ভোর হলে আর বিছানায় থাকতে মন চায় না মাহিনের। সারা দিন অনেক কাজ। বিশেষ করে সকাল তার কাছে অন্য সময়ের থেকে একটু বেশি দামি। কারণ, এ সময়টার ওপর নির্ভর করে দিনের মূল্যবান হিসাব। দিনের ব্যস্ততা তার রাতের ঘুমকে আরো নিবিড় করে তোলে। কখনো কখনো তার নাক-বাঁশির বিরক্তিকর শব্দ সংসারের অন্যদের ঘুম কেড়ে নেয়। তবু তাকে কিছু বলে না। কারণ তারা তার সুস্থতা আর স্বাভাবিকতার ওপর টিকে আছে। নিষ্প্রাণ মানুষের মতো এ পরিবারের অন্য দু’টি সদস্য। একজন দুনিয়ার আলো দেখে, মানুষ দেখে, মানুষের সুখ দেখে, কিন্তু নিজেদের দুরবস্থা দেখে দারুণ হতাশ হয়। অন্যজন এই ভেবে আশার আলো খুঁজে নেয়, একজন মানুষকে তো সৃষ্টিকর্তা ভালো রেখেছেন তাদের জন্য। হয়তো তাকে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবেন। একদিন তাদের এ অসহায় দিনগুলো কেটে যাবে। তারাও সুখের দিন গুনবে।
মাহিনের মা সুবর্ণা। দুই বছর আগে এক দুর্ঘটনায় দুটো চোখ হারিয়েছেন। এখন দিন আর রাত দুটোই তার কাছে সমান। বাবা মনজুর আলম। চাকরি করতেন একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে। মাইনে যা পেতেন এ দিয়ে সংসার কোনোমতে চলে যেত। দুই পয়সা জমানোর সুযোগ হয়নি কখনো। একদিন শিকার হলেন আকস্মিক দুর্ঘটনার।
মনজুর আলমের সেই দুর্ঘটনার সাথী ছিলেন তার স্ত্রী সুবর্ণা। মোটরসাইকেলে স্বামী-স্ত্রী খুলনায় সুবর্ণার বোনের বাড়ি যাচ্ছিলেন। মাহিন ছিল বাড়িতে। দিনটা ছিল রোববার। মাহিনের স্কুল খোলা। মাহিনও যেতে রাজি হলো না। তা ছাড়া মাহিন এমনিতেই একটু স্কুলপাগল। আর যা-ই করুক স্কুল কামাই করবে না সে। এ কারণে তাকে আর সাথে নেয়া সম্ভব হয়নি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ একটা প্রাইভেট কারের সাথে হাইওয়ের ওপর ধাক্কা লাগল তাদের মোটরসাইকেলের। মনজুর আলম ছিটকে পড়লেন হাতের ডানে। দ্রুতগামী একটি চলন্ত ট্রাক তার দুটো পা নিমেষেই পিষে দিলো। সুবর্ণা ছিটকে পড়েন বাঁ-দিকে রাস্তার পাশে একটা কাঁটাতারের বেড়ার ওপর। দুটো চোখে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। প্রথমে একটি চোখ হারালেও কিছু দিন পর অন্য চোখটিও নষ্ট হয়ে গেল। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হলো না। চরম দুর্দিন নেমে আসে তাদের সংসারে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পৈতৃক সম্পত্তি বলতে সুবর্ণা ও মনজুর আলমের তেমন কিছু ছিল না। দু’জনেই দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠা সাধারণ মানুষ। ভালোই ছিলেন তারা।
সংসারের হাল ধরতে হয় মাহিনকে। যখন অন্য দশটি শিশু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে ছুটে চলে, তখন তাকে বেরোতে হয় রুটি-রুজির সন্ধানে। মায়ের কথা ভেবে চোখে জল আসে। বাবার অসহায়ত্ব দেখতে পারে না। সে চায় বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে লেখাপড়া ছেড়েছে। রাস্তায় রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করছে সে। এ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে চলে তার সংসার। ভোর হলেই চোখেমুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। শহরে এসে এক কাপ চা আর একটা বিস্কুট দিয়ে সকালের নাশতা সেরে নেয়। চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষায় থাকে কখন পত্রিকা আসবে। আর দিনের কাজ শেষ করে দুপুর হওয়ার আগেই কখন বাড়ি ফিরবে। বাড়িতেও যে অনেক কাজ পড়ে আছে। মা অন্ধ মানুষ, কী করছে কে জানে!
কিছুতেই মন ভরে না তার। সে জানে, এভাবে জীবন চালালেও ভবিষ্যতে পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। গায়ে খেটেখুটে অনেক কষ্টে সে সম্পদশালীও হয়ে যেতে পারে, এ পথ হয়তো তার সামনে আসবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষ হওয়ার পথ তার শেষ হয়ে যাবে। তাই সে নিজের স্বপ্নটাকে বদল করেছে। দিনটা বেছে নিয়েছে কাজের জন্য। আর রাতটা তার লেখাপড়ায় ব্যয় হবে। ভর্তি হয়েছে একটি নৈশবিদ্যালয়ে। তাকে যে বড় মানুষ হতে হবে। একটা সোনালি ভোরের আলোর ঝলমলে রোদে এ পৃথিবীকে সুন্দর করে দেখবে সে।
ভোর হলে আর বিছানায় থাকতে মন চায় না মাহিনের। সারা দিন অনেক কাজ। বিশেষ করে সকাল তার কাছে অন্য সময়ের থেকে একটু বেশি দামি। কারণ,...
