ফেব্রুয়ারি মাসকে ভাষার মাস বলতে আমরা এক ধরনের স্বস্তিবোধ করি। এ মাসকে ঘিরে বাঙালির অনেক আবেগ, অভিজ্ঞতা আর অর্জনের ইতিহাস আবর্তিত। ভাবতে ভালো লাগে দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির পরিচিতি এখন বিশ্বপরিসরে। ফেব্রুয়ারি এলে প্রতি বছর আমরা নতুন করে বাংলা ভাষার প্রমিত প্রয়োগ নিয়ে ভাবতে শুরু করি। দিন গড়ালে মাসটি পেরিয়ে গেলে হাজারো কাজ আর চিন্তার ভিড়ে আবার হারিয়ে যায় আমাদের ভাষাকেন্দ্রিক ভাবনার প্রবলতা। আমার মনে হয়, এভাবে প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষার মর্যাদা অুণœ রাখা এবং তার প্রাসঙ্গিক বিস্তার আটকে পড়ছে অজানা কোনো নদীর অনতিক্রম্য চরে; আমাদের কাছে ধরা দিচ্ছে না বাংলা ভাষার আভিজাত্য আর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ব্যাপারাদি। পাশাপাশি অবহেলিতও থেকে যাচ্ছে সারা বিশ্বের সব মাতৃভাষার মর্যাদা এবং মাতৃভাষার প্রতি দরদি মানুষের দাবি। ভাষার প্রায়োগিক পদ্ধতি ও প্রকরণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর; সাহিত্য-শিল্পে এবং দাফতরিক ভাষার েেত্র আঞ্চলিকতার প্রসঙ্গ নিয়েও কম কথা হয়নি। উপভাষার লালন সংরণ সম্বন্ধে ভাষাবিদরা ভেবেছেন ভাবছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রায় ষাট বছর পরও পায়নি তার যথাযথ সামাজিক মর্যাদার প্রাপ্য ও প্রত্যাশিত আসন। বাংলা ভাষার প্রমিত বানান কিংবা যথার্থ উচ্চারণ প্রয়োগে আমাদের অনীহার জায়গাটি যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রচারমাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, পাঠকার্যক্রমসহ সব মাধ্যমেই চলছে ভাষার যথেচ্ছ বানান ও উচ্চারণের প্রবণতা, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনকি বাক্যগঠনেও অন্য ভাষার অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বাংলা ভাষা হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য ও আভিজাত্য (যেমন সংবাদ প্রতিবেদন বা অনুষ্ঠান সঞ্চালনের সময় কেউ কেউ বলছেন, ‘আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?’ বা ‘বলুন, আপনাকে আমি শুনতে পাচ্ছি।’ কিংবা নাটকের কোনো সংলাপে ‘তোমাকে আমি লাভ করি’ অথবা আমাকে ট্রাস্ট করতে পারো ইত্যাদি)। ভাষা প্রকাশের মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বই। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে পুস্তক প্রকাশনাকে শিল্প খাত হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ায় এবং প্রাসঙ্গিকভাবেই এই েেত্র কোনো নীতিমালা না থাকায় বিরাজ করছে ভয়াবহ অরাজকতা। নোটবই প্রকাশের অভয়ারণ্য সৃষ্টির মাধ্যমে জাতির সৃজনশীলতা বিনষ্টের মহাযজ্ঞ তৈরি করা হয়েছে। প্রকাশনা ও বিপণনেও রয়েছে দৃষ্টিগ্রাহ্য অস্বচ্ছতা। বইমেলা বিশেষত ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় সারা দেশে বই বিপণন হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পরিসরেও আমাদের বইয়ের বাজার খুবই সীমিত। ভিন দেশী বইও আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়। বিদ্যালয়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে আজো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ ছাড়া অভিধান ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বিষয় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার েেত্রও আমরা যথেষ্ট পরিমাণেই পিছিয়ে রয়েছি।