আমি আজ নিষ্পাপ নির্বাক বৃক্ষের কথা বলছি। আজ পরিবেশ দূষণ, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পরিবেশের ওপর মানুষের নানা অনাচার অত্যাচার অবিচার এবং অবহেলার কারণে পরিবেশ স্বয়ং আমাদের দিক থেকে ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আমরা তার প্রতিফল নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মাধ্যমে পাচ্ছি। আমরা একটু আমাদের কারো স্বার্থের ব্যত্যয় ঘটলে নিজেদের মধ্যে লাঠালাঠি বন্দুক-গুলি-বোমা ছুড়তে কিম্বা গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে পোঁচ মেরে মারামারি করে কাউকে ধরাশায়ী করতে দেরি করি না। এমনকি সামান্য মতের অমিল হলেও অঘটন একটা না একটা ঘটিয়েই ফেলি। হায়! এমনও অসহিষ্ণু মানব জাতি আমরা!
কিন্তু বৃক্ষ আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। রোদে ছায়া দিচ্ছে। আর সে ছায়া প্রায়ই সুশীতল। আপন প্রয়োজনে আমরা সেই বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় নেই। নানান বৃক্ষে নানান ফল আর নানান বৃক্ষে নানান ফুল। সে ফল ও ফুল তো সবই পাখি-পক্ষী কিম্বা আমাদের জীবন ধারণের প্রয়োজনে নানা উপকারে আসে। বৃক্ষ ছাড়া মানুষ জীবজন্তু কি বাঁচে! আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিঃসৃত বিষাক্ত গ্যাস গ্রহণ করছে সে আর দিচ্ছে আমাদের জীবন ধারণের গ্যাস। তাই বলে বৃক্ষ তো আমাদের কারো কোনো ক্ষতি করে না। বৃক্ষের কাছ থেকে আমরা তো মহান ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তা হলে তো মানুষে মানুষে আর হানাহানি-রক্তারক্তি হয় না।
হায়! যে সুখের জন্য আমাদের এত ক্রোধ তার আয়ুষ্কালই বা কতটুকু? কেউ কি আমরা তা ভাবছি? কিন্তু যে ভাবছি না, তাও সত্য নয়। ভাবছি, কিন্তু সবাই মিলেমিশে যতটা তার গুরুত্ব দেয়ার দরকার, ততটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। তার পরিণাম আদৌ শুভ হচ্ছে না। নিষ্পাপ নিরীহ বৃক্ষ কেটে সাফ করে লাভ করছি দুঃখের মরুভূমি আর সযতেœ তাকে লালন পালন করে পাচ্ছি তার সুশীতল ছায়া, ঠাণ্ডা হাওয়া। শুধু কি তাই? ফলমূল কাঠকুটোও তো পাচ্ছি। বৃক্ষ লতাপাতা ছাড়া আমরা তো বাঁচিও না। শাকসবজি তো আমাদের নিত্যদিনের খাবার। এ ছাড়া আমাদের জীবন রক্ষাকারী ঔষধি বৃক্ষও তো কম কাজে আসে না। প্রায় প্রত্যহই আমরা কেউ না কেউ যে ওষুধ খাচ্ছি জীবন রক্ষার তাগিদে, তার কোনটাই বা বৃক্ষের নয়? শুধু ভেষজ নয়, এলোপ্যাথি কিংবা হোমিওপ্যাথি এর সবই ঔষধি বৃক্ষের অবদান! বৃক্ষ তার বুকে আশ্রয় দেয় নানা লতাগুল্ম, সরীসৃপ প্রভৃতি নির্বিবাদে। কত নিঃশব্দ নির্বিকার অমায়িক তার ব্যবহার!
প্রসিদ্ধ সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক যথার্থই লিখেছেনÑ প্রকৃতির যত উপহার মানুষের জন্যে... তার মধ্যে সুন্দর যা তার প্রেমকে জাগায়, সে এই পুষ্পমঞ্জুরি, যেন একটা চিন্ময় সেতু গাছে মানুষেতে। আমি ফুল ভালোবাসব, অপুষ্প, সপুষ্পক সব তরুর প্রতি আমার প্রেম অটুট রাখব। গাছ আমার পরমাত্মীয়, বিশ্বের সীমাহীন কান্তারে একমাত্র সজীব বন্ধু, আমাকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ অবলম্বন। আমার পরম ধর্ম, গাছের ভালো আমার ভালো। আমাদের প্রয়োজন একটা বৃক্ষবান্ধব সংস্কৃতিতে জাগরণ। এই নতুন প্রেমধর্মে আমার প্রবর্তনা-প্রেরণার মূল রয়েছে পুষ্পপ্রেমে, ফলকে খাদ্যাভাসে উপযুক্ত স্থানে স্থানদানে। এ দেশের সব রাজপথের ধারে থাকতে হবে ফলবান বৃক্ষ। পাখি খাবে এবং থাকবে, মানুষ খাবে এবং বাঁচবে। ... (পারুলের সন্ধানের ভূমিকা থেকে)।
হায়! মানুষ মানুষকে নানা অজুহাতে মারবে বলে কত না আধুনিক মারণাস্ত্র তৈরি করেছে! শুধু মানুষই নয়, মানুষ-পশু বৃক্ষাদিসহ সমগ্র জীবজগৎ ধ্বংস করার আণবিক বোমাও মানুষের করায়ত্তে! সেই সাথে হিংসা-বিদ্বেষ শাসন-শোষণÑ এসব অনাচার তো আছেই; তদুপরি স্বার্থসিদ্ধির তাগিদে অবিচার তো লেগেই আছে। মানুষের শত্রু মানুষ, অথচ মানুষই নাকি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ জীব! এই শ্রেষ্ঠ জীবকে কি কোনো হিংস্র পশু শ্রেষ্ঠ বলে কখনো স্বীকার করেছিল কোনো কালে?
