জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে মানববিজ্ঞান বা নৃবিজ্ঞান (অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু) মানুষের কল্যাণ সাধনে এ যাবতকালে কী ভূমিকা রেখেছে এবং ভবিষ্যতে এ ভূমিকা আরো কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে প্রসারিত হতে পারে; বর্তমান নিবন্ধে সে বিষয়ে আলোচনার প্রয়াস পেয়েছি। মানবকল্যাণের বিষয়টি সর্বকালে সর্বত্রই চিন্তাবিদ, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, সমাজসংস্কারকসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বলতে গেলে অনেকেরই চিন্তা ও কর্মের মধ্যে বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। দেশ ও কালের পরি প্রেক্ষিতে মানবকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে তত্ত্ব, মতবাদ ও নানামুখী কর্মসূচি। রাষ্ট্র, সমাজ, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি পর্যায়ে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের অসংখ্য উদাহরণের সাথে আমরা পরিচিত। কাক্সিক্ষত ও পরিকল্পিত পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বহুবিদ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নজির রয়েছে। এসব উদ্যোগ ও প্রকল্পের যেমন আছে সাফল্য, তেমনি আছে আবার ব্যর্থতা।
কোন কোন চিন্তাবিদ, দার্শনিক সমাজব্যবস্থা (ঝড়পরধষ ংুংঃবস) বা সমাজ কাঠামো (ঝড়পরধষ ংঃৎঁপঃঁৎব) পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবন মানোন্নয়নের পথনির্দেশ করেছেন। কোন কোন মনীষী বিদ্রোহ বিপ্লবের মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ব্যতীত মানব সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; যা কিনা মানবমঙ্গলের জন্য অপরিহার্য। কেউবা আবার সমাজসংস্কারের তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছেন এবং সমাজসংস্কারের বহুবিধ পথ প্রদর্শন করেছেন, যার মাধ্যমে মানবকল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। অবশ্য অনেকে মনে করেন মানবকল্যাণের পরিধি অনেক ব্যাপক এবং আপেক্ষিক অর্থে একে অনুধাবন করতে হবে।
যাক, এসব বিতর্কে প্রবেশ করা বর্তমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এই নিবন্ধে মানববিজ্ঞানের জ্ঞান কিভাবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজে লাগতে পারে, আজকের আলোচনা এরই মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। এ প্রসঙ্গে দু’টি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই—
প্রথমত, মানববিজ্ঞান বলতে আমরা কী বুঝি? মানববিজ্ঞান হলো নৃবিজ্ঞান; মানুষের বিজ্ঞানসম্মত পঠন-পাঠন। এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মানুষের সংস্কৃতিকে অনুধাবন করা; সংস্কৃতির বিবরণ তৈরি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষের জীবন ও সমাজের একটি সঠিক ও সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা। ব্রিটিশ মানববিজ্ঞানী ম্যালনস্কি যাকে বলেছেন “ষরারহম ঢ়রপঃঁৎব ড়ভ ধ পড়সসঁহরঃু”। মানববিজ্ঞান অনুমানের ওপর নির্ভর করে মানুষের জীবন ও সমাজকে বোঝার চেষ্টা করে না। মানব ইতিহাস পুনঃনির্মাণও এর কাজ নয়। এর কাজ হলো— মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মানববিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়। একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে মানববিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাজ্যে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ সামাজিক মানববিজ্ঞানী র্যাডক্লিফ ব্রাউন (জধফপষরভভব ইৎড়হি) ও ম্যালিনস্কি (গধষরহড়ংিশর) এ বিজ্ঞানের জনক আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ বিজ্ঞানের চর্চা প্রথম শুরু করেন ফ্রাঞ্জ বোয়াস (ঋৎধহু ইড়ধং)। একই ধারায় মানববিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয় এ উপমহাদেশে। বাংলাদেশে মানববিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক যাত্র শুরু হয় আশির দশকের শেষ দিকে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ক্রমে এর আনুষ্ঠানিক পঠন-পাঠন ও চর্চা প্রসার লাভ করে এবং এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে।
মানববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান (অঢ়ঢ়ষরবফ অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু)। এটি কোন সমাজের পশ্চাৎপদ এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অধ্যয়ন ও গবেষণা করে এবং তাদের কল্যাণার্থে কৌশল গ্রহণে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে প্রয়োগিক মানববিজ্ঞানীরা মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, এথনিক সম্প্রদায়, বঞ্চিত এবং পশ্চাৎপদ মানুষের মধ্যে কাজ করে এবং তাদের কল্যাণ এবং উন্নয়নে নিজেদের নৃতাত্ত্বিক জ্ঞানকে ব্যবহার করেন। বিশে^র অনেক উন্নয়শীল এবং উন্নত দেশে প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানীরা উপরোক্ত জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে, তাদের অধিকার আদায়ের শক্তি অর্জনে এবং তাদের উন্নয়নের জন্য অতীতেও কাজ করেছেন এবং এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। মানববিজ্ঞানের জ্ঞান বর্ণবাদী এবং সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব, সংঘাত নিরসনে সফলতার সাথে ব্যবহৃত হয়েছে এবং তা একই সাথে বর্তমান বিশে^র বহু দেশে শোষণ এবং বঞ্চনা দূরীকরণে ভূমিকা রেখেছে। প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান পশ্চাৎপদ মানুষের পরিকল্পিত পরিবর্তন সাধনের উদ্দেশ্যেও কাজ করেছে। মানববিজ্ঞানীরা অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে (প্রথাগত সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি পূর্ণাঙ্গ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক) কুসংস্কার দূরীকরণে সমর্থ হয়েছেন এবং পরিকল্পিত পরিবর্তনের ধারা সুগম করে তাদের উন্নয়নের পথে ধাবিত করেছেন।
প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান শুধু মানব সমাজ ও সংস্কৃতির বর্ণনাই দেয় না, সমাজের বিভিন্ন সমস্যার স্বরূপ ও কারণ উৎঘাটন করে এবং সমস্যাসমূহের সমাধানের জন্য উপযুক্ত ও উপযোগী পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের পথ নির্দেশ করে। মানববিজ্ঞানীরা বর্তমানে মানুষের জীবন প্রণালীর সঠিক বিষয়াবলি অধ্যয়নের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বস্ত্র, বাসস্থানসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে, মানববিজ্ঞান শুধু আদিম সমাজ ও আদিম মানুষেরই পঠন-পাঠন; কিংবা এ শুধু অনক্ষর সমাজ (হড়হ-ষরঃবৎধঃব ংড়পরবঃু), অনগ্রসর জনগোষ্ঠী (নধপশধিৎফ ধহফ ঁহফবৎঢ়ৎরারষবমবফ ঢ়বড়ঢ়ষব) এবং প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর (সধৎমরহধষ বঃযহরপ পড়সসঁহরঃু) মধ্যে গবেষণা সীমাবদ্ধ রেখেছে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। তাই গত কয়েক দশক যাবত মানববিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার ক্ষেত্রকে শুধু নিরক্ষর বা অনগ্রসর সামাজের মাঝে সীমিত না রেখে অনগ্রসর ও অগ্রসর উভয় সামাজের সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, মানবকল্যাণ বলতে আমরা কী বুঝি? মানবকল্যাণ বলতে মানববিজ্ঞানীরা বুঝেছেন একটি সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সম-উন্নয়ন। এক শ্রেণীর মানুষের আয়, সম্পদ সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে আর অন্য শ্রেণীর মানুষ এগুলো থেকে বঞ্চিত হবে তাহলে তাকে উন্নয়ন বলা যাবে না এবং সে ব্যবস্থা মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। সব শ্রেণীর মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সব শ্রেণী ও গোষ্ঠীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সমাজ উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণ সাধন সম্ভব হতে পারে।
মানববিজ্ঞানের যে শাখা এ নিয়ে গবেষণা করে, কাজ করে তাকে বলা হয় প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান (অঢ়ঢ়ষরবফ অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু)। প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানের মূল পদ্ধতি হলো অ্যাকশান রিসার্চ (ধপঃরড়হ ৎবংবধৎপয)। বাংলায় বলা হয় অঙ্গীকারাবদ্ধ কর্ম-গবেষণা। অঙ্গীকারাবদ্ধ কর্ম-গবেষণার মূল লক্ষ্য গবেষণাধীন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং এর সাথে তাদের সম্পৃক্ত করা। তারপর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি হলে, তা সঙ্ঘবদ্ধভাবে মোকাবেলা করা এবং বাধা অতিক্রম করে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনয়ন করা।
অঙ্গীকারাবদ্ধ কর্ম-গবেষণার উদ্দেশ্যে শুধু সত্য অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণাধীন সমাজ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ছাড়াও গবেষককে সেখানকার জনগণকে সংগঠিত করতে হয় এবং নেতৃত্ব দিতে হয়। তবে সে নেতৃত্ব কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য নয়। সে নেতৃত্ব হবে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের জন্য। প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি হবে অবশ্যই ইতিবাচক এবং বাস্তবমুখী। মানব মঙ্গলের জন্যই তাদের অর্জিত জ্ঞান ব্যবহৃত হবে। উন্নয়নের অন্তরায়গুলো তাকে চিহ্নিত করতে হবে এবং সে বাধা ও অন্তরায় দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে হবে।
