যখন মানুষের চেতনার সব রঙ রূপ রস গন্ধ বর্ণ একত্রিত হয়ে মনের ভেতর থেকে মুখে মুখে উচ্চারিত হয়ে প্রকাশ পায় তখন তাকে বলি ভাষা। ভাষাই মানুষের সব কিছুর সম্বল। জগতে সব কিছুরই ভাষা আছে। কিছু নির্বাক কিছু সবাক। ভাষাই মানুষকে প্রলুব্ধ করে। ভাষাই মানুষকে দূরে ঠেলে। তাই ভাষাই হওয়া উচিত সর্বোতকৃষ্ট। ভাষার ব্যবহারই জানা দরকার সর্বাগ্রে। ব্যক্তিজীবন থেকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে বিশ্বব্যাপী ভাষার ব্যবহারে চিন্তাশীল হওয়া একান্ত জরুরি। কেননা, ভাষা যখন যাচ্ছেতাই ব্যবহার হয় তখন তা মূল্যহীন, অথর্ব, বক বক ছাড়া আর কিছুই না। এরকম অজস্র বকবকানি কাক, কবুতর, মোরগ-মুরগির মধ্যে ঘটতেই থাকে, তাদের চাওয়া-পাওয়ার নিমিত্তে। তাদের চাওয়া-পাওয়া আশা-আকাক্সা আর আমাদের চাওয়া-পাওয়া এক না। তাদের ভাষার জন্য তাদের জবাবদিহিতা নেই। কিন্তু আমাদের ভাষার জন্য আমাদের জন্ম থেকেই জবাবদিহিতার দায় বহন করতে হয়। একান্ত আপন মনে নিজের কাছে যেমন তেমনি নিজের স্ত্রী-সন্তান, ভাইবোন, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, ঊর্ধ্বতন-অধঃস্তন সব স্থান-কাল-পাত্রে। তাই ভাষার কাঠামো সম্পর্কে প্রতিটি মানুষের সজাগ থাকা আবশ্যক। ভাষার মৃত্যু নেই, সে জেগে থাকে কোথাও না কোথাও। কারো না কারো মনে, চেতনে, অবচেতনে। ভাষা ঘুরে বেড়ায়, উড়ে বেড়ায়, জমা থাকে হিসাবের খাতায়। মানুষ তার মনের ভাব ব্যক্ত করবে। শক্তি থাকলে প্রতিষ্ঠা করবে। যৌক্তিক কি অযৌক্তিক সে হিসাব পরে। তার পর তা পালন করতে বাধ্য করবে। যে শক্তির কাছে অবনত সে মেনে নেবে। যে তা অযৌক্তিক অসম ভাববে, সে প্রতিবাদ করবে। প্রতিবাদের মাধ্যমও হবে ভাষা। ভাষা যত চৌকস, প্রতিবাদও তত মুখর। ভাষা যখন পথ হারায়, তখন মানুষ হয় শৃঙ্খলিত। ভাষা পথ হারায় অহঙ্কার হিংসায়। অহঙ্কার আর হিংসার পথ উন্মুক্ত হয় ভাষার অন্ধ বিশ্বাস আর অন্ধ অনুকরণে। অন্ধ বিশ্বাস আর অন্ধ অনুকরণের পথ ধরে ভাষার আলো যতই ঝলমল করুক। তার দ্বারা দেহ-মনে যতই উন্মত্ততা আসতে পারে, কিন্তু সূদুর বয়ে চলার পথের পাথেয় হবে না। শান্তি বিরাজ করবে না। প্রচণ্ড আলোয় পোকার দল, দল বেঁধে যতই আসুক, পাখা মেলে নাচুক। শেষ পর্যন্ত সে আলোতেই তার পাখা ধসে পড়ে। সে আলোতেই তার মৃত্যু অবধারিত। যে আলোয় মন পাখা মেলে উড়ে আসে, সে আলোতেই তার সব পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তাই ভাষাকে বুঝতে হবে, ভাষাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। ব্যক্তি বিশিষ্ট নয়, তার ভাষাই তাকে বিশেষিত করবে। সমাজ নয়, সমাজের ভাষাই তাকে জাগ্রত করবে। রাষ্ট্রের মানচিত্র শুধু নয়, তার আর্থসামাজিক ভাষাই তার দেশপ্রেমকে জাগ্রত রাখবে। তার ভেতরের অনুভূতিকে নাড়াতে থাকবে। তাকে ভালো ভাষায় ভালো ভাবায় উদ্বুদ্ধ করবে।
বাংলা আজ আমাদের মাতৃভাষা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তঝরা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা ভাষার মর্যাদা আজ বিশ্বদরবারে অনেক উঁচুতে। কেননা এ ভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী দিন ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এই অর্জন বাংলা ভাষার। বাংলায় কথা বলি, বাংলায় খাই, বাংলায় চলি, বাংলার কারণেই আজ বিশ্বের সব ভাষার জাতিসত্তার প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। যে যার ভাষায় কথা বলতে পারবে, চাপিয়ে দেয়া যাবে না অন্য ভাষা। মুখের ভাষার এই প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে আজ। কিন্তু মনের ভাষা? মানুষ মুখের ভাষায় মুখে মুখে যতই মুখরা হয়ে উঠুক, মন কিন্তু বিপ্তিই থেকে গেছে। মন এখন বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমার ভাষায় গুন গুন করে। মন এখন মশগুল চিত্তের বিনোদনে। মন এখন যত্রতত্র উদাসীন। মন এখন আর একান্ত আপন না। সে আপন হওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে মিলিত হওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না কোথাও। সে