হ্যাঁ, ধর্মগ্রন্থে আছেÑ আল্লাহর প্রিয় ছিল ইবলিশ-জিন। আগুন দিয়ে গড়া। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করে তাকে বললেন, মানুষকে সিজদা করো। ইবলিশ বলল, ওই সামান্য মৃত্তিকা দিয়ে গড়া মানুষকে আমি সিজদা করব না। আল্লাহ বল্লেন, তাহলে তুমি যাও নরকে (দোজখে) আর যারা তোমাকে অনুসরণ করবে তারাও ভোগ করবে ওই দুর্ভাগ্যময় নরকাগ্নি। আর তোমার যে সহযোগী হবে, সেও ভোগ করবে অন্তহীন নরক-যন্ত্রণা।
কিন্তু বৃক্ষ কত নিষ্পাপ, শান্তির আকর। তার সুশীতল ছায়ার মাধুর্যময়তা ভোগ করে আমরা সব সৃষ্টজীব সাময়িক সব ক্লেশক্লিষ্টতা থেকে পাই অমোঘ মুক্তি।
আমরা মানুষ যদি সব হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মানুষকে আপন বলে মিলেমিশে থাকি এবং সবাই মিলে অন্তহীন নিসর্গের বিমল আনন্দ উপভোগ করি, তাহলে কার কী ক্ষতি! তাতে তো সবারই উপকার, কারো তো কোনো ক্ষতি নেই।
লাইবনিজ তাই তো বলছেনÑ
‘নিসর্গের নিত্য বিমল আনন্দের ঐক্যতান আমাদের হৃদয়কে যে মানবিক উৎফুল্লতায় অবগাহিত করে, তার উত্তর জীবন বড় অমলিন। এই যে আনন্দের উৎকর্ষতা এর পেছনে রয়েছে অমোঘ যুক্তির অবতারণা আর যা কিছু নৈসর্গিক ঘটনাপ্রবাহ ঘটে যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে যথার্থ সঙ্গত কারণ।’
কবিও ওই সুরে সুর মেলাচ্ছেনÑ
‘স্বকপোলকল্পিত নানা মতবাদের দ্বন্দ্বে মানুষ যখন নিত্যই
তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে সংঘর্ষে লিপ্ত
তখন আমি আমার হৃদয়াবেগ সকলি উজাড় করে বলি বৃক্ষের কথা
আর নির্বিকার নিসর্গের সকল সুন্দরের কথা
বৃক্ষরা দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে লিপ্ত নয় কখনো
ওদের মূক শব্দাবলির সমারোহে
আপ্লুত হৃদয় আমার উল্লসিত হয়ে বলে
ওরা আমারই মিত্র
ওরা বলে না যুদ্ধের কথা
বলে না যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা
বলে না, আমরা প্রস্তুত হচ্ছি যুদ্ধ করব বলে
এবং বলে না, যুদ্ধ করেই আমরা যুদ্ধের হাত পাকাচ্ছি
ওরা দেয় প্রেম
অমিয় আচরণের পরম উপহার
ওদের শব্দাবলি আমি শুনতে পাই
পুষ্পাবলির অমৃত বর্ণে-গন্ধে
এবং ফলবতী হৃদয়ের ঐকতানে
যখন দেখি প্রজাপতি কিম্বা পাখিরা
এদিকে ওদিকে উড়ে যাচ্ছে
তখন আমার মনও উড়ে যায় ওদের সঙ্গে
এক অপূর্ব সঙ্গীতময়তায়
এই ঘৃণারহিত প্রেম আমাকে উদ্দীপ্ত করে
নিসর্গের অমোঘ চেতনায়
ওদের আচরণে আমি দেখতে পাইনে কোনো মানুষের কূটকামিতা
তাই ফল ও ফুলের এই জীবনময়তায় আমি পাই স্বর্গের ভোগ
অপার শান্তি!
তোমরাও এসো, আমার সঙ্গে হাত মেলাও
আমরা সকলেই এই নিসর্গের আশিস গ্রহণ করি
শান্তি লাভ করি, শান্তি, অপার শান্তি!’
আমি আজ নিষ্পাপ নির্বাক বৃক্ষের কথা বলছি। আজ সবাই আমার সাথে এসো, আমরা বৃক্ষের কাছে যাই, শান্তি পাই, বড় শান্তি!
‘আমি বৃক্ষ। আমায় ভালোবাসো, আমি তোমাদের ভালোবাসা দেবো। চাইনা তার কোনো প্রতিদান।’
আজ বিজয়ের দিনে আমরা এ শপথ নিতে পারিÑ বৃক্ষ নিধন করব না।
সুযোগ পেলে বৃক্ষরোপণ করব। বিজয় তো আনন্দের। উল্লাসের।
সুখের। বৃক্ষ আমাদের সুখই এনে দেবে। সুখ হলে বিজয়ের আনন্দ হবে
অনেক বেশি। হ
