অতীত সেটা, যা গত হয়েছে। বর্তমান তাই, যা চলমান। আর ভবিষ্যৎ হচ্ছেÑ অনাগত। বেশির ভাগ সময় মানুষ অতীত ও বর্তমান নিয়ে যৎকিঞ্চিত ভাবলেও ভবিষ্যত নিয়ে ভেবে শেষ করতে পারেন না। অর্থাৎ অনাগতকে নিয়েই মানুষের যত ভাবনা। কেমন হবে সে ভবিষ্যৎ। কি কি থাকবে তাতে, আর কি কি থাকবে না সেই ভবিষ্যতে, ইত্যাদি সব। দেখা যায়, যা এখনো আসেনি, কিংবা আসার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন অনাগতকে নিয়ে মানুষ চিন্তা করতে করতে কাহিল হয়ে ওঠেন। এই বিবেচনায় ভবিষ্যৎ শুধু মানুষের ভাবনার বিষয়-ই নয়, রীতিরকম আরাধ্যেরও বিষয় বটে। যে অনাগতকে মানুষ আরাধ্য করতে চাইছে, তারই বা অস্তিত্ব কেমন হতে পারে; সে ব্যাপারটিও গভীর থেকে দেখার অবকাশ থাকতে পারে।
এটি বলা একেবারেই অযৌক্তিক নয় যে, একজন মানুষের অতীত আছে, আর আছে বর্তমান। ভবিষ্যত আছে কি না তা নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। অতীত আর বর্তমানকে ঘষে ঘষে মানুষ যা বের করে আনে, তা দিয়ে পরবর্তীতে নিজেকে যেমন দেখতে চাওয়া হয়, সেটাকেই কেউ ভবিষ্যৎ বলতে চায়, কেউ চায় না। অনেকেই আছেন যারা সামনের সময়টাকে ভবিষ্যৎ বলেন। সামনে বলতে একেবারে সম্মুখকে যদি ভবিষ্যৎ না বুঝায়, তাহলে সামনের সময়টা কতখানি লম্বা হওয়ার পর তা ভবিষ্যৎ বোঝাবে সে অনুমানও আপেক্ষিক। অর্থাৎ সামনে অবারিত পথের কতখানি সময় অতিক্রম করতে পারাকে ভবিষ্যৎ বলা যাবে সেটা কিন্তু নির্দিষ্ট নয়। কারণ, মৃত্যু মানুষের ঘারের কাছেই ওঁৎ পেতে থাকে। ভবিষ্যতটা এই মৃত্যুর কাছে নগণ্যভাবে পরাজিত। হতে পারে মৃত্যু অবধিই মানুষের ভবিষ্যৎ। কিন্তু মৃত্যুই যে ভবিষ্যৎ হতে পারে, সে কথা তো আর এভাবে বলা যায় না। তাই স্বপ্নকেই ভবিষ্যৎ বলতে পারলে মন্দ হয় না। তাহলে ‘অতীত, বর্তমান আর স্বপ্ন’ এভাবে বলতে পারলে কেমন শোনাবে সেটা অনুমান করাও কঠিন হতে পারে।
প্রত্যেক মানুষের অতীত খুবই স্পষ্ট। বর্তমানও পরিষ্কার, স্বচ্ছ। কিন্তু প্রতিটি মানুষের ভবিষ্যৎ অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট। কাজেই বলা যেতে পারে, প্রত্যেক মানুষেরই অতীত আছে, বর্তমানও আছে, তবে ভবিষ্যৎ আছে কি না, কে বলবে? থাকলেও ধোঁয়াশা। আর ভবিষ্যতকে যদি স্বপ্নতে অনুবাদ করে নেই, তাহলে ভবিষ্যতের ধারণাটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অর্থাৎ স্বপ্নই ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতই স্বপ্ন। সে জন্য মানুষ স্বপ্ন নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে; নিজের অজান্তেই স্বপ্নের জাল বোনে। মানুষ যতদূর পারে, সেই স্বপ্নজালের রেখাতে বিচরণ করতে করতেই একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্ন বোনা মানুষ থামাতে পারে না। সে কারণে স্বপ্ন চলমান থাকতে পারে। কোনো একজনের বোনা স্বপ্নকে তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো একজন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। এভাবে স্বপ্ন একসময় সফলতারও মুখ দেখতে পারে।
এ কথা সত্য যে, একজন মানুষের ভবিষ্যৎ থাকতে পারে আবার না-ও থাকতে পারে, কিন্তু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ থাকে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ থাকে। একটি দেশের ভবিষ্যৎ থাকে। একটি ভাষার ভবিষ্যৎ থাকে। একটি প্রতিষ্ঠানেরও ভবিষ্যৎ থাকে। তেমনিভাবে একটি দর্শন বা মতবাদেরও ভবিষ্যৎ থাকে। এ সবের ভবিষ্যৎ কিন্তু অর্থবহ। ব্যক্তির ভবিষ্যৎ মৃত্যুর কারণে অর্থবহ হতে না পারলেও এরকম প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতকে অর্থবহ করা যায়। অসংখ্য মানুষ রয়েছেন যাদের নিজেদের ভবিষ্যতে আস্থা নেই কিন্তু তারা একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেন না। যেমনটি হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। বৈষম্যহীন একটি সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে উপভোগ করতে পারবে এই চিন্তায় আপ্লুত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে। জীবন উৎসর্গ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কাক্সিক্ষত সেই ভবিষ্যৎ আজো অর্থবহ হতে পারেনি। হতে পারল না কেন? তার উত্তর বের হয়ে আসে এদেশের দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অতীত ও বর্তমানকে বিশ্লেষণ করলে। সে বিশ্লেষণে দেখা যায়, যাদের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দায়িত্ব ছিল, তারা নিজেদের পরিবারের ভবিষ্যৎকে অর্থবহ করতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। সে জন্য একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি দেশ স্বাধীন থাকা সত্ত্বেও এই দেশের ভবিষ্যতকে অর্থবহ করা যায়নি।
পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যখন বাংলাদেশ হয়েছিল সেই ১৯৭১ সাল, তখন ছিল বাংলাদেশের বর্তমান কাল। এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সময়। অর্থাৎ, ১৯৭২ থেকে এই ২০১৯ সাল। এই ৪৭ বছর পুরো সময় ধরেই ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কাল। এই ৪৭ বছরে বাংলাদেশ তার ভবিষ্যতকে কিভাবে কতটা অর্থবহ করে তুলেছে তার সারমর্ম উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের যখন বর্তমান কাল, সেই সময় বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল সামাজিক সব সূচকে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনা। যেটাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে প্রচার করা হয়েছে। সে চেতনা বা স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। এ বৈষম্য শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন, বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে। এই ৪৭ বছরের ভবিষ্যতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশীদের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে মজুদদার, ভেজাল কারবারি, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী হিসেবে। এই সময়ের ভেতরে বাংলাদেশে এমন একটি জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠেছে, যে জনগোষ্ঠী মুনাফার লোভে জীবন রক্ষাকারী খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রয়োগ করছে। এই ভেজাল শুধু খাদ্যদ্রব্যে নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের ভেতরে মেশানো হচ্ছে, এমনকি ওষুধ-পথ্যেও ভেজাল দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতে এসে এমন একশ্রেণীর চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে, যারা চিকিৎসাসেবার নামে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়েছেন এবং দেদার সেখানে তারা চিকিৎসাবাণিজ্য চালিয়ে নিতে পারছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যতে দাঁড়িয়ে আমরা এমন একদল অভিভাবককে দেখছি, যারা টাকার বিনিময়ে সন্তানের পরীক্ষার আগাম প্রশ্নপত্র কিনে নিচ্ছেন এবং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি যেন একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এদেশ এমন একটি ভবিষ্যৎ অতিক্রম করছে যে, ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন সার্বোভৌম দেশের গৌরবকে ম্লান করে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান বিতর্কিত হয়ে ভেঙে পড়েছে। আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থা কুক্ষিগত প্রায়। সাংবিধানিক অবকাঠামো নড়বড়ে হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় বেড়েছে। বেশির ভাগ মানুষ তাদের নৈতিকতাকে ভুলুণ্ঠিত করেছে।