রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে কে বড় কে ছোট, কে কার দ্বারা কতখানি প্রভাবিত, উদ্বুদ্ধ কিংবা পরিচালিত হয় তা আজো বিশ্বব্যাপী কোথাও খোলাসা করা সম্ভব হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে অর্থলোভী ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাদী রাজনীতিকের ওপর টেক্কা দিতে সফল হচ্ছে। শুধু বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশেই শুধু নয়, ইদানীং উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও ধুরন্ধর ব্যবসায়ীর অর্থ অন্যায্যপটতার পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাজনীতিবিদেরা। চীন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের নামে বাণিজ্য যুদ্ধকে উপায় ও উপলক্ষ সাব্যস্ত করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে কোন কোন বড় অর্থনীতিতে ধনীর রাজনীতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরো দরিদ্রবান্ধব হতে বাধ্য করছে। কেননা এ যাবৎ যুগে যুগে স্থান, পাত্র ও প্রক্রিয়াভেদে অর্থনীতি ও রাজনীতি অধিকাংশ সময় অনিবার্যভাবেই সমতালে ও সমভাবনায় এগিয়ে চলছে। কখনো সখনো মনে হতে পারে বড্ড পরস্পর প্রযুক্ত এরা। যেন দু’জনে দু’জনার। যদিও অনেক সময় এটাও দেখা গিয়েছে রাজনীতি অর্থনীতিকে শাসিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করেছে : আবার অর্থনীতি রাজনীতিকে অবজ্ঞার অবয়বে নিয়ে যেতে চেয়েছে বা পেরেছে। গত শতকে রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণা বেশ ব্যাপ্তিলাভ করে। এ কথা ঠিক বহমান বর্তমান বিশ্বে, ক্রমশ, অর্থনীতিই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। কেননা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে, সকল পর্যায়ে শিক্ষা স্বাস্থ্য বিনোদন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সব কিছুতেই নীতি-নির্ধারণে অর্থ আজ নিয়ামক কিংবা প্রভাবকের ভূমিকায়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয় আর্থিক প্রভাবের ও সক্ষম-সম্ভাবনার নিরিখে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি-নির্ধারণ করে অর্থনৈতিক জীবনযাপনকে আয় উপার্জন ব্যয় বরাদ্দকে জবাবদিহির আওতায় এনে সুশৃঙ্খল, সুশোভন, সুবিন্যস্ত করবে এটাই এই কিছু দিন আগে পর্যন্ত সাব্যস্ত ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও নীতিবান ন্যায়নিষ্ঠবানের হাতে অর্থনীতি তথা ভোগ ভাগবাটোয়ারার দায়-দায়িত্ব অর্পণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নীতি-নির্ধারক যদি ভক্ষক হয়ে নিজেই অর্থনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টির কারণ হয়, তখন আমজনতার অর্থনৈতিক জীবনযাপন পোষিত (ভধপরষরঃধঃবফ, ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃবফ) হওয়ার পরিবর্তে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নীতি-নির্ধারক নেতৃত্ব যদি নিজস্ব তাগিদে ও প্রয়োজনে নিজস্ব উপায়ে সম্পদ ও স্বার্থ সংগ্রহে আত্মসাতে ব্যাপৃত তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখতিয়ার ও ক্ষমতা খর্ব হয়। আইনসভায় নীতি-নির্ধারক বিধিবিধান তৈরি করবেন সবার জন্য প্রযোজ্য করে, নিরপেক্ষভাবে, দূরদর্শী অবয়বে। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগে নীতি-নির্ধারক নিজেই নিজেদের স্বার্থ অধিকমাত্রায় দেখতে থাকেন তাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, প্রতিপক্ষরূপী বিরুদ্ধবাদীদেরকে বঞ্চিত করতে স্বেচ্ছাচারী অবস্থান গ্রহণ করেন তখন ওই আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় সন্দেহ তৈরি হয়। আস্থার অভাব দেখা দেয়। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ততার অবয়বে, নৈতিকতার অবক্ষয়জনিত পরিবেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আমজনতার আগ্রহ নেতিবাচক মনোভাবে চলে যেতে পারে ও সর্বোপরি সবাই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে। অথচ যে আস্থার সরোবরে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ও টেকসই হওয়া নির্ভরশীল।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে উন্নয়ন ভাবনা ও কর্মসূচি পরিপালিত হবে দলমত নিরপেক্ষভাবে, কারো প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুযোগ সুবিধা অধিকার আদান প্রদান, নীতি নিয়মকানুন ও আইনশৃঙ্খলার বিধানাবলি বলবৎ, প্রয়োগ ও বাস্তবায়নযোগ্য হবে না এটাই সব নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক সত্য ও প্রথা। কিন্তু যদি দেখা যায় ক্ষমতাসীন নীতি-নির্ধারক তা শুধু নিজের, নিজের এলাকায়, গোত্রে, দলে ও কোটারির মধ্যে নাগরিক অধিকারের সব বরাদ্দ বিভাজন সীমিত করে ফেলে এবং বিরুদ্ধবাদীদের বঞ্চিত করায় স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে ওঠে তাহলে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য পূরণ ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখানে এ রূপ পরিবেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে, নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রিতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি উৎপাদনে সম্পদে সংসার সমাজসহ নীতি-নির্ধারককে যেমন একটি রূপময়, বেগবান, ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও আনন্দঘন সক্ষমতা নির্মাণ করবে আবার রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকের একগুঁয়েমি তথা ও ভ্রান্ত পদক্ষেপের দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে, সমৃদ্ধির সক্ষমতা ও সুযোগকে তেমন প্রশ্নবিদ্ধ-পক্ষপাতযুক্ত করে ফেলে, দুনীতিগ্রস্ত করে ফেলে। রাজনৈতিক কারণে পরস্পরের দোষারোপের দ্বারা এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ হয় বিপন্ন এবং এর ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা শুধু দ্বিধাগ্রস্ত নয়, হয় বাধাপ্রাপ্তও।
গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। নির্বাচনের ইশতিহারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির নানান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে রাজনৈতিক দল। ভোটারকে প্রতিশ্র“তি দেয়া হয় ক্ষমতায় গেলে এ জাতীয় উন্নয়নের বন্যায় ভেসে যাবে দেশ। কিন্তু নেতৃত্ব তা যদি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে না পারে তা হলে ব্যর্থতার ও অভিযোগের তীর নিক্ষিপ্ত হয় খোদ রাজনীতির নেতিবাচক ধারণার দিকেই।
অতীতে রাজা-বাদশাদের রাজনীতি আবর্তিত হত মসনদে আহরণকে কেন্দ্র করে; সে সময় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হতো সেভাবেই। মসনদ আহরনের ধ্রুপদ মুখ্য প্রেরণা ও শক্তির উৎস ও লক্ষ্য থাকত অর্থ প্রতিপত্তি উদ্ধার ও অধিকার অর্জন। এই ভারত বর্ষে কোম্পানি আমলে এ দেশ প্রশাসিত হয়েছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে। ছিল নানান খাজনা রাজস্ব আদায়কামী অর্থনীতি। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেছিলেন তা ছিল মধ্যস্বত্ব¡ভোগী জমিদারের মাধ্যমে রায়তের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্যই। কিন্তু প্রজার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন সবই কোম্পানির মুনাফামুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে উপেক্ষিত থাকে। ফলে রায়ত বা প্রজাকুল অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার পদে পদে নানান বঞ্চনার শিকার হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের মূল কারণ যতটা না সামাজিক কিংবা ধর্মীয় তার চেয়ে বেশি ছিল অর্থনৈতিক। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করার পর নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গটি সামনে আসে। সে দায়িত্ব পালনের জন্য নাগরিকদের ওপর কর আরোপ প্রথা প্রবর্তন করা হয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে একটা কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। এসবই কিন্তু মূলত এবং মুখ্যত রাজনীতিকে অর্থনীতির সাথে সাযুজ্য সামঞ্জস্য আনার জন্য, দায়বদ্ধ পরিবেশ সৃজনের জন্য। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত দু’টি অঞ্চলকে নিয়ে একটি পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে দেখা গেল পূর্বাঞ্চল নানান বৈষম্যের, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও পক্ষপাতিত্বকরণের শিকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত ও মূল কেন্দ্রবিন্দু এই অর্থনৈতিক বণ্টন বৈষম্য দূরীভূত করার আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে। সে সময় প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক অর্থনীতির চিন্তাচেতনা সামনে চলে আসে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম...’ উচ্চারণ করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিশেষ করে পাকিস্তানের সমাজ সংসার থেকে পৃথক স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব অর্জনের মূল কারণ ও প্রেরণা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি তথা শোষণ ও বণ্টন বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে মুক্তি। সাবেক পাকিস্তানি রাজনীতির ব্যর্থতা ছিল আঞ্চলিক উন্নয়ন তথা স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যাপারে সব অঞ্চলে সুষম, সুশোভনীয় সুশীল আচরণে অপারগতা।
বাংলাদেশের আটচল্লিশ বছর বয়ঃক্রমকালে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি নীতি-নির্ধারক সরকার নেতৃত্বে এসেছে। প্রত্যেকের কিছু না কিছু অবদানে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এই পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যা কমছে, দারিদ্র্যবিমোচন হয়েছে বা হচ্ছে। শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, মানুষের মাথাপিছু আয়ের পরিস্থিতিতে উন্নতি সাধিত হয়েছে। বাজেটের বপু বেড়েছে এডিপির আকার বেড়েছে। এখানে স্বভাবত প্রশ্ন এসেছে অর্থনীতির এই উন্নয়নে সরকারগুলোর একক কৃতিত্ব কতখানি। এসব সাফল্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৃজনশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, সততা স্বচ্ছতা জবাব দিহিতার ভূমিকা বেশি না আমজনতার অর্থনীতির স্বয়ংক্রিয় স্বচ্ছ সলিলা শক্তির বলে এটি বেড়েছে। এটাও দেখার বিষয় যে পরিস্থিতি এমন হয়েছে কি না আমজনতার নিজস্ব উদ্ভাবন প্রয়াসে অর্জিত সাফল্য বরং নীতি-নির্ধারকের নিজেদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের দ্বারা বরং বাঞ্ছিত উন্নয়ন অভিযাত্রা বাধাগ্রস্ত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন প্রয়াসে তাদের কর্ম উন্মাদনা ও প্রেরণায় ক্ষমতালোভী দুর্নীতিদগ্ধ রাজনৈতিক অভিলাস বাধা সৃষ্টি করেছে কি না কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সেবা প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত কিংবা বিড়ম্বনা দায়ক হয়েছে কি না।