আসাদ চৌধুরী
স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন আজও

স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন আজও দিই নি বিক্রি ক’রে।

ওটাই ছিল বাকি, আমার নিজের বলতে একার,
অন্ধকারের কোলে ব’সে অনেক আকাশ দেখার
ভূতের গালে করতে আদর রাতে কিংবা ভোরে
কাঁপি নি তো ডরে, স্বপ্ন ছিল দু’চোখ ভ’রে।

গ্যাছে আমার অনেক কিছুইÑ শখের তেজারতি,
জলের দরে জমি জিরেত, তাসের ঘরের ক্ষতি,
প’ড়ে পাওয়া নিন্দাখ্যাতি এবং নিজের কেনা
আলসেমিটাই সঙ্গী, আমার সবার কাছে দেনাÑ
আগলে রাখি স্বপ্ন, ঘরে হাজার অভাব ঘোরে
স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন আজও দিই নি বিক্রি করে।

আল মুজাহিদী
স্বাজাত্যবোধের উদ্বোধন

আজ বিজয়ের দিন মহা মুক্তির দিন
স্বাজাত্যবোধের উদ্বোধনী দিন
রাঢ়-বঙ্গ-কলিঙ্গ-সমতট-হরিকেল বাংলার দিন
মৃত্তিকা প্রাণিত চিরায়ত বাংলার
স্বাধীনতা-স্বাধীনতা দিন
আজ আকাশে বাতাসে স্বাধীন-পতাকা উড্ডীন

চির বিস্মিত চির বিম্বিত চির শাশ্বত
Ñএই স্বাধীনতা
শতবিংশতিতম এই স্বাধীনতা
আমাদের আর তাহাদেরÑ
লক্ষ কোটি শহীদের শোণিত ধারায় সিক্ত সিক্ত
শারসশ্বত এই স্বাধীনতা
বাংলার স্বাধীনতা
বাঙালির স্বাধীনতা
বিজয়তু স্বাধীনতা
নব নব বিংশতির বিজয়-বৈজয়ন্তী জয়তি
জয়তি জয়তি জয়ন্তী মুক্তির পতাকা উড়ছে
Ñউড়–ক উড়–ক
আগামী আরো হোক উন্মুখ
চৌদিকে ফুটছে রক্তিম কিংশুক

হাসান হাফিজ
পরম চরম ত্যাগ

সাধারণ সূর্য সে তো নয়
রক্তসূর্য, স্বাধীনতা বলে ওকে ডাকি
সে এক আশ্চর্য পাখি
ডানায় রক্তের ছোপ সমুদ্র সমান
কার? কার??
শহীদের। লাখো শহীদের।
স্বাধীনতা পেতে এত রক্ত লেগেছিল।
পতাকার লাল সূর্য
তার তৃষ্ণা গভীর প্রচণ্ড ছিল
লক্ষ প্রাণ বলিদান ছাড়া
ওই বৃত্ত সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন হওয়ার মতো
অধিকার, প্রত্যয় রাখে না
তার স্পর্ধা, উড্ডীন থাকবার শক্তি
কে কবে জোগান দেবে? কোত্থেকেই বা দেবে
ওই রক্ত। কার? কার??
শহীদের। স্বাধীনতা-স্বপ্নিল-বিভোর।
এই সোঁদা মৃত্তিকার
সাহসী সন্তান সেই বীর শহীদের
পরম চরম ত্যাগ
সেই সঙ্গে মা-বোনের
তিতিক্ষা সম্ভ্রম।