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিাপ্রতিষ্ঠানে ভুল উচ্চারণে ইংরেজি শেখানোর বিষয়টি এক রকম যেন গা-সয়া রীতিতে পরিণত হয়েছে। আর দুঃখজনকভাবে বাংলা ভাষার যথার্থ শিা প্রদানের উপযুক্ত লোক বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়া যায়নি। ভাষা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক জ্ঞান পর্যন্ত নেই এমন শিকই সাধারণত বিদ্যালয়ে ভাষা এবং ব্যাকরণের প্রাথমিক পাঠ দান করে চলেছেন। অবশ্য এর জন্য তিনি দায়ী নন, এর সমূহ দায় শিাব্যবস্থাপনা ও শিাপ্রশাসনের। কাঠামোটিকে প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো হয়নি আজো। বছর বছর বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে; নিয়োগ দেয়া হচ্ছে হাজার হাজার শিক; কিন্তু নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না ভাষা শিায় উচ্চশিতি কিংবা প্রশিতি ভাষাশিক। সম্প্রতি প্রণীত শিানীতিতেও এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। সারা দেশে শিকদের প্রশিণ চলে বহুভাবে; কিন্তু তার প্রায়োগিক বাস্তবতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ভাষার প্রাসঙ্গিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ বর্তমানে একাধিক ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা কিংবা দাফতরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভাষার শুদ্ধচর্চা ও লালনকে প্রণোদনা দেয়ার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক প্রশিণ ইনস্টিটিউট এবং ভাষা পরিচর্যাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমিকে প্রাণকেন্দ্র হিসেবে রূপ দেয়া যেতে পারে; জেলাপর্যায়ে সরকারি প্রশিক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠা করা যায় ভাষা শিা ও প্রশিণের উপযুক্ত ভুবন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে ভাষার মর্যাদা, দাবি, আভিজাত্য, শুদ্ধতা রণাবেণের দায়িত্ব দিয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিকপর্যায়ে ভাষাশিক ও ভাষাপ্রশিক নিয়োগ দেয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এর পরিসর বাড়ানো যায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। আর নিয়মিতভাবে ভাষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রকাশনাকে উৎসাহিত করাও জরুরি। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রখ্যাত ভাষাবিদ এবং বহুভাষাবিদ পণ্ডিতদের জন্য উচ্চতর ও প্রায়োগিক গবেষণার েেত্রও তৈরি করতে হবে। চলচ্চিত্র, নাটক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে ভাষার প্রায়োগিক প্রশিণের ত্রেকে প্রসারিত করা যায় (ইংরেজি ভাষায় নির্মিত ভিঞ্চি পাওয়েল প্রণীত ও স্টুয়ার্ড অ্যালেন প্রযোজিত ভাষা শিাবিষয়ক সিরিয়ার মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা বার্নার্ড শ রচিত ও জর্জ কুকার পরিচালিত মুভি মাই ফেয়ার লেডির কথা মনে করতে পারি।) ভাষা প্রতিযোগিতা আয়োজন করার মাধ্যমে শিার্থী সমাজকে ব্যাপকভাবে ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগে অভ্যস্ত করে গড়ে তুলতে হবে। পোস্টার, প্রচারপত্র প্রভৃতির মাধ্যমে ভাষার প্রতি আমাদের নাগরিক দায়িত্ব বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব। টেলিভিশন ও রেডিওতে আলোচনা ও শিামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজনও নিশ্চয়ই এ েেত্র ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের রেডিও-টিভিতে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় অনুষ্ঠান, সঙ্গীত, নাটক, সিনেমা প্রভৃতি প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারলে দুনিয়াজুড়ে আমাদের মিডিয়া ও ভাষা অনুশীলনের পরিচিতি ও প্রসার বৃদ্ধি পাবে। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা কিংবা চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনালের মতো বাংলাদেশের সরকারি প্রচারমাধ্যমকে আন্তর্জাতিকমান ও পর্যায়ে উন্নীত করা যায়। আর ওই সময়ও বোধ করি আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ কিংবা আন্তর্জাতিক ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আর কতকাল অপো করতে পারি আমরা!
