সেলিম খন্দকার একজন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক ও স্বনামধন্য লেখক। ছাত্র জীবনে প্রফেসর হওয়ার শখ থাকলেও হয়ে গেছেন লেখক। ছোটবেলা থেকে টুকটাক লেখার অভ্যাস ছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেটা যে জীবিকা হয়ে উঠবে, তা কে জানত। তবে ছোটবেলায় সেলিম খন্দকারের মা মালেকা বেগম ছেলের টুকটাক লেখা গোপনে পড়ে তখনই বুঝেছিলেন আগামী দিনে ছেলে একজন প্রতিভাবান লেখক হবেন। টিভিতে প্রায়ই তার লেখা নাটক প্রচারিত হয়, কলাম লেখার জন্য সম্পাদকের অনুরোধ রক্ষা করেন। মাসের প্রতিটি দিনই বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় ডুবে থাকা সেলিম খন্দকার, প্রতিবার বইমেলা এলে অনেকটা হাঁপিয়ে ওঠেন। হাঁপিয়ে না ওঠা ছাড়া উপায়ও তো নেই। বিভিন্ন প্রকাশকরা যেভাবে গল্প উপন্যাস লিখে দেয়ার চাপ দিচ্ছেন, তাতে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। রাত জেগে এভাবে লেখালেখির টেবিলে দেখে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় সেলিম খন্দকারের স্ত্রী নাসরিন। অবশ্য লেখক জীবনের এই এতটা বছর স্ত্রীর সাপোর্ট না পেলে আজ এভাবে নাম পরিচিতি পেতেন না তিনি।
একটা সময় ছিল, যখন মনে হতো তার লেখার এক নম্বর ভক্ত হচ্ছে তার তিন মেয়ে রোদেলা, নীলা আর নিঝুম। কিন্তু পরে কণার সাথে পরিচয় হওয়ার পর সেলিম খন্দকার বুঝতে পারলেন তার লেখার সেরা পাঠক হচ্ছে মিরপুরের কণা। বেশ ক’বছর আগে এক বিকেলে সেলিম খন্দকারের ফোনে কণার কল আসে।
প্রথমে ব্যাপারটা খুব একটা পাত্তা দিলেন না সেলিম খন্দকার। আজকাল অনেকেই তো কল করে। ভক্ত শুভাকাক্সক্ষী হাবিজাবি এসব বলে এক সময় চেনা হয়ে ওঠে। কিন্তু মাঝে মাঝে কণার কল পেয়ে এবং তার কথা শুনে সেলিম খন্দকার বুঝতে পারেন এই মেয়ে তার লেখার দুর্দান্ত পাঠক। সে যেভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার লেখার ব্যাখ্যা করেÑনিখাদ শুভাকাক্সক্ষী ছাড়া এমনটি আর কেউ করতে পারবে না। ধীরে ধীরে সেলিম খন্দকার জানতে পারেন, তার কোনো বই কণার বেশি প্রিয়, কোনো বই কম প্রিয়। তার লেখা কি কি উপন্যাস আছে কণার কাছে।
২
সেবার একুশে গ্রন্থমেলা আসি আসি করছে। সেলিম খন্দকার একদিন কণাকে ডাকলেন বইমেলায় দেখা করার জন্য। এক নম্বর শুভাকাক্সক্ষীকে দেখতে কেন জানি ইচ্ছা হলো তার।
সেদিন ছিল বইমেলার সতেরতম দিন। বিকেলে রঙধনু প্রকাশনীর স্টলে বসে আছেন সেলিম খন্দকার। এক ঘণ্টা আগে কণা রওনা দিয়েছে বলে তাকে জানিয়েছিলো। একে একে ভক্তরা তার বই কিনে অটোগ্রাফ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ ছবি তুলছে। তিনিও সানন্দে পোজ দিচ্ছেন। কিন্তু মনে মনে কণার অপেক্ষায় আছেন তিনি। তার তীক্ষè চোখ কণাকে খুঁজছে। বাইরে কত মেয়ে এসেছে মেলায়। সেলিম খন্দকার মনে মনে চাইছেন সেখান থেকে একটা মেয়ে এসে পরিচিত গলায় তাকে বলুকÑ‘এই যে স্যার, আমি কণা। নিউমার্কেট থেকে আপনার জন্য একটি খয়েরি কালার পাঞ্জাবি কিনেছি গিফট করবো বলে। বেদনা উপন্যাসে আপনি বারবার খয়েরি পাঞ্জাবির কথা লিখেছেন। খয়েরি পাঞ্জাবি আপনার খুব প্রিয়, তাই না? ’
সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। সেলিম খন্দকার কল দেন কণাকে। নম্বর বন্ধ। একি, কণা তার সাথে প্রতারণা করছে না তো। সেকি আসবে? নাকি মিরপুর থেকে আসতে লেট হচ্ছে। এক সময় মেলা সেদিনের মতো শেষ হয়ে যায় কিন্তু কণা আর আসে না। সেলিম খন্দকার কল দেন আবার। না নম্বর বন্ধ। আজ আসতে না পারলে মেয়েটার তো উচিত ছিল একটা কল করে জানিয়ে দেয়া।
৩
ছয় মাস পরের ঘটনা। এই ছয় মাসে একবারো কণার কল আসেনি সেলিম খন্দকারের ফোনে। একদিন সেলিম খন্দকার মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ চোখে পড়ে কণার সেইভ করা নম্বর। কল দেন। রিং ও হয়।
হ্যালো কে বলছেন?
আমি রিক্তা বলছি। কাকে চান?
কণাকে। একটু কণাকে দেন তো!
ইয়ে মানে। আপনি? আপনার পরিচয়?
প্লিজ কোনো প্রশ্ন না করে কণাকে দেন না।
আমি কণার বোন। কণা তো মারা গেছে।
হোয়াট?
ছয় মাস আগে মিরপুর থেকে বইমেলায় যাবার পথে কণা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। এই নম্বরটি তখন কণার কাছে ছিল এবং ফোনসহ হারিয়ে গেছে। ক‘দিন আগে আমি কাস্টমার কেয়ার থেকে নম্বরটা উঠালাম।
ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন সেলিম খন্দকার। মুখে কোনো কথা আসছে না। ওপার থেকে রিক্তার হাঁকডাকÑ‘হ্যালো, আপনার পরিচয়? প্লিজ কথা বলেন। আপনি কণার ক্লাসমেট নাকি? হ্যালো কথা বলছেন না কেন?’
সেলিম খন্দকার অচেতনের মতো মোবাইল কানে দিয়ে বসে আছেন।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী
