকে গড়েছে। মানুষই মানুষের প্রকৃত বন্ধু, সাথী, সহযোগী। এর বিপরীত রূপটি মনুষ্যবৈশিষ্ট্য বর্জিত। কাম্য না হলেও অনিবার্য। মানুষ মানুষের সহযোগীর বদলে কখনো হয়ে উঠেছে শত্রু হয়ে। চিন্তা করেছে, বুদ্ধি এঁটেছে কিভাবে স্বজাতিকে ধ্বংস করা যায়। মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা বিবর্জিত এ শ্রেণীকে কী মানুষ বলা যায়? পশু নিজের স্বজাতিকে ধ্বংসের মতো ঘৃণ্য কাজটি কখনো করে না। অতএব ওই শ্রেণীটিকে পশু বললেও মনে হয় কম বলা হবে।
মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে মানুষের প্রতি কেন এত অন্যায়? কেন এত অবিচার? মানুষে মানুষে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি পার্থক্যগত চিন্তা আমাদেরকে নিজেদের জন্য চিন্তা করতে শিখিয়েছে সত্য, কিন্তু সেখানে বিরোধ কেন? আর পার্থক্য ভুলে সকল জন্য চিন্তা করলে ক্ষতি কোথায়? জগতের বড় বড় কবি সাহিত্যিক ও বিশিষ্টজনেরা কখনো মানুষকে আলাদা করে দেখেননি। জগতের সকল মানুষকে এক করে দেখেছেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। কবির ভাষায়Ñ
‘জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানুষ জাতি।/ এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত একই রবি শশী মোদের সাথী।’
মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এক, কিন্তু চেহারা হয়ত ভিন্ন। মাথা, চোখ, কান, দাঁত, নাক, মুখ, হাত, পাÑ প্রত্যেকেরই সমান, কিন্তু পার্থক্য মানুষের চিন্তা ও চেতনায়, ধর্মে ও কর্মে। এক একজন মানুষ একই বিষয় ভিন্ন ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারে, বুদ্ধির চর্চা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সাধনা করতে পারে। জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধনায় কেউ হতে পারেন বিশ^বিখ্যাত বিজ্ঞানী এরিস্টটল, নিউটন; আবার কেউ হতে পারেন বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ, শেকসপিয়র; আবার কেউবা সুযোগের অভাবে নিরক্ষর, কলম ধরতেও জানেন নাÑ এখানেই মানুষের পার্থক্য। কিন্তু তাই বলে এক মানুষ অপর মানুষের শত্রু হতে পারে না।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র মানুষকে যতটুকু পৃথক করেছে; কিন্তু এ কারণে সে কখনো দায়ী নয়। কারণ এ ব্যাপারে মানুষের কোনো হাত নেই। এছাড়া কোনো ধর্ম বা নীতিশাস্ত্র মানুষের অকল্যাণের কথা বলে না। ধর্ম হচ্ছে শান্তির প্রতীক। মানবকল্যাণ, শান্তি ও সম্প্রীতি ধর্মের প্রধান কাজ। যুগে যুগে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মেও শান্তি, ভালোবাসা, সেবা ও পরোপকারের আদেশ দেয় এবং হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ ও সহিংসতা পরিহার করতে বলে। বিভিন্ন ধর্মে বলা হয়েছে মানুষকে ভালো করো, মানুষের কল্যাণ করো, সুখ শান্তি দান করো এবং সর্বজীবে দয়া করো। আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সা: গুরুত্বারোপ করেছেন মানুষে মানুষের মিলন, সৌহার্দ ও সহিষ্ণুতার ওপর, সঙ্কীর্ণতা ও বিভেদের ওপর নয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ধর্মের নামে একশ্রেণীর মানুষ অধর্ম কায়েম করেছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে দাঁড় করিয়েছে মানুষের শত্রুরূপে। ধর্মীয় কারণে ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রোটেস্টান্ট ও ক্যাথলিক দুটি খ্রিষ্টান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ৩০ বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। যুগে যুগে ধর্মীয় সঙ্ঘাতে প্রাণ দিয়েছে অসংখ্য মানুষ। এই তো কিছু দিন আগে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে কুখ্যাত খ্রিষ্টান যুবকের নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারান ৫০ এর বেশি নিরপরাধ মানুষ। ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকায় বর্ণ বিদ্বেষে প্রাণ হারায় অগণিত মানুষ। আমেরিকায় সমঅধিকার দাবির স্বার্থে প্রাণ দিয়েছেন নিগ্রো নেতা মার্কিন লুথার কিং, প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং রবার্ট কেনেডি।
প্রকৃত ধর্ম কখনো মানুষকে ক্ষতি করতে বলে না। মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। আমাদের মহান নবী হজরত মুহাম্মদ সা: বিশ^ মানবতা ও ক্ষমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন। তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হওয়া সত্ত্বেও শত্রুকে ক্ষমা করেছেন। বলেছেন, ‘এদের জ্ঞান দাও, প্রভু এদের ক্ষমা কর।’ এছাড়া মক্কা বিজয়ের পরে শত্রুকে অনুকূলে পেয়েও প্রতিশোধপরায়ণ হননি, বরং ক্ষমা করে দিয়েছেন। মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি দয়া ও মহানুভবতার এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল।
রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভিন্নতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার। একই পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন পথ-মত অস্বাভাবিক বা দূষণীয় কিছু নয়। কিন্তু যে রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের মুখোশে চলে সৈ¦রতন্ত্র, চলে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার অবৈধ প্রচেষ্টা, সে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নির্যাতন, নিপীড়ন, গুম, খুন ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার মোহে অন্ধ রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এ জাতীয় রাষ্ট্রে শাসক সব শ্রেণীর মানুষের জন্য না হয়ে গুটিকতক মানুষের স্বার্থের দাসে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কারণে বিশে^র ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। খোঁড়া অজুহাতে চাপিয়ে দিচ্ছে অবৈধ যুদ্ধ বিগ্রহ। ১৯৪১ সালের প্রথম বিশ^যুদ্ধে ও ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে ভয়াবহ আক্রমণে অকালে প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহর। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয় এক অসম যুদ্ধ। নিরীহ বাঙালির ওপর আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শহীদ হন ৩০ লাখ মানুষ এবং সম্ভ্রমহানি হয় দুই লাখ মা-বোনের। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশে^র বেশির ভাগ দেশ এমনকি ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীনের আবেদন অগ্রাহ্য করে এবং জাতিসঙ্ঘকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াকে সাথে নিয়ে এক অযৌক্তিক, অসম এবং অবৈধ যুদ্ধ শুরু করে। আক্রমণ করে নিরীহ ইরাকিদের ওপর। নারী ও শিশুসহ কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিমর্মতায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আফগানস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ফিলিস্তিন প্রভৃতি দেশে যুদ্ধ এখনো চলমান। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মির সীমান্তে প্রতিনিয়ত গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং মানুষের জ্ঞানবিজ্ঞান ও গবেষণালব্ধ মানব বিধ্বংসী মরণাস্ত্রের কাছে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মানবতা। মানুষ মানুষের জন্য না হয়ে মানুষই হয়েছে মানুষের শত্রু। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়Ñ হত্যা কখনো মানুষকে শান্তি দিতে দেয়নি, দিতে পারে না। তাই এটা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। এজন্য বিশ^ বিবেককে নাড়া দিতে হবে। বিশ^বিবেক জাগ্রত না হলে মানুষ হত্যার এ লীলা কখনো বন্ধ হবে বলে মনে হয় না।
মানুষকে ক্ষতির চিন্তা করার আগে অবশ্যই ভাবা উচিতÑ সেও আমার মতো একজন মানুষ। সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেককে একটি করেই প্রাণ দিয়েছেন। পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকার আমার মতো তারও রয়েছে। এছাড়া যুগে যুগে মানুষই মানুষের কল্যাণ করেছে। প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীটা এরূপ ছিল না; এ পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য করেছে মানুষ, মুমূর্ষু মানুষকে রক্তদান করেছে মানুষ, মানুষকে চরম বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে মানুষ। আর মানুষকে ভালোবাসলে সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসা হয়। কথায় আছেÑ ‘মানবসেবাই পরম ধর্ম’। মানুষকে সেবা করলে প্রকারান্তরে সৃষ্টিকর্তাকেই সেবা করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দ তাই বলেছেনÑ
‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ^র।’
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাস সবার ওপরে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো কিছু নেই, কোনো কিছুই মানুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই মানুষের স¦ার্থ সংরক্ষণ সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। কবি বলেছেনÑ
‘শুনহ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের জয়গান করেছেন। তিনি বহুমুখী কৃতিত্বের জন্য মানব বন্দনায় মুখর হয়েছেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষকে তিনি এক ভেবেছেন। এই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে মহীয়ান আর কিছু নেই। কবির ভাষায়Ñ
‘গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই নহে কিছু মহীয়ান।’
কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে আরো বলেছেন, ‘মানুষ-ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম।’ আর মানব ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন এবং বিদ্রোহী হয়েছেন। মানুষে মানুষের বিরোধ কোথায় তা খুঁজে বের করা ও দূর করা প্রয়োজন। মানুষের জন্য অকল্যাণকর এমন কিছু চিন্তা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা মানবধর্মের পরিপন্থী। মানুষ নামের অমানুষেরা মানুষ বিরোধী অতীতে যা কিছু করেছে এবং বর্তমানে করছে, সেজন্য প্রয়োজন বিশ^ বিবেক জাগ্রত হওয়ার; প্রয়োজন আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রতিরোধ। মানুষকে যেকোনো মূল্যে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে, কেননা সর্বদা আমাদের মনে রাখা উচিত ‘মানুষের প্রয়োজনেই মানুষ’। হ