ফরিদ আহমদ দুলাল
ঘুড়িকথা

ঘুড়ির ‘ডান্ডিফটাশ’ হলে কে আর সযতেœ তাকে বুকে ডাকে
পর্যুদস্ত জীবনে কে স্পর্শ পেতে তাকে শোভন বাঁধিয়ে রাখে;
কাছে রাখা আর দূরে থাকাতে ঘুড়ির কোনো পক্ষপাত নেই
ঘুড়ি ওড়ে নীলাকাশে ইচ্ছেটা ঘুমায় নাটাইয়েই।
ঘুড়ির আকাক্সক্ষা স্বপ্ন বাঁধা ‘কামানিতে’ বাঁধে সুতোয় মনও
আকাশ ঘুড়ির স্বজন মেঘেরা প্রতিপক্ষ এবং আত্মীয়।
বাতাস ছুঁয়েই ঘুড়ি ওড়ে নাটাইয়ের মনে যদি সাধ জাগে
দোবাজ এবং পঙ্খিরাজ হয় কারিগরের শিল্পিত অনুরাগে;
হাসে ঘুড়ি কাঁদে ঘুড়ি কোনোটাই নয় নিজ ইচ্ছায়
পা দু’খানি শৃঙ্খলিত তাই ঘুড়ি থাকে নিরুপায়।

জন্ম-মৃত্যু অসুখ-বিসুখ জানে না কখন হয়
শৃঙ্খলিত ঘুড়ির কি আর ডাক্তারের সাথে আছে পরিচয়!
শোক-তাপ বেদনাবোধ থাকে না ঘুড়ির নির্বোধ মনে
বিরোধ রাখে না ঘুড়িরা কখনও বুকে সঙ্গোপনে।
মুক্তি পেতে ইচ্ছে হলে সুতো ছিঁড়ে মুক্তির আনন্দে নিমগ্ন হও
দোষ-ত্রুটি চাপিয়ে অন্যের কাঁধে পবিত্রতার মুখোশ বও।
যত দোষ আর কলঙ্ক চাপাও ঘুড়ির কিছু-কি যায়-আসে?
প্রাণহীন ঘুড়ি ললাটে চন্দন মেখে কলঙ্কের গাঙে ভাসে।

তমিজ উদ্ দীন লোদী
নদী ভাসে পাথরের স্লাভের ক্যানভাসে

ভয়ঙ্করের ভেতর বেড়ে উঠছে ভ্রুণ
যদিও বারুদ খসে পড়ছে টোটেমের ভেতর
প্রাণ যেন মনুয়া পাখি, ঝরে পড়ছে তুলো হয়ে।

তবু বাজে রণসঙ্গীত
কমলা রঙের পাখি ওড়ে নদী ভাসে পাথরের স্লাভের ক্যানভাসে
বুক ঘষে মাতাল যৌবন, অনিশ্চিত পাখি শিস দেয়।

নির্বাসিত অন্ধকার সরিয়ে কোথায় যে চিলতে আলো
কোথায় যে সূর্যোদয়ের আভা
অলীক হরিণ শুধু দৌড়ে যায় সূর্যাস্তের ছায়া ঢেলে।

তবু ভোর হয়, সুপারি গাছের পাশ দিয়ে উদিত হয় সূর্য
একটি কি একাধিক পাখির রণসঙ্গীতে ভরে ওঠে চার পাশ।

শাহীন রেজা
জোছনা ছুঁয়েছে ঘাস

জোছনা ছুঁয়েছে ঘাস
আর রোদগুলো জুড়ে চেনা শালিকের বাস।

বুঝো না নদীকে ভুল
সে তো দীঘল আকাশে মেঘেদের জোড়াদুল।

না ডেকো না শ্রমঘরে
নুনে ঘামে একাকার শুয়োপোকা থরেথরে।

ঘুঘুদের চেনা দিনে
ওড়াও ঘুড়িটা আর ডুবে যাও প্রেমঋণে।।

মোশাররফ হোসেন খান
বাতাস ও বারুদ

মূলত আমি হেঁটে চলেছি নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে
শব্দহীন শব্দের ভেতর দিয়ে
প্রগাঢ় তিমির ও তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে
রৌদ্রহীন ও রৌদ্রকরোজ্জ্বলের ভেতর দিয়ে
প্রণয় ও প্রণতির ভেতর দিয়ে
প্রবল প্রশ্বাস ও প্রশান্তির ভেতর দিয়ে
স্রোত ও স্রোতহীনতার ভেতর দিয়ে
মারি ও মহামারীর ভেতর দিয়ে
আমি হেঁটে চলেছি দেশ-মহাদেশ
পৃথিবী ও মহাপৃথিবীর ভেতর দিয়ে
মহাকাশের ভেতর দিয়ে,
গ্রহানুপুঞ্জের ভেতর দিয়ে
নিয়ত নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে
তাবত উপেক্ষা ও ভ্রƒক্ষেপহীনের ভেতর দিয়ে
শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্যের ভেতর দিয়ে
অপূর্ণতা ও স্বপ্নহীনতার ভেতর দিয়ে
মানবতা ও মমতাহীন সময়ের ভেতর দিয়ে
লয় ও প্রলয়ের ভেতর দিয়ে
বিকাশ ও বিনাশের ভেতর দিয়ে
আমি হেঁটে চলেছি
আমি হেঁটে চলেছিÑ
বাতাস ও বারুদের ভেতর দিয়ে
আমি হেঁটে চলেছিÑ
জীবন ও মৃত্যুর ভেতর দিয়ে
হাওয়ার মেয়ে গো,
বাতাস ও বারুদের আগে কালবোশেখীর মতো
তুমিও জাগো!


হাসান আলীম
ভাপা পিঠার উত্তাপ

গরম ভাপা পিঠার ওমের মতন
মিঠে রোদের জোসনা
সারা শরীর হৃদয়জুড়ে উল্লাস জাগিয়ে দেয়Ñ
বিজয়ের উৎসবে ঝরে শিউলী ফুলের সুঘ্্রাণ-কলরব
কল-কাকলির ভিড়ে আমি হারিয়ে ফেলেছি
নাম না জানা অনেক শহীদের ঠিকানা,
আমরা কি হারিয়ে ফেলব
আমরা কি ভুলে যাবো আমাদের স্বর্ণগ্রাম
বীর সখিনার ইতিহাসÑ
পরপদ সেবা বৃত্তে ভৃত্যের মতো তৃপ্তির লেজ নাড়ব?
ভাপা পিঠার উত্তাপ জমে
কঠিন পাথর হয়ে গেছে।


সৈয়দ রফিকুল আলম
প্রতœশীলা

নিশ্চল নিস্তরঙ্গের অনুধ্যানে মৌনতার স্থির
অক্ষপুটে ধ্যানী বক যেমন শিকার প্রক্ষেপণে
আশার দীপিকা জ্বেলে সুচাগ্র দৃষ্টিতে বসে থাকে,
ঠিক তেমনি বিহ্বল তোলপাড় আনমনে আমি
বসে আছি হিল্লোলিত কণ্ঠরব প্রত্যাশায়, কিন্তু
নিসর্গ প্রান্তরে খুঁজে ফিরে দেখি, ধু ধু শূন্যে হাওয়া
দোল দোলনা কটাহে ঝিরিঝিরি পাতার আশ্লেষ।
মর্মে- সুগীত সুমন্ত টঙ্কারে বাজে না সম্মোহিত
ধ্বনি মাধুর্যের গীত। শুনি পাথরও কাঁদে, তারÑ
সময়ের অধিগ্রোতে - প্রতœমেরা নিকষ নিশ্চলে।
তুমি কোন পাথরের সৃষ্টিশীলে তৈরি, পাষাণের
হৃদয়ে ও মোম গলে-শ্রুতিমধুরে কখনও আত্মমগ্নে
রচে যায় শান্ত সুললিত সুরের মূর্চ্ছনা।
তুমি স্থাপত্যের কোন অন্ধকারে তৈরি বলবে কি?


রেজাউদ্দিন স্টালিন
উন্নয়ন

মানুষ হতে চায় অলৌকিক,
ছুটছে সেলফোনে দিগি¦দিক।

হৃদয় বলে কিছু থাকলে, প্রাণ
করতো অর্জন অনুধ্যান।

পলকে অদ্ভুত আয়ুর দাস,
সেলাই করে নীল অনুপ্রাস।

বাইশ শতকেও মৃত্যুদল,
স্বপ্ন গিলে খাবে অনর্গল।

মৃত্যু ভয়ে ভীত, দোরগোড়ায়
শান্তি নেই বলে স্বর্গে যায়।

মাতাল বিজ্ঞান চন্দ্র পার,
সাধ্য নেই তার ক্ষত সারার।

অন্ধ সামাজিক টানছে কান,
ঈসাও নেই হবে দৃষ্টি দান।

ক্ষুধা ও খাদ্যের দ্বন্দ্বে দিন
ক্রমশ ফিকে হলো; অর্বাচীন

জ্ঞানের গহ্বরে পতিত মন,
ইমেলে খোঁজ করে উন্নয়ন।


দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
প্রয়োজন ছিল

একটা দেহের প্রয়োজন ছিল
একটা স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের।
একটা মাটির প্রয়োজন ছিল
একটা জমিনেরÑ বেঁচে বেড়ে ওঠার।

একটা পিতার প্রয়োজন
একটা মাতারÑ একটা যতেœর
সুরক্ষিত গর্ভের।

একটি আকাশ চেয়েছিলাম উপরে
সূর্য নক্ষত্র চন্দ্ররা ঝরে ঝরে পড়ে।
একটা বাতাস বয়ে যাওয়া দরকার ছিল
শো শো গানেরÑ নিঃশ্বাসে প্রাণেরÑ
আর প্রয়োজন ছিল স্বাধীনতা
প্রয়োজন ছিল দিকনির্দেশনা- দীক্ষা
প্রয়োজন ছিল স¦প্ন
আর স্বপ্ন পূরণের।

সবই বুঝি পেয়েছি
এই মাটিতে-মাটির উপরে
বা মাটির ভেতরে।

শাহনেওয়াজ চৌধুরী
দেশ আমার, মাটি আমার

এখানে মাটির মায়ায় ঘুমিয়ে আছে শহীদের প্রাণ
হাজারো পাখি ডাকে, বুকে রাখা ফুলের ঘ্রাণ,
এখানে নদীরা ছোটে বুকে তার নীল নীল ঢেউ
কত যে সুখের সুর, খালি হাতে ফেরে না তো কেউ।
এখানে সগৌরবে কন্যা চায় জনকের চোখে
সম্ভ্রম হারানো নারী বেঁচে আছে সহস্র শোকে,
শোক আসে, শোক যায়; বেঁচে থাকে মাটির মায়া
দেশ আমার, মাটি আমার মমতার অপার ছায়া।


জামসেদ ওয়াজেদ
পিঁপড়া কাহিনী শেষে

বিমূর্ত সকাল এক বয়ে আনে শীত আর অতীত কাহিনী
তখনও বারুদ ঘ্্রাণে কেঁপেছিল এ ভূমির শতত পরত
পিঁপড়া কাহিনী শেষে জেগে ওঠে ঘোড়াশালা আর ঐরাবত
আরো জাগে এ ভূমিতে কৃষাণ যুবক বৃদ্ধা আমার বাহিনী

পিতার পায়ের ছাপ দেখে দেখে কত বীর দিয়ে গেছে প্রাণ
দেখবে দেখবে বলে কেবলি একটি ফুল সাজানো বাগান
ফুটেছিল সেই ফুল গেয়েছিল শুকপাখি বিজয়ের গান
ভূমিতে রক্তের দাগ সোঁদা মাটি এঁটেলে তো তারই প্রমাণ

আমার শহর থেকে আজকাল চুরি হয় দিনের আলোরা
আমাদের হস্তরেখা বোঝে না তো বিশেষজ্ঞ জ্যোতিষী প্রখর
সম্মানিত চোরগণ বিজয় শরাব খায় ঠিক অতঃপর
তফাত বোঝে না আজো এ ভূমিতে বাস করা সাদা ও কালোরা

তবুও বিজয় তুমি বারবার ফিরে এসো আমাদের হাতে
আমরা তোমাকে চাই সাহস ও বস্ত্রহীন শীতের প্রভাতে