একটি শিশু যে সমাজে জন্ম গ্রহণ করে, সে সমাজের ভাষা এবং সংস্কৃতি তাকে পরাধীন করে ফেলে। আর এই পরাধীনতার মধ্যেই সে স্বাধীন। দুনিয়ার আসার পর সে তার মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা শেখে, সেটি তার মাতৃভাষা। যার কারণে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তার জীবনভর লক্ষ করা যায়। বিশ্বে হারিয়ে যাচ্ছে এমন ভাষার সংখ্যা দুই হাজার ৪৯৮টি। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, লুডউইগ জ্যামেনহফের ছদ্ম নাম অনুসারে এসপ্যারাস্তো ভাষার নামকরণ হয়। এসপ্যারাস্তো ভাষা হলো একটি কৃত্রিম ভাষা। লুই দ্য বোফ্রে নামক এক ভাষাবিজ্ঞানী কৃত্রিম এসপ্যারাস্তো ভাষাকে সংশোধন করে ১৯০৭ সালে ইদো ভাষা তৈরি করেন। এর কিছু আগে ১৮৮৭ সালে আন্তর্জাতিক ভাষার উদ্ভব ঘটে। পৃথিবীতে মিসরীয়রা প্রথম লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার করে। যার নাম হায়ারোগ্লিফিক্স। মানব শিশুর প্রথম ভাষার নাম বাবলিং।
শিশুর ভাষা উপলব্ধি নিয়ে গবেষণা করে ভাষাবিজ্ঞানী হ্যায়াস্ম কার্মউদ্ধার ডাটাবেজ ব্যবহার করে ইংরেজি ভাষায় শিশু হঁষষ ংঁনলবপঃ ঢ়ধৎধসবঃবৎ স্থাপায়ন পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, দুই বছর সাত মাস থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যে এটা দ্রুত বর্ধন হয়ে থাকে। বাক্যের উদ্দেশ্যকে চেনার ক্ষেত্রে ১০ থেকে বেড়ে ৭০ শতাংশ হয়। বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষা ছয় হাজার ৯০৯টি। বিশ্বের সবচেয়ে দেশী ভাষার দেশ পাপুয়া নিউগিনি ৮৩০টি। সর্বাধিক বিদেশী ভাষার দেশ যুক্তরাষ্ট্র। যার ভাষার সংখ্যা ১৮৮টি। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলে চৈনিক ভাষায়। সবচেয়ে বেশি সরকারি ভাষা আছে ভারতে যার ভাষা সংখ্যা ২২টি। ভাষাগুলো আসামিজ, বাংলা, ইংরেজি, গুজরাটি, হিন্দি, কানাগা, কাশ্মিরি, কোনকানি, মালেয়ান, মনিপুরি, মারাঠি, নেপালি, উড়িয়া, বোদো, দোগরি, সানতালি, পাঞ্জাবি, সংস্কৃতি, সিন্দি, তামিল, তেলেগু ও উর্দু প্রভৃতি। বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ ব্যবহৃত ভাষা। বাংলাদেশে মোট ব্যবহৃত ভাষা ৪৬টি। দেশী ৪২টি আর বিদেশী চারটি।
মা কথাটি যেমন মধুর, তেমনি মায়ের ভাষাও মধুর। অন্তরের অকৃত্রিম অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য মায়ের ভাষার বিকল্প নেই। তাই তো কবি বলেনÑ নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা/মিটে কি আশা। অথবা যারে যে ভাষে প্রভু করিল সৃজন/সেই তার মাতৃভাষা/অমূল্য সে ধন। ভাষার জন্য লড়াই করে বীরের মতো প্রাণ দিয়ে যে জাতি স্বাধীনতা আন্দোলন করে জয়ী হয়েছে, সে জাতি, তাদের স্থান দিতে হবে বিশ্বের দরবারে। জাতিসঙ্ঘে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ২৯ মার্চ ১৯৯৮। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে মর্যাদা দেয় এবং ৫ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা দেয় একুশে ফেব্রুয়ারিকে।
যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, তাদের ভাষার প্রতি দরদ আছে কি না ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে বিদেশের মাটি-মাতৃভাষা প্রেমিকদের ঘোরে ফেলে দিয়েছে। তারা শিকড়কে ধারণ করতে আজ ব্যর্থ হচ্ছে। দেশে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান মাতৃভাষায় রচনার পথকে প্রশস্থ করতে হবে এবং ভিন্ন ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতিকে মাতৃভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রে উৎসাহ এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। ভাষা সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রবাসীদের অবস্থা জানানোর জন্য আমি গত ২১ মে ২০০২ দৈনিক ইনকিলাবে ‘মাতৃভাষাচর্চার মাধ্যমে প্রবাসী পৃথিবীকে নান্দিনিক স্বদেশে পরিণত করা যায়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলাম। নিবন্ধে আমি বলেছিলামÑ আজ আমাদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। অশ্লীল নৃত্যগীতের সমারোহ হিন্দি ফিল্ম সেক্স ভায়োলেন্স ক্রাইমের ভরা ইংরেজি ছবির দাপটে বাংলা ভাষা আজ আগ্রাসনের শিকার। তা ছাড়া ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে বাংলার পূর্বাবস্থা নেই। শিশুরা আজ আর ঘুমপাড়ানি গান শুনে ঘুমাতে যায় না।
প্রবাসে বাংলাভাষার অবস্থা আরও ভয়াবহ। উদাহরণস্বরূপ কানাডার কথা বলা যায়। কানাডায় বসবাসকারী বাঙালিদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। এটা একদিকে যেমন আনন্দের সংবাদ, অন্য দিকে তেমনি চিন্তারও বটে। অনেকের ছেলেমেয়ে ইতোমধ্যে বাংলা ভুলে গেছে। কেউ কেউ ভুলতে শুরু করেছে। তবে একজন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এগিয়ে এসে বলেছেন, ‘আমাদের মৃত্যুর আগে পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা শেখানোর ব্যবস্থা করে না গেলে এ দেশে আমাদের অর্থাৎ বাঙালিদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাবে। আর সেটাই হবে অনেকটা আত্মহত্যারই সামিল। আত্মপ্রচারবিমুখ এই ব্যক্তির না ড. মহাদেব চক্রবর্তী। মুখভরা কাঁচা-পাকা দাড়ি। সাদাসিধে বেশভুষার মাঝারি গড়নের এই বৃদ্ধকে টাকা চাইতে শোনা যায়। টাকা না হলে কানাডার শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেন কিভাবে। ১৯৯১ সালের দীর্ঘ দিন রোগে ভুগে মহাদেবের স্ত্রীবিয়োগ হয়। স্ত্রী দীপ্তির ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রী মৃত্যুশয্যায় মাঝে মধ্যে অনুরোধ করে বলতেনÑ
এ দেশে ছাত্রদের কত কী পড়ালে, বাংলা ভাষা শেখানোর কি কোনো ব্যবস্থা করতে পারো না? কথাটা মহাদেবের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি যেন উন্মাদ হয়ে ছুটেছেন টাকার জন্য। তিনি একটি বৃত্তি তহবিল খুললেন। স্বউপার্জিত টাকা জমা করে ১৯৯৬ সালে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ হাজার ডলার। তিনি তার স্থাবর ও অবস্থাবর সম্পত্তি (তিন লাখ ৫০ হাজার ডলার সমপরিমাণ) এই তহবিলে যুক্ত হবে এই মর্মে একটি উইলও তৈরি করেন। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে উত্তর আমেরিকার সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশে লেখিকা খালেদা সিনহা কানাডায় যান। ‘আমরা ক’জন’ কর্তৃক আয়োজিত সম্বর্ধনা অনুষ্ঠোনে ড. মহাদেব চক্রবর্তীর সাথে তার দেখা হয়। লেখিকা তার ‘জীবনের পাতা থেকে নেয়া’ গ্রন্থের বিক্রয়মূল্যের সমস্ত অর্থ বাংলা শিক্ষার জন্য ওই তহবিলে দান করেন। মহাদেব মনে করেছেন, সুযোগের অভাব কিংবা ইংরেজি ও ফরাসি পরিবেশ দিনের বেশির ভাগ সময় কাটায় বলে যা কিছু বাংলা বলতে পারে সেগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের মতো শোনায়। সুযোগ পেলে এই সমস্ত ছেলেমেয়েরা কি মাতৃভাষা শিখতে চাইবে না? অবশ্যই চাইবে। তার