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক এবং সেই বাংলাদেশে জনগণ তার ভোটাধিকার নিশ্চিন্তে প্রয়োগ করতে পারবেন। অথচ এই সময়ে এসে বাংলাদেশের জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। ভবিষ্যতের এই ৪৭ বছরে বাংলাদেশের সামাজিক ও মানবিক স্তরগুলোতেও বিপর্যয় লক্ষ করা গেছে। উল্লেখযোগ্য হারে মানুষে মানুষে, আত্মীয়-স্বজনে অনাস্থা ও অবিশ্বাস বেড়ে সৌহার্দের পরিবর্তে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সততা ও ন্যায়-অন্যায়বোধ লুট হয়েছে। খুন-ধর্ষণ, শিশু ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে এবং আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শিত হচ্ছে।
মানুষজনের মধ্যে এক ধরনের আত্মঘাতী ধারণা সৃষ্টি হয়ে তারা বিশ্বাস করতে চাইছে যে, এদেশে সৎ লোকের ভাত নেই, ঘুষ ছাড়া চাকরি নেই; ভালো লোকের ভোট নেই; আইন-আদালতে বিচার নেই; টাকা যার পকেটে, বিচারের রায়ও তার পক্ষে; ক্ষমতা যার দুনিয়াও তার; এই নেতিবাচক ধারণাগুলো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সময় নিয়ে তৈরি হয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে প্রতিবন্ধী করে তুলেছে। এই ধারণাগুলো একটি সমাজব্যবস্থার জন্য জাতিধ্বংসাত্মক ধারণা। এটি খুবই মারাত্মক এক সংক্রমণ। এত উন্নয়নের ভেতরেও যখন এই সংক্রমণগুলো সর্বাগ্রে প্রদর্শিত হতে থাকে, তখন বুঝতে হবেÑ একটি দেশ, একটি জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। এই অন্ধকারকে ঠেলে ফেলে দেয়ার মতো কোনো পরিকল্পনা বাংলাদেশের বিগত দীর্ঘ ভবিষ্যতেও দেখা যায়নি। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, অর্থবিত্ত-বৈভব দিয়ে দেশে খুন-ধর্ষণ-নির্যাতন ও নেতিবাচক সংক্রমণ বন্ধ করা যায় না। এসব বন্ধ করতে হলে দরকার সমতা ও সমৃদ্ধি। এই সমৃদ্ধি শুধু বিত্ত-বৈভবের ওপর নির্ভর করে না। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীতে অবিশ্বাস ও অনাস্থা থাকলে সে ঘরে দামি আসবাবপত্র থাকলেও সম্প্রীতি-সৌহার্দ ও ভালোবাসা না-ও থাকতে পারে। যে উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য আগে দরকার ছিল, সে উন্নয়নকে বাংলাদেশ এখনো ছুঁতেও পারেনি। মানবাধিকার ও অর্থব্যবস্থার সুষম-বিলিবণ্টন নীতি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। এই জায়গায় বাংলাদেশে কাজ হয়নি। বাংলাদেশের সমাজে এখনো মানবাধিকার উপেক্ষিত থাকতে পারছে। রাজনৈতিক কারণে মানুষ হয়রানি, গুম ও খুনও হচ্ছে। অথচ এসব হওয়ার কথা ছিল না। এ জন্য ছিল না যে, এসবের তিক্ততা বাংলাদেশীরা অনুভব করতে পেরেছিলেন একাত্তুরের আগেই। সে জন্য মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সশস্ত্র সংগ্রাম। কিন্তু দেশ পড়ে গেল গভীর এক ষড়যন্ত্রে। সক্রিয় হয়ে ওঠল দালালচক্র। দেশে সংঘবদ্ধ হতে থাকল মুনাফাখোর সম্পদলোভী পিশাচের দল। তাদের তৎপরতায় ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এসে দাঁড়িয়েছে আজ এই জায়গায়। সে জন্যই ১৯৭১ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের যে অঙ্গিকার করেছিল, সেই অঙ্গিকার এখনো পূরণ করতে পারেনি। তার মানে বাংলাদেশ সেই তিমিরেই রয়ে গেল না? এই তিমির থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে চাইলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া জরুরি। জরুরি হতে পারে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা গেলে অন্যান্য সমস্যা নিরসন করা অতি সহজতর হতে পারে এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে সমৃদ্ধির সাথে, স্বপ্নের পথে। হ
অতীত সেটা, যা গত হয়েছে। বর্তমান তাই, যা চলমান। আর ভবিষ্যৎ হচ্ছেÑ অনাগত। বেশির ভাগ সময় মানুষ অতীত ও বর্তমান নিয়ে যৎকিঞ্চিত ভাবলেও ভবিষ্যত নিয়ে...
