অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাদি শক্তিশালী না হলে বিধি-বিধান ও আইন-কানুন যাই থাকুক না কেন সেগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেনের খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাতে মোট উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে বা স্তরে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা, নতুন প্রযুক্তি, নতুন ধরনের সহায়তা ও নতুন খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। সমাজ ও দেশের নেতৃত্বদানকারীদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এমন এক প্রক্রিয়া যাকে সর্বদা ক্রিয়াশীল রাখতে হলে ক্রমাগতভাবে ও যথাসময়ে যথাপ্রাসঙ্গিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রয়োজন উন্নততর স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর মতোই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রক্রিয়া কোনো বিচ্ছিন্নতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে পারে না। সে কারণেই নানা খাতের উন্নয়ন যুগপৎ চলতে হবে এবং তা হতে হবে কার্যত সুসমন্বিত ধারায় ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। প্রবৃদ্ধির নকশা ও আদর্শ (মডেল) কী হবে তাও সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আকাক্সক্ষা ও সম্পদের সাথে তাল মিলিয়ে নেতৃত্বকে অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য মডেল নির্ধারণ করে সেই মডেলের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে হবে। এর কারণ, উন্নয়নের নীতি-কৌশল ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ইতিবাচক ফলাফল অর্জনে যথেষ্ট সময় প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়া ধরে রাখতে হলে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়া আবশ্যক। অন্য দিকে আবার দেশের রাজনীতি ও সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে এবং প্রবৃদ্ধির হারে গতিশীলতা বাড়াতে প্রয়োজন হলো রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে একটা সমন্বিত রফা।
ভালো নেতৃত্বই কেবল বিভিন্ন উপায় উপকরণের আদর্শ থেকে উত্তম উপায় বের করতে পারেন, যেসব উপায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা টেকসই করতে অবদান রাখতে পারে। এসব উপায়ের মধ্যে : ((১) জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা; (২) উন্নত প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে শক্তিশালী করা; (৩) উদ্ভাবনাময় দেশজ নীতি-কৌশল প্রণয়ন; (৪) দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের স্বার্থে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা; (৫) স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাকাঠামো উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা; (৬) স্থানীয় বা জাতিগত মতপার্থক্য দূর করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা; (৭) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করা; (৮) সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে পুঞ্জীভূত ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রায়ন করা; (৯) দুর্নীতি কমানো; (১০) সমাজকে স্থিতিশীল রাখা ও আইন-শৃঙ্খলা অবস্থার উন্নতি করা; এবং (১১) সর্বোপরি গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, যাতে করে জাতীয় ঐক্যের ধারণাটি মানুষের মনোজগতে বলিষ্ঠ, সৎসাহস ও দেশপ্রেমের মহৎ প্রেরণা জোগায় এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে শরিক হতে উদ্বুদ্ধ করে।
টমাস কার্লাইল (১৮৪১) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমাজ উন্নয়নে মহামানব অথবা লৌহমানবের আধিপত্য তত্ত্বের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ঐ তত্ত্বের প্রভাব এখন হারিয়ে গেছে। জারেড ডায়মন্ড (ঔধৎবফ উরধসড়হফ) তাঁর ‘অ্যানালিসিস অফ সাকসেসফুল ইকোনমিজ’-(১৯৯৭) গ্রন্থে নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বিষয়ে নানা বহির্বিশ্বের ওপর জোর দিয়েছেন। সেই তত্ত্বের ওপরও এখন মানুষের আর তেমন আস্থা নেই। অনেকের মতে গণতন্ত্রায়ণ, ভালো নেতৃত্ব ও ভালো সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে ত্বরান্বিত করে। বিশ্বে বিভিন্ন সমীক্ষার আলোকে বলা যায় যে উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের বিষয়টি এখনো একেবারেই অমীমাংসিত। বরং দেখা যায় যে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ণের পূর্বে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের হার বাড়লে সেই সমাজে গণতন্ত্রায়ণের পথ সহজতর হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ওপর গবেষণা-সমীক্ষায় এই বাস্তবতাটির সত্যতা সুনিশ্চিত হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সমীক্ষায় এও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, গলাবাজ ও বিভাজন নেতাদের পরিবর্তে যেসব দূরদর্শী নেতা সমাজকে একতাবদ্ধ করতে পারেন কেবল তারাই পারেন নতুন নতুন নীতিকৌশল নির্ধারণ করে আর্থ-সামাজিক অঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ সৃষ্টিতে নেতৃত্বের ভূমিকা