খায়, বাথরুমে যায়, সে হাঁটে, সস্তায় হাসে, পস্তায়, কান্তিতে ঘুমায়। সে পালিয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত নিজে, নিজের কাছ থেকে। কারণ তার নিজের কাছ থেকে নিজের জবাবদিহিতার ভাষা নেই। নিজের কাছেই নিজে ভাষাহীন অপরিচিত অচেনা। একটা মানুষ অনেকগুলো খণ্ডবিখণ্ড মন নিয়ে বিপ্তিভাবে নিজেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আজ বিচ্ছিন্ন, ল্যহীন উদাসীন। বাঁচার জন্য খাওয়া দরকার, খাওয়ার জন্য টাকা দরকার, টাকার জন্য চাকরি-বাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, ভালো-মন্দ কাজ-কারবার দরকার। চাকরি, ব্যবসার জন্য জানাশোনার দরকার। জানাশোনার মানে পড়াশোনা। আর এসবের জন্য মাঝে মধ্যে দরকার চিত্তের বিনোদন। চিত্তের বিনোদনের জন্য প্রয়োজন গান-বাজনা, নাটক-সিনেমা। নাটক-সিনেমা, নাচ-গান জমে না শরীরী ভাষা ছাড়া। সে ভাষায় দেহ মন অবশ করে দিয়ে ঘুম। এভাবেই জীবনের চলমান গতি। তার পর যখন গতিহীন বার্ধক্য, তখন চরম হতাশা, কাজহীন, সময় পেণের রাস্তাহীন দিন। ঘুমহীন রাত ছটফট। মস্তিষ্ক উদ্ভট চিন্তার বেড়াজালে অস্থির, অসুস্থ দেহ মন। ওষুধেও অকার্যকর। যৌবনে পালানোর যে পথ খোলা ছিল, সেই চাকরি-বাকরি, নাটক-সিনেমা আজ আর ভালো লাগে না, সব অর্থহীন অথর্ব মনে হয়। কি যেন নেই এখন, কোথায় যেন সে নিজে নেই। কী নেই সেই ভাষা। কোথায় নেই সেই ভাষা, খুবই অজানা আজ। অথচ সে ভাষা জানার খুব দরকার, মন খুবই উদগ্রীব সে ভাষা জানতে। সেই ভাষার খোঁজে কেউ মসজিদে, কেউ রাস্তায়, কেউ বারান্দায়, কেউ বিছানায় বিচ্ছিন্ন। ভাষার ভাষা না বোঝার কারণেই আজ সংশয়, সঙ্ঘাত, অশান্তি অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তাই ভাষা বোঝাটা আজ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। মানব সন্তান জন্মের শুরুতেই শব্দ করে কান্না করে। তাই সন্তানের জন্মের শুরুর কান্নার ভাষাটা সবার জন্য আনন্দের ভাষা। এই কান্নার ভাষা মায়ের মনকে আন্দোলিত করে। শিশুর কান্নার ভাষা মানে তাকে মুখে খাবার দিতে হবে। শুধু কান্নার দ্বারাই সে একের পর এক ভাষা তৈরি করে। কখনও কান্না মানে খাওয়া, কখনও কান্না মানে ঘুমাতে না পারা, কখনও কান্না মানে অসুস্থতা। শিশুর একই রকম কান্নার এরকম অনেক ভাষা তৈরি হয়। এভাবে শিশু থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে কিশোর তরুণ যুবা বয়স ও সময়ের সাথে সাথে ভাষার সুর পাল্টায়। মানে ভাষার অর্থ বদলায়। ভাষার বিভিন্ন অর্থ দ্বারাই মানব মন পরিচালিত হয়। তাই মানব মনকে প্রথমে ভাষা বুঝতে হবে। ভাষার দ্বারাই তার নিজেকে প্রথম থেকেই জানতে হবে, বুঝতে হবে, সে কে? সে কেন? কোথা থেকে কিভাবে এলো? কোথায় যাবে? কিভাবে যাবে? যাত্রাপথে কি কি বাধা আসবে? বাধা এলে কিভাবে জয় করতে হবে? তাকে জানতে হবে তার গন্তব্য পথ এবং পথের ভাষা। জীবনের শুরুতে এই ভাষা জানতে বুঝতে পারলে জীবনের কোনো পথই আর কঠিন পথ হবে না। শরীর অসুস্থ, দেহ জরাগ্রস্ত, কিন্তু মন মনোবল হারাবে না। অভাব-অনটন দুঃখ দারিদ্র্য মানব জীবনের এই অংশের মন সচেতন থাকবে। জয় করার স্পৃহা হারাবে না। অর্থ, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তিতে, অহঙ্কার হিংসা জেদ মনকে ধ্বংস করবে না। প্রতিহিংসাপরায়ন করে তুলবে না। কি তারুণ্য, কি যৌবন, কি বার্ধক্য, কোনো অবস্থাতেই মন চেতনা হারাবে না। ল্য ভুল করবে না। জগতের ভাষা জানা থাকলে ভাষার মানে বুঝতে পারলে জগতের সব সময়ই সব পরিস্থিতিকে বোঝা যেমন সহজ, অতিক্রম করাও তেমন কঠিন নয়। জীবন য় হবে, কিন্তু অবয় গ্রাস করবে না। সময় বয়ে যাবে, কিন্তু অপচয় হবে না। হিসাবের খাতায় জীবনের এই পাতাগুলো ভরাট থাকবে। জীবনে মৃত্যু আসবে, মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যাবে না। যে ভাষায় তার জীবনের খাতা ভরাট হয়ে আছে সেই ভাষাই একদিন জীবনের হিসাব মিলাবে। সে হিসাবে কেউ জয়ী কেউ পরাজিত। কেউ আনন্দিত, কেউ ধ্বংস। মনের এই ভাষার বিশ্বাসেই দেহ-মনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে একদিন।