প্রমাণ ক্রোয়েশিয়ান, চেগ, ফিনিশ, হাঙ্গেরিয়ান, পোলিশ, পাঞ্জাবি, সার্বিয়ান, ইউক্রেনিয়ান, মেসিডোনিয়ান ইত্যাদি ভাষাভাষী প্রায় ৪০টি দেশের ছেলেমেয়েরা। এরা টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের ভাষা শিখছে। তাদের কমিউিনিটি যদি অর্থ জুগিয়ে নিজের ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু রাখতে পারে তবে এত গর্বের বাংলাভাষা আমরা কেন চালু রাখতে পারব না। এই উদাহরণ মহাদেবকে প্রেরণা যুগিয়েছে। তার সহযাত্রী হিসেবে পাওয়া যায় ড. মিল্টন ইসরাইল, ড. দীপক মজুমদার ও তার স্ত্রী ড. পলিন মজুমদার। ড. ক্যাথেলিন স্বামী জোসেফ এরা সবাই বাংলাপ্রেমিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পারদর্শী। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বাংলা অন্তর্ভুক্তির জন্য এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে দীপক ও বিদেশিনী পলিন বাংলাভাষা দরদি হিসেবে সমাদৃত হওয়ার যোগ্য। এরাও তাদের সব বিষয় সম্পত্তি বাংলাভাষা শিক্ষাদান উপলক্ষে নিজেদের মৃত্যু-পরবর্তী উইল করে রেখেছেন। পলিনের সাথে ড. মহাদেব চক্রবর্তী যোগ দিলেন। দু’টি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য। যথাÑ ছাত্রবৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ সৃষ্টি এবং টিচিং ফান্ড তৈরি করা। এই দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে মহাদেব মাঠে নামলেন। নিরলস কর্তব্যকর্মের পথে পাড়ি দিতে লাগলেন। কোথাও উপেক্ষিত হলেন, কোথাও লাঞ্ছনার শিকার হলেন। কিন্তু তিনি হাল না ছেড়ে সামনের আশার দিকে যেতে লাগলেন। অনেক অবাঙালি ড. মহাদেব চত্রবর্তীর উদ্যোগকে সফল করতে এগিয়ে এসেছেন অথচ অনেক বাঙালি মহাদেবের প্রতি আছে অনীহা। বৃদ্ধকালে তার মহৎ উদ্যোগকে আসুন আমরা স্বাগত জানাই এবং মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করে নান্দনিক স্বদেশে পরিণত করেই বাংলাভাষা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক বিশ্ব বাংলা গড়ে উঠুক একান্তভাবে, এই আশা করি।
আজ মহাদেব চক্রবর্তী বেঁচে আছেন কি না জানি না। খালেদা সিনহা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার চর্চা আজ উদ্বেগজনক। মিডিয়ায় এবং অফিস-আদালতে বাংলা বা ইংরেজির ছড়াছড়ি। বাংলা ভাষাকে যদি শ্রদ্ধা না করা হয়, তাহলে শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। তারা জীবন উৎসর্গ করেছেন একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। আজ আমরা সেই শহীদদের কথা স্মরণ করি। সৃষ্টিকর্তা তাদের সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে স্থান দিক, এই কামনা করি। আকাশের তারকারাজি আজও মিট মিট করে জ্বলে। সূর্য পূর্ব গগনে উদিত হয়ে পশ্চিমাকাশে অস্ত যায়। রাত পোহালে পাখির কিচির মিচির শব্দ শোনা যায়। রাতে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ। যেন জগৎ ছুটে চলেছে গন্তব্যের দিকে, প্রাচীন নক্ষত্রকে সাক্ষ্য রেখে আমরা এই আলোয় উদ্ভাসিত ধরাতল ঝলমলে দেখতে চাই। যেখানে থাকবে না কোনো শয়তান-শকুনের দল, যারা ব্যবচ্ছেদ করেছিল শহীদদের পতাকাবাহী মিছিল। বিশ্ববাসী তোমাদের কথা বিস্ময় চিত্তে আদর-ভালোবাসায় চিরকাল মনের মণিকোটায় সংরক্ষণ করে রাখবে।
একটি শিশু যে সমাজে জন্ম গ্রহণ করে, সে সমাজের ভাষা এবং সংস্কৃতি তাকে পরাধীন করে ফেলে। আর এই পরাধীনতার মধ্যেই সে স্বাধীন। দুনিয়ার আসার পর...