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থনীতিতে কর ডিজিপির রেশিও কাক্সিক্ষত সাধারণ মাত্রার (জিডিপির ১৫-১৬ শতাংশ) চাইতে যথেষ্ট কম। বর্তমানে কর জিডিপি রেশিও ১০-১১ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে অর্থাৎ জিডিপির ৫-৬ শতাংশ কর আওতার বাইরে বা রাজস্ব অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে জিডিপির ৪-৫ ভাগ পরিমাণ অর্থই ঘাটতি হিসেবে প্রাক্কলিত হতে হচ্ছে এবং এ ঘাটতি পরিমাণ অর্থ দেশী বিদেশী ঋণ নিয়েই মূলত উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ দেশে জিডিপির আকার অনুপাতে যথাপরিমাণ ন্যায্য কর রাজস্ব অর্জিত হলে ঘাটতি বাজেট হয় না এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ব্যাংকঋণ গ্রহণ কিংবা নানান শর্তসাপেক্ষে বিদেশের কাছে হাত পাততে হয় না। গভীর অভিনিবেশসহকারে বিচার বিশ্লেষণের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়Ñ কেন ন্যায্য কর রাজস্ব আহরিত হয় না বা হচ্ছে না, কারা করনেটের বাইরে এবং তাদেরকে কর নেটের আনার পথে প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা কোথায়? বিভিন্ন কৌণিক দৃষ্টিতে পরীক্ষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে দেশ সমাজ ও প্রশাসন কর রাজস্ব সুষমকরণের পথে স্বচ্ছতার ন্যায়ানুগতার, পক্ষপাতহীন পদক্ষেপ নিতে অপারগ হয়েছে বা হচ্ছে। কর প্রদানে আহরণে, এমনকি কর রেয়াত বা অব্যাহতি প্রাপ্তিতে অন্তর্নিহিত অপারগতা বা দুর্বলতা রয়েছে। সাধারণ ও অসাধারণ করদাতায় অসম বিভক্ত সমাজে অসাধারণ করদাতারা শুধু একদাগে যে কর ফাঁকি দেয় সহস্র সাধারণ করদাতার ওপর তার চাপ পড়ে। বড় করদাতারা নীতি-নির্ধারকের প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগে থাকলে কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতি সুস্থ ও সাবলীল হতে পারে না। আইনপ্রণেতাদের বেশির ভাগ অংশ বৃহৎ করদাতা হলে ক্ষমতার বলয়ে বসবাসকারী হিসেবে রেয়াত ও ছাড় গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক কর রাজস্ব রাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যায়। যথাযথ কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। অথবা কথাটি এভাবে ঘুরিয়ে বলা যায় নীতি-নির্ধারক নেতৃত্বের যে বলিষ্ঠ কমিটমেন্ট দরকার কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে, যে এনফোর্সমেন্ট, যে সুষম পরিবেশ, যে পক্ষপাতহীন আচরণ, যে দৃঢ়চিত্ত মনোভাবের প্রয়োজন তার ঘাটতি কাক্সিক্ষত, বাঞ্ছিত ফল আসার পথে অন্তরায়। আইনসভায় যে অর্থবিল উত্থাপিত ও গৃহীত হয় সেখানে পরীক্ষা পর্যালোচনা- উত্তর ছাঁটাই প্রস্তাব পেশের কিংবা বিভিন্ন গঠনমূলক মতপ্রকাশ বা প্রস্তাবনা পেশের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থায় যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে বলেই ফিসকেল মেজারসগুলো যা যা যেভাবে উত্থাপিত হয় তাই গৃহীত হয়। মূল বাজেটে আয় ব্যয়ে প্রাক্কলিত বরাদ্দ যথাযথ অর্জিত হচ্ছে কি না তার জবাবদিহিকরণের সুযোগ সেখানে অনুপস্থিত। সামষ্টিক অর্থনেতিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আয় ও ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবাদিহিতা নিশ্চিতকরণের অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। কর রাজস্ব প্রদানের বিপরীতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ায় নাগরিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি সুনিশ্চিতকরণ কর প্রদানে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য অপরিহার্য। কর দাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর আহরণকারীর কাছ থেকে উপযুক্ত আচরণ পাচ্ছে কি না সেটাও কর দানে উৎসাহিত হওয়ার বা কর দানে দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য বিবেচ্য থেকে যায়। পৃথিবীর শতাধিক দেশে কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান আছেই কর দাতারা কর আহরণকারীদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার প্রতিকার করা তথা আস্থার পরিবেশ সৃজনে সহায়তা করা। উন্নয়নশীল দেশে কর রাজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য কর ন্যায়পাল ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি যেখানে আবশ্যক ভাবা হয় সেখানে প্রতিষ্ঠিত কর ন্যায়পাল ব্যবস্থাপনা বাতিল করা কর প্রদান পরিবেশে আস্থা সৃষ্টির উদ্যোগ ও উপায়কে উপেক্ষার শামিল।
আরেক পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে মধ্যম আয়ের পথযাত্রী দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি দুই ডিজিটে উপনীত হওয়ার উপযুক্ত উৎপাদন, বিপণন, সেবা, নির্মাণ পরিবেশ সবই বিদ্যমান সত্ত্বেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব ৬-৭ এর মধ্যে আটকা থাকছে। নানান কারণে প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জিডিপিতে অবদান রাখতে পারছে না বা যথাযথ হিসাবভুক্ত হতে পারছে না। অদূরদর্শী কর্মযোজনা ও সামষ্টিক আর্থিক অব্যবস্থাপনা, অপচয় অপব্যয় আত্মসাৎকৃত কর্মসূচির দ্বারা মোটা অঙ্কের অর্থ উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহসহ অবকাঠামো নির্মাণসহ সব সহযোগী খাতে অপব্যয়িত হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্যে চোরা কারবারে, ইনফরমাল ট্রেডে আমদানি-রফতানি ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিং এ দ্বারা, ইনফরমাল রেভিনিউ রেন্টসিকিংয়ের মাধ্যমে নানানভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির সৌভাগ্যের ওপর ভাগ বসানো হচ্ছে। বিনা প্রতিকারে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট হচ্ছে, আত্মসাৎসহ নানান প্রকার আর্থিক কেলেঙ্কারিতে মানিমার্কেটের প্রতি আস্থা বিনষ্ট হচ্ছে, পুঁজিবাজারে পুঁজিপ্রবাহ কমছে। পণ্য সরবরাহে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেশন ব্যবসা বাণিজ্যে টেন্ডারবাজি সবই ব্যয় বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি সব কিছু বাবদ যে অতিরিক্ত অর্থের অপচয় হচ্ছে তা যদি জিডিপিতে যথাযথভাবে অবদান রাখতে পারত (অর্থাৎ ব্যয়িত অর্থ দ্বারা গুডস এনড সার্ভিস প্রডিউস হতো) তা জিডিপিকে দুই ডিজিটে নিয়ে যাওয়ার জন্য হতো যথেষ্ট।
অতি সম্ভাবনাময় এই অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির নানান সমস্যা সীমাবদ্ধতাকে নিয়ন্ত্রণ দূরীভূতকরণের দায়িত্ব যে রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারক নেতৃত্বের তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়টি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক দোষারোপের অবয়বে অর্থনীতির যে ক্ষয়ক্ষতি সাধন তা কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। কোনো ঘটনার কারণ (পধঁংব) ঘটিয়ে সেই ঘটনার ফলাফলের (বভভবপঃ) ওপর দোষ চাপালেই ক্ষয়ক্ষতির দায় দায়িত্ব নির্ধারণ শেষ হয় না। ঘটনার কারণ ও কার্যকরণও পর্যালোচনাযোগ্য। দলীয় বা কোটারিগত, শ্রেণীগত পক্ষপাতিত্বে অর্থনীতিতে যে ভারসাম্যহীন পরিবেশ সৃষ্টি হয় তা অবশ্যই অনুধাবনীয়। সাম্প্রতিককালে দেখা গিয়েছে জনগণ নিজেদের দিন এনে দিন খাওয়ার টানাপড়েনের অর্থনীতিতে অতিশয় আগ্রহী ও মনোযোগী হতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকছে। রাজনীতিকে অর্থনীতির প্রতিপক্ষ প্রতিপন্নকরণের কিংবা অর্থনৈতিক সাফল্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের দ্বারা, আয় ব্যয় উভয় ক্ষেত্রকে অস্বচ্ছ, জবাবদিহিহীন, দুনীতিগ্রস্তকরণের দ্বারা আস্থাহীন পরিস্থিতি তৈরির পথ এড়াবার স্বার্থে নীতি-নির্ধারকের নিজেরই দায়িত্বশীল হওয়ার যৌক্তিকতা হারিয়ে যায়নি, যেতে পারে না। হ
রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে কে বড় কে ছোট, কে কার দ্বারা কতখানি প্রভাবিত, উদ্বুদ্ধ কিংবা পরিচালিত হয় তা আজো বিশ্বব্যাপী কোথাও খোলাসা করা সম্ভব হয়নি।...