শিাপ্রতিষ্ঠানে শিক-শিার্থীদের মধ্যে শুদ্ধ বাংলা প্রয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে পারে উন্নয়নভিত্তিক সংস্থা ও ব্যক্তি। বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে বানানের প্রমিত নিয়ম ও উচ্চারণের রীতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সম্প্রতি নরসিংদী জেলার কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যাসোসিয়েশন ৩০টি বিদ্যালয়ে প্রমিত বাংলা বানান ও উচ্চারণের নিয়ম পাঠ্য হিসেবে চালু করেছে। আমরা সবাই হয়তো মানব যে, ভিত্তি মজবুত না হলে যেমন ভবন দুর্বল হয় তেমনি ভাষা শিার ভিত্তি শক্তিশালী না হলে জাতিগতভাবে ভাষার গৌরব ও মাহাত্ম্য ধসে পড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ে বাংলা ভাষার একটি কোর্স বাধ্যতামূলক করার কথা সাম্প্রতিককালে বারবার উচ্চারিত হয়েছে, অবশ্য এর বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ এখনো বক্তব্য আর কাগজের পাতায় খবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে কোর্স অনুমোদন নেয়া থাকলেও পড়ানো হয় না। এসবের পেছনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করছে বলে আমি মনে করি। নিজ ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে না পারলে কিভাবে একটা জাতি অপরের ভাষাকে শ্রদ্ধা জানাতে পারে আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। কেবল বিদেশপ্রীতি দিয়ে কারো কোনো কল্যাণ হতে পারে না; ভিন্ন ভাষার প্রতিও থাকতে হবে ভালোবাসা। বাংলাদেশে অফিস আদালতে বা কর্মেেত্র ব্যবহারিক বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য দরকার সরকারি আগ্রহ উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিজ্ঞাপনে ভাষা প্রয়োগের েেত্র অসচেতনতা কিংবা ইচ্ছা করে ভাষার অপপ্রয়োগের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নীতিমালাও গ্রহণ করা যায়।
ভাবলে অবাক হতে হয়, বাংলা ভাষার একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাকরণ বই আজো লেখা হয়ে ওঠেনি, যদিও বাজারে পাওয়া যায় শত রকমের বাহারি ব্যাকরণ বই। বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে পড়ানো হয় ব্যাকরণ নামক নি¤œমানের নোটবই। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি একটি বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশ করেছে বটে তবে তার প্রচার-প্রসার আশানুরূপ নয় আর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি তো সময়সাপে ব্যাপার। আর কালবিলম্ব না করে বাংলা ভাষার সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যাকরণ প্রণয়নে গ্রহণ করতে হবে বাস্তবভিত্তিক সরকারি উদ্যোগ। বিদ্যালয়ে পাঠ্য ব্যাকরণও নির্ধারণ করতে হবে সরকারকে। অভিধানকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করার জন্যও গ্রহণ। করতে হবে পদপে। কেননা সময় প্রবাহের সাথে সাথে সমাজগতিকে ধারণ করে ভাষােেত্র অনবরত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ।
আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি যে, প্রচারমাধ্যম সব দেশে সব কালে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রচারমাধ্যমে ভাষার প্রয়োগের েেত্র শুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ভাষার যথেচ্ছ প্রয়োগ রোধ করার জন্য বাংলা একাডেমি বা কোনো গ্রহণযোগ্য পাবলিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে বাংলা ভাষাকে যথাসম্ভব সহজীকরণ এবং অপোকৃত অধিক বোধগম্য করার জন্য বর্ণমালা সংস্কারের কথাও ভাবতে হবে। (ঋ স্বরবর্ণের তালিকায় থাকবে কি না, ঐ এবং ও না লিখে দ্বিস্বর হিসেবে ‘ওই’ ও ‘ওউ’ লেখা যায় কি না, ‘ৎ’ এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু, ণত্ববিধান কিংবা ষত্ববিধান আমাদের বংশধররা আর কতকাল তোতাপাখির মতো মুখস্থ করতে থাকবে? এসব জরুরি কিছু প্রশ্নে সংস্কার চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।)
প্রযুক্তির প্রবল প্রবাহের এই অনুকূল সময়ে বাংলা ভাষাকে ইউনিভার্সাল নেটওয়ার্কিং ল্যাঙ্গুয়েজের (ইউএনএল) আওতায় আনার ব্যাপারে গ্রহণ করতে হবে প্রয়োজনীয় কার্যাদি। পৃথিবীর অন্য ভাষাভাষীর কাছে বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভাষান্তরের (স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর) মহাকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে পারলে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য, শিল্প সাহিত্যসহ সামাজিক সাংস্কৃতিক যাবতীয় ভাবসম্পদ সম্বন্ধে অগণন মানুষ অবগত হতে পারবে, বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীও অনুরূপভাবে জানতে পারবে অপরাপর ভাষাভাষীর কৃষ্টিসমেত দরকারি সব বিষয়। আর এটি যথার্থরূপে সম্পন্ন করা গেলে বৃদ্ধি পাবে আমাদের আন্তঃভাষা যোগাযোগ। এমনটি করা গেলে ভাষার দাবি বিষয়ে আমাদের বর্তমান প্রত্যয়ের সাথে যুক্ত হবে এক বিস্ময়কর নতুন দিগন্ত। হ