কোন দেশ ভবিষ্যতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে, সেটা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করার অন্যতম আদর্শিক মান হলো, ‘কোন ধরনের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত।’ যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকুক বা না থাকুক, অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি ও মৌলিক উপাদান হলো দেশের শাসনপদ্ধতি। ভিন্ন ভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন সময় ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, ভিন্ন ভিন্ন শাসনপদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। তবে যে শাসনব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, সেই ব্যবস্থা সাধারণত আবার শাসকগোষ্ঠীর অধঃপতনও ত্বরান্বিত করে। এর একটা কারণ হতে পারে এই শাসনব্যবস্থা বহুমতের সমন্বিত বা পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নয়। এই শাসনব্যবস্থা আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে বালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যে পথ দিয়েই আসুক না কেন সেটা জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করে। জীবনমান উন্নয়নের সাথে সাথে জনগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আরো বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা দাবি করে। তা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার, সমতা, সর্বজনীন শিক্ষা ও আইনের শাসনের পক্ষে নাগরিকদের হৃদয়ে নতুন এক চেতনা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এই চেতনার ইতিবাচক ফল হিসেবে তারা স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠীর দ্রুত অপসারণ দাবি করে, যেমনÑ ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন। তবে জনগণ যখন আরো বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক অধিকারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে তখন প্রধান সমস্যা দাঁড়ায়, যাঁরা ক্ষমতায় আসীন থাকেন তাঁরা সাধারণ নিয়মেই পুরনো, ঘুণেধরা ও সেকেলে ধ্যান-ধারণা বুকে আঁকড়ে রাখেন। তাতে রাজনীতি সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। অনিবার্যভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়। জাতীয় জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো দুর্বল হয়ে যায় এবং প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হতে থাকে।
নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সর্বদা অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল ও ব্যবস্থাপনার নাড়ি-নক্ষত্র বুঝতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে পরিবর্তনের গতিপথ। তাদের আরো উপলব্ধি করতে হবে অর্থনীতি কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক না নেতিবাচক হারের দিকে যাচ্ছে। ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির উৎসগুলো যেমন সঞ্চয়, বিনিয়োগ, আমদানি-রফতানি, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, ভোগ এসবের অবস্থান কোথায়। প্রবৃদ্ধি কি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ না বৈষম্যমূলক। শ্রেণীভিত্তিক আয়, বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও অঞ্চলের মধ্যে সুষম প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজে নাজুক বৈষম্য সৃষ্টি হতে বাধ্য।
সত্যিকার অর্থে সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে নিটোল ধারণা নিশ্চিত করতে হলে আর্থ-সামাজিক গতিপথের বিভিন্ন বিষয় যেমন মাথাপিছু আয়ের স্তর, রাজনীতিকদের বক্তৃতা-ভাষণ, কার্ভ মার্কেট বা খোলা বাজারে ডলারের মূল্য, ব্যবসায়ীদের বিদেশ বেড়ানোর গতিবিধি ও প্রবণতা, আমদানি-রফতানি বৃদ্ধির হার, মূলধন পাচার, সঞ্চয়ের হার, ব্যবসায়ে মুনাফার সীমানা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দেশের বৃহৎ নগরের সাথে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ নগরীর আকার, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘনত্ব, এসব বিষয় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। সাধারণত অতিমাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী নগরী বলতে বোঝা যায়, সে দেশের মুষ্টিমেয় রাজনৈতিক অভিজাতবর্গের হাতে অতিমাত্রায় ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন ও বাড়তি দারিদ্র্যের হারের আভাস। অতএব সরেজমিন অভিজ্ঞতার আলোকে এসব বিষয় ধর্তব্যে এনে উন্নয়নের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে; কেবল তত্ত্ব বা সংখ্যার ওপর নির্ভর করে নয়। এ সবকিছুই নেতৃত্বের যোগ্যতা, দক্ষতা ও ইতিবাচক ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল।
নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে সংক্ষিপ্ত রূপরেখামূলক আলোচনার রাস্তা থেকে বেরিয়ে অন্যত্র যাত্রা শুরুর পূর্বে পাঠকদের কাছে, বিশেষ করে ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। তাঁরা যেন গভীরভাবে চিন্তা, আলোচনা-পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রশ্নগুলো হলো : (ক) প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য নেতৃত্ব কি আসলেই অপরিহার্য? (খ) নেতাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, কার্যব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত আসলে কি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে? (গ) সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের জন্য নেতৃত্বের ভূমিকা কি আসলে গুরুত্বপূর্ণ? (ঘ) জাতীয় ঐক্যবিধানে আসলে কি নেতৃত্বের কোনো ভূমিকা আছে? (ঙ) ভালো নেতৃত্ব ছাড়া প্রতিষ্ঠান গড়ার অন্য কোনো উপায় আছে কি না, বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং (চ) দক্ষ, যোগ্য ও সৎ নেতা ও নেতৃত্বের পরিণামে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটে, না অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের পরিণামে উত্তম নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠক তাঁর নিজ চিন্তাধারার আঙ্গিকে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
গত দুই দশকে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোতে কোনো সর্বোত্তম উপায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে গতিশীলতা আনা যায় বা কোনো পথ অবলম্বন করলে প্রবৃদ্ধির হার ও উন্নয়নে গতিশীলতা আসবে, সে সব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা-পর্যালোচনা ও গবেষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে, বর্তমানের ক্রিয়া-পদ্ধতি তা থেকে একান্তই ভিন্ন। জ্ঞানচর্চা পরিমণ্ডলের অর্থনীতিবিদ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তাদানকরী সংস্থার বিশেষজ্ঞরা এবং জনবিতর্কে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি (সুশীল সমাজ, বিশেষ করে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা) অংশ নেন, তাঁরা ক্রমেই উন্নয়নের এক নতুন ধারণার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে বলছেন যে ‘সনাতনী উন্নয়ন তত্ত্ব বা নব্যধ্র“পদী অর্থনীতি’ বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জটিল প্রশ্নগুলোর পরিপূর্ণ সমাধান দিতে সক্ষম নয়। বর্তমানে যে উদীয়মান অভিমত উন্নয়ন সংস্থা ও কর্মকর্তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে সেটা হলো ‘নেতৃত্ব, শাসনব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অর্থনীতিবিদরা এখন এগুলোকে মুখ্য অবলম্বন করে উন্নয়নের পরিকল্পনা নিচ্ছেন। অন্য দিকে আবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিনেতাদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ নেইল ফারগুসন ‘প্রতিষ্ঠান’-কে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ‘মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠান যেমন গুরুত্বপূর্ণ-মৌমাছির জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ মৌচাক বা মধুচক্র।’
অর্থনৈতিক কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের বিষয়ে নোবেল বিজয়ী ডগলাস নর্থ ১৯৯০ সালে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। তিনি ঐ গবেষণার কাজে বিভিন্ন দেশের অতীত উন্নয়নের ইতিহাসকে উদাহরণ হিসেবে টেনে এনেছেন। তিনি বিশদভাবে বিভিন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন যে, ‘সেই মধ্যযুগ থেকে বর্তমান অব্দি ভালো প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রেরণা জুগিয়েছে।’ তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইন বা বিধিবিধান বলতে কেবলই আইনি বিধিবিধান বা সংগঠন নয় বরং সেই দেশের সব নিয়ম-কানুন, সামাজিক রীতি-নীতি ও প্রথা এবং জনগণের আচার-ব্যবহার ও আচরণকেও হিসেবে নিতে হবে। মৌচাক গড়তে যেমন যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজন সবল ও কার্যক্ষম প্রতিষ্ঠান এবং যোগ্য নেতা ও তাঁর আদর্শবান নেতৃত্ব। হ