তাদের কাজ শুধু সুপারিশ প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিকল্পিত পরিবর্তন আনয়নই হবে প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানের কর্ম-গবেষণার মূল লক্ষ্য। তবে মনে রাখতে হবে যে অঙ্গীকারাদ্ধ কর্ম-গবেষণার ক্ষেত্রে হবে ক্ষুদ্র সমাজ (ষরঃঃষব পড়সসঁহরঃু বা ংসধষষ ংপধষব ংড়পরবঃু)। গবেষণাকর্ম হবে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর পরিসরে (ভৎড়স সধপৎড় ষবাবষ ঃড় সরপৎড় ষবাবষ)। এ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনয়নের প্রচেষ্টাকে পক্ষ সমর্থন বা ধফাড়পধপু কৌশল বলা হয়।
কাক্সিক্ষত পরিবর্তন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি দাতাদেশগুলো উন্নয়নশীল দেশে ক্রমেই প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানী প্রেরণ করেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও কৃষি খাতের উন্নয়নে তাদের নিয়োগ করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের সাহায্য নিচ্ছেন। তারা মূলত পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। এ ধরনের রীতি বা কৌশলকে প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানের প্রধান কৌশল (ফড়সরহধহঃ ধঢ়ঢ়ৎড়ধপয) বলা হয়।
অনেক প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানী অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের (ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধহঃ ড়নংবৎাধঃরড়হ) পর্যায় অতিক্রম করে আরো গভীরে প্রবেশ করেছেন, জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হয়েছেন; অনুধাবন করেছেন কিভাবে তারা প্রধান সংস্কৃতি (ফড়সরহধহঃ পঁষঃঁৎব) দ্বারা শোষিত হয়েছেন। এর বিরুদ্ধে গবেষক প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানী সোচ্চার হয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন, অধীনস্থ বা শোষিত মানুষের স্বার্থ রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেছেন। এ রীতি বা কৌশলকে বলা হয় মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপ (ধফাড়পধপু বা রহঃবৎাবহঃরড়হরংঃ) কৌশল।
প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানের আরেকটি অন্যতম লক্ষ্য হবে উন্নয়নকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত থাকে বিপুল সংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা। প্রায়োগিক মানবাবিজ্ঞানীদের একটি প্রধান কাজ হতে পারে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ও অ্যাকশন রিসার্চের মাধ্যমে উন্নয়ন সাধনের পথ নির্দেশ করা।
বস্তুতপক্ষে বর্তমান শতাব্দীতে (একবিংশ শতাব্দী) মানববিজ্ঞানীরা মানুষের আরো কাছে আসবেন, বিশেষ করে পশ্চাৎপদ, অনুন্নত, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবেন, তাদের সংগঠিত করবেন এবং তা করবেন তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। অবশ্যই সেটা হবে ইতিবাচক পরিবর্তন। এভাবে মানববিজ্ঞানীরা বৃহত্তর মানবকল্যাণে নিয়োজিত হতে পারেন।
বাংলাদেশ প্রধানত একটি গ্রামীণ সমাজ। গ্রামীণ জনসংখ্যার অধিকাংশই নিরক্ষর, অর্ধশিক্ষিত, অদৃষ্টবাদী ও কৃসংস্কারাচ্ছন্ন। তাদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অপুষ্টি ও রোগের শিকার। এ দেশের কোনো কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বর্তমানে আধুনিকায়ন, নগরায়ণের ফলে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। বহুলাংশে তাদের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। তারা বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানীরা বৃহত্তর সমাজের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করতে কার্যকর ও সফলভাবে কাজ করতে পারে।
আমাদের কোনো কোনো প্রান্তিক নৃগোষ্ঠী বিভিন্ন কারণে বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রেও প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানীরা হস্তক্ষেপ করতে পারে। উপরন্তু, সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাওয়ার আগে তাদের সনাতন জীবন প্রণালী ও তাদের সংস্কৃতির পরিচয় লিপিবদ্ধ করা দরকার। এ ক্ষেত্রেও প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান এই দেশে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো একটি পশ্চাৎপদ, অনুন্নত ও সনাতন সমাজের উন্নয়নে মানববিজ্ঞান অন্তত অনেক কাল যাবৎ প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে বলে আমার বিশ^াস। মানববিজ্ঞানের এই প্রায়োগিক গুরুত্ব আজ আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। তাই আমি একাধিকবার বলেছি ‘অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু সঁংঃ নব ধঢ়ঢ়ষরবফ ধহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু রহ ঃযব পড়হঃবীঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয ভড়ৎ সধহু ুবধৎং ঃড় পড়সব’। আমি আরো বলেছি ‘তত্ত্বীয় জ্ঞানদানের পাশাপাশি, ক্ষেত্র গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামজিক, সাংস্কৃতিক ও দৈহিক নানা দিক সম্পর্কে বাস্তবিক ও জীবন্ত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মানববিজ্ঞানের গবেষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি জাগ্রত করতে হবে।’
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে মানববিজ্ঞান একটি পৃথক বিজ্ঞান এবং প্রায়োগিক বিজ্ঞান হিসেবে এখনো অপরিপক্ব বা ভ্রƒণাবস্থায়। মানববিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে অব্যাহত ক্ষেত্র গবেষণার মাধ্যমে ‘সামাজিক প্রতিশ্রুতি’ জাগ্রত করে একে একটি ‘বৈপ্লবিক বিজ্ঞানে’ রূপান্তরিত করতে হবে। মানববিজ্ঞান গবেষণার সামাজিক প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে মানববিজ্ঞানের অন্যতম জনক ম্যালিনস্কি থেকেই। ম্যালিনস্কি সঙ্গত কারণে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, মানববিজ্ঞান ভবিষ্যতে ফলিত বা প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানে পরিণত হবে। ম্যালিনস্কির মতে, “অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু সঁংঃ নবপড়সব ধহ ধঢ়ঢ়ষরবফ ংপরবহপব”। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, সমাজের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনয়নের জন্য ‘নতুন মানববিজ্ঞান’ তৈরি (হবি ধহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু) হবে; যাকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন, অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু ড়ভ পযধহমরহম হধঃরাব হিসেবে। লেভি স্ট্রসও তেমনটি চিন্তা করেছিলেন। তিনি পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় মানববিজ্ঞানকে পরিবর্তিত হতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, ‘অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু রিষষ ংঁৎারাব রহ ধ পযধহমরহম ড়িৎষফ নু ধষষড়রিহম রঃংবষভ ঃড় ঢ়বৎরংয রহ ড়ৎফবৎ ঃড় নব নড়ৎহ ধমধরহ ঁহফবৎ ধ হবি মঁরংব।’ বানেটও নৃবিজ্ঞানকে প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান হিসেবে দেখার প্রয়াস পেয়েছেন।
নিঃসন্দেহে আমরা আমাদের এসব পথিকৃৎ মানববিজ্ঞানীর কর্মে, লেখায় ও গবেষণায় অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং আমাদের দেশে মানববিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর চর্চা অব্যাহত রেখেছি। আমরা একদিকে যেমন সমাজ গবেষণায় মানববিজ্ঞান পদ্ধতির গুরুত্ব অনুধাবন করেছি, অন্যদিকে আমাদের অগণিত ছাত্র-ছাত্রীদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু গবেষককে এর সাথে সম্পৃক্ত করেছি। এ ধারায় আজ বহু গবেষক তাদের গবেষণাকর্ম সম্পাদন করেছেন, যা দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। এখন প্রয়োজন আরো বেশি বেশি প্রায়োগিক গবেষণা।
এ লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড অ্যানথ্রাপলোজি। একটি বিজ্ঞান বিকশিত এবং সমৃদ্ধ হয় এভাবেই। তাছাড়া গবেষক, বুদ্ধিজীবীদের একটি সামাজিক দায়িত্বও আছে। আমি মনে করি আমরা যারা আজ মানববিজ্ঞান পঠন-পাঠন, গবেষণা ও চর্চার সাথে যুক্ত আছি, তাদের এ দায়িত্ব পালনের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে যদি অন্তত কিছুকাল আমরা প্রায়োগিক মানববিজ্ঞান চর্চায় অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করি। প্রায়োগিক মানববিজ্ঞানীদের প্রধান কাজ হবে মানবকল্যাণের লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করা, তাদের অর্জিত জ্ঞান যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। শুধু আমাদের সামাজে তাদের কর্ম সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশে^র অন্যত্রও পরিকল্পিত পরিবর্তন সাধনে তারা সম্পৃক্ত হতে পারেন। হ
জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে মানববিজ্ঞান বা নৃবিজ্ঞান (অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু) মানুষের কল্যাণ সাধনে এ যাবতকালে কী ভূমিকা রেখেছে এবং ভবিষ্যতে এ ভূমিকা আরো কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে প্রসারিত...
